Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সমুদ্রে প্রাণ ফেরাতে ৩ডি প্রিন্টেড কোরাল: গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে বিজ্ঞানীদের ঐতিহাসিক সাফল্য

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মৃতপ্রায় গ্রেট ব্যারিয়ার রিফকে বাঁচাতে অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানীরা ৩ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছেন। ল্যাবে তৈরি কৃত্রিম প্রবাল বা ৩ডি প্রিন্টেড কোরাল সমুদ্রের তলদেশে বসানোর মাত্র এক বছরের মধ্যেই সেখানে মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীদের ফিরে আসতে দেখা গেছে। এই পদ্ধতি সফল হলে বিশ্বের অন্যান্য মৃতপ্রায় প্রবাল দ্বীপগুলোকেও বাঁচানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সমুদ্রে প্রাণ ফেরাতে ৩ডি প্রিন্টেড কোরাল: গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে বিজ্ঞানীদের ঐতিহাসিক সাফল্য
Environment & Geoscience

পৃথিবীর ফুসফুস যদি আমাজন বন হয় তবে সমুদ্রের রত্নভাণ্ডার হলো প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল রিফ। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের করাল গ্রাসে এই রত্নভাণ্ডার আজ ধ্বংসের মুখে। বিশেষ করে বিশ্বের বৃহত্তম প্রবাল প্রাচীর গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ তার জৌলুস হারিয়ে ক্রমেই একটি মৃত পাথরের স্তূপে পরিণত হচ্ছিল। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আশীর্বাদে আজ সেই হতাশার মেঘ কেটে আশার নতুন সূর্য উদিত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার একদল বিজ্ঞানী দীর্ঘ গবেষণার পর আজ এমন এক সাফল্যের কথা জানিয়েছেন যা কেবল সমুদ্রবিজ্ঞান নয় বরং সমগ্র পরিবেশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। তাদের ল্যাবে তৈরি ৩ডি প্রিন্টেড কোরাল বা কৃত্রিম প্রবাল সমুদ্রের তলদেশে বসানোর মাত্র এক বছরের মাথায় সেখানে মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীদের ফিরে আসতে দেখা গেছে। এই ঘটনা প্রমাণ করেছে যে মানুষ যদি চায় তবে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সে প্রকৃতিকে আবার সারিয়ে তুলতে পারে।

সমুদ্রের তলদেশে নিঃশব্দ বিপ্লব

আমরা জানি যে প্রবাল প্রাচীর কেবল সমুদ্রের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না বরং এটি সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের বা ইকোসিস্টেমের ভিত্তি। হাজার হাজার প্রজাতির মাছ এবং সামুদ্রিক প্রাণী তাদের খাদ্যের জোগান এবং বাসস্থানের জন্য এই প্রবাল প্রাচীরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের জলের উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় প্রবালগুলো তাদের রঙ হারিয়ে সাদা হয়ে যাচ্ছিল যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় কোরাল ব্লিখিং বলা হয়। এর ফলে প্রবালগুলো মারা যাচ্ছিল এবং মাছেরা তাদের বাসস্থান হারিয়ে অন্যত্রে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছিল। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজছিলেন। অবশেষে সমাধান এল আধুনিক ৩ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির হাত ধরে।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ইউনিভার্সিটি এবং মেরিন বায়োলজি ইনস্টিটিউটের গবেষকরা যৌথভাবে এই প্রজেক্টটি শুরু করেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি কৃত্রিম কাঠামো তৈরি করা যা দেখতে এবং গঠনগতভাবে হুবহু প্রাকৃতিক প্রবালের মতো হবে। তারা বিশ্বাস করতেন যে যদি মাছ এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীদের একটি পরিচিত পরিবেশ দেওয়া যায় তবে তারা আবার ফিরে আসবে। সেই লক্ষ্যেই তারা ল্যাবে বিশাল সব ৩ডি প্রিন্টার ব্যবহার করে ক্যালসিয়াম কার্বনেট এবং পরিবেশবান্ধব বায়োপ্লাস্টিক দিয়ে কৃত্রিম প্রবাল তৈরি করেন। উল্লেখ্য যে প্রাকৃতিক প্রবালের কঙ্কালও ক্যালসিয়াম কার্বনেট দিয়েই তৈরি। তাই এই উপাদানটি সমুদ্রের জলের সাথে কোনো ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না।

