আজ থেকে বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনে আমিষ খাবার পরিবেশন শুরু, যাত্রীদের দাবিতে ভারতীয় রেল সিদ্ধান্ত বদলেছে! হাওড়া কামাখ্যা রুটে নতুন মেনুতে কী কী যোগ হল? জেনে নিন।
২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, কলকাতা/হাওড়া – দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনে আজ থেকে আমিষ (মাংসভিত্তিক) খাবার পরিবেশনা শুরু হচ্ছে। শুরুতে এই ট্রেনে শুধুমাত্র নিরামিষ খাবারের ব্যবস্থা থাকায় বহু যাত্রী, বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বে রাতের যাত্রায়, খাবারের ভিন্নতা ও পুষ্টির দিক থেকে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। যাত্রীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও দাবি মেনে রেল কর্তৃপক্ষ অবশেষে এই পরিবর্তন আনলো—এবং কেন্দ্রীয় বাজেট ঘোষণার দিনই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আজ, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে।
বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন চালু হওয়ার পর থেকেই যাত্রীদের মধ্যে উৎসাহ চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে বাংলা থেকে অসমের কামাখ্যার সঙ্গে হাওড়াকে যুক্ত করার পর এই ট্রেন দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। কলকাতা-কমাখ্যা রুটে এই ট্রেনের সেবা যাত্রাপথে থাকা বহু মানুষকে সুবিধা দিয়েছে—বিশেষ করে যারা পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের দিকে নিয়মিত যাতায়াত করেন।
তবে যাত্রীদের একাংশের আপত্তি ছিল খাবার নিয়ে। তাদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘ দূরত্বের রাতের যাত্রায় শুধুমাত্র নিরামিষ খাবার অনেকের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়। অনেকেই বলেন, রাতের ট্রেনে দীর্ঘ সময় ধরে চলার সময় প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবার না থাকায় শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, ক্লান্তি বেশি হয় এবং বিশেষ করে দীর্ঘ যাত্রার পর “নিরামিষই কেন?”—এই প্রশ্ন বারবার মনে আসে।
যাত্রীদের অভিযোগের মূল কারণ ছিল এই যে, বন্দে ভারত স্লিপার মূলত মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে চালু করা হয়েছে। যারা দীর্ঘ সময়ের যাত্রায় খাওয়ার উপর নির্ভর করে। কিন্তু নিরামিষ খাবারই থাকায় অনেকের পক্ষে তা গ্রহণযোগ্য না হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাদের খাদ্যাভ্যাসে মাংসভিত্তিক খাবার অপরিহার্য, তারা অনেক সময় বাইরে থেকে খাবার আনতে বাধ্য হন, যা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।
কিছু যাত্রী জানান, তারা আগে থেকে খাবার নিয়ে যেতেন—কিন্তু রাতের অন্ধকারে ট্রেনের চলাচলের সময় খাবার গরম করা বা ভোজনের উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া কঠিন। তাছাড়া নিরামিষ খাবার অনেকের পক্ষে হজমে কষ্টকর হয়ে যায়, বিশেষ করে যাদের স্বাস্থ্যের কারণে প্রোটিনের চাহিদা বেশি। ফলে তারা বলতেন, “আমিষ খাবার না থাকলে এই পরিষেবা সম্পূর্ণ হবে না।”
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় বাজেট ঘোষণার দিনই বন্দে ভারত স্লিপারের খাবারের মেনুতে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল:
যাত্রীদের চাপ: দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীদের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি ও আনুষ্ঠানিকভাবে রেলের কাছে অনুরোধের পরও বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়নি। কিন্তু জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাবি তীব্র হয়ে ওঠে।
সেবা মান উন্নয়ন: বন্দে ভারত স্লিপারকে ‘বাজেট-ফ্রেন্ডলি’ হিসেবে চালু করা হলেও পরিষেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে রেল কর্তৃপক্ষ নিয়মিত সমীক্ষা করে। মেনু পরিবর্তনই সেই মান উন্নয়নের অংশ।
বাজারের চাহিদা: নিরামিষ খাবার শুধুমাত্র একাংশ মানুষের পছন্দের বিষয়। অধিকাংশ ভারতীয়ের খাদ্যাভ্যাসে মাংসভিত্তিক খাবারও গুরুত্বপূর্ণ। তাই যাত্রীসেবা উন্নয়নের জন্য এই পরিবর্তন আবশ্যক ছিল।
রেল রান্না ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি: ইতিমধ্যেই রেলের রান্না ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, স্বাস্থ্যবিধি ও গুণগত মান বাড়ানো হয়েছে। তাই আমিষ খাবার পরিবেশনার ঝুঁকি কমে এসেছে।
আজ, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ট্রেন নম্বর ২৭৫৭৬-এ যে মেনু রাখা হয়েছে, তাতে রয়েছে:
জিরা কর্ন পুলাও
তেহদার পরোটা
মিক্সড ডাল (মুগ ও অড়হর)
পনির মসলা (অসমীয় ধাঁচে)
চিকেন মসলা (অসমীয় ধাঁচে)
বিনস আলু ভাজি (অসমীয় শুকনো সবজি)
ডেজার্ট হিসেবে রসগোল্লা
