ভারতের বৃহত্তম বেসরকারি বিমান সংস্থা ইন্ডিগোকে ঘিরে সাম্প্রতিক যে অপারেশনাল বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, তা গোটা দেশের বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় বড়সড় আলোড়ন ফেলেছে। ডিসেম্বরের শুরুতেই একের পর এক ফ্লাইট বাতিল, দীর্ঘ বিলম্ব এবং যাত্রী ভোগান্তির ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়ে যায় ইন্ডিগোর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা। পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার নেয় যে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয় ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন বা DGCA।
ডিসেম্বর ২০২৫-এর শুরুতে ভারতের বেসরকারি বিমান সংস্থা IndiGo ব্যাপকভাবে ফ্লাইট বাতিল এবং চলমান অপারেশনাল বিশৃঙ্খলার মুখোমুখি হয়, যা এক অনাবশ্যক অভ্যুদয় এবং সংকটগ্রস্ত বিমানযাত্রার পরিস্থিতি তৈরি করে। এতে লক্ষ লক্ষ যাত্রী প্রভাবিত হন ও দেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। পরে এই ঘটনাকে “ইন্ডিগো ফিয়াসকো” হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই বিশৃঙ্খলা মূলত নতুন নিয়ম, পরিকল্পনার ত্রুটি, নিয়মিত ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রক তদারকির অভাবে আরও বৃহত্তর রূপ নিয়েছিল।
এ বিষয়ে পরে Directorate General of Civil Aviation (DGCA) কর্তৃপক্ষের উপরও নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষগত পদক্ষেপ ও সমালোচনা চলে এবং অনেকেই মনে করেন এই ঘটনাটি ভারতের বিমানপরিচালনা ব্যবস্থায় একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিসেম্বর ২, ২০২৫ থেকে IndiGo-এর ফ্লাইট অপারেশনগুলোতে বড় ধরনের গড়বড় শুরু হয়। বেশিরভাগ বড় শহর — যেমন দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদ — সহ বিভিন্ন রুটে দেরি ও ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা দেখা যায়। এ সময় দ্রুতগতিতে বিমান সংখ্যা ও ক্রু পরিচালনার সমস্যা দেখা দেয়।
ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রায় ৪,০০০+ ফ্লাইট বাতিল হয়।
বিশেষ করে ৫ ডিসেম্বর একদিনে প্রায় ১,৬০০ ফ্লাইট বাতিল হয়।
নেটওয়ার্কের অন্যান্য দিকেও ব্যাপক গড়বড়ের কারণে বিমান অপারেশন সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।
এই বিশৃঙ্খলা শুধুমাত্র একটি সাধারণ বিপর্যয় ছিল না — এটি এমন একটি কৌশলগত ব্যর্থতা ছিল, যা পূর্ণভাবে আগে থেকে পরিকল্পিত নাও ছিল। ফলে বাতিল ফ্লাইটের সংখ্যা পেছনে ধাবিত হয়ে যাওয়া ক্রু ও পাইলট শিডিউল, কুয়াশা ও আবহাওয়া চাপ, এবং অন্যান্য অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তগুলো মিলিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে।
এই বড় গড়বড়ের কিছু মূল কারণ ছিলঃ
নতুন Flight Duty Time Limitation (FDTL) নীতির শুরু – পাইলট ও ক্রুর কাজের সময় এবং বিশ্রামের নীতিতে পরিবর্তন।
ক্রু রোস্টার ও সময়সীমা পরিকল্পনায় ভুল, ফলে ক্রুগণ যথেষ্ট বিশ্রাম পাচ্ছে না বা সময়মতো উপস্থিত নেই।
কুয়াশা ও আবহাওয়ার প্রভাব — বিশেষত উত্তর ভারতীয় শহরগুলোর ঘন কুয়াশার কারণে দারুনভাবে ফ্লাইট সমস্যায় পড়া।
প্রযুক্তিগত স্লট ও বিমান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের পরিকল্পনা ও দুর্ঘটনাজনিত চাপ।
এই সব মিলিয়ে একটি “সম্পর্কবিহীন পরিকল্পনা” তৈরি করেছিল, যার জন্য একাধিক ফ্লাইট উড়ে না যাওয়া, ক্রু হাস্ণ ব্যর্থতা এবং বিমান অপারেটিং শিডিউল পেছনে ধাবিত হওয়া ঘটেছিল।