এক বছরের প্রতীক্ষা ও অভাবনীয় সাফল্য

২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বিজ্ঞানীরা গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু অংশে এই কৃত্রিম প্রবালগুলো স্থাপন করেছিলেন। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ প্রতীক্ষা। প্রতি মাসে ডুবুরিরা সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতেন। প্রথম কয়েক মাসে খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায়নি। কিন্তু ছয় মাস পর থেকে ছোট ছোট পরিবর্তন নজরে আসতে শুরু করে। আর আজ ঠিক এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর বিজ্ঞানীরা যে রিপোর্ট পেশ করেছেন তা এক কথায় অবিশ্বাস্য।

ডুবুরিদের তোলা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে যে এক বছর আগে বসানো সেই ধূসর রঙের কৃত্রিম কাঠামোগুলো আজ আর প্রাণহীন নয়। সেগুলোর গায়ে জন্মেছে নানা রঙের সামুদ্রিক শৈবাল যা প্রাকৃতিক প্রবালের মতোই কাজ করছে। সবচেয়ে আনন্দের সংবাদ হলো সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরে এসেছে নানা প্রজাতির ছোট মাছ। ক্লাউনফিশ ড্যামসেলফিশ এবং কার্ডিনালফিশের মতো প্রবাল পছন্দকারী মাছেরা এই কৃত্রিম কাঠামোগুলোকে তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বা বাসা হিসেবে গ্রহণ করেছে। কৃত্রিম প্রবালের খাঁজ এবং ছিদ্রগুলো মাছের পোনাদের বড় শিকারি মাছের হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করছে।

বিজ্ঞানীরা আরও লক্ষ্য করেছেন যে কেবল মাছ নয় বরং প্রবাল পলি বা লার্ভারাও এই কৃত্রিম কাঠামোর ওপর বসতি স্থাপন করতে শুরু করেছে। অর্থাৎ কৃত্রিম প্রবালের ওপর প্রাকৃতিক প্রবাল জন্ম নিতে শুরু করেছে। এটি হলো সবচেয়ে বড় সাফল্য কারণ এর অর্থ হলো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই কৃত্রিম কাঠামোটি পুরোপুরি প্রাকৃতিক প্রবাল প্রাচীরে ঢেকে যাবে এবং মানুষ আর বুঝতেই পারবে না যে এর নিচে কোনো কৃত্রিম ভিত্তি ছিল।

কেন এই পদ্ধতি কাজ করল

প্রজেক্টের প্রধান গবেষক ডক্টর মেরিন লারসেন সংবাদ সম্মেলনে এই সাফল্যের পেছনের বিজ্ঞানটি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন যে মাছ এবং সামুদ্রিক প্রাণীরা মূলত শব্দ এবং দৃশ্যের ওপর নির্ভর করে তাদের বাসস্থান নির্বাচন করে। মৃত প্রবাল প্রাচীর হয় নীরব এবং ধূসর। কিন্তু ৩ডি প্রিন্টেড কোরালগুলোর জটিল জ্যামিতিক গঠন এবং খাঁজগুলো জলের নিচে এমন এক ধরনের পরিবেশ তৈরি করে যা মাছের কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়। এ ছাড়া এই কাঠামোগুলো জলের স্রোতকে এমনভাবে প্রবাহিত করে যা প্লাঙ্কটন বা মাছের খাবার আটকাতে সাহায্য করে। ফলে মাছেরা এখানে প্রচুর খাবার পায়।

news image
আরও খবর

তিনি আরও বলেন যে আমরা যখন ল্যাবে এই প্রবালগুলো ডিজাইন করছিলাম তখন আমরা প্রাকৃতিক প্রবালের থ্রিডি স্ক্যান ব্যবহার করেছিলাম। ফলে আমাদের তৈরি প্রবালগুলো দেখতে এতটাই বাস্তবসম্মত হয়েছে যে মাছেরা পার্থক্য করতে পারেনি। তারা একে প্রাকৃতিক প্রবাল মনে করেই এখানে বাসা বেঁধেছে। প্রকৃতি যে এত দ্রুত আমাদের এই কৃত্রিম সাহায্য গ্রহণ করবে তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। এটি আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি সফল হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে নতুন আশার সঞ্চার

