শেষ পর্যন্ত মরিয়া প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেও ইনদওরে তৃতীয় এক দিনের ম্যাচে নিউ জিল্যান্ডের কাছে হার মেনে নিতে হল ভারতকে। বিরাট কোহলির শতরান এবং হর্ষিত রানার লড়াই সত্ত্বেও ৩৩৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে ২৯৬ রানেই অলআউট হয়ে যায় টিম ইন্ডিয়া। এই পরাজয়ের ফলে ১ ২ ব্যবধানে এক দিনের সিরিজ হাতছাড়া হয় শুভমন গিলের দলের।
নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইনদওরে তৃতীয় এক দিনের ম্যাচে ভারতের পরাজয় শুধু একটি ম্যাচ হার নয়। এটি ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান কাঠামো দল নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিল। বিরাট কোহলি এবং হর্ষিত রানার মরিয়া চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হল না। আগে ব্যাট করে নিউ জিল্যান্ড ৩৩৭ রান তুললেও ভারত ২৯৬ রানেই গুটিয়ে যায়। ফলে ১ ২ ব্যবধানে সিরিজ হারতে হল শুভমন গিলের দলকে। ভারতের মাটিতে এই প্রথম এক দিনের সিরিজ জিতল কিউয়িরা যা ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই হার আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এর আগে ২০২৪ সালে টেস্ট সিরিজেও ভারতকে হারিয়েছিল নিউ জিল্যান্ড। ফলে অনেকের মনেই ফিরে এসেছে ১৯৮৭ সালের সেই স্মৃতি যখন পাকিস্তান ভারত সফরে এসে পর পর টেস্ট ও এক দিনের সিরিজ জিতে নিয়েছিল। যদিও নিউ জিল্যান্ডের ক্ষেত্রে পর পর সিরিজ নয় তবু এক বছরের ব্যবধানে দুই ফরম্যাটে ভারতের মাটিতে জয় মানেই বড়সড় বার্তা। বিশেষ করে এই দলটি সম্পূর্ণ নতুন এবং পরীক্ষামূলক হওয়া সত্ত্বেও তারা যে আত্মবিশ্বাস দেখাল তা ভারতীয় দলের জন্য অস্বস্তিকর।
এই সিরিজে আবারও প্রমাণিত হল বিরাট কোহলির গুরুত্ব। রান তাড়া করার সময় তাঁর মানসিক দৃঢ়তা এবং ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা এখনও অতুলনীয়। ৩৭ বছর বয়সেও তিনি দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটার। ১০৮ বলে ১২৪ রানের ইনিংসে ছিল দায়িত্ববোধ এবং জেদের মিশেল। পঞ্চম ওভার থেকে ৪৬তম ওভার পর্যন্ত ব্যাট করে তিনি একাধিক সঙ্গী বদলেও লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। তবে শেষ দিকে বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হওয়া ছিল অনিবার্য কারণ ততক্ষণে ম্যাচ কার্যত হাতছাড়া।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে ভারতের মিডল অর্ডার নিয়ে। শ্রেয়স আয়ার কেএল রাহুল এবং রবীন্দ্র জাডেজার মতো অভিজ্ঞ ব্যাটাররা যখন দলে থাকেন তখন কেন হর্ষিত রানার উপর ভরসা করতে হয়। তিনজনই আউট হয়েছেন দায়িত্বজ্ঞানহীন শটে। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী একটু ধৈর্য ধরে খেললে ভারতের জয়ের সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়ত। রাহুল অন্তত আগের ম্যাচে শতরান করেছিলেন কিন্তু এই ম্যাচে শ্রেয়স এবং জাডেজার শট নির্বাচন ছিল হতাশাজনক।
বোলিং বিভাগেও সমস্যার শেষ নেই। এক সময় ভারতের শক্তি বলে পরিচিত স্পিন আক্রমণ এখন কার্যত নিষ্প্রভ। কুলদীপ যাদব এবং রবীন্দ্র জাডেজা মিলে ১২ ওভারে ৮৯ রান দিয়ে মাত্র একটি উইকেট নিয়েছেন। বিপরীতে নিউ জিল্যান্ডের স্পিনারেরা অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত বোলিং করেছে। কুলদীপের মতো চায়নাম্যান স্পিনারকে যেভাবে অনায়াসে মারলেন কিউয়ি ব্যাটারেরা তা উদ্বেগজনক। পুরো সিরিজে তাঁর পারফরম্যান্স প্রত্যাশার ধারেকাছেও নেই। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে অক্ষর পটেলকে দলে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও।
