Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

এবার মুখোমুখি সত্যের লড়াই এখন সিধে কথার সময়

নির্বাচন কমিশনের কথাই ধরা যাক না কেন। খাতায়কলমে তারা তো সাংবিধানিক সংস্থা। সে দিক থেকে কোনও রাজনৈতিক দলেরই শত্রু বা বন্ধু তাদের হওয়ার কথা নয়। এমনকি এখনও নথিতে পদ্মছাপ পাওয়া গেলে, তারা জিভ কেটে বলে, ‘মিসটেক মিসটেক’।

এবার মুখোমুখি সত্যের লড়াই এখন সিধে কথার সময়
political developments

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে বহুদিন ধরেই নানা প্রশ্ন বিতর্ক এবং রাজনৈতিক আলোচনা চলে আসছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনকে একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়। সংবিধানের মূল ভাবনায় এই কমিশনের কাজ হল নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা যাতে দেশের প্রতিটি নাগরিক নিজের ভোটাধিকার স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারেন। খাতায়কলমে নির্বাচন কমিশনের কোনও রাজনৈতিক রং থাকার কথা নয়। কোনও দল তাদের বন্ধু নয় আবার কোনও দল তাদের শত্রুও নয়। কারণ তারা রাষ্ট্রের একটি নিরপেক্ষ সাংবিধানিক সংস্থা। কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বারবার এমন কিছু ঘটনা সামনে আসে যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়।

অনেক সময় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি অভিযোগ তোলে যে নির্বাচন কমিশনের কিছু সিদ্ধান্ত বিশেষ কোনও রাজনৈতিক দলকে সুবিধা করে দিচ্ছে। আবার শাসক দল দাবি করে নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই কাজ করছে। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে বিতর্ক আরও গভীর হয়। বিশেষ করে ভোটের সময় আচরণবিধি লঙ্ঘন প্রচার কৌশল কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন ইভিএম সংক্রান্ত অভিযোগ ভোট গণনার পদ্ধতি কিংবা রাজনৈতিক প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা বারবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।

নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্কের সবচেয়ে বড় কারণ হল মানুষের প্রত্যাশা। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে চান যে ভোট প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ হবে। কারণ গণতন্ত্রে ভোটই শেষ কথা। ভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় ক্ষমতার পালাবদল। তাই ভোট পরিচালনাকারী সংস্থার উপর মানুষের আস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু যখন কোনও রাজনৈতিক দল অভিযোগ তোলে যে কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে তখন সেই আস্থার ভিত কিছুটা হলেও কেঁপে ওঠে।

অনেক সময় দেখা যায় কোনও রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ নিতে দেরি হচ্ছে। আবার অন্য কোনও ক্ষেত্রে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই বৈপরীত্য থেকেই প্রশ্ন তৈরি হয়। মানুষ ভাবতে শুরু করেন আদৌ কি সব দলের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য হচ্ছে নাকি কোথাও অদৃশ্য কোনও প্রভাব কাজ করছে। যদিও নির্বাচন কমিশন প্রতিবারই দাবি করে তারা আইন মেনেই কাজ করছে এবং কোনও রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে না।

এমনকি কখনও কখনও এমন ঘটনাও সামনে আসে যেখানে সরকারি নথি বা প্রচার সামগ্রীতে রাজনৈতিক প্রতীকের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। বিরোধীরা অভিযোগ তোলে সরকারি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রচার করা হচ্ছে। আর তখন যদি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা আসে যে এটি শুধুমাত্র ভুল বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি তবে সেই ব্যাখ্যা নিয়েও শুরু হয় রাজনৈতিক কটাক্ষ। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন এত বড় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজে বারবার এমন ভুল কীভাবে হয়। আবার কমিশনের সমর্থকেরা বলেন মানবিক ভুল হতেই পারে এবং সেটিকে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়।

ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কয়েক কোটি ভোটার হাজার হাজার প্রার্থী অসংখ্য বুথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশাসনিক কর্মী সবকিছু মিলিয়ে এটি অত্যন্ত জটিল এবং বিশাল একটি ব্যবস্থা। সেই কারণে ছোটখাটো ত্রুটি বা সমস্যা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনার পরিবেশে ছোট একটি ঘটনাও বড় বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ প্রতিটি রাজনৈতিক দলই চায় নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নিজেদের পক্ষে ব্যাখ্যা করতে।

নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা রাজনৈতিক দল কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। কখনও কেন্দ্রের শাসক দলের বিরুদ্ধে নমনীয় আচরণের অভিযোগ উঠেছে আবার কখনও বিরোধীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই নির্বাচন কমিশনকে নিজের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি বজায় রাখতে হয়।

