Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বর্ধমানে এটিএম ভেঙে টাকা লুটকাণ্ডে রাজস্থানবাসীকে মহারাষ্ট্র থেকে গ্রেফতার

বর্ধমানের একটি এটিএম লুটকাণ্ডে অবশেষে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হল এক অভিযুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে চলা তদন্তের পর পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ধরে তাকে আটক করে। ধৃতকে জিজ্ঞাসাবাদ করে লুটের ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও তথ্য জানার চেষ্টা চলছে। ঘটনায় আরও কেউ যুক্ত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা।

বর্ধমানে এটিএম লুটকাণ্ড: পুলিশের জালে এক অভিযুক্ত, ধীরে ধীরে খুলছে রহস্যের জট

বর্ধমান শহর ও সংলগ্ন এলাকায় এটিএম লুটকাণ্ড ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই আতঙ্ক ও উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। রাতের অন্ধকারে এটিএম ভেঙে লক্ষাধিক টাকা লুটের ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল। অবশেষে সেই ঘটনায় এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করল পুলিশ। এই গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে তদন্তে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে শুরু করেছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলার সাধারণ মানুষের মনে যেমন নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তেমনই প্রশাসনের উপর চাপও ক্রমশ বাড়ছিল। পুলিশি তদন্তে ধীরে ধীরে সামনে আসছে এমন সব তথ্য, যা এই লুটকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা চক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ঘটনাটির সূত্রপাত

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বেশ কিছুদিন আগে বর্ধমান জেলার একটি ব্যস্ত এলাকায় গভীর রাতে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের এটিএমে লুটের ঘটনা ঘটে। সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা এটিএমের শাটার ভাঙা ও ভেতরের যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গেই খবর দেওয়া হয় থানায়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ দেখে, এটিএম মেশিন সম্পূর্ণ ভাঙা এবং ক্যাশ ট্রে থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা উধাও।

প্রাথমিক তদন্তে অনুমান করা হয়, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবেই এই লুট চালানো হয়েছে। কারণ সাধারণ চুরির মতো নয়, বরং এটিএম মেশিন ভাঙার জন্য বিশেষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছিল। ঘটনাস্থল থেকে কিছু ভাঙা যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জামের চিহ্নও উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ দেখতে পায়, সাধারণ চুরির মতো কোনও তড়িঘড়ি কাজ নয়, বরং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এটিএম মেশিন ভাঙা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি কোনও অপেশাদার চোরের কাজ নয়। বিশেষ যন্ত্রপাতি ও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া এই ধরনের লুট সম্ভব নয় বলেই মত তদন্তকারীদের।

আতঙ্ক ছড়ায় এলাকায়

এটিএম লুটের খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়ায়। অনেক মানুষ তাঁদের নিত্যদিনের আর্থিক লেনদেন নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে কখনও এমন দুঃসাহসী লুটের ঘটনা এলাকায় ঘটেনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের ভূমিকা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে চাপ বাড়তে থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশি নজরদারি নেই। আবার কেউ কেউ এটিএমের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও দায়ী করেন। সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তদন্তে নামে পুলিশ

ঘটনার পরই বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করে পুলিশ। এটিএম সংলগ্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি, জেলার অন্যান্য এটিএমগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা শুরু হয়। তদন্তকারীরা প্রথমেই বুঝতে পারেন, এটি কোনও স্থানীয় ছোটখাটো চোরের কাজ নয়। এর পিছনে থাকতে পারে পেশাদার অপরাধচক্র।

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গভীর রাতে কয়েকজন মুখ ঢাকা ব্যক্তি এটিএমের সামনে আসে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা এটিএম মেশিন ভেঙে টাকা নিয়ে এলাকা ছাড়ে। পুরো ঘটনাটি এতটাই দ্রুত ঘটে যে আশপাশের কেউ কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ পাননি।
প্রথম ধাপে এটিএম সংলগ্ন এলাকা থেকে সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। আশপাশের দোকান, রাস্তা, বাসস্ট্যান্ড—সব জায়গার ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি এটিএমের প্রযুক্তিগত লগ ও ব্যাঙ্কের তথ্যও পরীক্ষা করা হয়।

প্রযুক্তিগত সূত্রে মিলল গুরুত্বপূর্ণ ক্লু

পুলিশ আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে তদন্তে নামে। মোবাইল টাওয়ার ডাম্প, যানবাহনের গতিবিধি, টোল প্লাজার তথ্য—সবকিছু খতিয়ে দেখা হয়। তদন্তে উঠে আসে, ঘটনার সময় ওই এলাকায় একটি নির্দিষ্ট রাজ্যের নম্বরপ্লেটযুক্ত গাড়ি দেখা গিয়েছিল।

