সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহ পৃথিবীতেই এখন পর্যন্ত প্রাণের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতভাবে পাওয়া গেছে। তবে সাম্প্রতিক মহাকাশ গবেষণায় এমন এক নতুন গ্রহের সন্ধান মিলেছে, যার একাধিক বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যাচ্ছে—ফলে বিজ্ঞানীমহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে সম্ভাব্য বাসযোগ্যতা নিয়ে।
৩৫৫ দিনে এক বছর! পৃথিবীর মতো হিমশীতল গ্রহে বাসযোগ্যতার সম্ভাবনা — বিস্তারিত বিশ্লেষণ
মহাকাশের অসীম বিস্তারে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন আবিষ্কার মানবসভ্যতাকে বিস্মিত করে চলেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্র এবং উন্নত বিশ্লেষণ পদ্ধতির কারণে এখন সৌরজগতের বাইরের গ্রহ—অর্থাৎ এক্সোপ্ল্যানেট—খুঁজে পাওয়া আর অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। তবুও কিছু আবিষ্কার এমন হয়, যা শুধু নতুন তথ্যই দেয় না, বরং মানুষের কল্পনাশক্তিকেও নাড়িয়ে দেয়। সম্প্রতি আবিষ্কৃত HD-137010 b সেই ধরনেরই এক গ্রহ, যা পৃথিবীর সঙ্গে আশ্চর্যজনক মিল থাকার কারণে বিজ্ঞানী মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পৃথিবী থেকে ১৫০ আলোকবর্ষেরও কম দূরত্বে অবস্থিত এই গ্রহটি প্রদক্ষিণ করছে একটি বামন নক্ষত্র HD-137010-কে। এর বছর মাত্র ৩৫৫ দিন—পৃথিবীর ৩৬৫ দিনের সঙ্গে প্রায় সমান। আকারেও এটি পৃথিবীর খুব কাছাকাছি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এ কি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য “দ্বিতীয় পৃথিবী”?
এক্সোপ্ল্যানেট গবেষণার প্রেক্ষাপট
১৯৯০-এর দশকের আগে সৌরজগতের বাইরের গ্রহের অস্তিত্ব ছিল কেবল তাত্ত্বিক অনুমান। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতির ফলে একের পর এক এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কৃত হতে থাকে। বর্তমানে হাজার হাজার এক্সোপ্ল্যানেটের তালিকা তৈরি হয়েছে। তবুও তাদের মধ্যে অল্প কয়েকটি গ্রহই পৃথিবীর সঙ্গে উল্লেখযোগ্য মিল রাখে।
এই প্রেক্ষাপটে HD-137010 b গুরুত্বপূর্ণ, কারণ—
এর কক্ষপথের দৈর্ঘ্য পৃথিবীর কাছাকাছি
এর আকার পাথুরে গ্রহের ইঙ্গিত দেয়
এটি নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থান করছে
এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় খুব বিরল।
কক্ষপথ ও ঋতুচক্রের সম্ভাবনা
৩৫৫ দিনে একটি বছর সম্পূর্ণ হওয়া মানে গ্রহটির কক্ষপথ প্রায় পৃথিবীর মতোই। যদি গ্রহটির অক্ষীয় ঝোঁক (axial tilt) পৃথিবীর মতো হয়, তবে সেখানে ঋতুচক্রও থাকতে পারে।
ঋতুচক্র থাকলে—
তাপমাত্রার ওঠানামা হবে
বরফ গলে জল প্রবাহিত হতে পারে
বায়ুমণ্ডলীয় চক্র সক্রিয় হতে পারে
এই সবই বাসযোগ্যতার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে।
মাধ্যাকর্ষণ ও পৃষ্ঠতল
গ্রহটির ব্যাস পৃথিবীর চেয়ে ১.২ গুণ বড়। এর মানে এর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কিছুটা বেশি হতে পারে। বেশি মাধ্যাকর্ষণ মানে—
বায়ুমণ্ডল ধরে রাখার ক্ষমতা বেশি
গ্যাস সহজে মহাকাশে পালিয়ে যেতে পারে না
দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ স্থিতিশীল হতে পারে
তবে অতিরিক্ত মাধ্যাকর্ষণ হলে প্রাণের বিকাশ ভিন্ন রূপ নিতে পারে।
বায়ুমণ্ডল: অজানা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ
এখনও HD-137010 b-এর বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে সরাসরি তথ্য নেই। তবে বায়ুমণ্ডল থাকলে তা গ্রহটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
যদি সেখানে—
কার্বন ডাই অক্সাইড
নাইট্রোজেন
জলীয় বাষ্প
থাকে, তবে গ্রীনহাউস প্রভাবের মাধ্যমে তাপমাত্রা কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে।
বরফাবৃত পর্যায়: স্নোবল পৃথিবীর তুলনা
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন বছর আগে এমন সময় এসেছিল, যখন পুরো গ্রহ বরফে আচ্ছাদিত ছিল। বিজ্ঞানীরা একে “Snowball Earth” পর্যায় বলেন।
