Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

২০ বছর পর ট্রেনে উঠলাম”— কৌশানির বন্দে ভারত যাত্রা ঘিরে নেটিজেনদের ট্রোলের বন্যা

টলিউড অভিনেত্রী কৌশানি মুখোপাধ্যায়ের একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দেখা যায় তিনি বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে চড়ছেন। সাংবাদিকের প্রশ্নে কৌশানি জানান, “প্রায় ২০ বছর পর ট্রেনে উঠলাম।” এই মন্তব্য ঘিরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে নানান মজার কমেন্ট ও ট্রোলিং।

একসময় সেলিব্রিটি মানেই আকাশপথে যাত্রা, ফার্স্ট ক্লাস ফ্লাইট, বিলাসবহুল গাড়ি—এটাই ছিল সাধারণ মানুষের ধারণা। স্টারদের জীবনযাপন যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে দর্শকদের দৃষ্টিভঙ্গি। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে পর্দার তারকারাও যেন প্রতিদিনের জীবনের এক অংশ। তাঁদের হাসি, কান্না, পোশাক, এমনকি ট্রেন বা বাসে ওঠা—সবই মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। আর এমনই এক মুহূর্ত এখন ঘিরে ফেলেছে টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী কৌশানি মুখোপাধ্যায়কে।

২৮ অক্টোবর সকালে টলি অনলাইনের অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া পেজ থেকে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করা হয়। ভিডিয়োতে দেখা যায়, একেবারে ক্যাজুয়াল পোশাকে কৌশানি বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে যাত্রা করার জন্য স্টেশনে পৌঁছেছেন। সাদা টি-শার্ট, ডেনিম, মুখে হালকা হাসি—একেবারে স্বাভাবিক লুকে তিনি গাড়ি থেকে নামেন এবং প্ল্যাটফর্মে হাঁটতে শুরু করেন। সাংবাদিকরা তাঁকে ঘিরে প্রশ্ন করেন, “এতদিন পর ট্রেনে যাত্রা করতে কেমন লাগছে?”

কৌশানির উত্তর, “প্রায় ২০ বছর পর ট্রেনে চাপলাম। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে ট্রেনে চেপেছিলাম, আবার এখন উঠলাম। সত্যিই আলাদা অনুভূতি হচ্ছে, ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।”

এই সরল মন্তব্যই মুহূর্তের মধ্যে আলোড়ন তুলেছে নেট দুনিয়ায়। মন্তব্য বিভাগে শুরু হয়েছে হাসি-ঠাট্টা, কটাক্ষ ও নানা রকমের প্রতিক্রিয়া।

ভিডিয়োটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ তা দেখে ফেলেন। কমেন্ট সেকশন ভরে যায় নানা রকম মন্তব্যে। কেউ মজার ছলে লেখেন, “শেষ যখন ট্রেনে উঠেছিলেন তখন বয়স কত ছিল?” আবার কেউ বলেন, “এখন নতুন নাটক শুরু হয়েছে!”

আরও এক নেটিজেনের কটাক্ষ, “সবাই মিলে মালদহ যাচ্ছে নাকি?”—ইঙ্গিত, সাম্প্রতিক টলি তারকাদের রাজ্যজুড়ে প্রচার বা প্রোমোশনাল ট্যুরের দিকে।

কেউ কেউ আবার সোজাসাপটা লিখেছেন, “গাড়ি থাকতে ট্রেনে কেন?” আবার অন্য একটি অংশ বলেছেন, “এতে এত হইচই করার কী আছে? সবাই তো ট্রেনে ওঠে।”

অবশ্য, কৌশানির অনুরাগীদের মধ্যে অনেকে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ লিখেছেন, “সাধারণ মেয়ে, সাধারণভাবে যাত্রা করছেন—তাতেও যদি এত ট্রোল করতে হয়, তবে সোশ্যাল মিডিয়া সত্যিই অসহনীয় হয়ে যাচ্ছে।”

এই দুই বিপরীত প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই ফুটে উঠেছে বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার বাস্তব চিত্র—যেখানে তারকাদের প্রতিটি পদক্ষেপই সমালোচনার মুখে পড়তে বাধ্য।