রবীন্দ্র জাডেজার ভবিষ্যৎ নিয়েও জোরালো আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে। টি টোয়েন্টি থেকে অবসর নেওয়ার পর কি এক দিনের ক্রিকেটেও তাঁর সময় শেষের পথে। সাম্প্রতিক সিরিজগুলোতে না ব্যাটে না বলে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেননি তিনি। এক সময় মাঝের ওভারে নিয়ন্ত্রিত বোলিং এবং চাপের মধ্যে ব্যাটিং ছিল তাঁর ইউএসপি। কিন্তু এখন সেই রহস্য ভেদ করে ফেলেছে বিপক্ষ ব্যাটারেরা। এই ম্যাচেও কোহলির সঙ্গে জুটি গড়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় শটে আউট হয়ে যান তিনি।
রোহিত শর্মাকেও নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অধিনায়কত্ব হারানোর পর তাঁর ব্যাটিংয়ে আগ্রাসনের ঘাটতি স্পষ্ট। আগের মতো দ্রুত রান তুলে দলকে ভিত দেওয়ার চেষ্টা আর দেখা যাচ্ছে না। স্ট্রাইক রেট একশোর আশেপাশে থাকলেও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে সেই ইনিংসগুলি যথেষ্ট হচ্ছে না। সামনে টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থাকলেও এই সিরিজের গুরুত্ব উড়িয়ে দেওয়া যায় না কারণ কোচ গৌতম গম্ভীরের অধীনে প্রতিটি সিরিজই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মানদণ্ড।
সব মিলিয়ে এই সিরিজ ভারতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিরাট কোহলি এখনও অপরিহার্য কিন্তু তাঁকে একা লড়াই করতে হলে সাফল্য আসবে না। মিডল অর্ডার স্পিন বিভাগ এবং অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের ভূমিকা নিয়ে এখনই সিদ্ধান্ত না নিলে এক দিনের বিশ্বকাপের আগে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। এই হার শুধু একটি সিরিজ হার নয় বরং আত্মসমালোচনার সুযোগ যা কাজে লাগানোই এখন ভারতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
ভারত বনাম নিউ জিল্যান্ড সাম্প্রতিক এক দিনের সিরিজে হর্ষিত রানা নিঃসন্দেহে ছিলেন ভারতের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। এই সিরিজ শুরুর আগে খুব বেশি আলোচনায় না থাকলেও ইনদওরের তৃতীয় ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্স দেখিয়ে দিল ভবিষ্যতের জন্য তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন। কিছু দিন আগেই হর্ষিত জানিয়েছিলেন যে তিনি এখন নিয়মিত ভাবে ব্যাটিংয়ে বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন। ইনদওরের ম্যাচে তাঁর ইনিংস সেই কথার বাস্তব প্রমাণ হয়ে রইল।
ভারতের রান তাড়া যখন কার্যত ভেঙে পড়ার পথে তখন হর্ষিত ব্যাট হাতে দায়িত্ব নেন। চারপাশে একের পর এক উইকেট পড়লেও তিনি অযথা তাড়াহুড়ো না করে পরিস্থিতি বুঝে খেলেছেন। মাথা ঠান্ডা রেখে কী ভাবে বিপক্ষ বোলারদের উপর চাপ তৈরি করতে হয় তা হর্ষিত দেখিয়ে দিয়েছেন নিজের ব্যাটিং দিয়ে। শুধু মারমুখী শট নয় বরং সঠিক সময়ে আক্রমণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ষণ এই দুইয়ের ভারসাম্য ছিল তাঁর ইনিংসের সবচেয়ে বড় দিক।
এই সিরিজে ভারতের মিডল অর্ডারের ব্যর্থতার মধ্যে হর্ষিতের ব্যাটিং আরও বেশি করে চোখে পড়েছে। অভিজ্ঞ ব্যাটাররা যখন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না তখন এক জন তুলনামূলক নতুন ক্রিকেটার দলের লড়াই জিইয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। বিপদের সময় এমন মানসিক দৃঢ়তা যে কোনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের বড় সম্পদ এবং হর্ষিত সেই দিক থেকে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরেছেন।
বল হাতে হর্ষিত এই ম্যাচে তিনটি উইকেট নিলেও কিছুটা রান বেশি দিয়ে ফেলেছিলেন। তবে তিনি নিজেই তার জবাব দিলেন ব্যাট হাতে। বোলিংয়ে যে খামতি ছিল সেটার শোধ তুলতে ব্যাটিংয়ে বাড়তি দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা তাঁর চরিত্রের ইতিবাচক দিককে তুলে ধরে। যদিও শেষ পর্যন্ত ভারত ম্যাচ জিততে পারেনি তবু হর্ষিতের এই অলরাউন্ড লড়াই দলের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছে।