HD-137010 b বর্তমানে অত্যন্ত ঠান্ডা হলেও, এটি হয়তো এক দীর্ঘ হিম-পর্বের মধ্যে রয়েছে। ভবিষ্যতে আগ্নেয়গিরির ক্রিয়া, বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন বা নক্ষত্রের বিকিরণ পরিবর্তনের ফলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
নক্ষত্রের আয়ু ও স্থায়িত্ব
গ্রহটির নক্ষত্র সূর্যের চেয়ে ছোট হলেও দীর্ঘজীবী। দীর্ঘস্থায়ী নক্ষত্র মানে গ্রহের পরিবেশ স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা বেশি।
সূর্যের আয়ু আনুমানিক ১০ বিলিয়ন বছর। ছোট নক্ষত্রের আয়ু তার চেয়েও বেশি হতে পারে। ফলে HD-137010 b কোটি কোটি বছর ধরে একই ধরনের শক্তি পেতে পারে।
ভবিষ্যৎ টেলিস্কোপ ও গবেষণা
বর্তমানে উন্নত স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণের চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী যন্ত্র ব্যবহার করে—
অক্সিজেনের উপস্থিতি
মিথেন
ওজোন স্তর
জলীয় বাষ্প
নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।
জৈব চিহ্নের সম্ভাবনা
যদি গ্রহটির বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও মিথেন একসঙ্গে পাওয়া যায়, তবে তা জৈব ক্রিয়ার ইঙ্গিত হতে পারে। পৃথিবীতে এই দুই গ্যাসের সহাবস্থান মূলত জীবজগতের কারণে।
তবে সতর্কতা জরুরি—অজৈব প্রক্রিয়াতেও এই গ্যাস তৈরি হতে পারে।
প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ
১৫০ আলোকবর্ষ দূরত্ব মানে—
বর্তমান প্রযুক্তিতে সেখানে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব
আলো পৌঁছাতে ১৫০ বছর সময় লাগে
সরাসরি অনুসন্ধান অত্যন্ত কঠিন
তাই আপাতত দূরবীক্ষণ পর্যবেক্ষণই ভরসা।
পৃথিবী কেন বিশেষ?
আমাদের সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহ পৃথিবীই এখন পর্যন্ত একমাত্র পরিচিত গ্রহ, যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে পাওয়া গেছে। পৃথিবীর বিশেষত্ব তৈরি হয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের সমন্বয়ে—
সূর্য থেকে সঠিক দূরত্ব
স্থিতিশীল কক্ষপথ
তরল জলের উপস্থিতি
অনুকূল বায়ুমণ্ডল
চৌম্বক ক্ষেত্র
টেকটোনিক ক্রিয়া
এই সব কিছুর নিখুঁত ভারসাম্য পৃথিবীকে প্রাণের জন্য উপযুক্ত করেছে। তাই যখনই কোনও নতুন গ্রহে এই বৈশিষ্ট্যগুলির মিল পাওয়া যায়, বিজ্ঞানীদের আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।
HD-137010 b: মিল কোথায়?
নতুন গ্রহটির ক্ষেত্রে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে—
১. বছরের দৈর্ঘ্য
গ্রহটির বছর ৩৫৫ দিন। পৃথিবীর ৩৬৫ দিনের সঙ্গে পার্থক্য খুবই কম। অর্থাৎ কক্ষপথের দৈর্ঘ্য প্রায় সমান।
২. আকার
গ্রহটির ব্যাস পৃথিবীর প্রায় ১.২ গুণ। এটি নির্দেশ করে যে গ্রহটি সম্ভবত পাথুরে প্রকৃতির।
৩. বাসযোগ্য অঞ্চল
গ্রহটি তার নক্ষত্রের এমন দূরত্বে অবস্থান করছে, যাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে “হ্যাবিটেবল জোন” বলা হয়—যেখানে তাপমাত্রা এমন হতে পারে যে তরল জল টিকে থাকতে পারে।
৪. শক্তি প্রাপ্তি
এই গ্রহটি তার নক্ষত্র থেকে পৃথিবীর তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম শক্তি পেতে পারে। ফলে অতিরিক্ত উত্তাপের ঝুঁকি কম।
এই সব তথ্য মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য বাসযোগ্যতার হার প্রায় ৫১ শতাংশ বলে অনুমান করছেন।
নক্ষত্রের গুরুত্ব
গ্রহটির নক্ষত্র সূর্যের ভরের প্রায় ৭০ শতাংশ। এটি সূর্যের তুলনায় ছোট ও কম উজ্জ্বল। তবে এর আয়ু সূর্যের চেয়ে বেশি হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী নক্ষত্র মানে গ্রহের উপর স্থিতিশীল পরিবেশ দীর্ঘদিন বজায় থাকার সম্ভাবনা।
একটি স্থিতিশীল নক্ষত্র ছাড়া বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে ওঠা কঠিন। কারণ নক্ষত্রের বিকিরণ ও তাপমাত্রা গ্রহের বায়ুমণ্ডল ও জলবায়ুকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
কীভাবে আবিষ্কার?
