Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ডিজিটাল রুপির বিশ্বজয়: ইউরোপের ৫টি দেশে চালু হলো ভারতের ‘ই-রুপি’, মুদ্রাবিনিময়ের ঝক্কি ছাড়াই ঘুরবে ভারতীয় পর্যটকরা

ভারতের ফিনটেক বিপ্লব এবার ইউরোপের মাটিতে। রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI) আজ ঘোষণা করেছে যে ফ্রান্স ও জার্মানি সহ ইউরোপের ৫টি দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হবে ভারতের ডিজিটাল কারেন্সি বা ই-রুপি (e₹)। এর ফলে ভারতীয় পর্যটকদের আর ডলার বা ইউরো কেনার প্রয়োজন হবে না, তারা সরাসরি নিজেদের ই-ওয়ালেট থেকেই পেমেন্ট করতে পারবেন। আর্থিক দুনিয়ায় ডলারের আধিপত্য কমাতে এটি ভারতের এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

মুম্বাই/প্যারিস, ৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ভারতের মানিব্যাগ থেকে কাগজের নোট ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে, আর তার জায়গা দখল করছে ডিজিটাল কারেন্সি। কিন্তু সেই ডিজিটাল কারেন্সি বা ‘ই-রুপি’ (e₹) যে এত দ্রুত দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও রাজত্ব করবে, তা হয়তো অনেকেই কল্পনা করতে পারেননি। আজ, ৩রা ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের পাতায় একটি স্বর্ণালী দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ইউপিআই (UPI)-এর বিশাল সাফল্যের পর, রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI) আজ একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা করেছে। এখন থেকে ইউরোপের পাঁচটি প্রধান দেশ—ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস এবং লুক্সেমবার্গ-এ ভারতের নিজস্ব ডিজিটাল কারেন্সি ‘ই-রুপি’ আইনত বৈধ লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হবে।

আজ সকালে মুম্বাইয়ে আরবিআই-এর সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে গভর্নর শক্তিকান্ত দাস এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, “ভারত আজ আর কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং বিশ্বকে পথ দেখানো এক অর্থনৈতিক মহাশক্তি। আমাদের ই-রুপি এখন আর শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ সম্পদ নয়, এটি একটি গ্লোবাল অ্যাসেট। ইউরোপের মাটিতে ই-রুপির এই গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে যে ভারতীয় অর্থনীতির ওপর বিশ্বের আস্থা কতটা গভীর।”

পর্যটকদের জন্য নতুন দিগন্ত: ফরেক্স কার্ডের দিন শেষ?

এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় সুফল ভোগ করবেন ভারতীয় পর্যটকরা। প্রতি বছর লাখ লাখ ভারতীয় ইউরোপ ভ্রমণে যান। এতদিন বিদেশে যাওয়ার আগে তাদের অন্যতম বড় মাথাব্যথা ছিল কারেন্সি এক্সচেঞ্জ বা মুদ্রা বিনিময়। টাকা দিয়ে ডলার বা ইউরো কেনা, তার জন্য উচ্চহারে কনভার্সন ফি দেওয়া, এবং বিদেশে গিয়ে পকেটে নগদ ইউরো নিয়ে ঘোরার ঝুঁকি—এই সবকিছুর দিন এবার শেষ হতে চলল।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভারতীয় পর্যটকরা তাদের মোবাইলে থাকা ই-রুপি ওয়ালেট (যেমন এসবিআই ই-রুপি বা আইসিআইসিআই ডিজিটাল ওয়ালেট) ব্যবহার করেই প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের টিকিট কাটতে পারবেন অথবা বার্লিনের কোনো ক্যাফেতে কফির দাম মেটাতে পারবেন। প্রক্রিয়াটি হবে অত্যন্ত সহজ। পর্যটক তার ই-রুপি ওয়ালেট থেকে স্ক্যান করবেন, আর মার্চেন্ট বা বিক্রেতা তার নিজের মুদ্রায় (ইউরো) পেমেন্ট পেয়ে যাবেন। মাঝখানে কোনো ফরেক্স কার্ড বা মানি চেঞ্জারের প্রয়োজন হবে না।

