গোয়ার বার্ষ ডে রোমিও লেন নাইটক্লাব অগ্নিকাণ্ড মামলায় বড় পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন। তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগে ক্লাবমালিক লুথরা ব্রাদার্সের পাসপোর্ট সাসপেন্ড করা হয়েছে। আগুনকাণ্ডে নিরাপত্তাহীন পরিবেশ ও লাইসেন্স সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ সামনে আসায় তদন্ত আরও তীব্র হয়েছে। অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ।
গোয়ার জনপ্রিয় নাইটক্লাব ‘বার্ষ ডে রোমিও লেন’–এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই গোটা দেশ জুড়ে আলোচনা চলছে এই ঘটনা নিয়ে। আগুনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি উঠে এসেছে একাধিক নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ, যা গোয়া প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য, যা এই ঘটনার গভীরতা ও জটিলতা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হিসেবে গোয়া সরকার লুথরা ব্রাদার্স—নাইটক্লাবটির মালিকদের—পাসপোর্ট সাসপেন্ড করে দিয়েছে। অর্থাৎ তাঁরা আপাতত দেশ ছাড়তে পারবেন না এবং বিদেশে থাকলে তাঁদের দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হবেন। এই সিদ্ধান্তকে গোয়া প্রশাসনের কড়া অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই বিশেষ ঘটনার মূল রূপরেখা, তদন্তের অগ্রগতি, প্রশাসনিক পদক্ষেপ, সন্দেহভাজনদের ভূমিকা এবং ভবিষ্যতের আইনি প্রক্রিয়া—সবকিছুই বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল এই প্রতিবেদনে।
গোয়ার জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা অঞ্জুনায় অবস্থিত ‘বার্ষ ডে রোমিও লেন’ নাইটক্লাবটি দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে নতুন বছরের সময় এটিতে ভিড় থাকে তুঙ্গে। তবে এবার এই উৎসবের মাঝেই ঘটে গেল ভয়াবহ আগুন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আগুন ছড়াতে সময় লাগেনি। ক্লাবের বেশিরভাগ অংশই দাহ্য উপাদান দিয়ে সাজানো ছিল—যার ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, ক্লাবে যথাযথ ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট ছিল না এবং পর্যাপ্ত ফায়ার এক্সিটও ছিল না।
আগুন লাগার পর আতঙ্কে মানুষ ছুটোছুটি শুরু করেন। অনেকে সময়মতো বের হতে পারেননি। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতেই আহত হন অনেকেই। যদিও মৃত্যুর সংখ্যা কম, কিন্তু মানুষের বাঁচার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো এই সব নিরাপত্তাহীনতা প্রশ্ন তুলেছে ক্লাব মালিকদের দায়বদ্ধতা নিয়ে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরই তদন্তে উঠে আসে একাধিক গুরুতর অভিযোগ—
লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও ক্লাব চালানো হচ্ছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যাপক গাফিলতি।
ফায়ার সেফটি নিয়ম ভঙ্গ।
অতিরিক্ত ভিড় অনুমতি ছাড়া ঢুকতে দেওয়া।
স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য।
এই তথ্যগুলো সামনে আসতেই গোয়া পুলিশ লুথরা ব্রাদার্সের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রশাসনের দাবি—
"যদি ঠিকমতো লাইসেন্স থাকত, ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা থাকত, তাহলে আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেকটাই সহজ হত। মানুষও নিরাপদে বেরোতে পারতেন।"
লুথরা ব্রাদার্স এই ঘটনার পর থেকেই তদন্তে সহযোগিতা করছেন না—এমন অভিযোগ জানিয়েছে গোয়া পুলিশ। সংবাদমাধ্যম সূত্র অনুযায়ী, ভাই দু’জনেরই কেউ এখন দেশে নেই এবং তাঁরা থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
পাসপোর্ট সাসপেন্ড করার মূল কারণ:
তাঁরা তদন্তে সহযোগিতা করেননি।
বিদেশে থাকায় তাঁদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
প্রশাসন চাইছে, তাঁরা দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করুন।
গোয়ার প্রধান সেক্রেটারি বলেন—
"এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহু পর্যটকের প্রাণসংশয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। মালিকদের বিচারপ্রক্রিয়া থেকে পালাতে দেওয়া যাবে না।"
সেই কারণেই তাঁদের পাসপোর্ট সাসপেন্ড করে ভারত ছাড়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
গোয়া পুলিশ জানিয়েছে, লুথরা ব্রাদার্সের ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের অবস্থান বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে বলেও সন্দেহ। তদন্তকারীদের মতে, এটি তাদের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা।
