পূর্বস্থলীতে মুহুরি সুমন্তের রহস্যমৃত্যু নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। পুলিশের দাবি, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে বিষ খাইয়ে খুন করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দুইজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা গোটা ঘটনার পেছনে পূর্বপরিকল্পনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এলাকার মানুষ আতঙ্কে।
পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলীতে মুহুরি সুমন্ত মণ্ডলের রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা এলাকায়। শুরুতে এটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মনে করা হলেও, পুলিশের পরবর্তী তদন্তে উঠে এসেছে এক ভয়ংকর অভিযোগ—মুহুরিকে নাকি পরিকল্পিতভাবে বিষ খাইয়ে খুন করা হয়েছে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই প্রকাশ্যে আসছে নানান চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা গোটা ঘটনার রহস্যকে আরও জটিল করে তুলছে।
ঘটনার পর থেকে পরিবারের সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা, এমনকি আইনজীবী মহলে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কারণ মৃত সুমন্ত পেশায় একজন মুহুরি ছিলেন, অর্থাৎ আইনজীবীদের কাজে সহায়তা করা তাঁর নিত্যদিনের কাজ ছিল। তাঁর মতো একজন মানুষের এমন দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে ব্যথিত করেছে।
নিচে পুরো ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হল—
সুমন্ত মণ্ডল, বয়স আনুমানিক চল্লিশের আশেপাশে, স্থানীয় আদালতে বহুদিন ধরে মুহুরি হিসেবে কাজ করতেন। এলাকার মানুষ তাঁকে শান্ত, নম্র এবং দায়িত্ববান ব্যক্তি হিসাবে চিনতেন। তাঁর হঠাৎ মৃত্যু সকলকে অবাক করে তোলে। প্রথমে পরিবার ভেবেছিল অসুস্থতা অথবা স্ট্রোকের কারণে মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু দেহে কিছু অস্বাভাবিক চিহ্ন দেখে সন্দেহ হয়।
মৃতদেহ ময়নাতদন্তে পাঠানোর পর শুরু হল আসল রহস্য। চিকিৎসকের প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়, শরীরে বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এখানেই তদন্তের মোড় বদলে যায়। পুলিশ বুঝতে পারে এটি কোনো সাধারণ মৃত্যু নয়—এটি সম্ভবত একটি হত্যাকাণ্ড।
এরপরই পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে। প্রথমেই মৃতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হয়। তাঁর দৈনন্দিন জীবন, পেশাগত সম্পর্ক, কোনো শত্রুতা বা আর্থিক লেনদেন—সব খতিয়ে দেখা হয়। তদন্তে উঠে আসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা পুলিশের সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়।
তদন্তে পুলিশের নজরে আসে দু’জন সন্দেহভাজন ব্যক্তি—যাদের সঙ্গে মৃত সুমন্তের কাজকর্ম বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তাঁদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়। কয়েকদিনের মধ্যে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদেই উঠে আসে নতুন তথ্য, যা ঘটনার ধোঁয়াশা দূর করতে সাহায্য করে।
অবশেষে পুলিশ দুই জনকে গ্রেফতার করে। যদিও তদন্তের স্বার্থে তাঁদের নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবে পুলিশের দাবি—এদেরই মধ্যে রয়েছে মূল চক্রান্তকারী এবং বিষ প্রয়োগের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তি।
