মঙ্গলবার আবু ধাবিতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে এ বারের আইপিএল নিলাম। গত মরসুমে মেগা নিলাম হওয়ার ফলে এ বার মূলত দলে থাকা ফাঁকফোকর পূরণ করাই লক্ষ্য ১০টি ফ্র্যাঞ্চাইজির। তাই বড় চমকের বদলে কৌশলী কেনাকাটার দিকেই নজর থাকবে দলগুলির।
কেউ প্রায় পুরো দলটাই ধরে রেখেছে। আবার কেউ সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে দলের অধিনায়ককেই। কারও হাতে রয়েছে মাত্র ২ কোটি টাকার মতো নগদ, আবার কেউ নিলামে নামছে ৬৪ কোটির বিশাল তহবিল নিয়ে। সম্পূর্ণ ভিন্ন সমীকরণ, ভিন্ন পরিকল্পনা এবং ভিন্ন চাহিদা নিয়েই মঙ্গলবার আবু ধাবিতে বসতে চলেছে চলতি মরসুমের আইপিএল নিলাম। স্বাভাবিকভাবেই এই নিলাম ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে ক্রিকেট মহলে।
গত মরসুমে মেগা নিলাম হওয়ায় এ বার কোনও দলেরই গোটা দল নতুন করে গড়ার প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ ফ্র্যাঞ্চাইজি তাদের মূল কাঠামো ধরে রেখেছে। ফলে এ বারের নিলাম কোনও বিশাল তারকা শিকার বা রেকর্ড ভাঙা দরযুদ্ধের মঞ্চ নয়। বরং এটি হতে চলেছে সূক্ষ্ম পরিকল্পনা, হিসেবি বিনিয়োগ এবং নির্দিষ্ট ভূমিকার জন্য উপযুক্ত ক্রিকেটার বেছে নেওয়ার লড়াই। দলের ভারসাম্য রক্ষা করাই এ বার সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
১০টি দলের প্রত্যেকটির প্রয়োজন আলাদা। কোথাও ব্যাটিং গভীরতা বাড়ানোই প্রধান লক্ষ্য, আবার কোথাও ডেথ ওভারের বোলিংই সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা। কিছু দল নতুন অধিনায়কের খোঁজে নিলামে নামছে, আবার কেউ আগামীর কথা ভেবে শক্তিশালী ব্যাক-আপ তৈরি করতে চাইছে। ফলে এক জন ক্রিকেটারের জন্য একাধিক দল ঝাঁপাতে পারে, আবার অনেক নামী তারকা তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাজেটের দিক থেকেও এই নিলাম অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এক দিকে এমন দল রয়েছে, যাদের হাতে খরচ করার মতো টাকা প্রায় নেই বললেই চলে। অন্য দিকে কয়েকটি ফ্র্যাঞ্চাইজি রয়েছে, যারা বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ে নিলামের মঞ্চে নামছে এবং চাইলে গোটা সমীকরণই বদলে দিতে পারে। তবে টাকা থাকলেই যে সফল নিলাম হবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই—আইপিএলের ইতিহাস তা বারবার প্রমাণ করেছে।
এ বার বড় চমকের বদলে বেশি গুরুত্ব পাবে কৌশলী কেনাকাটা। নির্দিষ্ট ভূমিকার জন্য নির্ভরযোগ্য ক্রিকেটার, অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সঠিক মিশ্রণ এবং প্রয়োজনে শেষ মুহূর্তে দল সামাল দেওয়ার মতো ব্যাক-আপ—এই সব বিষয়ই প্রাধান্য পাবে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলির পরিকল্পনায়। বিশেষ করে ইনজুরি প্রবণ ক্রিকেটারদের বিকল্প প্রস্তুত রাখা এবং বিদেশি ক্রিকেটারদের উপস্থিতি-নির্ভর ঝুঁকি কমানোই হবে অধিকাংশ দলের মূল লক্ষ্য।
নিলামের আগে থেকেই বিভিন্ন ক্রিকেটারের নাম ঘুরছে বিভিন্ন দলের সঙ্গে। কে কাকে নিতে পারে, কোন দলে কার জায়গা ফাঁকা—এই সব নিয়ে জল্পনা চলছে পুরোদমে। তবে শেষ পর্যন্ত নিলামের টেবিলে বসে নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে কোন দল নিজেদের কাজ ঠিকঠাক সেরে ফেলতে পারল আর কে পিছিয়ে পড়ল।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এ বারের আইপিএল নিলাম কোনও ঝলমলে প্রদর্শনী নয়, বরং এটি হতে চলেছে পরিকল্পনা, বাস্তবতা এবং দূরদর্শিতার পরীক্ষা। মঙ্গলবার আবু ধাবিতে কোন দল কতটা সফলভাবে নিজেদের চাহিদা মেটাতে পারে, সেদিকেই এখন নজর ক্রিকেটপ্রেমীদের।