আসুন দেখি ওই নতুন Flight Duty Time Limitation (FDTL) নীতি ঠিক কী কারণে এই বড় সমস্যা তৈরির সূচনা করেছিল:
Flight Duty Time Limitation হলো একটি এমন নিয়ম, যা পাইলট ও ক্রুদের দৈনিক কাজের সময়, বিশ্রাম ও রুট শিডিউলকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, যাতে ক্লান্তি কম থাকে এবং নিরাপত্তা সর্বোচ্চ স্থরে থাকে।
ডিসেম্বর ২০২৫-এ DGCA নতুন কিছু FDTL নিয়ম চালু করে, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলঃ
পাইলট ও ক্রুর রাতের কাজ সীমাবদ্ধ করে দেওয়া
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্রুগণকে বিশ্রামে থাকতে বাধ্যকরণ
FDTL Phase II-এর আওতায় কঠিন নতুন শর্তাবলী প্রবর্তন
এই নিয়মগুলোর অভিন্ন প্রয়োগ করার জন্য প্রায় ২ মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া বলা হলেও, IndiGo এই পরিবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত রোস্টার ও ক্রু ব্যাকআপ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। এতে তাদের রুট পরিকল্পনা ও ফ্লাইট পরিচালনায় ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল — পরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবে ঠিকভাবে কার্যকর করা হয়নি। এটি মূলত দুটি কারণে সংঘটিত হয়েছিলঃ
ইন্ডিগোর পাইলট ও ক্রুর সংখ্যা তাদের বিমান সংখ্যা ও ফ্লাইট দাবির তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম ছিল।
পাইলট নিয়োগের ধীরগতির জন্য তারা প্রয়োজনীয় সংখ্যা পূরণ করতে পারছিল না।
অন্য বড় বিমান সংস্থাগুলোর তুলনায় ইন্ডিগোর পাইলট সংখ্যা বৃদ্ধি কম ছিল, এবং এই কারণে নতুন FDTL নিয়ম বাস্তবায়নের সময় তাদের কাছে পর্যাপ্ত প্রান্তবিহীন ক্রু ও পাইলট ছিল না।
এই সব মিলিয়ে এক বড় ধরণের “মানবসম্পদ পরিকল্পনা ভুল” তৈরি হয়, যা ফ্লাইটের শিডিউল বিকৃতি ও বাতিলের পথ তৈরি করে দেয়।
ফ্লাইটের রোস্টার ও শিডিউল — যা পাইলট, ক্রু, বিমান ও রুটের এক সমন্বিত পরিকল্পনা — সেটি ত্রুটিপূর্ণ ছিল। ফলে ফ্লাইট চালাতে পাইলট ও ক্রুদের সময়মতো পাওয়া যাচ্ছিল না এবং বাতিলের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছিল।
ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল, দেরি এবং অপারেশনাল বিশৃঙ্খলার কারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়:
হাজার হাজার যাত্রী বিভিন্ন শহরে বিমানবন্দরে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হন।
অনেকে তাঁদের সংযুক্ত আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সংযোগ হারিয়ে ফেলেন।
বিমানের টিকিট বাতিল হওয়ার কারণে যাত্রীরা নতুন শিডিউলে সংযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন।
যে যাত্রীরা ব্যস্ত সময়ে যাত্রা করার পরিকল্পনা করেছিলেন — যেমন শীতের শুরুর সময় বিয়ের পরিকল্পনা ও পরিবারিক ইভেন্ট — তারা ব্যাপক অস্বস্তির সম্মুখীন হন।
ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ইন্ডিগোকে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়, বিশেষ করে ক্ষতিপূরণ ও ফেরত টিকিট ইস্যুর কারণে।
এই ঘটনা ভারতের বিমান খাতের ওপর একটি বড় বিশ্লেষণাত্মক প্রশ্ন তুলেছে — কীভাবে একটি বড় বিমান সংস্থা এ-এটা মহানুভব ও দক্ষতার সাথে পরিচালিত হচ্ছে? ইন্ডিগো বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে বড় বিমান সংস্থা হলেও এই বড় গড়বড় তাদের শাখার পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও বড় প্রতিকূলতার সৃষ্টি করেছে।
এ ঘটনায় DGCA কঠোর মনোভাব গ্রহণ করে। এর মধ্যে ছিলঃ