দিল্লির এক ট্রাভেল ব্লগার, যিনি বর্তমানে মিউনিখে আছেন, ভিডিও কলের মাধ্যমে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। আজ সকালে আমি মিউনিখের একটি সুপারশপে আমার ই-রুপি ওয়ালেট দিয়ে পেমেন্ট করলাম। কোনো এক্সট্রা চার্জ কাটল না, আর পেমেন্ট হলো চোখের পলকে। মনে হচ্ছে যেন আমি দিল্লিতেই আছি। ভারতের এই প্রযুক্তি দেখে জার্মানরাও অবাক।”

কীভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি?

আরবিআই এবং ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ECB)-এর মধ্যে একটি বিশেষ 'ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট ইন্টারলিংকেজ' চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো ব্লকচেইন। যখন একজন ভারতীয় পর্যটক ই-রুপিতে পেমেন্ট করবেন, তখন ভারতের আরবিআই-এর সার্ভার এবং ইউরোপের পেমেন্ট গেটওয়ের মধ্যে রিয়েল-টাইমে সেটেলমেন্ট হবে।

প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ: ১. গ্রাহক তার ই-রুপি অ্যাপে ইউরোতে লেখা দামটি স্ক্যান করবেন। ২. অ্যাপটি তাৎক্ষণিকভাবে সেই সময়ের বিনিময় হার (Exchange rate) অনুযায়ী টাকার অঙ্ক দেখাবে। ৩. গ্রাহক পিন দিলেই তার ওয়ালেট থেকে ই-রুপি কেটে নেওয়া হবে। ৪. কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিক্রেতার অ্যাকাউন্টে ইউরো জমা হয়ে যাবে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রচলিত ফরেক্স কার্ড বা ক্রেডিট কার্ডে যেখানে ৩% থেকে ৫% পর্যন্ত 'মার্কআপ ফি' দিতে হয়, সেখানে ই-রুপির মাধ্যমে লেনদেনে নামমাত্র ফি লাগবে, যা ১ শতাংশেরও কম।

ইউপিআই থেকে ই-রুপি: ভারতের ফিনটেক আগ্রাসন

২০২৪ সালে প্যারিসের আইফেল টাওয়ারে ইউপিআই (UPI) পেমেন্ট চালু হওয়া ছিল প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু ইউপিআই এবং ই-রুপির মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ইউপিআই হলো ব্যাংক টু ব্যাংক ট্রান্সফার, যেখানে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা থাকা জরুরি। কিন্তু ই-রুপি হলো নগদ টাকার ডিজিটাল রূপ (Central Bank Digital Currency - CBDC)। এটি সরাসরি আরবিআই দ্বারা ইস্যু করা হয় এবং এর জন্য কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মধ্যস্থতার প্রয়োজন হয় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউপিআই ছিল ট্রেলার, আর ই-রুপি হলো পুরো সিনেমা। ইউরোপের বাজারে ই-রুপির প্রবেশ ভারতের 'ইন্ডিয়া স্ট্যাক' (India Stack) বা ডিজিটাল পরিকাঠামোর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। যেখানে আমেরিকা বা চীনের মতো দেশগুলো এখনো তাদের ডিজিটাল কারেন্সি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে, সেখানে ভারত তা সফলভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ছেড়ে দিয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব ও ডলারের আধিপত্যে আঘাত

