Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সাইবার জাল আরও বিস্তৃত মিনিটে ৭৬১টি মোবাইল পড়ছে হ্যাকারদের নিশানায়

প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনে বেড়েছে সাইবার অপরাধের ঝুঁকি। প্রতিদিনই নতুন কৌশলে প্রতারণার ফাঁদ পেতে নাগরিকদের নিশানা করছে অপরাধীরা।

স্বার্ণিক দাস, কলকাতা:
প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে যেমন সহজ করে তুলেছে, তেমনই তার অন্ধকার দিকও ক্রমশ ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। ডিজিটাল সুবিধার হাত ধরেই সাধারণ মানুষের জীবনে ঢুকে পড়েছে নিত্যনতুন সমস্যা, যার মধ্যে অন্যতম এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক হল সাইবার অপরাধ। অদৃশ্য এই অপরাধ জাল ক্রমে এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে এক মুহূর্তের অসতর্কতাই ফাঁকা করে দিতে পারে সারা জীবনের সঞ্চয়।

বর্তমান সময়ে সাইবার অপরাধীরা আর এলোমেলোভাবে হামলা চালায় না। তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত কৌশলে, মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। কখনও ভয় দেখিয়ে, কখনও লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে, আবার কখনও সরকারি আধিকারিক বা কোম্পানির এজেন্ট সেজে প্রতারণা চালানো হচ্ছে। একবার ‘টোপ’ গিললেই মুহূর্তের মধ্যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা।

টেলিকমিউনিকেশন মন্ত্রকের ২০২৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১০০ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রায় প্রত্যেকেই কোনও না কোনও ভাবে ডিজিটাল পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। ফলে সাইবার অপরাধীদের জন্য ভারত এখন একটি বিশাল ‘হান্টিং গ্রাউন্ড’। ডেটা সিকিওরিটি কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (DSCI)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালোভাবে সামনে এনেছে।

প্রতি মিনিটে ৭৬১টি মোবাইল নিশানায়

ডিএসসিআই-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রতি মিনিটে গড়ে ৭৬১টি মোবাইল ফোন সাইবার অপরাধীদের টার্গেটে থাকে। অর্থাৎ দিনে প্রায় ১১ লক্ষের বেশি মোবাইল ফোনে কোনও না কোনও ভাবে সাইবার হামলার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান শুধু ভয়াবহই নয়, বরং ভারতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরছে।

রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন মাসে অন্তত তিনবার করে হ্যাক করার চেষ্টা চালানো হয়। যদিও আধুনিক স্মার্টফোনের সিকিউরিটি সিস্টেম আগের তুলনায় অনেক উন্নত, তবুও প্রতারকদের চেষ্টায় কোনও ভাটা পড়েনি। কারণ, প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, অপরাধীদের কৌশলও ততই পরিশীলিত হচ্ছে।

কেন অ্যান্ড্রয়েড ফোনই মূল নিশানা

ভারতে অ্যান্ড্রয়েড ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা আইওএস ব্যবহারকারীর তুলনায় বহুগুণ বেশি। স্বাভাবিকভাবেই সাইবার অপরাধীদের প্রথম টার্গেট হয়ে উঠেছে অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইওএস-এর তুলনায় অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্ম ওপেন সোর্স হওয়ায় সেখানে ম্যালওয়্যার ঢোকানোর সুযোগ কিছুটা হলেও বেশি থাকে।

ট্রোজান, স্পাইওয়্যার, র‌্যানসামওয়্যার—এই সব ধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যার মূলত ব্যবহারকারীর অজান্তেই ফোনে ঢুকে পড়ে। একবার ঢুকে গেলে তা ফোনের সিস্টেম সফটওয়্যার থেকে শুরু করে সমস্ত অ্যাপের তথ্য হাতিয়ে নিতে পারে। ব্যাঙ্কিং অ্যাপ, ইউপিআই, ই-মেল, সোশ্যাল মিডিয়া—কিছুই নিরাপদ থাকে না।

কোন সেক্টর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

ডিএসসিআই-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, অটোমোবাইল সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত মোবাইল ব্যবহারকারীরাই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। কারণ, গাড়ি বা বাইক কেনার আগে গ্রাহকদের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে নিজের মোবাইল নম্বর, লোকেশন এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে লগ-ইন করতে হয়।

এই তথ্যগুলিই পরবর্তীতে সাইবার অপরাধীদের হাতে চলে যাচ্ছে। প্রতারকরা সেই নম্বর ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির এজেন্ট সেজে ফোন করে, লিংক পাঠায় বা অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলে। একবার ব্যবহারকারী সেই লিংকে ক্লিক করলেই ফোনে ম্যালওয়্যার ঢুকে পড়ছে।

সরকারি দপ্তরের আধিকারিকরাও নিরাপদ নন

অটোমোবাইল সেক্টরের পরেই সবচেয়ে বেশি টার্গেট করা হচ্ছে সরকারি মন্ত্রক ও দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের। অনেক সময় তাঁদের মোবাইল ফোন সরকারি তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত থাকে। সেই ফোনে যদি হ্যাকিং সফটওয়্যার ঢোকানো যায়, তাহলে গোপন নথি, গুরুত্বপূর্ণ ডেটা এবং লগ-ইন ক্রেডেনশিয়াল হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।

এই ধরনের হামলার ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য শুধুই আর্থিক প্রতারণা নয়। অনেক সময় রাষ্ট্রীয় তথ্য চুরি বা ভবিষ্যতের বড় সাইবার হামলার প্রস্তুতিও থাকে এর পেছনে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও সাইবার থ্রেটের তালিকায়

