Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

„স্বর্ণব্যবসায়ীকে অপহরণ থেকে নিউ টাউনের ফ্ল্যাটে মারধর, সব জায়গায় রাজগঞ্জের বিডিও! পুলিশের হাতে মোক্ষম প্রমাণ“

বিধাননগর পুলিশের হাতে পাওয়া নতুন সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে যে রাজগঞ্জের বিডিও স্বর্ণব্যবসায়ী অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একাধিক স্থানে উপস্থিত ছিলেন। এই ভিডিও সামনে আসায় তদন্ত আরও জোরদার হয়েছে এবং ঘটনাটির নেপথ্যের রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ দিশা মিলেছে।

 


বিধাননগর এলাকার চাঞ্চল্যকর স্বর্ণব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ড ঘিরে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই প্রকাশ্যে আসছে নতুন নতুন তথ্য-প্রমাণ। শুরুতে এই ঘটনাটিকে সাধারণ অপরাধ বলেই মনে করা হচ্ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তদন্তকারীরা বুঝতে শুরু করেন যে এর পেছনে রয়েছে অনেক গভীর ষড়যন্ত্র, অনেক অজানা যোগাযোগ এবং এমন কিছু ব্যক্তির ব্যাপক ভূমিকা যাদের সম্পৃক্ততা সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারেননি। এই প্রেক্ষাপটে রাজগঞ্জের বর্তমান বিডিও-র নাম উঠে আসা স্বভাবতই রাজ্যজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পুলিশ যে নতুন সিসিটিভি ফুটেজ হাতে পেয়েছে তার প্রাথমিক বিশ্লেষণেই দেখা গিয়েছে যে স্বর্ণব্যবসায়ী অপহরণের বিভিন্ন ধাপ থেকে শুরু করে নিউ টাউনের ফ্ল্যাটে তার ওপর নির্মম নিপীড়নের ঘটনায় পর্যন্ত রাজগঞ্জের বিডিও-র উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই উপস্থিতি নিছক কাকতালীয় নাকি পরিকল্পিত, তা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে প্রশাসনিক মহল থেকে রাজনৈতিক অন্দরের বিভিন্ন স্তরে।

ঘটনার সূচনা হয় যখন ওই স্বর্ণব্যবসায়ীকে রহস্যজনকভাবে অপহরণ করা হয়। পরিবারের লোকজন প্রথমে ভেবেছিলেন ব্যবসায়িক কোনো শত্রুতার জেরে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, কারণ অতীতে ব্যবসার ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে কোনোরকম হিংসা বা মনোমালিন্যের পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এরপর যখন অপহরণকারীরা একাধিকবার তাঁর অবস্থান গোপন রেখে অদ্ভুতভাবে স্থান পরিবর্তন করছিল, তখনই সন্দেহ গভীর হতে থাকে। পুলিশও শুরু করে নিজেদের অনুসন্ধান। কিন্তু প্রাথমিকভাবে কোনো দৃঢ় সূত্র না পাওয়ায় তদন্ত দীর্ঘ সময় আটকে ছিল। অবশেষে যখন বিধাননগর পুলিশের তদন্ত দল গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ জোগাড় করতে সক্ষম হয় তখনই মামলার মোড় ঘুরতে শুরু করে। কারণ সেই ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায় যে অপহৃত ব্যবসায়ীকে নিয়ে যাওয়া কয়েকটি গাড়ির কাছাকাছি সময়ে রাজগঞ্জের বিডিও-ও উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করতে দেখা যায় তাঁদের।

ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, স্বর্ণব্যবসায়ীকে অপহরণের ঠিক পরেই গাড়িটি বিধাননগর এলাকা ছেড়ে একটি নির্দিষ্ট দিকে এগিয়ে যায়। পুলিশ সেই একই রাস্তায় দ্বিতীয় একটি গাড়ির গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করে এবং সেটি ছিল বিডিও-র সরকারি গাড়ি। এ ঘটনাকে প্রথমে কাকতালীয় মনে হলেও অন্যান্য ফুটেজে বারবার দুই গাড়ির একে অন্যের কাছাকাছি অবস্থান তদন্তকারীদের চমকে দেয়। উপরন্তু, নিউ টাউনের ফ্ল্যাট যেখানে ব্যবসায়ীকে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই বিল্ডিংয়ের প্রবেশপথের ক্যামেরায়ও ধরা পড়েছে বিডিও-র উপস্থিতি। তাঁকে গাড়ি থেকে নেমে বিল্ডিংয়ের লিফটের দিকে যেতে দেখা যায়। যদিও তিনি সেখানে কেন গিয়েছিলেন কিংবা কার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন তা এখনো স্পষ্ট নয়, কিন্তু পুলিশের ধারণা ক্রমশ শক্ত হচ্ছে যে তাঁর ভূমিকা শুধুই ‘ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা’ নয় বরং আরও গভীর সংযোগ থাকতে পারে।