পুলিশ জানায়, সুমন্তকে পরিকল্পনা অনুযায়ী বিষ দেওয়া হয়েছিল। কীভাবে? কখন? কেন?—এসব প্রশ্নের উত্তরও ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকে।
তদন্তে জানা যায়, মৃত ব্যক্তি ঘটনাদিন রাতে দুই পরিচিত মানুষের সঙ্গে ছিলেন। তাঁদের মধ্যেই একজনের সঙ্গে চলছিল কিছুদিন ধরে আর্থিক এবং পেশাগত বিরোধ। ধারণা করা হচ্ছে, সেই সমস্যা থেকেই এই হত্যার পরিকল্পনা তৈরি হয়।
পুলিশের তত্ত্ব অনুযায়ী, খাওয়াদাওয়ার সময় সুমন্তের পানীয় বা খাবারে ধীরে ধীরে মেশানো হয় এক ধরনের শক্তিশালী রাসায়নিক বিষ। পরিমাণ এতটাই হিসেব করে দেওয়া যে, তা শরীরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যায় এবং সময়ের মধ্যে মৃত্যুও ঘটে।
চিকিৎসকদের রিপোর্ট বলছে, শরীরে ‘অর্গানিক পয়জন’-এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে—যা সাধারণত কৃষিকাজ বা স্থানীয় বাজারে মেলে। এই তথ্য পুলিশকে ঘটনার উদ্দেশ্য এবং পরিকল্পনার গভীরতা বুঝতে সাহায্য করেছে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন—
“এটি একেবারে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। শুধু মুহূর্তের উত্তেজনায় করা নয়। আগে থেকেই তৈরি ছিল পরিকল্পনা।”
মৃত সুমন্ত পেশায় মুহুরি হওয়ায় অনেক আইনগত বিষয়, কাগজপত্র, জমি-সম্পত্তির কাজে যুক্ত ছিলেন। পুলিশের মতে, যে কোনও মুহুরির ক্ষেত্রে মানুষজনের সঙ্গে বিরোধ হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। তবে সুমন্ত খুবই ভদ্র এবং পেশাদার মানুষ ছিলেন—এ কথা সবাই বলছেন।
তাই তাঁর মৃত্যুর পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে পুলিশ তিনটি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে—
অনেক সময় মুহুরিদের বিপুল অঙ্কের কেস-সংশ্লিষ্ট টাকা লেনদেন করতে হয়। কোনো ভুল বোঝাবুঝি, দেনাপাওনা বা প্রতারণার সন্দেহ থেকেই বিরোধ তৈরি হতে পারে।
আইনজগতের সঙ্গে যুক্ত মানুষের মধ্যে তথ্যভিত্তিক বা কাজনির্ভর শত্রুতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এর মধ্যে একটি ঘটনা তদন্তকারীদের নজরে আসে।
কিছু ব্যক্তিগত বিষয়ও পুলিশের নজরে এসেছে, যেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ মনে করছে, এ তিনটির মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত কারণ। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
মৃত সুমন্তের পরিবার শুরু থেকেই দাবি করছিল এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। তাঁদের বক্তব্য—সুমন্ত খুবই সুস্থ ছিলেন, কোনও বড় রোগে ভুগছিলেন না। হঠাৎ করে তাঁর এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।
সুমন্তের স্ত্রী বলেন—
“আমরা প্রথম থেকেই সন্দেহ করছিলাম। আজ পুলিশ যা বলছে তা পুরোপুরি সত্যি। আমার স্বামীকে ঠান্ডা মাথায়, পরিকল্পনা করে খুন করা হয়েছে।”
পরিবার পুলিশের ওপর আস্থা রেখেছে এবং দ্রুত অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
ঘটনার পর থেকেই পূর্বস্থলীতে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। স্থানীয় বাসিন্দারা অবাক—দেখতে সাধারণ একটি গ্রামে এমন ভয়াবহ হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে!
অনেকে বলছেন—
“এলাকার মানুষ শান্তিপ্রিয়। এমন ঘটনা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। একজন মুহুরিকে যদি এভাবে বিষ খাইয়ে খুন করা যেতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?”