গণতন্ত্রের মূল শক্তি হল জনগণের আস্থা। মানুষ যদি মনে করেন নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে হচ্ছে না তাহলে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। শুধু নিরপেক্ষ হওয়াই যথেষ্ট নয় বরং সেই নিরপেক্ষতার ভাবমূর্তিও মানুষের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি। কারণ রাজনীতিতে perception বা জনমানসের ধারণা অনেক সময় বাস্তবের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবও এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। আগে কোনও অভিযোগ সীমিত পরিসরে আলোচনা হত কিন্তু এখন মুহূর্তের মধ্যে একটি ভিডিও ছবি বা পোস্ট ভাইরাল হয়ে যায়। ফলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আবার কমিশনের পক্ষ থেকেও দ্রুত ব্যাখ্যা দিতে হয়। অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্য বা গুজবও মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। তাই তথ্য যাচাই এবং দ্রুত স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া এখন নির্বাচন কমিশনের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ।

বিরোধীরা প্রায়ই অভিযোগ করেন যে নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির অপব্যবহার রুখতে যথেষ্ট কড়া ভূমিকা নেয় না। আবার শাসক দল দাবি করে বিরোধীরা পরাজয়ের আশঙ্কায় আগেই কমিশনকে কাঠগড়ায় তুলছে। এই রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মাঝখানে সাধারণ মানুষ অনেক সময় বুঝে উঠতে পারেন না আসল সত্য কোথায়। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট গণতন্ত্রকে শক্তিশালী রাখতে হলে নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হওয়া উচিত। কারণ কমিশনের সদস্যদের নিয়োগ নিয়ে বহু সময়েই প্রশ্ন ওঠে। কেউ কেউ দাবি করেন নিয়োগের ক্ষেত্রে বিচারবিভাগ বিরোধী দল এবং সরকারের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কমিটি থাকা উচিত যাতে নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক কমে। আবার অন্য পক্ষের যুক্তি বর্তমান ব্যবস্থাই যথেষ্ট এবং অযথা বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।

ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে নির্বাচন কমিশন বহু কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সফলভাবে নির্বাচন পরিচালনা করেছে। জরুরি অবস্থা রাজনৈতিক হিংসা সন্ত্রাসবাদ প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবকিছুর মধ্যেও ভোট হয়েছে। সেই ইতিহাস নির্বাচন কমিশনের শক্তি এবং সক্ষমতার পরিচয় দেয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক মেরুকরণ যত বেড়েছে ততই কমিশনের উপর চাপও বেড়েছে।

news image
আরও খবর

বর্তমান সময়ে ভোট শুধু রাজনৈতিক লড়াই নয় এটি ভাবমূর্তি এবং প্রচারেরও লড়াই। তাই নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি পদক্ষেপকে রাজনৈতিক চশমায় দেখা হয়। কোনও সিদ্ধান্ত যদি এক পক্ষের পছন্দ না হয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে। আবার অন্য পক্ষ সেটিকে স্বাগত জানায়। এই পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি বজায় রাখা যে কতটা কঠিন তা সহজেই বোঝা যায়।

তবুও নির্বাচন কমিশনের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। কারণ এই প্রতিষ্ঠানটিকেই গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হিসেবে দেখা হয়। সাধারণ মানুষ চান ভোট যেন ভয়মুক্ত পরিবেশে হয় এবং প্রতিটি ভোটের মূল্য সমান থাকে। কোনও রাজনৈতিক দল যেন প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বাড়তি সুবিধা না পায়। আর এই বিশ্বাস বজায় রাখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।

রাজনৈতিক দলগুলিরও দায়িত্ব রয়েছে নির্বাচন কমিশনের মর্যাদা রক্ষা করার। কোনও সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও প্রমাণ ছাড়া লাগাতার অবিশ্বাস তৈরি করলে গণতন্ত্রের উপরই তার প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনেরও উচিত আরও বেশি স্বচ্ছতা এবং দ্রুততার সঙ্গে কাজ করা যাতে মানুষের মনে কোনও সন্দেহ না থাকে।

সব মিলিয়ে বলা যায় নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয় এবং ভবিষ্যতেও তা চলবে। কারণ গণতন্ত্রে ক্ষমতার লড়াই যত তীব্র হবে নির্বাচন পরিচালনাকারী সংস্থাকে ঘিরে প্রশ্নও তত বাড়বে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মানুষের আস্থা। নির্বাচন কমিশন যদি সত্যিই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছভাবে কাজ করতে পারে তবে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। আর যদি সেই আস্থায় ফাটল ধরে তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়বে। তাই সময়ের দাবি নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস অটুট রাখতে স্বচ্ছতা জবাবদিহি এবং নিরপেক্ষতার বার্তা আরও শক্তভাবে তুলে ধরা।

 

 

 

 

 

Preview image