পুলিশ আরও জানায়, থাইল্যান্ডে ভারতীয় দূতাবাসের সহায়তায় তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পাসপোর্ট সাসপেন্ড হওয়ার পর এখন তাঁরা বৈধভাবে সেখানে থাকতে পারবেন কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
যদি তাঁরা অতিরিক্ত সময় বিদেশে কাটান, তবে স্থানীয় দেশের আইন অনুযায়ী তাঁদের ইমিগ্রেশন ডিটেনশন পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে তাঁরা বাধ্য হয়ে ভারতে ফেরত আসতে পারেন।
ঘটনার পরই গোয়া সরকার তৎপর হয়ে ওঠে।
প্রশাসন ক্লাবটি সিল করে দেয় এবং তদন্তের জন্য একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়। এই টিম ফায়ার ব্রিগেড, পুলিশ, বম্ব স্কোয়াড ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত।
অন্যদিকে, গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন—
"এই ধরনের অবৈধ ও নিরাপত্তাহীন ব্যবসা চলতে দেওয়া হবে না। পর্যটকদের নিরাপত্তা আমাদের প্রথম দায়িত্ব।"
উল্লেখযোগ্য যে, ঘটনার কয়েকদিন আগেও স্থানীয় প্রশাসন কিছু ক্লাবকে নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে সতর্ক করেছিল।
অগ্নিকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়তেই পর্যটকদের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। অনেক পর্যটক বলেন যে তারা গোয়া ভ্রমণের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
এক বিদেশি পর্যটক বলেন—
"গোয়া খুবই সুন্দর জায়গা, কিন্তু যদি নৈশক্লাবগুলোতে নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে ভয় লাগবেই।"
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বহুদিন ধরে নাইটক্লাবগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল—
অতিরিক্ত শব্দদূষণ
বেআইনি মদ পরিবেশন
নিরাপত্তাহীন পরিবেশ
পুলিশের নির্দেশ না মানা
এই ঘটনার পর প্রশাসনের ওপর চাপ বেড়েছে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার।
সমাজকর্মীরা বলছেন—
"নাইটলাইফ ব্যবসা গোয়ায় বড় শিল্প। কিন্তু লাইসেন্স ছাড়া যেভাবে বহু ক্লাব চলছে, তা বন্ধ হওয়া জরুরি। না হলে মানুষের জীবন বিপন্ন হবে।"
আইনজীবীদের মতে—
"পাসপোর্ট সাসপেনশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর ফলে তাঁরা বিচার থেকে পালাতে পারবেন না। IPC 336, 304A, 285 সহ একাধিক ধারায় মামলা চলতে পারে।"
এই ঘটনার জেরে গোয়া পর্যটন শিল্পে সাময়িক প্রভাব পড়েছে। অনেকেই নাইটক্লাব ও বারে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। পর্যটকরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে আরও সতর্ক হয়েছেন।
হোটেল ও ট্রাভেল এজেন্টরা জানিয়েছে—
"মানুষ বুকিং করছেন, তবে প্রশ্নও করছেন—সেখানে কি নিরাপত্তা যথেষ্ট?"
এতে বোঝা যায়, ঘটনার প্রভাব অনেকটাই গভীর।
ঘটনার পর সরকার কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে—
সমস্ত নাইটক্লাব ও রেস্তোরাঁয় ফায়ার সেফটি অডিট বাধ্যতামূলক
বেআইনি নির্মাণ ভেঙে ফেলা
নিয়ম ভঙ্গ করলে তাৎক্ষণিক সিল
বিদেশিদের নিরাপত্তায় নতুন নির্দেশিকা
পর্যটন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো
গোয়া সরকারের পর্যটন মন্ত্রী বলেন—
"আমরা গোয়াকে আরও নিরাপদ করতে চাই। যারা আইন ভাঙবে, তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
লুথরা ব্রাদার্স—অনেকেই যাদের পরিচিত নাম। তাঁরা বিগত কয়েক বছরে গোয়ায় ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় ক্লাব ব্যবসা বিস্তৃত করেছেন।
তাঁদের বিরুদ্ধে আগেও কয়েকটি অভিযোগ উঠেছিল—
বাড়তি ভিড় ঢোকানো
লাইসেন্স নবীকরণ না করা
পুলিশের নির্দেশ অমান্য
এই ঘটনাটিই তাঁদের বিরুদ্ধে এখন সবচেয়ে বড় মামলা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লুথরা ব্রাদার্স ভারতে ফিরলেই তাঁদের—
পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হতে পারে
জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে
ক্লাবের বেআইনি কার্যকলাপ নিয়ে চার্জশিট দাখিল হবে
সম্ভবত জামিন কঠিন হবে
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে,
"এই ঘটনায় যদি প্রমাণিত হয় যে তাঁদের অবহেলায় মানুষের প্রাণসংশয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর শাস্তি হতে পারে।"
এই ঘটনার পর মানুষ প্রশ্ন তুলছে—
"গোয়ার নাইটক্লাব কি সত্যিই নিরাপদ?"
একদিকে প্রশাসন বলছে কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেবে। অন্যদিকে, পর্যটকরা আরও সচেতন।
তবে এই ঘটনার শিক্ষা একটাই—
নিরাপত্তা কোনও ব্যবসার গৌণ বিষয় নয়, বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
যতক্ষণ পর্যন্ত মালিকদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়ানো কঠিন।
লুথরা ব্রাদার্সের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট সাসপেনশন—এই মামলার একটি বড় মোড়। এখন সবাই অপেক্ষা করছে তাঁরা দেশে কবে ফিরবেন এবং তদন্তে কী নতুন তথ্য উঠে আসবে।