বন্দে ভারত এক্সপ্রেস শুধু একটি ট্রেন নয়—এটি এখন একপ্রকার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতীক। আধুনিক ভারতের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক হিসেবেই একে তুলে ধরা হয়। তাই কোনও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের এই ট্রেনে যাত্রা করা মানেই তা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি নজর কাড়ে।

অনেকে মনে করছেন, কৌশানির এই যাত্রার পেছনে হয়তো ছবির প্রচার বা কোনও প্রচারমূলক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। কারণ কিছুদিন আগেই ‘রঘু ডাকাত’ ছবির প্রচারের সময়ও টলিউড তারকারা ট্রেনে ও বাসে করে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছিলেন। ফলে, কৌশানির এই যাত্রা যদি শুধুই প্রোমোশনাল উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু নেটিজেনরা যেভাবে তা নিয়ে হইচই শুরু করেছেন, তা এই যুগে তারকা ও দর্শকের সম্পর্কের জটিলতাই তুলে ধরে।

দশ-পনেরো বছর আগেও টলিউড তারকাদের ট্রেনে বা বাসে দেখা মানেই খবরের শিরোনাম হতো। এখন সেটাই প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা। পুজোর সময় তারকারা প্যান্ডেলে যান, লোকাল ট্রেনে ওঠেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সেলফি তোলেন—এ সবই নতুন প্রজন্মের স্টার ইমেজ গড়ে তোলার অংশ।

তবে, কৌশানির মন্তব্য “২০ বছর পর ট্রেনে উঠলাম” অনেকের কাছে বাস্তবতার সঙ্গে মেলেনি। তাঁদের মতে, একজন জনপ্রিয় তারকা যদি বলেন যে তিনি দুই দশক ধরে ট্রেনে ওঠেননি, তা শুনে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই একধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। এখানেই তৈরি হয়েছে ট্রোলের ক্ষেত্র।

একজন সমাজ বিশ্লেষকের ভাষায়, “সেলিব্রিটিরা এখন দর্শকের খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন। ফলে তাঁদের জীবনযাত্রায় সামান্য অমিল বা অতিরঞ্জনও সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ে যায়। কৌশানি হয়তো নিছকই নস্টালজিয়ায় ভেসে এমন কথা বলেছেন, কিন্তু দর্শকরা এখন আর কথাগুলো নিছকভাবে নেন না।”

সোশ্যাল মিডিয়া এমন এক জগৎ তৈরি করেছে যেখানে স্টারডমের সংজ্ঞাই বদলে গেছে। আগে সিনেমা হলে, টিভি পর্দায়, বা বিশেষ অনুষ্ঠানে তারকাদের দেখা যেত। এখন ইনস্টাগ্রাম লাইভ, রিল, ইউটিউব ভ্লগে তাঁদের প্রতিদিনের জীবনই দর্শকদের সামনে চলে আসে।

তাই যখন কোনও তারকা বলেন, “২০ বছর পর ট্রেনে উঠলাম”, তখন সাধারণ মানুষ সেটিকে “বিলাসী” ভাবার বদলে “অবাঞ্ছিত নাটকীয়তা” হিসেবে নেন।

একজন নেটিজেনের মন্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ—“আমরা প্রতিদিন ট্রেনে উঠি, ওঁরা একবার উঠলে নিউজ হয়ে যায়! সত্যিই এখন তারকারা কেমন সাধারণ, আর সাধারণরা কেমন তারকা!”

news image
আরও খবর

এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন সেলিব্রিটি আর সাধারণের ব্যবধান প্রায় বিলুপ্ত। বরং, এখন সাধারণ মানুষই কন্টেন্ট তৈরি করে ভাইরাল হন, আর সেলিব্রিটিরা সেই প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন।

এই মুহূর্তে কৌশানি মুখোপাধ্যায় নিজে এই ট্রোলিং নিয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রের মতে, অভিনেত্রী ঘটনাটিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে চান না। তিনি মনে করেন, তাঁর মন্তব্যে কোনও নেতিবাচক উদ্দেশ্য ছিল না, শুধুমাত্র নিজের অনুভূতিটাই প্রকাশ করেছিলেন।

তবু নেট দুনিয়ায় আলোচনা চলছে—একজন তারকা কি তাঁর জীবনের সাধারণ অভিজ্ঞতা নিয়েও এত সমালোচনার মুখে পড়বেন? না কি দর্শকদের প্রত্যাশাই এখন অতিরিক্ত বেড়ে গেছে?