news image
আরও খবর

এই পদক্ষেপের ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্ব বাণিজ্যে এতদিন মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। যেকোনো আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য ডলারের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু ভারত গত কয়েক বছর ধরে টাকার আন্তর্জাতিকীকরণ (Internationalization of Rupee) নিয়ে কাজ করছে। ইউরোপের বাজারে ই-রুপির প্রবেশ সেই প্রচেষ্টারই একটি বড় ফসল।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ডঃ অমর্ত্য সেনগুপ্ত বলেন, “এটি কেবল পর্যটকদের সুবিধার বিষয় নয়। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। যখন আমরা টাকার বিনিময়ে সরাসরি ইউরোতে লেনদেন করছি, তখন ডলারের প্রয়োজনীয়তা কমে যাচ্ছে। এতে ভারতের ফরেক্স রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে এবং টাকার মান শক্তিশালী হবে। আজ ৫টি দেশ, কাল হয়তো পুরো ইউরোপ এবং ভবিষ্যতে আমেরিকাও ই-রুপি গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।”

ফ্রান্স ও জার্মানির আগ্রহ কেন?

প্রশ্ন জাগতে পারে, ইউরোপের উন্নত দেশগুলো কেন ভারতের ই-রুপি গ্রহণে রাজি হলো? এর উত্তর হলো—বাজারের আকার। ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ এবং ভারতীয় পর্যটকরা ইউরোপের পর্যটন শিল্পের একটি বড় আয়ের উৎস। ভারতীয় পর্যটকদের খরচ করার প্রক্রিয়া সহজ করলে তা আখেরে ইউরোপের অর্থনীতির জন্যই লাভজনক।

ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী আজ এক বিবৃতিতে বলেছেন, “ভারতের সাথে আমাদের কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনেক গভীর। ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে ভারত যা করে দেখিয়েছে, তা অবিশ্বাস্য। আমরা ভারতীয় পর্যটকদের স্বাগত জানাতে এবং তাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে মসৃণ করতে এই প্রযুক্তি গ্রহণ করেছি।”

নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা

ডিজিটাল কারেন্সির ক্ষেত্রে হ্যাকিং বা চুরির ভয় সবসময় থাকে। তবে আরবিআই আশ্বস্ত করেছে যে ই-রুপি বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ডিজিটাল কারেন্সি। এতে ব্যবহৃত হয়েছে অত্যাধুনিক 'কোয়ান্টাম এনক্রিপশন' প্রযুক্তি। তাছাড়া, এটি যেহেতু ব্লকচেইন প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তাই প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড থাকে এবং তা টেম্পার করা অসম্ভব।

তবে ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তার বিষয়টিও মাথায় রাখা হয়েছে। আরবিআই জানিয়েছে, ছোট অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর পরিচয় গোপন রাখা হবে, ঠিক যেমন নগদ টাকায় বাজারে কেনাকাটা করলে কেউ পরিচয় জানতে চায় না।

আগামী দিনের পরিকল্পনা

আজ ৫টি দেশে চালু হলেও, আরবিআই-এর লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সিঙ্গাপুরে ই-রুপি চালু করা। ইতিমধ্যেই সিঙ্গাপুর এবং ইউএই-র সাথে প্রাথমিক কথাবার্তা শেষ হয়েছে। এছাড়া, প্রবাসী ভারতীয়রা (NRIs) যাতে বিদেশ থেকে সরাসরি ই-রুপিতে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও খুব শীঘ্রই চালু হতে যাচ্ছে।

উপসংহার

 

মুদ্রা বা কারেন্সি কেবল বিনিময়ের মাধ্যম নয়, এটি একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও শক্তির প্রতীক। এক সময় ব্রিটিশ পাউন্ড বা মার্কিন ডলার বিশ্ব শাসন করেছে। আজ ডিজিটাল যুগে ভারত সেই ব্যাটন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। পকেটে কোনো বিদেশি মুদ্রা না রেখে, কেবল স্মার্টফোন হাতে নিয়ে একজন ভারতীয় যখন বিদেশের মাটিতে বুক ফুলিয়ে ঘুরবেন, তখন তা হবে নতুন ভারতের আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।

৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬—দিনটি মনে রাখবেন। কারণ আজ থেকে টাকা আর কেবল ভারতের নয়, টাকা এখন গ্লোবাল। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিল।

Preview image