Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কোন কোন রোগ মানুষকে ভোগায় কিন্তু সংক্রামক নয়?

পরামর্শে পিজি হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাঃ নীলাদ্রি সরকার।

ক্যান্সার: শরীরের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ক্যান্সার হয়। এই বৃদ্ধি পাওয়া কোষ শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এটি জিনগত পরিবর্তনের কারণেও হতে পারে। পরিবেশগত কারণ ও জীবনযাত্রার ভুল থেকেও হতে পারে। এই অসুখে শরীরে টিউমার তৈরি হয় ও শরীরের স্বাভাবিক কাজ বাধাপ্রাপ্ত হয়। ক্যান্সার কোনওভাবেই সংক্রামক অসুখ নয়।

অ্যালঝাইমার্স: এই অসুখে মগজের কোষে অস্বাভাবিকভাবে বিশেষ প্রোটিন জমা হতে থাকে। ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের এই কোষগুলি নষ্ট হতে শুরু করে। স্মৃতি ঝাপসা হতে থাকে। অনেকেই এই রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনেই রোগীর সান্নিধ্য এড়িয়ে চলেন। অথচ এই অসুখও সংক্রামক নয়।

ডাউন সিনড্রোম ও অটিজম: স্নায়ুর বিকাশজনিত ঘাটতি থেকে হয় এই অসুখ। কোনওভাবেই সংক্রামক নয়। অথচ এই দুই অসুখে ভুগছে এমন অনেক শিশুর সঙ্গেই অনেকে নিজের সন্তানকে মিশতে দেন না। এই ধারণা ঠিক নয়।

এগজিমা: এটি এমন এক চর্মরোগ যা সংক্রামক নয়। জেনেটিক ও পরিবেশগত কারণ এবং স্ট্রেস থেকে বাড়ে। কোনও ধরনের অ্যালার্জি, নির্দিষ্ট সাবান বা কাপড় ব্যবহার থেকেও হতে পারে। জীবনযাপনের পরিবর্তন করলে ও যে কারণে সমস্যাটি হচ্ছে সেটি এড়িয়ে চললে, এটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই অসুখে কেউ আক্রান্ত হলেও অনেকেই সেই ব্যক্তির সঙ্গ পরিত্যাগ করেন। তাঁর সঙ্গে বসে খান না, এড়িয়ে চলেন। এটাও ভুল ধারণা।

 

সোরিয়াসিস: এটি অটোইমিউন চর্মরোগ। সংক্রামক নয়। স্ট্রেস, ওবেসিটি সহ জেনেটিক নানা কারণে হয়। ত্বকের কোষগুলি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে লালচে শুষ্ক হয়ে আঁশযুক্ত ত্বকের খোসা উঠতে থাকে।

কুষ্ঠ: ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপরে নামক ব্যাকটেরিয়া এই রোগের কারণ। ত্বক, পেরিফেরাল নার্ভ, উপরের শ্বাসতন্ত্র ও চোখ এই রোগে আক্রান্ত হয়। এই অসুখও সংক্রামক নয়। ঠিক সময়ে নিয়মিত চিকিৎসা করলে এই রোগ সম্পূর্ণ সেরে যায়। বরং পেটের অসুখ, সর্দিকাশি এসব সংক্রামক রোগ। কিন্তু রোগীর সংস্পর্শে এলে কুষ্ঠ ছড়ায় না।

অ্যাজমা: জিনগত কারণ ছাড়াও অ্যালার্জি, দূষণ, ধোঁয়া, ঠান্ডা আবহাওয়া, মানসিক চাপ ইত্যাদি কারণে শ্বাসনালিতে প্রদাহ হলে এই অসুখ বাড়ে। নিয়ম মেনে চলা, ইনহেলার ব্যবহার, অ্যাজমার ট্রিগার এড়িয়ে চলা ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকে। রোগটি সংক্রামক নয়। এছাড়া ছানি, ডায়াবেটিস, শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ সহ নানা রোগ আছে, যা মানুষের জীবনে সমস্যা ডেকে আনে তবে সংক্রামক নয়। আক্রান্ত হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করলে নিয়ন্ত্রণে থাকে বা সেরে যায়।