ব্যবসায়ীর যন্ত্রণা এবং নির্যাতনের যে বর্ণনা তদন্তে উঠে এসেছে তা অত্যন্ত মর্মান্তিক। তাঁকে প্রথমে মানসিক চাপ দিতে একাধিকবার নতুন জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। কখনো শুনশান রাস্তা, কখনো অচেনা বাড়ির ঘর—প্রতিটি সেকেন্ডে তাঁর আতঙ্ক বেড়েই চলছিল। নিউ টাউনের ফ্ল্যাটটি ছিল সেই পরিকল্পনার সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়, কারণ সেখানেই তাঁকে নির্মমভাবে মারধর করা হয় বলে পুলিশের সন্দেহ। সেখানে উপস্থিত থাকার যে প্রমাণ মিলছে তা শুধুমাত্র অপহরণকারী দলের ওপর নয় বরং প্রশাসনিক দিক থেকেও বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। একজন প্রশাসনিক উচ্চপদস্থ কর্মীর এমন ঘটনায় সম্পৃক্ততা রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোর স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বিডিও-র ভূমিকা ঘিরে এখন অনেক প্রশ্নই উঠে আসছে। তিনি কি সরাসরি অপহরণ ও হত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, নাকি কোনো বিশেষ স্বার্থে সেই জায়গায় যাওয়া তাঁর প্রয়োজন ছিল, তা পুলিশ এখনো খতিয়ে দেখছে। তবে তাঁর উপস্থিতিই যে তদন্তের অগ্রগতিকে সম্পূর্ণ নতুন মোড় দিয়েছে তা বলা যায় নিশ্চয়ভাবেই। তাঁর ফোনের কল রেকর্ড, লোকেশন ডিটেলস, অফিসিয়াল লেনদেন—সবই এখন পুলিশের হাতে এবং সেগুলোর প্রতিটি খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। পুলিশের ধারণা, অপহরণের পরিকল্পনা দীর্ঘদিন আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল এবং সে পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপে কোনো না কোনোভাবে বিডিও-র নজর বা জড়িত থাকা সম্ভব। বিশেষ করে যেভাবে অপহৃত ব্যক্তিকে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে পরিকল্পনা সম্পর্কে অপহরণকারীদের যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। এ ধরনের জ্ঞান সাধারণ অপরাধীদের পক্ষে স্বাভাবিক নয়, ফলে সন্দেহ আরও গভীর হচ্ছে।

এদিকে রাজগঞ্জের বিডিও-র বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। শাসক দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইন নিজের মতো কাজ করবে এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো মন্তব্য করা অনুচিত। বিরোধীরা অবশ্য পুরো ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছেন এবং তাঁরা দাবি করছেন যে প্রশাসনে দুর্নীতির মাত্রা এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে তার ছাপ এখন মারাত্মক অপরাধের ক্ষেত্রেও উঠে আসছে। রাজ্যের বিভিন্ন সংগঠনও এই ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছে। তাঁরা মনে করছেন, এই মামলার সঠিক বিচার না হলে সাধারণ মানুষের প্রশাসনের প্রতি বিশ্বাস ভেঙে পড়বে।

news image
আরও খবর

যদিও বিডিও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে দাবি করেছেন যে ওই দিন ওই এলাকায় তাঁর উপস্থিতির পেছনে অন্য কারণ ছিল এবং তাঁর কোনো অপরাধমূলক জড়িত থাকার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু তাঁর বক্তব্য তদন্তকারীরা কতটা গুরুত্ব সহকারে নেবেন তা নিয়ে এখনই কিছু বলা কঠিন। কারণ পুলিশ যে ফুটেজ দেখেছে তা তাঁর কথার সঙ্গে কোনোভাবেই মিলছে না। উপরন্তু, তাঁর ফোনের তথ্য ও যাতায়াতের বহিঃপ্রকাশিত রুটও সেই একই দিনের বিবরণকে আরও সন্দেহজনক করেছে। তিনি যে সময়ে নিউ টাউনের ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেছিলেন, সেই সময়ই অপহৃত ব্যবসায়ীর সেখানে উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা পুলিশের নজরে এসেছে। যদিও ভেতরে কী ঘটেছিল তা দৃশ্যমান প্রমাণের অভাবে নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, কিন্তু তাঁর সেখানে থাকা নিজেই তদন্তের মূল ফোকাস হয়ে উঠেছে।

