ভারত এবং আমেরিকার বাণিজ্যচুক্তি বর্তমানে কৃষিজ পণ্য ইস্যুতে আটকে আছে আমেরিকা তাদের ভুট্টা এবং সয়াবিনসহ বিভিন্ন শস্য ভারতের বাজারে রফতানি করতে চাইলেও দিল্লি তাতে সম্মতি দিচ্ছে না এই আপত্তির কারণেই দুই দেশের আলোচনায় অগ্রগতি থমকে আছে
ভারত এবং আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি দীর্ঘ দিন ধরেই একটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে দুই দেশের কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কে বহুবার ওঠানামা লক্ষ্য করা গেলেও উভয় দেশের পক্ষ থেকেই বারবার জানানো হয়েছে যে তারা একটি স্থায়ী এবং সুফলদায়ী চুক্তির দিকে এগোতে চায় পৃথিবীর দুটি বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে এই আলোচনা শুধুমাত্র বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানো নয় বরং উভয় দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বকেও আরও দৃঢ় করার প্রতিশ্রুতি বহন করে তাই ভারত আমেরিকা বাণিজ্যচুক্তিকে কেন্দ্র করে যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এমন এক মন্তব্য করেছেন যা দুই দেশের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে তিনি জানিয়েছেন যে ভারত আমেরিকার কাছে এযাবৎকালের সেরা প্রস্তাব দিয়েছে তাঁর দাবি অনুযায়ী ভারতের দেওয়া বর্তমান প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এতটাই সুবিধাজনক যে অতীতের তুলনায় এটি সর্বাধিক ইতিবাচক প্যাকেজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এই বক্তব্য যখন উঠে এসেছে সেই সময় নয়াদিল্লিতে দুই দিনের বাণিজ্য বৈঠক চলছিল ফলে এই মন্তব্য বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে
গ্রিয়ার জানিয়েছেন যে শস্য মাংস এবং আরও কিছু নির্দিষ্ট পণ্য নিয়ে ভারতের তরফে কয়েকটি কড়া আপত্তি রয়েছে এই আপত্তিগুলি বহু বছর ধরেই আলোচনার বারবার বাধার সৃষ্টি করেছে তাঁর মতে এই জটিল বাধা থাকা সত্ত্বেও ভারত আলোচনায় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে এবং সেই কারণেই তিনি এটিকে সর্বোত্তম প্রস্তাব হিসেবে অভিহিত করেছেন এখন প্রশ্ন উঠছে আসলে ভারতের পক্ষ থেকে কী ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যেটিকে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি যদিও এ বিষয়ে কোনও দেশই এখনও মন্তব্য করেনি
ভারত এবং আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা বহু বছর ধরেই চলছে আগের কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও আলোচনা ভেস্তে যায় কারণ উভয় দেশের অর্থনৈতিক নীতি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের অমিল ছিল বিশেষ করে কৃষিজ পণ্য বাণিজ্য এই চুক্তির সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে উঠেছে আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছে তাদের কৃষিজ পণ্য ভারতের বাজারে আরও বিস্তৃতভাবে রফতানি করতে তারা চায় ভুট্টা সয়াবিন এবং আরও কয়েক ধরনের শস্য ভারত আমদানি করুক কিন্তু ভারত এতে সম্মতি দিচ্ছে না
এর মূল কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ কৃষক রাজনীতি ভারতের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর এখানে কোটি কোটি মানুষ সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ফলে বাজারে বিদেশি শস্য প্রবেশ করলে দেশীয় কৃষকরা গুরুতর প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে এই পরিস্থিতিতে সরকার চাইছে না যে ভারতীয় কৃষক কোনওভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হোক ফলে কৃষি পণ্য ইস্যুতে ভারতের অবস্থান শুরু থেকেই কঠোর
নরেন্দ্র মোদী সরকার দেশের কৃষকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় তাই বিদেশি শস্য আমদানির ক্ষেত্রে ভারত অত্যন্ত সতর্ক দেশীয় কৃষির ওপর চাপ সৃষ্টি হলে রাজনৈতিক এবং সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে এই কারণেই গত অগস্টে কৃষি পণ্য সম্পর্কিত মতানৈক্যের জেরে আলোচনার একটি বড় পর্যায় ভেস্তে গিয়েছিল