হাতে টাকা: ৬৪ কোটি ৩০ লক্ষ
ফাঁকা জায়গা: ১৩ জন (৬ বিদেশি)
নিলামে নামছে সবচেয়ে বেশি টাকা নিয়ে। সেই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ক্রিকেটার কেনার দায়ও কেকেআরের। অজিঙ্ক রাহানে, রিঙ্কু সিংহ, সুনীল নারাইনের মতো অভিজ্ঞদের ধরে রাখলেও দল গঠনের ক্ষেত্রে এখনও বেশ কিছু বড় প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অধিনায়কত্ব। আন্দ্রে রাসেলকে ছেড়ে দেওয়ার পর নেতৃত্বের দায়িত্ব কার হাতে যাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পাশাপাশি একজন বিদেশি ওপেনার এবং একজন ম্যাচ-জেতানো বিদেশি অলরাউন্ডারের খোঁজে নামবে শাহরুখ খানের দল। পেস বিভাগে বিদেশি শক্তি বাড়ানোও অন্যতম লক্ষ্য।
নজরে থাকতে পারেন: ক্যামেরন গ্রিন, ভেঙ্কটেশ আয়ার, কুইন্টন ডি’কক, জনি বেয়ারস্টো, মাথিসা পাথিরানা।
হাতে টাকা: ৪৩ কোটি ৪০ লক্ষ
ফাঁকা জায়গা: ৯ জন (৪ বিদেশি)
মহেন্দ্র সিংহ ধোনিকে ধরে রেখেছে চেন্নাই। তবে রবীন্দ্র জাডেজা ও স্যাম কারেন না থাকায় অলরাউন্ডার বিভাগে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞ দু’জন ব্যাটারের প্রয়োজন রয়েছে।
ধোনির নেতৃত্বে দল সাধারণত বড় ঝুঁকি নেয় না। ফলে ভারসাম্যপূর্ণ ক্রিকেটারই তাদের প্রথম পছন্দ হতে পারে। পাশাপাশি একজন বিদেশি স্পিনার ও পেসারের দিকেও নজর থাকবে।
নজরে থাকতে পারেন: লিয়াম লিভিংস্টোন, জেসন হোল্ডার, মাইকেল ব্রেসওয়েল, মুস্তাফিজ়ুর রহমান।
হাতে টাকা: ১৬ কোটি ৪০ লক্ষ
ফাঁকা জায়গা: ৮ জন (২ বিদেশি)
গত মরসুমের চ্যাম্পিয়নদের দলে বড় কোনও পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। বিরাট কোহলিকে ঘিরেই দল গড়া। তবে জশ হেজ়লউডের চোট বেঙ্গালুরুর পরিকল্পনায় সামান্য হলেও চিন্তার কারণ।
ফলে এক জন বিদেশি পেসার নেওয়াই প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি ভারতীয় ব্যাটিং বিকল্পের দিকেও নজর থাকবে।
নজরে থাকতে পারেন: লুঙ্গি এনগিডি, আলজারি জোসেফ, তাসকিন আহমেদ।
হাতে টাকা: ২২ কোটি ৯৫ লক্ষ
ফাঁকা জায়গা: ৬ জন (৪ বিদেশি)
ঋষভ পন্থকে নেতৃত্বে রেখে লখনউ নিজেদের কোর ধরে রেখেছে। তবে মিডল অর্ডারে নির্ভরযোগ্য বিদেশি ব্যাটারের অভাব স্পষ্ট। বোলিং আক্রমণে ভারতীয়দের আধিক্য থাকলেও বিদেশি পেসারের প্রয়োজন রয়েছে।
নজরে থাকতে পারেন: জেসন হোল্ডার, অনরিখ নোখিয়া, উইয়ান মুল্ডার।
হাতে টাকা: ১২ কোটি ৯০ লক্ষ
ফাঁকা জায়গা: ৫ জন (৪ বিদেশি)
শুভমন গিল, রশিদ খান, জস বাটলারের মতো তারকাদের নিয়ে গুজরাতের দল শক্তিশালী। তবে বিদেশি মিডল অর্ডার ব্যাটার ও একজন বিদেশি পেসারের অভাব রয়েছে।
নজরে থাকতে পারেন: ডেভিড মিলার, লিয়াম লিভিংস্টোন, ম্যাট হেনরি।
হাতে টাকা: ১৬ কোটি ০৫ লক্ষ
ফাঁকা জায়গা: ৯ জন (১ বিদেশি)
সঞ্জু স্যামসনকে ছেড়ে দেওয়ার পর অধিনায়কত্বই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। রিয়ান পরাগের নাম ঘুরছে নেতৃত্বের দৌড়ে। মাত্র এক বিদেশি নেওয়ার সুযোগ থাকায় রাজস্থানকে খুব হিসেব করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নজরে থাকতে পারেন: রবি বিশ্নোই, রাহুল চহার।
হাতে টাকা: ২১ কোটি ৮০ লক্ষ
ফাঁকা জায়গা: ৮ জন (৫ বিদেশি)
ফাফ ডুপ্লেসি না থাকায় টপ অর্ডারে অভিজ্ঞ বিদেশি ব্যাটার দরকার দিল্লির। পাশাপাশি মিচেল স্টার্কের বিকল্প প্রস্তুত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