সমাজে বহু রোগ নিয়ে আজও ভয়, ভুল ধারণা ও অজ্ঞতা রয়ে গিয়েছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির পরও অনেক মানুষ মনে করেন, কিছু রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি গেলে সেই অসুখ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই ভুল ধারণার কারণে শুধু রোগীই নয়, তাঁদের পরিবারকেও নানা সামাজিক সমস্যার মুখে পড়তে হয়। অথচ বাস্তবে এমন বহু গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী রোগ রয়েছে, যা একেবারেই সংক্রামক নয়। তবুও সমাজের একাংশ সেই সত্য মেনে নিতে চায় না।

ক্যান্সার এমনই একটি রোগ, যাকে ঘিরে ভয় সবচেয়ে বেশি। ক্যান্সার মূলত শরীরের কোষের অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির ফল। এই অস্বাভাবিক কোষ ধীরে ধীরে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা ব্যাহত করে। জিনগত পরিবর্তন, পরিবেশগত দূষণ, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন কিংবা দীর্ঘদিনের কিছু অভ্যাস এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে ক্যান্সার কোনওভাবেই ছোঁয়াচে রোগ নয়। ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে অন্য কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত হবেন—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও অবৈজ্ঞানিক।

news image
আরও খবর

অ্যালঝাইমার্স রোগ নিয়েও সমাজে বিস্তর ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। এই রোগে মস্তিষ্কের কোষে বিশেষ ধরনের প্রোটিন অস্বাভাবিকভাবে জমা হতে থাকে। এর ফলে ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি কমে যায়, চিন্তাভাবনার ক্ষমতা নষ্ট হয় এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে অসুবিধা দেখা দেয়। অনেক সময় মানুষ অ্যালঝাইমার্স রোগীদের এড়িয়ে চলেন, কথা বলা বা পাশে বসতেও ভয় পান। অথচ এই রোগও একেবারেই সংক্রামক নয়। রোগীর পাশে থাকা, তাঁদের সঙ্গে সময় কাটানো বরং মানসিকভাবে তাঁদের উপকারই করে।

ডাউন সিনড্রোম ও অটিজম—এই দুই স্নায়ুবিক বিকাশজনিত সমস্যাকে ঘিরেও সমাজে গভীর ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। এই অবস্থাগুলি মূলত জিনগত ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলি কোনও রোগ নয়, বরং বিশেষ শারীরিক ও মানসিক অবস্থা। অথচ বহু জায়গায় দেখা যায়, ডাউন সিনড্রোম বা অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের সঙ্গে অন্য শিশুদের মেলামেশা করতে দেওয়া হয় না। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এই অবস্থাগুলি কোনওভাবেই সংক্রামক নয় এবং সহমর্মিতা ও সহানুভূতিই পারে এই শিশুদের স্বাভাবিক জীবনের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

চর্মরোগ মানেই সংক্রামক—এই ভুল ধারণা সমাজে বহু পুরনো। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ এগজিমা। এটি একটি অ-সংক্রামক চর্মরোগ, যা মূলত জেনেটিক কারণ, পরিবেশগত প্রভাব, মানসিক চাপ বা অ্যালার্জির কারণে হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট সাবান, কাপড় বা রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে এলে সমস্যাটি বেড়ে যেতে পারে। সঠিক চিকিৎসা, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং ট্রিগার এড়িয়ে চললে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবুও এগজিমায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেক সময় সামাজিকভাবে একঘরে করা হয়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

সোরিয়াসিসও এমনই একটি অটোইমিউন চর্মরোগ, যা একেবারেই সংক্রামক নয়। এই রোগে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজের ত্বককেই আক্রমণ করে। ফলে ত্বকের কোষ অস্বাভাবিক দ্রুত হারে বৃদ্ধি পায় এবং লালচে, শুষ্ক ও আঁশযুক্ত ত্বকের সমস্যা দেখা দেয়। স্ট্রেস, স্থূলতা এবং জিনগত কারণ এই রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অথচ সমাজে এখনও অনেকেই মনে করেন, সোরিয়াসিস ছোঁয়াচে—যা সম্পূর্ণ ভুল।