Flight Standards Directorate (FSD)-এর ইন-চার্জ প্রধানকে তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
DGCA কর্তৃপক্ষের দায়ের বিভিন্ন অন্য উচ্চ কর্মকর্তার ভূমিকা ভালোভাবে যাচাইয়ের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কয়েকজন flight operations inspector-কে তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এই পদক্ষেপটি ইন্ডিগো ব্যবস্থাপনার অপ্রতুল নজরদারি ও পরিকল্পনার ত্রুটির ব্যাপারে সরকারের কঠোর মনোভাব প্রতিফলিত করে।
DGCA একটি বিশেষ প্যানেল গঠন করে যাতে ইন্ডিগো ফ্লাইট অপারেশনের বিস্তৃত বিশ্লেষণ করা যায় এবং ক্রু সময়, শিডিউল, রোস্টার একইভাবে পর্যালোচনা করা হয়। এই প্যানেলের রিপোর্ট ভাষায় শুরু হয় এবং DGCA-র কাছে গোপনভাবে জমা দেওয়া হয়।
অনেক বিমান ও শিল্প বিশ্লেষক মনে করেন যে DGCA-র কাঠামো নিজেই পুনঃগঠন হওয়া দরকার — একটি স্বাধীন, স্বনির্ভর ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন বিমান নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ যা আন্তর্জাতিক মানের সাথে খাপ খাইয়ে কাজ করতে পারে।
অনেকে মনে করেন যে এই ঘটনা শুধু ইন্ডিগো বা DGCA-র একক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি সম্পূর্ণ ভারতীয় বিমান খাতের ব্যবস্থাপনার একটি মাথা-ধাক্কা। তিনি বলেন, কঠোর নিয়ম থাকলে ঠিক রয়েছে, কিন্তু সফল বাস্তবায়নের জন্য সময় ও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকা উচিৎ ছিল।
বিশ্লেষকরা বলেন DGCA-র উচিত একটি আন্তর্জাতিক মানের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ হিসাবে নিজেকে গঠন করা — যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের বিমান নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। এর জন্য DGCA-কে স্বাধীন, স্ব-অর্থায়িত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণকারী একটি নতুন কাঠামো প্রয়োজন বলেও তারা মনে করেন।
ইন্ডিগো ফিয়াসকোর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নতুন বিমান সংস্থাগুলোর জন্য অনুমোদন শুরু করেছে — যাতে বাণিজ্যিক বিমান খাতে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায় এবং একটি একচেটিয়া পরিস্থিতি এড়ানো যায়। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি দুইটি নতুন এয়ারলাইনকে প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে — যার ফলে ভবিষ্যতে যাত্রীদের জন্য আরও বিকল্প ও উন্নত পরিষেবা আসতে পারে।
২০২৫-এর ইন্ডিগো ফিয়াসকো ভারতের বিমান খাতের ইতিহাসে একটি মাইলস্টোন ঘটনা। এটি শুধু একটি বিমান সংস্থার অপারেশনাল ব্যর্থতা ছিল না, বরং DGCA-র নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থার ত্রুটি এবং ইন্ডিগো-র মানবসম্পদ পরিকল্পনার বড় пропথिरিক্ত পথচিহ্নও ඉظهار করেছিল।
এই ঘটনা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া উচিতঃ
কঠোর নিয়ম থাকলে তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।
বিমান সংস্থাগুলোকে পর্যাপ্ত ক্রু ও পাইলট পরিকল্পনা করতে হবে।
DGCA-র মতো কর্তৃপক্ষকে স্বাধীন, স্ব-অর্থায়িত ও শক্তিশালী কাঠামোতে গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিমান খাতের মনোব্যবস্থা উন্নত করা যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, ইন্ডিগো ফিয়াসকো শুধু একটি বড় সংবাদ নয় — এটি একটি বিদ্যালয়, যেখানে ভারতীয় বিমান খাতকে আরও নিরাপদ, দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।