এই সূত্র ধরেই তদন্ত এগোয়। বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য আদান-প্রদান শুরু হয়। অবশেষে পাওয়া যায় গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, যা পুলিশকে নিয়ে যায় রাজ্যের বাইরে।

মহারাষ্ট্রে গ্রেফতার অভিযুক্ত

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর পুলিশ মহারাষ্ট্র থেকে এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। ধৃত ব্যক্তির কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। প্রাথমিক জেরায় ধৃত ব্যক্তি এটিএম লুটের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলেও জানা যাচ্ছে, যদিও পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও সে বিষয়ে মুখ খোলেনি।

পুলিশের দাবি, ধৃত ব্যক্তি একটি আন্তঃরাজ্য অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত। এই চক্র দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এটিএম লুটের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।

ধৃতকে ট্রানজিট রিমান্ডে আনা হচ্ছে

গ্রেফতারের পর ধৃতকে ট্রানজিট রিমান্ডে বর্ধমানে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাকে আদালতে পেশ করে হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে পুলিশ। তদন্তকারীদের মতে, ধৃতকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও একাধিক নাম সামনে আসতে পারে।

news image
আরও খবর

আরও কেউ জড়িত?

এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ মনে করছে, একা একজনের পক্ষে এই ধরনের এটিএম লুট করা সম্ভব নয়। ফলে এর সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন যুক্ত থাকার সম্ভাবনা প্রবল। বিশেষ করে কারা পরিকল্পনা করেছিল, কে গাড়ি চালিয়েছিল, কে এটিএম ভাঙার কাজ করেছিল—এই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।

উদ্ধার হতে পারে লুটের টাকা

পুলিশের লক্ষ্য এখন লুট হওয়া টাকার বড় অংশ উদ্ধার করা। ধৃতের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালানোর প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ সূত্রে খবর, কিছু টাকা ইতিমধ্যেই উদ্ধার হতে পারে বলে আশাবাদী তদন্তকারীরা।

এটিএম নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবনা

এই ঘটনার পর ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন এটিএম নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। একাধিক ব্যাঙ্ক এটিএমে অতিরিক্ত সিসিটিভি, অ্যালার্ম সিস্টেম ও নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েনের কথা ভাবছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, অপরাধীরাও ততই কৌশলী হয়ে উঠছে। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও আধুনিক করতে হবে।

এই ঘটনার পর এটিএমের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক এটিএমে এখনও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। সিসিটিভি থাকলেও তা অনেক সময় কার্যকর হয় না, আবার কোথাও অ্যালার্ম সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করে না।

এই পরিস্থিতিতে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশংসা

দীর্ঘ তদন্ত ও আন্তঃরাজ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করায় পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করছেন অনেকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই গ্রেফতারি প্রমাণ করে পুলিশ চাইলে বড় অপরাধচক্রের নাগাল পেতে পারে।

সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া

ঘটনাটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ স্বস্তি প্রকাশ করছেন, কেউ আবার বলছেন, শুধু গ্রেফতারই যথেষ্ট নয়—পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে। অনেকেই চান, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। অনেকেই মনে করছেন, একটি গ্রেফতার যথেষ্ট নয়। পুরো চক্রকে ধরতে হবে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

এই এটিএম লুটকাণ্ড প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধুমাত্র একটি ঘটনার তদন্ত নয়, বরং ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধ কীভাবে আটকানো যায়, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।

পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনসচেতনতা—এই তিনটি বিষয়কেই বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

উপসংহার

বর্ধমানের এটিএম লুটকাণ্ডে এক অভিযুক্তের গ্রেফতারি নিঃসন্দেহে পুলিশের বড় সাফল্য। তবে তদন্ত এখানেই শেষ নয়। এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত পুরো চক্রকে চিহ্নিত করা, লুটের টাকা উদ্ধার করা এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধ রুখে দেওয়া—এই তিনটি লক্ষ্যই এখন পুলিশের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

এই ঘটনায় একদিকে যেমন আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, তেমনই পুলিশের তৎপরতায় মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছে। এখন দেখার, তদন্তের পরবর্তী ধাপে কী কী নতুন তথ্য সামনে আসে এবং শেষ পর্যন্ত কতটা বড় অপরাধচক্রের পর্দাফাঁস হয়।

Preview image