কুষ্ঠ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সামাজিক কুসংস্কার রয়েছে। যদিও এটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, তবুও বাস্তবে কুষ্ঠ অত্যন্ত কম সংক্রামক। দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ ও চিকিৎসা না হলে তবেই সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। আধুনিক চিকিৎসায় নিয়মিত ও সঠিক ওষুধ খেলে এই রোগ সম্পূর্ণ সেরে যায়। কিন্তু আজও কুষ্ঠ রোগীদের প্রতি সমাজে ভয় ও অবহেলা রয়ে গিয়েছে, যা মানবিকতার পরিপন্থী।

অ্যাজমাও একটি অ-সংক্রামক রোগ। এটি মূলত শ্বাসনালির প্রদাহজনিত সমস্যা। জিনগত কারণ, ধুলোবালি, দূষণ, ধোঁয়া, ঠান্ডা আবহাওয়া কিংবা মানসিক চাপ এই রোগকে উসকে দিতে পারে। নিয়ম মেনে ইনহেলার ব্যবহার ও চিকিৎসকের পরামর্শ মানলে অ্যাজমা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবুও অনেক সময় অ্যাজমা রোগীদের কাছ থেকে দূরে থাকার প্রবণতা দেখা যায়, যা অযৌক্তিক।

এছাড়াও ডায়াবেটিস, ছানি, হৃদরোগ, বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী অসুখ—এই সবই অ-সংক্রামক রোগ। এগুলি মানুষের জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করলেও সঠিক চিকিৎসা ও সচেতনতা থাকলে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রোগের থেকেও বড় সমস্যা হল রোগ নিয়ে মানুষের ভুল ধারণা। বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে এই কুসংস্কার ভাঙতে। রোগীর পাশে দাঁড়ানোই সভ্য সমাজের আসল পরিচয়।

কুষ্ঠ রোগ নিয়ে সমাজে সবচেয়ে বেশি ভ্রান্ত ধারণা ও ভয় কাজ করে। যদিও এটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, তবুও বাস্তব চিত্র একেবারেই আলাদা। কুষ্ঠ অত্যন্ত কম সংক্রামক এবং সাধারণ স্পর্শ, একসঙ্গে বসে খাওয়া, কথা বলা বা দৈনন্দিন সামাজিক মেলামেশার মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, দীর্ঘদিন খুব ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা এবং চিকিৎসা না হলে তবেই সংক্রমণের সামান্য সম্ভাবনা থাকে। বর্তমানে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার আওতায় বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়া যায় এবং নিয়মিত চিকিৎসা করলে কুষ্ঠ সম্পূর্ণ সেরে ওঠে। তবুও অজ্ঞতা ও সামাজিক কুসংস্কারের কারণে কুষ্ঠ রোগীরা আজও বহু ক্ষেত্রে একঘরে হয়ে পড়েন। এই মানসিক আঘাত অনেক সময় শারীরিক সমস্যার থেকেও বেশি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

অ্যাজমা এমনই একটি রোগ, যাকে ঘিরে ভয় থাকলেও বাস্তবে এটি একেবারেই সংক্রামক নয়। এই অসুখ মূলত শ্বাসনালির প্রদাহজনিত সমস্যা। জিনগত প্রবণতা থাকলে অ্যালার্জি, ধুলোবালি, দূষণ, ধোঁয়া, ঠান্ডা আবহাওয়া কিংবা মানসিক চাপ অ্যাজমার উপসর্গকে বাড়িয়ে দিতে পারে। অনেকেই মনে করেন, অ্যাজমা রোগীর কাছাকাছি গেলে বা তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র ব্যবহার করলে এই রোগ ছড়াতে পারে। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। সঠিক নিয়ম মেনে চলা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনহেলার ব্যবহার এবং অ্যাজমার ট্রিগার এড়িয়ে চললে এই রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সচেতনতা ও নিয়মিত চিকিৎসাই অ্যাজমা রোগীদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের চাবিকাঠি।

Preview image