ডিএসসিআই-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, অটোমোবাইল ও সরকারি সেক্টরের পরেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত মোবাইল ব্যবহারকারীরা সাইবার ঝুঁকিতে রয়েছেন। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল ভর্তি, ই-মেল ও ক্লাউড ডেটার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষাক্ষেত্র এখন সাইবার অপরাধীদের নতুন টার্গেট।

news image
আরও খবর

কোন শহরে বিপদ সবচেয়ে বেশি

রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের মধ্যে সুরাত ও বেঙ্গালুরু শহরে সবচেয়ে বেশি মোবাইল ফোন সাইবার অপরাধীদের নিশানায় পড়ছে। এই দুই শহরে প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প ও স্টার্টআপের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ডিজিটাল ডেটার পরিমাণও বিপুল। ফলে অপরাধীদের আগ্রহও বেশি।

কীভাবে চলছে হামলা

ডিএসসিআই-এর তথ্য অনুযায়ী,

  • প্রায় ৫০ শতাংশ সাইবার হামলায় মোবাইলের মাধ্যমে বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ড্রাইভ থেকে তথ্য হাতানোর চেষ্টা হয়েছে

  • ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে টার্গেট করা হয়েছে ই-মেল ও ব্রাউজারে সংরক্ষিত ওয়েবসাইটের তথ্য

এই তথ্য চুরি করেই পরবর্তীতে বড় আর্থিক প্রতারণা বা পরিচয় চুরির মতো অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে।

শেষ কথা

সব মিলিয়ে স্পষ্ট, সাইবার অপরাধ এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি ডিজিটাল সচেতনতা ও সতর্কতা না বাড়ালে এই অদৃশ্য অপরাধের ফাঁদ থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হবে। মোবাইল ব্যবহারে সামান্য অসতর্কতাই যে বড় বিপদের কারণ হতে পারে, এই রিপোর্ট সেই কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে।

এই তথ্য চুরি করেই পরবর্তীতে বড় আর্থিক প্রতারণা বা পরিচয় চুরির মতো অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একবার ডেটা হাতছাড়া হলে তার প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে ভুক্তভোগীকে তাড়া করে বেড়ায়। শুধু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা খোয়া যাওয়া নয়, ব্যক্তিগত পরিচয় ব্যবহার করে ঋণ তোলা, ভুয়ো অ্যাকাউন্ট খোলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর ঘটনাও সামনে আসছে। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীকে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যেও পড়তে হচ্ছে।

সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীরা এখন আর শুধু প্রযুক্তিগত দুর্বলতার উপর নির্ভর করছে না। তারা মানুষের আচরণগত দুর্বলতাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। হঠাৎ পাওয়া একটি ফোনকল, আকর্ষণীয় ক্যাশব্যাকের বার্তা, জরুরি অ্যাকাউন্ট ব্লক হওয়ার ভুয়ো নোটিস—এই সবই তৈরি করা হচ্ছে ব্যবহারকারীর ভয় বা লোভকে উস্কে দিতে। আতঙ্কিত হয়ে বা লাভের আশায় অনেকেই যাচাই না করেই লিংকে ক্লিক করেন, ওটিপি শেয়ার করেন বা সন্দেহজনক অ্যাপ ডাউনলোড করে ফেলেন। সেখান থেকেই শুরু হয় সর্বনাশ।

বিশেষ করে ডিজিটাল লেনদেনের উপর নির্ভরতা যত বাড়ছে, সাইবার অপরাধের ঝুঁকিও তত গভীর হচ্ছে। ইউপিআই, মোবাইল ব্যাংকিং এবং অনলাইন শপিং এখন দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। কিন্তু নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা না থাকায় বহু ব্যবহারকারী এখনও সহজ ভুল করে বসছেন। অনেকেই নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট করেন না, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন না কিংবা একই পাসওয়ার্ড একাধিক অ্যাপে ব্যবহার করেন—যা সাইবার অপরাধীদের কাজ আরও সহজ করে দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে বলছেন, কোনও সংস্থা বা সরকারি দপ্তর কখনও ফোন করে পাসওয়ার্ড বা ওটিপি জানতে চায় না। তবুও প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এর একটি বড় কারণ হল ডিজিটাল শিক্ষার অভাব। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও স্মার্টফোনের ব্যবহার বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়েনি।

এই পরিস্থিতিতে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রযুক্তি সংস্থার উপর দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। সাধারণ মানুষকেও নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে। অচেনা লিংক এড়িয়ে চলা, সন্দেহজনক কল বা বার্তার ক্ষেত্রে যাচাই করা, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ডিলিট করা এবং গুরুত্বপূর্ণ ডেটার ব্যাকআপ রাখা—এই ছোট ছোট সতর্কতাই বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।

শেষ কথা
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, সাইবার অপরাধ এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি ডিজিটাল সচেতনতা ও সতর্কতা না বাড়ালে এই অদৃশ্য অপরাধের ফাঁদ থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হবে। মোবাইল ব্যবহারে সামান্য অসতর্কতাই যে বড় বিপদের কারণ হতে পারে, এই রিপোর্ট সেই কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে। আজ সতর্ক না হলে, আগামী দিনে এই ডিজিটাল ফাঁদের মাশুল আরও চড়া দামে দিতে হতে পারে—এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই এগোনো ছাড়া আর কোনও পথ নেই।

Preview image