গ্রহটি আবিষ্কৃত হয়েছে NASA-র Kepler Space Telescope-এর মাধ্যমে। ব্যবহৃত হয়েছে ট্রানজিট পদ্ধতি।
ট্রানজিট পদ্ধতি কী?
যখন কোনও গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করে, তখন নক্ষত্রের আলো সাময়িকভাবে সামান্য কমে যায়। এই ক্ষীণ আলোর পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে গ্রহের অস্তিত্ব নির্ধারণ করা হয়।
HD-137010 b-এর ট্রানজিট এখনও একবারই নিশ্চিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তাই ভবিষ্যতে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
তাপমাত্রা: হিমশীতল বাস্তবতা
বর্তমান অনুমান অনুযায়ী, গ্রহটির তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৬৮ থেকে ৮৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে। অর্থাৎ এটি অত্যন্ত ঠান্ডা। এমনকি মঙ্গলগ্রহের থেকেও শীতল হতে পারে।
তবে পৃথিবীর ইতিহাসে ‘স্নোবল আর্থ’ নামে একটি পর্যায় ছিল, যখন সমগ্র গ্রহ বরফে ঢাকা ছিল। তবুও পরবর্তীকালে পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ ঘটেছে। তাই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, HD-137010 b হয়তো বর্তমানে এক হিম-পর্বে রয়েছে।
তরল জল—সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
বাসযোগ্যতার মূল শর্ত তরল জল। এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি যে এই গ্রহে জল রয়েছে কি না। তবে যদি—
বায়ুমণ্ডলে পর্যাপ্ত কার্বন ডাই অক্সাইড থাকে
গ্রীনহাউস প্রভাব সক্রিয় হয়
তবে নিম্ন তাপমাত্রা সত্ত্বেও তরল জল টিকে থাকতে পারে।
গ্রহটি কি একা?
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই নক্ষত্র পরিবারে আরও গ্রহ থাকতে পারে। একাধিক গ্রহ থাকলে তাদের পারস্পরিক মাধ্যাকর্ষণ সম্পর্ক কক্ষপথের স্থিতিশীলতা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
৫১ শতাংশ সম্ভাবনা—এর ব্যাখ্যা
এই সংখ্যা কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি একটি পরিসংখ্যানগত অনুমান, যা নির্দেশ করে—
কক্ষপথ উপযুক্ত
গ্রহের আকার পাথুরে হওয়ার সম্ভাবনা
শক্তি প্রাপ্তি নিয়ন্ত্রিত
নক্ষত্র স্থিতিশীল
তবে বায়ুমণ্ডলের গঠন, চৌম্বক ক্ষেত্র, ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপ—এই সব বিষয় এখনও অজানা।
পৃথিবীর সঙ্গে তুলনা
|
বৈশিষ্ট্য |
পৃথিবী |
HD-137010 b |
|---|---|---|
|
বছর |
৩৬৫ দিন |
৩৫৫ দিন |
|
আকার |
১x |
১.২x |
|
নক্ষত্র |
সূর্য |
বামন নক্ষত্র |
|
গড় তাপমাত্রা |
~১৫°C |
অত্যন্ত নিম্ন |
|
দূরত্ব |
— |
<১৫০ আলোকবর্ষ |
এই মিলগুলিই একে বিশেষ করে তুলেছে।
ভবিষ্যৎ গবেষণা
আগামী দিনে উন্নত টেলিস্কোপ দিয়ে গ্রহটির বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতে পারে। স্পেকট্রোস্কোপির মাধ্যমে অক্সিজেন, মিথেন, জলীয় বাষ্পের উপস্থিতি নির্ধারণ করা গেলে বাসযোগ্যতার প্রশ্ন আরও স্পষ্ট হবে।
যদি সত্যিই বাসযোগ্য হয়?
যদি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যে HD-137010 b বাসযোগ্য—
মানবসভ্যতার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু হবে
মহাকাশ উপনিবেশ গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত হবে
পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সম্ভাবনা জোরালো হবে
বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক গুরুত্ব
এই ধরনের আবিষ্কার শুধু বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়, মানবজাতির অস্তিত্ব সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন তোলে—
আমরা কি মহাবিশ্বে একা?
পৃথিবীর মতো পরিবেশ কি বিরল, না সাধারণ?
ভবিষ্যতে কি মানবজাতি অন্য গ্রহে বসতি গড়তে পারবে?
উপসংহার
হিমশীতল হলেও HD-137010 b একটি সম্ভাবনাময় এক্সোপ্ল্যানেট। ৩৫৫ দিনে বছর, পৃথিবীর কাছাকাছি আকার, অনুকূল কক্ষপথ—সব মিলিয়ে এটি গবেষণার নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
এখনও বহু প্রশ্নের উত্তর বাকি। আরও পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তবে একথা নিশ্চিত—এই আবিষ্কার মহাকাশ গবেষণায় নতুন আশার আলো দেখিয়েছে।
মহাকাশের অসীম অন্ধকারে হয়তো সত্যিই কোথাও রয়েছে আরেকটি পৃথিবী—আর HD-137010 b সেই সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল নাম।