এই মেনুতে পরিষ্কারভাবে লক্ষ্য করা যায় যে, রেল কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের স্বাদ ও অঞ্চলভিত্তিক পছন্দকে গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে অসমীয় ধাঁচের পনির ও চিকেন মসলা যাত্রীদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি, জিরা কর্ন পুলাও ও তেহদার পরোটা—এগুলো সাধারণত ট্রেন যাত্রায় সবাই পছন্দ করেন।
রেল কর্তৃপক্ষের মতে, যাত্রীদের পছন্দ ও সুবিধার কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারা জানান, বন্দে ভারত স্লিপারের জনপ্রিয়তা এই পরিবর্তনের ফলে আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
এক রেল আধিকারিক বলেছেন, “যাত্রীদের সেবা মান বাড়াতে আমরা নিয়মিত তাদের মতামত নিচ্ছি। নিরামিষের পাশাপাশি আমিষ খাবার যুক্ত হওয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। বিশেষ করে দীর্ঘ রাতের যাত্রায় প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে এটি সহায়ক হবে।”
আমিষ খাবার পরিবেশনা নিয়ে সাধারণত যাত্রীদের একটি বড় উদ্বেগ থাকে—নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি। রেল কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে বলেছে:
রান্না ও পরিবেশনের সময় সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মানা হবে
রান্নাঘরে ব্যবহৃত কাঁচামাল নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে
হালাল/সুরক্ষিত মাংস ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে
রেস্তোরাঁ/কেটারিং সংস্থাগুলির লাইসেন্স ও মান বজায় রাখা হবে
পরিবেশনের সময় গরম খাবার সরবরাহ করা হবে
এইসব মানদণ্ডের মাধ্যমে রেল কর্তৃপক্ষ আশা করছে, যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে এবং খাবারের মানও বজায় থাকবে।
খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর যাত্রীদের মধ্যে খুশির ঢেউ দেখা গেছে। বিশেষ করে যারা পূর্বে খাবার নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন, তারা বলছেন—এটি একটি বড় পদক্ষেপ। অনেক যাত্রী বলেছেন, “এতোদিন আমরা নিরামিষ খাবার খেয়ে ক্লান্ত হয়ে যেতাম। এখন আমিষও থাকলে যাত্রা অনেক সহজ হবে।”
কিন্তু কিছু যাত্রী প্রশ্ন তুলেছেন, যেমন:
ভাগ্যক্রমে খাবার যে সকল ট্রেনে পরিবেশন হবে—সব ট্রেনেই কি একই মেনু থাকবে?
আমিষ খাবারের দাম কত হবে?
মেনু নিয়মিত বদলানো হবে কি?
কোন কোন রুটে এই পরিষেবা আরও বিস্তৃত করা হবে?
রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ মেনু প্রকাশ করা হবে এবং যাত্রীদের মতামত অনুযায়ী মেনু আরও উন্নত করা হবে। তবে এই মুহূর্তে শুধু আজকের মেনুই প্রকাশ করা হয়েছে।
যদিও ভবিষ্যতের পূর্ণাঙ্গ মেনু এখনও প্রকাশ্যে আনা হয়নি, তবু আমিষ খাবার যুক্ত হওয়ার খবরে খুশি বহু যাত্রী। রেল কর্তৃপক্ষের মতে, এটি একটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ—যাতে যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া ও চাহিদা অনুযায়ী মেনু ও পরিষেবা উন্নত করা হবে।
সম্ভাব্য পরিকল্পনা:
মেনুতে আরও বিভিন্ন ধরনের আমিষ যোগ করা
অঞ্চলভিত্তিক খাবারের মেনু (উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ভারত, উত্তর ভারত ইত্যাদি)
শাকসবজি/ডায়েটারি খাবার যুক্ত করা
খাবারের দাম ও মানের সমন্বয়
ট্রেনের নির্দিষ্ট স্টেশনে গরম খাবার সরবরাহ
বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের খাবার মেনুতে আমিষ যুক্ত হলে এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হতে পারে:
যাত্রী সন্তুষ্টি বৃদ্ধি
যাত্রীদের অভিজ্ঞতা উন্নত হলে ট্রেনের জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে।
কেটারিং ব্যবসায়ীদের সুযোগ
রেল কর্তৃপক্ষ যদি স্থানীয় কেটারিং সংস্থাকে যুক্ত করে, তাহলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও সুবিধা হবে।
ভ্রমণ খরচে সামঞ্জস্য
খাবারের দাম সামঞ্জস্য রেখে যাত্রীদের ভ্রমণ খরচ কম রাখা হবে—এটা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ
অসমীয় ধাঁচের খাবার জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পাবে—এতে উত্তর-পূর্ব ভারতের খাবারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে।
কিছু সমালোচক বলছেন, এই পরিবর্তন আসলেও এটি অর্ধেক সফল হবে যদি মেনু নিয়মিত পরিবর্তন না হয়। কারণ ট্রেন যাত্রার সময় একই ধরনের খাবার বারবার পাওয়া গেলে যাত্রীদের স্বাদে একঘেয়েমি তৈরি হবে। তাই তারা রেল কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, মেনুতে আরও বৈচিত্র্য আনতে হবে এবং নিয়মিত নতুন খাবার যুক্ত করতে হবে।
আজ থেকে বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনে আমিষ খাবার পরিবেশন শুরু হওয়া সত্যিই যাত্রীদের দীর্ঘদিনের দাবির একটি বড় সাফল্য। এটি যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। তবে এটি একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ; পুরোপুরি সফল করতে হলে রেল কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত মেনু আপডেট, মান নিয়ন্ত্রণ ও যাত্রীদের মতামত অনুযায়ী পরিবর্তন আনতে হবে।