এই ঘটনাটি আবারও তুলে ধরেছে কীভাবে একটি ছোট্ট মন্তব্যও এখন বৃহত্তর সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
কৌশানির মন্তব্যে হয়তো কোনও বিশেষ বার্তা ছিল না, কিন্তু মিডিয়ার কাভারেজ, ভিডিওর ক্যাপশন, এবং ভাইরাল হওয়ার গতির কারণে সেটি হঠাৎই ‘বিতর্কিত’ হয়ে উঠেছে।

অনেকেই মনে করছেন, এই ধরনের হাইপার-মিডিয়াটাইজড সমাজে সেলিব্রিটিদের প্রতিটি শব্দ এখন সতর্কতার সঙ্গে বেছে নিতে হয়। কারণ তাঁদের কথা, ভঙ্গি, বা একটুখানি আবেগ—সবই এখন স্ক্রিনশট হয়ে যায়, মিমে রূপান্তরিত হয়, এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজারো মানুষ তা নিয়ে নিজেদের মতামত দেন।

একদিক থেকে দেখলে, কৌশানির মন্তব্যে একটা সরল মানবিক অনুভূতিই ধরা পড়েছে। তিনি ছোটবেলার স্মৃতি মনে করেছেন, এবং দীর্ঘদিন পর ট্রেনে ওঠার আনন্দ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু দর্শকরা সেই সরলতাকে “অতিরঞ্জিত” বা “ড্রামাটিক” হিসেবে দেখেছেন—এটাই আধুনিক সময়ের ট্র্যাজেডি।

মানুষ এখন তারকাদের কাছ থেকে চায় নিখুঁত আচরণ—না বেশি বিনয়, না বেশি আত্মপ্রচার। কিন্তু বাস্তবে, এমন ভারসাম্য রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। কৌশানির মতো জনপ্রিয় মুখরা তাই প্রতিনিয়ত হাঁটছেন এক সূক্ষ্ম দড়ির উপর—যেখানে সামান্য এক মন্তব্যই তাঁকে ট্রোলিংয়ের শিকার করে তুলতে পারে।

২০১৫ সালে ‘পরবেশ’ ছবির মাধ্যমে টলিউডে আত্মপ্রকাশ করেন কৌশানি মুখোপাধ্যায়। তারপর থেকে একাধিক ছবিতে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর সহজ-সরল চেহারা ও প্রাণবন্ত অভিনয় তাঁকে দ্রুত টলিউডের প্রথম সারির অভিনেত্রীদের কাতারে নিয়ে আসে।

কিন্তু জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনাও বাড়তে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি মন্তব্য নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়েছে। এই বন্দে ভারত বিতর্কও তারই ধারাবাহিকতা।

এই পুরো ঘটনাকে যদি সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, তাহলে দেখা যায় এটি শুধুমাত্র কৌশানির ঘটনা নয়—এটি পুরো সেলিব্রিটি সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।

আজকের তারকারা শুধু বিনোদনের উৎস নন; তাঁরা সমাজের প্রতীক, অনুপ্রেরণা, এবং এক অর্থে “পাবলিক প্রোপার্টি”। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁরা মানুষও—যাঁদের নিজের মতো অনুভব করার, স্মৃতি মনে করার, এবং আবেগ প্রকাশ করার অধিকার আছে।

সুতরাং, কৌশানির “২০ বছর পর ট্রেনে উঠলাম” মন্তব্যটি হয়তো অতটা নাটকীয় নয়, যতটা নেটিজেনরা বানিয়ে তুলেছেন। এটি বরং তাঁর জীবনের এক সরল আনন্দ, যা আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার কোলাহলে বিকৃত রূপ পেয়েছে।

এই ঘটনাটি আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়—আজকের দিনে বাস্তব ও ভার্চুয়ালের সীমারেখা প্রায় মিলেমিশে গেছে। একজন তারকা যখন বাস্তবে ট্রেনে ওঠেন, সেটি আর কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; সেটি তাৎক্ষণিকভাবে জনসমক্ষে প্রকাশিত একটি “কন্টেন্ট” হয়ে যায়।

তাই কৌশানির মতো শিল্পীদের হয়তো এখন থেকে আরও সতর্ক হতে হবে, কারণ তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপই সামাজিক বিশ্লেষণের উপাদান।

 

 

Preview image