এই ঘটনার তদন্ত যত এগোচ্ছে ততই পরিষ্কার হচ্ছে যে পুরো বিষয়টি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। অপহরণের আগে ব্যবসায়ীর চলাফেরা খতিয়ে দেখা হয়েছে, তাঁর আর্থিক পরিস্থিতি জানা হয়েছে এবং তাঁর ব্যবসার গতিপ্রকৃতিও পরীক্ষা করা হয়েছে। অপহরণের পর তাঁকে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে এমন অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল যাতে তিনি ভেঙে পড়েন এবং যেটাই চাওয়া হবে সেটিই মেনে নেন। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী সব কিছু এগোলেও অপরাধীরা বুঝতে পারেনি যে এত সুরক্ষা সত্ত্বেও তাদের কিছু কার্যকলাপ নজরবন্দি হয়ে যাবে। শহরের বিভিন্ন মোড়ে লাগানো সিসিটিভিগুলোই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে এই তদন্তের মোক্ষম হাতিয়ার।

নতুন ফুটেজ সামনে আসায় পুলিশ এখন আরও আত্মবিশ্বাসী। তারা মনে করছে, এই মামলাটির প্রতিটি স্তর খুলে বের করতে এখন বেশি সময় লাগবে না। ইতিমধ্যেই সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। বিডিও-কে ইতিমধ্যেই নোটিশ পাঠানো হয়েছে এবং তাঁকে শীঘ্রই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজির হতে বলা হয়েছে। তদন্তকারী দল মনে করছে, তাঁর বক্তব্যের মধ্য থেকেই অনেক গোপন তথ্য বেরিয়ে আসবে। এই মুহূর্তে তাঁকে তদন্তে সহায়তা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি সহযোগিতা না করলে আইনগতভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে পুলিশের তরফে ইঙ্গিত মিলেছে।

এমন একটি মামলার তদন্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ এখানে জড়িয়ে আছে একদিকে একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর নির্মম মৃত্যু, অন্যদিকে প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মীর সম্ভাব্য ভূমিকা। ফলে পুরো বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা হচ্ছে। পুলিশ চাইছে যেন কোনো প্রকার ভুল বোঝাবুঝি বা বাহ্যিক চাপ তদন্তের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। তাঁরা মনে করছেন, সঠিক প্রমাণ উপস্থাপন করা গেলে এই মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।

ঘটনার প্রভাব পড়ছে স্বর্ণব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ওপরও। তাঁরা এখন আরও আতঙ্কিত। তাঁদের মতে, যদি একজন পরিচিত ব্যবসায়ীকে এইভাবে পরিকল্পনা করে অপহরণ করে হত্যা করা যায় এবং সেই ঘটনায় প্রশাসনের কোনো কর্মীর সম্পৃক্ততা থাকে, তবে নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর প্রশ্ন উঠতেই পারে। অনেকেই এখন তাঁদের ব্যবসার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও বাড়াচ্ছেন। কেউ কেউ আবার দুর্নীতির মাত্রা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং প্রশাসনের ওপর আস্থা টলে যাচ্ছে পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে।

তদন্তের শেষ পরিণতি কী হবে তা এখনো জানা যায়নি। কিন্তু একটাই কথা নিশ্চিত—এই মামলার পর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূচনা হবে। রাজ্যের মানুষ আশা করছে সত্য যেন সামনে আসে এবং যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তারা প্রত্যেকে আইনের কঠোর শাস্তি পায়। একজন নিরপরাধ ব্যবসায়ীর মৃত্যুর নেপথ্যে যে অন্ধকার ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে, সেটিকে ভেদ করাই এখন পুলিশের প্রধান লক্ষ্য। নতুন ফুটেজ পাওয়ায় তদন্তের পথ আরও প্রসারিত হয়েছে এবং তদন্তকারীরা বিশ্বাস করছেন, এই ঘটনায় জড়িত প্রতিটি ব্যক্তির মুখোশ শেষ পর্যন্ত খুলে যাবে।

এই মামলার পর থেকে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—কি কারণে একজন প্রশাসনিক আধিকারিক এমন একটি অপরাধমূলক ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারেন? তাঁর স্বার্থ কী ছিল, কার নির্দেশে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন বা আদৌ অপরাধীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল কি না—সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়াই এখন তদন্তের মূল চ্যালেঞ্জ। একদিকে মৃত ব্যক্তির পরিবার বিচার পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন, অন্যদিকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ করার দাবি জোরদার হচ্ছে। এই মামলার সুষ্ঠু সমাধান রাজ্যের প্রশাসনের স্বচ্ছতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে

Preview image