ভারত বনাম নিউ জিল্যান্ড এই সিরিজ ভারতের জন্য ফলের দিক থেকে হতাশার হলেও হর্ষিত রানা প্রমাণ করেছেন যে ভবিষ্যতের দলের কাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে তাঁর মতো ক্রিকেটারদের গুরুত্ব কতটা বেশি। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে সুযোগ পেলে নিজেকে শুধুমাত্র একজন বোলার হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না বরং দলের প্রয়োজনে ব্যাট হাতেও লড়াই করতে প্রস্তুত। এই সিরিজ থেকে ভারতের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হিসেবে হর্ষিত রানার নাম তাই আলাদা করে মনে রাখা হবে
সব মিলিয়ে রবিবারের ম্যাচটি হয়তো শুধু একটি সিরিজের শেষ ম্যাচ নয় বরং রবীন্দ্র জাডেজার এক দিনের কেরিয়ারের জন্য এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রইল। টি টোয়েন্টি থেকে অবসর নেওয়ার পর তাঁর ভবিষ্যৎ যে ধীরে ধীরে শুধু এক দিনের ক্রিকেটের দিকেই সীমাবদ্ধ হয়ে আসছে তা সকলেরই জানা ছিল। কিন্তু নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই সিরিজ এবং তার আগে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে পারফরম্যান্স নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে নির্বাচক এবং টিম ম্যানেজমেন্টকে।
এক সময় যিনি মাঝের ওভারে ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অস্ত্র ছিলেন সেই জাডেজা এখন আর প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের আটকে রাখতে পারছেন না। তাঁর বোলিংয়ের বৈচিত্র এবং লাইন লেংথ যে এক সময় ম্যাচের গতি বদলে দিত তা এখন কার্যত অনুপস্থিত। বিপক্ষ ব্যাটাররা অনেক আগেই তাঁর বোলিংয়ের রহস্য ভেদ করে ফেলেছে এবং সেই কারণেই তিনি এখন নিয়মিত ভাবে রান খরচ করছেন। উইকেট নেওয়ার ক্ষমতাও আগের মতো নেই যা শেষ ছয় ম্যাচের পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।
ব্যাট হাতেও জাডেজার অবদান ক্রমশ কমে এসেছে। চাপের মুহূর্তে দলের পাশে দাঁড়ানো এক সময় তাঁর বড় পরিচয় ছিল। কিন্তু নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইনদওরের ম্যাচে সেই পুরনো জাডেজার ছায়াও দেখা গেল না। বিরাট কোহলির সঙ্গে লম্বা জুটি গড়ে ম্যাচে ফেরার সুযোগ ভারতের সামনে ছিল। হাতে সময় ছিল উইকেটও ছিল। সেই পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে খেলাই ছিল সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় একটি শট খেলে আউট হয়ে যাওয়ায় ভারতের আশা কার্যত শেষ হয়ে যায়। ওই মুহূর্তেই বোঝা গিয়েছিল ম্যাচ আর ভারতের দিকে ফিরবে না।
এই ব্যর্থতা এক দিনের ক্রিকেটে জাডেজার ভূমিকা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন তুলছে। বর্তমান ভারতীয় দলে অলরাউন্ডারের জায়গায় প্রতিযোগিতা ক্রমশ বাড়ছে। অক্ষর পটেল হর্ষিত রানা কিংবা ভবিষ্যতের আরও কিছু নাম ইতিমধ্যেই বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে। সেখানে শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার জোরে দলে থাকা কি যথেষ্ট হবে এই প্রশ্ন এখন জাডেজার সামনেই দাঁড়িয়ে।
তবে এটাও অস্বীকার করা যায় না যে ভারতীয় ক্রিকেটে জাডেজার অবদান দীর্ঘদিনের। বহু ম্যাচে তিনি একা হাতে ফল ঘুরিয়ে দিয়েছেন। সেই কারণেই তাঁর কেরিয়ারের শেষ অধ্যায় কী ভাবে লেখা হবে তা নিয়ে আবেগ রয়েছে সমর্থকদের মধ্যেও। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আবেগ নয় পারফরম্যান্সেই চলে। নিউ জিল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ মিলিয়ে সেই পারফরম্যান্সই এখন তাঁর বিপক্ষে কথা বলছে।
এই ম্যাচ হয়তো জাডেজার শেষ এক দিনের ম্যাচ কিনা তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু এটুকু পরিষ্কার যে তাঁর কেরিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সামনে এক দিনের বিশ্বকাপ এবং তার আগে দল গঠনের প্রক্রিয়ায় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে ভারতকে। সেই সিদ্ধান্তে জাডেজার নাম থাকবে কি না তা নির্ভর করবে তিনি নিজে কত দ্রুত নিজের খেলায় পরিবর্তন আনতে পারেন তার উপর।