নজরে থাকতে পারেন: কুইন্টন ডি’কক, জনি বেয়ারস্টো, মাথিসা পাথিরানা।
হাতে টাকা: ২৫ কোটি ৫০ লক্ষ
ফাঁকা জায়গা: ১০ জন (২ বিদেশি)
ডেথ ওভারে কার্যকর পেসারই হায়দরাবাদের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি মিডল অর্ডারে ব্যাটিং শক্তি বাড়াতে চাইবে তারা।
নজরে থাকতে পারেন: আকাশদীপ, লিয়াম লিভিংস্টোন।
হাতে টাকা: ১১ কোটি ৫০ লক্ষ
ফাঁকা জায়গা: ৪ জন (২ বিদেশি)
সবচেয়ে স্থিতিশীল দলগুলির মধ্যে অন্যতম পঞ্জাব। বড় কোনও পরিবর্তনের দরকার নেই। তবে বিদেশি উইকেটরক্ষক ও পেসারের দিকে নজর থাকবে।
নজরে থাকতে পারেন: শাই হোপ, ম্যাট হেনরি।
হাতে টাকা: ২ কোটি ৭৫ লক্ষ
ফাঁকা জায়গা: ৫ জন (১ বিদেশি)
সবচেয়ে কম বাজেট নিয়ে নিলামে নামছে মুম্বই। ফলে বড় লড়াইয়ে নামা কঠিন। তবে এক জন কার্যকর বিদেশি ক্রিকেটার নেওয়ার চেষ্টা থাকবে হার্দিক পাণ্ড্যদের।
রিকেলটন ফর্মে না থাকায় বিদেশি উইকেটরক্ষক ব্যাক-আপও প্রয়োজন।
এ বারের আইপিএল নিলাম কোনও ঝলমলে তারকা শো নয়। এখানে বড় নাম বা আলোচিত মুখের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাবে পরিকল্পনা, হিসেব আর কৌশল। গত মরসুমে মেগা নিলাম হওয়ার ফলে অধিকাংশ দলই তাদের মূল কাঠামো ধরে রেখেছে। তাই এ বার নিলামের মূল লক্ষ্য হবে দলে থাকা দুর্বল জায়গাগুলি চিহ্নিত করে সেগুলিকে যতটা সম্ভব নিখুঁতভাবে পূরণ করা। কোন দল সেই কাজটি কতটা দক্ষতার সঙ্গে করতে পারে, তার উপরেই নির্ভর করবে আগামী মরসুমে তাদের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা।
এই নিলামে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সঠিক ক্রিকেটারকে সঠিক ভূমিকায় বেছে নেওয়া। কোনও দল হয়তো মিডল অর্ডারের স্থিতিশীলতা বাড়াতে চাইবে, আবার কোনও দল ডেথ ওভারের বোলিং শক্তিশালী করার দিকে নজর দেবে। কোথাও নতুন অধিনায়কের প্রয়োজন, কোথাও আবার অভিজ্ঞতার ঘাটতি। ফলে একই ক্রিকেটার একাধিক দলের কৌশলের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। তবে বাজেট সীমিত হওয়ায় প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।
বিপুল অঙ্কের টাকা হাতে থাকা দলগুলির সামনে যেমন সুযোগ রয়েছে, তেমনই ঝুঁকিও কম নয়। অযথা দর বাড়িয়ে ফেলার প্রবণতা বা আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়া নিলামের হিসেব পুরোপুরি ওলটপালট করে দিতে পারে। আবার কম বাজেট নিয়ে নামা দলগুলির সামনে চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন হলেও, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে তারা নীরবে কার্যকর কেনাকাটা করে অন্যদের চমকে দিতে পারে—আইপিএলের ইতিহাসে যার উদাহরণ কম নেই।
এ বার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ব্যাক-আপ পরিকল্পনা। ইনজুরি, আন্তর্জাতিক সূচি বা ফর্মের ওঠানামার কারণে মরসুম চলাকালীন দলকে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। সেই কারণেই একাধিক বিকল্প প্রস্তুত রাখা এবং বেঞ্চ শক্তিশালী করাও এই নিলামের গুরুত্বপূর্ণ দিক। শুধু প্রথম একাদশ নয়, পুরো স্কোয়াডের গভীরতাই আলাদা করে ভাবতে হবে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলিকে।
সব মিলিয়ে, এ বারের আইপিএল নিলাম হবে বাস্তববাদী চিন্তাভাবনার পরীক্ষা। ঝলক বা চমকের চেয়ে ধারাবাহিকতা, ভারসাম্য ও দূরদর্শিতাই ঠিক করে দেবে কে এগিয়ে থাকবে। মঙ্গলবার আবু ধাবিতে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলিই পরবর্তী কয়েক মাস ধরে আইপিএলের গল্পের দিকনির্দেশ ঠিক করে দেবে।