এই সাফল্য কেবল অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের জন্য সুসংবাদ নয় বরং এটি সারা বিশ্বের সমুদ্র উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য এক নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মালদ্বীপ ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর প্রবাল প্রাচীর মারাত্মক হুমকির মুখে। প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হলে এই দেশগুলোর পর্যটন শিল্প এবং মৎস্য সম্পদ ধসে পড়বে। অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীদের এই প্রযুক্তি এখন এই দেশগুলোকেও তাদের সমুদ্র সম্পদ রক্ষা করতে সাহায্য করবে।

ইতিমধ্যেই জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা বা ইউএনইপি এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছে এবং এই প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে আগামী দশকে তারা এই পদ্ধতিতে কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে নতুন প্রবাল প্রাচীর তৈরি করতে সক্ষম হবেন। এটি কেবল সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা করবে না বরং উপকূলীয় এলাকাগুলোকে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস থেকেও রক্ষা করবে। কারণ প্রবাল প্রাচীর প্রাকৃতিক বাঁধ হিসেবে কাজ করে।

চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

যদিও আজকের দিনটি উদযাপনের তবুও বিজ্ঞানীরা বাস্তবতা ভুলে যাচ্ছেন না। তারা জানেন যে ৩ডি প্রিন্টেড কোরাল কেবল একটি সাময়িক সমাধান বা ব্যান্ডেজ। প্রবাল প্রাচীর ধ্বংসের মূল কারণ হলো বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং সমুদ্র দূষণ। যতক্ষণ না আমরা কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনছি এবং সমুদ্রের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছি ততক্ষণ এই কৃত্রিম সমাধান দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

তবে আশার কথা হলো এই প্রযুক্তি আমাদের হাতে কিছুটা সময় এনে দিল। প্রবাল প্রাচীরগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আগে আমরা সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার একটি উপায় পেয়েছি। বিজ্ঞানীরা এখন কাজ করছেন আরও উন্নত মানের বায়ো ম্যাটেরিয়াল নিয়ে যা প্রবালের বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করবে। তারা এমন স্মার্ট কোরাল তৈরির পরিকল্পনা করছেন যার ভেতরে সেন্সর বসানো থাকবে এবং তা সমুদ্রের তাপমাত্রা ও অম্লতা সম্পর্কে রিয়েল টাইম তথ্য পাঠাতে থাকবে।

উপসংহার

২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি দিনটি পরিবেশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মানুষ তার নিজের সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য প্রযুক্তির আশ্রয় নিয়েছে এবং প্রকৃতি তাতে সাড়া দিয়েছে। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের নীল জলে আজ যে প্রাণের স্পন্দন দেখা যাচ্ছে তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবী এখনো তার আরোগ্য লাভ করার ক্ষমতা হারায়নি। প্রয়োজন কেবল আমাদের সদিচ্ছা এবং সঠিক উদ্যোগ।

ল্যাবের চার দেওয়ালের ভেতর তৈরি হওয়া একটি প্লাস্টিক সদৃশ কাঠামো যে সমুদ্রের তলদেশে নতুন জীবনের জন্ম দিতে পারে তা এক বছর আগেও ছিল কল্পনার অতীত। আজ তা বাস্তব। মাছের ঝাঁক যখন সেই কৃত্রিম প্রবালের ভেতর দিয়ে সাঁতার কাটে তখন তারা জানে না যে এটি মানুষের তৈরি। তারা শুধু জানে তাদের হারানো বাড়ি তারা ফিরে পেয়েছে। আর মানুষের কাছে এর চেয়ে বড় তৃপ্তি আর কী হতে পারে। আমরা আশা করব এই প্রযুক্তির হাত ধরে পৃথিবীর সকল মৃতপ্রায় প্রবাল প্রাচীর আবার রঙে রঙে ভরে উঠবে এবং আমাদের সমুদ্র আবার তার পূর্ণ যৌবন ফিরে পাবে।

Preview image