স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্যরাও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনাটির তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র এসেছে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট থেকে। রিপোর্টে প্রথমেই শনাক্ত হয় অস্বাভাবিক বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি।
এরপর ফরেনসিক টিম মৃতদেহের অঙ্গগুলো বিশদভাবে পরীক্ষা করে। এতে নিশ্চিত হওয়া যায়—
• বিষ ধীরে ধীরে শরীরে প্রবেশ করেছে
• এটি খাবার বা পানীয়ের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল
• মৃত্যুর সময় বিষের প্রভাব চরমে পৌঁছেছিল
ফরেনসিক টিম আরও জানিয়েছে, এমন বিষ সাধারণত বাজারে পাওয়া যায়, যা সহজেই কেউ সংগ্রহ করতে পারে। তাই তদন্তকারীরা আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করছেন, কোন দোকান বা উৎস থেকে বিষটি কেনা হয়েছিল।
পুলিশ এই মামলাকে সম্পূর্ণ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে তদন্ত চলছে।
পুলিশ—
• সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখছে
• ফোন রেকর্ড বিশ্লেষণ করছে
• সন্দেহভাজনদের ব্যাংক ও কল ডিটেল পরীক্ষা করছে
• ঘটনাস্থলে প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে
• মৃতের ব্যবহৃত মোবাইল পরীক্ষা করছে
তদন্তকারীদের মতে, সমস্ত তথ্য মিলিয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি হচ্ছে। তাঁরা নিশ্চিত—সুমন্তকে খুন করা হয়েছে এবং এতে একাধিক ব্যক্তি জড়িত।
মুহুরির হত্যার ঘটনায় পুলিশ IPC-এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা প্রয়োগ করেছে—
• ৩০২ (হত্যা)
• ১২০বি (ষড়যন্ত্র)
• ৩৪ (একাধিক ব্যক্তির অভিন্ন উদ্দেশ্য)
এই ধারাগুলি প্রয়োগ করলে অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত চলার সময় আরও ধারা যুক্ত হতে পারে।
গ্রেফতার হওয়া দুই সন্দেহভাজনকে আদালতে পেশ করা হয়। বিচারক তাঁদের পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন তদন্তকারীরা।
জামিনের আবেদন জানানো হলে আদালত তা নাকচ করে দেয়। আদালতের মন্তব্য—
“অভিযুক্তরা গুরুতর অপরাধে জড়িত। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের বাইরে রাখা যাবে না।”
বাংলার বিভিন্ন জেলায় গত কয়েক বছরে বিষপ্রয়োগ করে খুনের ঘটনা বেড়েছে বলে পুলিশের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে। এর মূল কারণ—
• সহজে বিষের প্রাপ্যতা
• আর্থিক বিরোধ
• পারিবারিক কলহ
• পেশাগত শত্রুতা
• প্রতিহিংসামূলক মনোভাব
সুমন্তের খুনের ঘটনাই সেই চক্রের আরেকটি দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই ধরনের ঘটনা রোখা সম্ভব প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, স্থানীয় মানুষের সতর্কতা এবং দোকানগুলির দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে।
যে রাসায়নিক থেকে বিষ তৈরি হয়, তা বিক্রির সময় দোকানিদের ক্রেতার পরিচয় নেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত বলে মনে করছেন অনেকেই।
তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। খুব শীঘ্রই পুলিশ পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট দাখিল করতে চলেছে। চার্জশিটে—
• ঘটনার সময়রেখা
• কিভাবে বিষ দেওয়া হয়েছিল
• কারা পরিকল্পনায় ছিল
• কোন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়
• উদ্দেশ্য কী
সব বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকবে।
পুলিশ দাবি করছে—
“আমাদের কাছে পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে। দোষীরা শাস্তি পাবেই।”
সুমন্তের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা এলাকার মনোকষ্টের কারণ। তাঁর মতো শান্ত স্বভাবের মানুষের এমন নির্মম মৃত্যু সকলকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
পরিবারের এক আত্মীয় বলেন—
“আমরা শুধু চাই আদালত দ্রুত বিচার করুক। আমার দাদা নির্দোষ ছিলেন। তাঁকে যেভাবে খুন করা হয়েছে, তার যথাযথ শাস্তি যেন হয়।”
স্থানীয় মানুষও একই দাবি জানাচ্ছেন।
পূর্বস্থলীর এই ঘটনা প্রমাণ করে—মানুষের লোভ, শত্রুতা এবং প্রতিহিংসা কোথায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে তার কোনো সীমা নেই। একজন পেশাদার মুহুরিকে পরিকল্পনা করে বিষ খাইয়ে খুন করার মতো নির্মম ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন গোটা এলাকায় নিন্দার ঝড় উঠেছে।
পুলিশের তদন্তে সত্য সামনে এসেছে। কিন্তু ন্যায়বিচার মিলবে আদালতের রায়ের পরই। এ ঘটনার পর প্রশাসনও সতর্ক হয়েছে।
অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হবে—এই আশায় এখন তাকিয়ে আছে সুমন্তের পরিবার এবং পূর্বস্থলীর মানুষ।