কিন্তু সাম্প্রতিক আলোচনার পরিবেশ কিছুটা আলাদা কারণ মার্কিন প্রতিনিধি গ্রিয়ার জানিয়েছেন যে ভারত যে প্রস্তাব দিয়েছে তা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক যদিও সেই প্রস্তাবের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি তবুও তাঁর বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে ভারত এবার কিছু নতুন ছাড় বা নতুন কাঠামো প্রস্তাব করেছে যা আমেরিকার দৃষ্টিতে যথেষ্ট মূল্যবান
এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত থেকে আমদানি করা চালের ওপর শুল্ক বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন এতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে এমন পরিস্থিতিতে গ্রিয়ারের মন্তব্য আলোচনায় নতুন গতি এনে দিয়েছে তিনি বলেছেন যে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কার্যকর বিকল্প বাজার এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত হতে পারে
নয়াদিল্লিতে যে আলোচনা চলছে তা শুধুমাত্র বাণিজ্য নয় বরং দুই দেশের সামগ্রিক কৌশলগত সম্পর্কের অংশ দুটি দেশই বর্তমানে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে আমেরিকা চায় ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত সহযোগিতা আর ভারত চায় তার রপ্তানি বাজার বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়ার পথ আরও মজবুত হোক
যদিও আলোচনা ইতিবাচক পথে এগোচ্ছে তবুও সমস্যার জায়গা স্পষ্ট কৃষিজ পণ্যের প্রতিবন্ধকতা সমাধান না হলে চুক্তি সম্পূর্ণ করা কঠিন ভারত চাইছে তাদের কৃষকদের জন্য সুরক্ষা বজায় রাখতে এবং তাদের বাজার রক্ষা করতে অন্যদিকে আমেরিকা চাইছে তাদের কৃষি লবির স্বার্থ রক্ষা করতে ফলে দুই দেশের রাজনৈতিক চাপের ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ নয়
এ ছাড়া মাংস এবং দুগ্ধজাত পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে মতানৈক্য রয়েছে ভারতীয় জনগণের খাদ্যাভ্যাস ধর্মীয় প্রেক্ষিত এবং অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যনীতি মিলিয়ে এই খাতে বিদেশি পণ্য আমদানি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় এই সব কারণ মিলিয়ে আলোচনা বারবার বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে
এখন প্রশ্ন উঠছে যদি ভারত সত্যিই এযাবৎকালের সেরা প্রস্তাব দিয়ে থাকে তবে তা কি কৌশলগত দিক থেকে কোনও নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে ভারত হয়তো চাইছে প্রযুক্তি প্রতিরক্ষা বা পরিষেবা খাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বড় সুবিধা পেতে এবং তার বিনিময়ে কিছু ক্ষেত্রে নমনীয়তার ইঙ্গিত দিতে পারে অন্যদিকে আমেরিকা চায় চীনার বিকল্প হিসাবে একটি শক্তিশালী বাজার ভারত সেই কারণে তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার
ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল জানিয়েছেন যে আলোচনা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চলছে এবং দ্রুতই দুই দেশ বাণিজ্যচুক্তির প্রথম ধাপের দিকে এগোচ্ছে তাঁর বক্তব্যে আশাবাদী সুর পাওয়া গেলেও তিনি প্রস্তাবের প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু জানাননি
অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের মতে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি সম্পন্ন হলে এটি ভবিষ্যতে ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলসহ বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন দিশা দেখাতে পারে কারণ দুই দেশের অর্থনীতির মিলিত শক্তি পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনৈতিক ব্লকের সমতুল্য তৈরি করতে পারে ভারত চাইছে তার উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করতে দক্ষ মানবসম্পদ প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ আমেরিকা চাইছে সস্তা এবং নির্ভরযোগ্য বাজার এবং উৎপাদন কেন্দ্র
বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অর্থনীতি এবং কূটনীতি একে অপরের পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করছে বিশ্বায়নের যুগে বড় শক্তিগুলির মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক যত মজবুত হয় ততই তাদের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে ভারত এবং আমেরিকার বাণিজ্য আলোচনা সেই কারণেই শুধু দুই দেশের অর্থনৈতিক লাভক্ষতির হিসেব নয় বরং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির জন্যও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ
দীর্ঘ দিন ধরে ভারত এবং আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে যদিও একাধিক পর্যায়ে অগ্রগতি দেখা গেলেও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যুর কারণে আলোচনা থমকে যায় বিশেষ করে কৃষিজ পণ্য শুল্কনীতি তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা এবং বাজারে প্রবেশ সংক্রান্ত আপত্তি দুই দেশের আলোচনার পথে বড় বাধা হয়ে থাকে এই সমস্যাগুলির কিছু অবস্থা এখনও বিদ্যমান তবুও সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং নতুন করে শুরু হওয়া দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে
এই অবস্থায় দুই দেশের ওপরই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাপ রয়েছে যাতে দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত চুক্তি চূড়ান্ত হয় কারণ বহু সংস্থা এবং বিনিয়োগকারী অপেক্ষা করছে এই আলোচনার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তাদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নির্ধারণের জন্য বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থাগুলি ভারত এবং আমেরিকার বাজার উভয়ের ওপরই নির্ভরশীল তাই চুক্তি হলে লজিস্টিক বিনিয়োগ এবং উৎপাদন ক্ষেত্রে বড় ধরনের গতি আসতে পারে পাশাপাশি এই চুক্তি এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যের ওপরও প্রভাব ফেলবে কারণ বিশ্বের শক্তিশালী দুটি অর্থনীতি যদি পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ায় তবে অন্যান্য দেশও তাদের নীতি পরিবর্তনে বাধ্য হতে পারে
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বড় ভূমিকা নিতে দেশীয় উৎপাদন রপ্তানি এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধি ভারত সরকারের প্রধান লক্ষ্য আমেরিকার সঙ্গে একটি শক্তিশালী বাণিজ্য চুক্তি হলে ভারতীয় কোম্পানি এবং শিল্পঘরানার কাছে নতুন বাজার খুলে যাবে অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও চায় নির্ভরযোগ্য উৎপাদন কেন্দ্র এবং বৃহৎ ভোক্তা বাজারের সঙ্গে স্থায়ী অংশীদারিত্ব স্থাপন করতে চীন নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের মতো দেশকে কৌশলগতভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে ফলে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনার বড় ধরনের আন্তর্জাতিক মূল্য রয়েছে
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে ভারত এবং আমেরিকার বাণিজ্য আলোচনায় নতুন সম্ভাবনার সঞ্চার হয়েছে যদিও এখনও বহু সমস্যার সমাধান বাকি কিন্তু আলোচনার ইতিবাচক পরিবেশ এবং উভয় দেশের প্রতিনিধিদের আশাবাদী মন্তব্য পরিস্থিতিকে নতুন অর্থ দিয়েছে আগামী দিনে এই আলোচনা কোন দিকে এগোয় তা আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও কূটনীতির জগতে গভীর আগ্রহের বিষয় হয়ে থাকবে দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাস এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে এই চুক্তি শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ককেই নয় বরং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির গতিপথকেও প্রভাবিত করতে পারে
ভারত এবং আমেরিকা উভয় দেশই বুঝতে পারছে যে ভবিষ্যতের বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় জরুরি বিশ্বের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলি ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং নতুন শক্তি হিসেবে ভারত দ্রুত উঠে আসছে ফলে আমেরিকা চাইছে ভারতের সঙ্গে এমন এক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে যা দীর্ঘমেয়াদে উভয়ের জন্যই লাভজনক হবে
এই প্রেক্ষিতে আলোচনা যত এগোবে ততই স্পষ্ট হবে কোন কোন বিষয়ে দুই দেশ ছাড় দিচ্ছে এবং কোন বিষয়গুলিতে এখনও কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে তবে একটি বিষয় স্পষ্ট দুই দেশই এই আলোচনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মহলও গভীর নজরে রাখছে এই আলোচনার দিক পরিবর্তন কারণ এর ফলাফল ভবিষ্যতের বহুপাক্ষিক বাণিজ্যনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে