পুষ্টিগুণে ঠাসা এই পানীয়ে মিলবে ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের আদর্শ সমন্বয়। নিয়মিত পান করলে পেটের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, হজম শক্তিশালী হবে এবং শরীর পাবে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জেনে নিন সহজ বানানোর পদ্ধতি।
সকাল শুরু হয় এক কাপ চা বা কফি দিয়ে। তাড়াহুড়োর মধ্যে কখনও বিস্কুট, কখনও ফাঁকা পেটে কিছু একটা মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়া এই নিয়মেই কেটে যায় বেশির ভাগ মানুষের দিন। দুপুরে ঠিকঠাক খাওয়া হয় না, বিকেলে ক্ষুধা পেটাতে জাঙ্ক ফুড, আর রাতে ভারী খাবার। বাইরে থেকে পেট ভরা মনে হলেও শরীর আদৌ পুষ্টি পাচ্ছে কি না, সে দিকে খুব কম মানুষই নজর দেন। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই অভ্যাসই ধীরে ধীরে ক্লান্তি, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস-অম্বলের মতো সমস্যার জন্ম দেয়। শুধু তাই নয়, দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যেতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীর ভাল রাখার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে পেটের স্বাস্থ্যে। অন্ত্র ভাল থাকলে পরিপাক প্রক্রিয়া ঠিকমতো হয়, খাবার থেকে পুষ্টি শোষণ হয় সঠিক ভাবে এবং শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি পায়। কিন্তু বর্তমান জীবনযাত্রায় সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা যায় ফাইবারে। শাকসবজি, ফল, গোটা শস্য—সব কিছুর পরিমাণই কমে যাচ্ছে। তার ফলেই পেট পরিষ্কার হয় না, অন্ত্রে উপকারী ব্যাক্টেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং নানা শারীরিক সমস্যা মাথাচাড়া দেয়।
এই সমস্যার এক সহজ, ঘরোয়া সমাধানের কথা বলছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত চিকিৎসক পালানিয়াপ্পন মানিক্কম। দীর্ঘদিন ধরে পেটের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জীবনযাপন নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসকারী এই চিকিৎসক সমাজমাধ্যমে বেশ জনপ্রিয়। স্বাস্থ্যকর খাওয়া, সহজ রেসিপি ও পুষ্টিগুণে ভরপুর খাবার নিয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, শরীর ভাল রাখতে বড় কোনও পরিবর্তনের দরকার নেই। শুধু দিনে একটি সঠিক পানীয়ই অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে।
চিকিৎসক মানিক্কম এমন এক বিশেষ ‘হেলথ ড্রিংক’-এর কথা বলেছেন, যা একাধারে ফাইবারের ঘাটতি পূরণ করে, শরীরকে জোগায় স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ভিটামিন ও খনিজ। তাঁর দাবি, টানা পাঁচ দিন এই পানীয় খেলেই শরীরে পরিবর্তন টের পাওয়া যাবে—ক্লান্তি কমবে, মন চনমনে থাকবে, পেট পরিষ্কার হবে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি কোনও জাদু নয়। পুরো বিষয়টাই পুষ্টিবিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তৈরি।
এই পানীয়ের মূল উপাদান হল চিয়াবীজ, কুমড়োর বীজ, কাঠবাদাম ও সূর্যমুখীর বীজ। চারটি উপকরণই সহজলভ্য, কিন্তু পুষ্টিগুণে ভরপুর। সঠিক অনুপাতে এবং সঠিক পদ্ধতিতে এগুলি ব্যবহার করলে এক গ্লাস পানীয়েই মিলবে বহু প্রয়োজনীয় উপাদান।
প্রথমেই আসা যাক ফাইবারের কথায়। এই বিশেষ পানীয়ে রয়েছে জলে দ্রবণীয় ফাইবার। চিয়াবীজে থাকা এই ফাইবার জল শুষে নিয়ে জেলির মতো হয়ে যায়। এর ফলে মল নরম হয় এবং মলত্যাগ সহজ হয়। যাঁরা নিয়মিত কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন, তাঁদের জন্য এটি বিশেষ উপকারী। পেট পরিষ্কার থাকলে শুধু অস্বস্তিই কমে না, শরীরও হালকা লাগে।
এর পাশাপাশি রয়েছে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট। কাঠবাদাম, কুমড়োর বীজ ও সূর্যমুখীর বীজে থাকা আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট পরিপাক প্রক্রিয়াকে ধীর করে। এর ফলে শক্তি ধীরে ধীরে শরীরে ছড়ায় এবং দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এনার্জি বজায় থাকে। সকালে এই পানীয় খেলে খুব তাড়াতাড়ি ক্ষুধা পায় না, অযথা খাওয়ার প্রবণতাও কমে।
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট অন্ত্রের জন্যও উপকারী। এটি অন্ত্রে উপকারী ব্যাক্টেরিয়ার বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এই ‘গুড ব্যাক্টেরিয়া’ হজমশক্তি বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মজবুত করে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভাল থাকলে মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এই পানীয়ে জল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পর্যাপ্ত জল না খেলে ফাইবার ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। জল ফাইবারকে সক্রিয় করে, গ্যাস-অম্বল ও বদহজমের সমস্যা দূরে রাখতে সাহায্য করে। তাই চিকিৎসক মানিক্কম জোর দিয়ে বলেছেন, এই পানীয়ের সঙ্গে সঙ্গে সারাদিন পর্যাপ্ত জল পান করা অত্যন্ত জরুরি।
এ বার দেখে নেওয়া যাক পানীয়ের প্রতিটি উপাদানের পুষ্টিগুণ আলাদা করে।
চিয়াবীজ:
চিয়াবীজে রয়েছে জলে দ্রবণীয় ফাইবার, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভাল রাখে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে।
কাঠবাদাম:
কাঠবাদামে রয়েছে ফাইবার, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, ভিটামিন ই এবং ম্যাগনেশিয়াম। এটি ত্বক ও চুলের জন্য উপকারী, পাশাপাশি পেশির কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ভিটামিন ই শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে।
কুমড়োর বীজ:
এই ছোট বীজে লুকিয়ে আছে প্রচুর ম্যাগনেশিয়াম, জিঙ্ক ও ফাইবার। ম্যাগনেশিয়াম স্নায়ু ও পেশির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, জিঙ্ক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কুমড়োর বীজ মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করে।
সূর্যমুখীর বীজ:
সূর্যমুখীর বীজে রয়েছে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, বি-কমপ্লেক্স ভিটামিন ও সেলেনিয়াম। এটি শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে এবং ত্বকের স্বাস্থ্য ভাল রাখে।
এই সব উপাদান একসঙ্গে জলেই ভিজিয়ে রাখার ফলে বীজ ও বাদাম নরম হয়ে যায়। এর ফলে শরীর সহজে পুষ্টিগুণ শোষণ করতে পারে। কাঁচা অবস্থায় যেগুলি হজম করতে কঠিন, ভিজিয়ে নিলে সেগুলি অনেক বেশি উপকারী হয়ে ওঠে।
এ বার জেনে নেওয়া যাক কী ভাবে এই স্বাস্থ্যকর পানীয় বানাবেন।
প্রথমে এক গ্লাস পরিষ্কার জলে ১ টেবিল চামচ চিয়াবীজ, ৫-৬টি কাঠবাদাম, ১ টেবিল চামচ কুমড়োর বীজ এবং ১ টেবিল চামচ সূর্যমুখীর বীজ দিয়ে দিন। এই মিশ্রণটি রাতভর ভিজিয়ে রাখুন। সকালে দেখবেন চিয়াবীজ ফুলে গেছে এবং বাদাম-বীজ নরম হয়ে গেছে।
পরদিন সকালে এই মিশ্রণটি মিক্সারে ভালো করে ঘুরিয়ে নিন। চাইলে এতে বাড়িতে বানানো কাঠবাদামের দুধ যোগ করতে পারেন, এতে স্বাদ ও পুষ্টিগুণ দুটোই বাড়বে। যাঁরা একটু মিষ্টি পছন্দ করেন, তাঁরা মধু, খেজুর বা অল্প কলা মিশিয়ে নিতে পারেন। তবে অতিরিক্ত মিষ্টি এড়িয়ে চলাই ভাল।
এই ঘন মিশ্রণটি পানীয়ের মতো সকালে খেয়ে নিন। খালি পেটে খেলে সবচেয়ে ভাল ফল পাওয়া যায়। চিকিৎসক মানিক্কম জানাচ্ছেন, নিয়ম করে টানা পাঁচ দিন এই পানীয় খেলে শরীরের পরিবর্তন নিজেই টের পাবেন। ক্লান্তি কমবে, পেট পরিষ্কার থাকবে, সারাদিন ঝরঝরে ভাব বজায় থাকবে।
এই পানীয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এটি কোনও নির্দিষ্ট ডায়েট বা কঠোর নিয়মের উপর নির্ভরশীল নয়। বাড়িতে থাকা সহজ উপকরণ দিয়েই বানানো যায়। অফিসে যাওয়ার আগে, ব্যস্ত দিনের শুরুতে এক গ্লাস এই পানীয় শরীরকে সঠিক পথে এগিয়ে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভাল স্বাস্থ্য মানেই বড় কোনও ত্যাগ বা ব্যয়বহুল খাবার নয়। সঠিক পুষ্টির সমন্বয়, নিয়মিত অভ্যাস আর পেটের স্বাস্থ্যের দিকে একটু বাড়তি নজরই যথেষ্ট। প্রতিদিনের জীবনে যদি এই ছোট পরিবর্তনটি আনা যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে শরীর ও মন—দুটোই সুস্থ থাকবে।
এই ছোট পরিবর্তনের প্রভাব ধীরে ধীরে হলেও গভীর। নিয়মিত পেট পরিষ্কার থাকলে শরীরের বিষাক্ত বর্জ্য সহজে বেরিয়ে যায়, যার ফলে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ে, মাথাব্যথা ও অলস ভাব কমে এবং মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়। অনেকেই লক্ষ্য করেন, হজম ঠিক না থাকলে সারাদিন অস্বস্তি কাজ করে—খিদে ঠিকমতো লাগে না, আবার অল্প খেলেই ভারী লাগে। পেটের এই সমস্যাগুলি দূর হলে স্বাভাবিক ভাবেই দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেটের স্বাস্থ্যের সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সরাসরি যোগ রয়েছে। অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাক্টেরিয়া শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। এই ব্যাক্টেরিয়াগুলির সংখ্যা কমে গেলে সহজেই সর্দি-কাশি, সংক্রমণ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ঝুঁকি বাড়ে। ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার ও পানীয় এই উপকারী ব্যাক্টেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে। ফলে নিয়মিত এমন পানীয় খেলে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মানসিক স্বাস্থ্য। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে গভীর যোগাযোগ রয়েছে। পেট ভাল থাকলে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিরক্তির মাত্রাও অনেকাংশে কমে। সকালে পুষ্টিকর একটি পানীয় দিয়ে দিন শুরু করলে তার প্রভাব সারাদিনে পড়ে—মেজাজ ভাল থাকে, কাজে মন বসে এবং অকারণ খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়।
এই পানীয় ও তার মতো পুষ্টিকর অভ্যাসগুলি ওজন নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করতে পারে। ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে, ফলে বারবার কিছু খাওয়ার ইচ্ছে হয় না। এর ফলে অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ কমে এবং ধীরে ধীরে শরীরের ওজনও নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এটি কোনও দ্রুত ওজন কমানোর উপায় নয়, বরং সুস্থ ও স্থায়ী পরিবর্তনের পথে একটি ধাপ।
সবচেয়ে বড় কথা, এই অভ্যাস বজায় রাখা সহজ। আলাদা করে রান্না বা সময় বের করার দরকার নেই। রাতে ভিজিয়ে রাখা আর সকালে মিক্সারে ঘুরিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট। ব্যস্ত জীবনে এমন সহজ পদ্ধতিই দীর্ঘদিন ধরে মেনে চলা সম্ভব হয়। তাই স্বাস্থ্য ভাল রাখতে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ছোট, বাস্তবসম্মত পরিবর্তন দিয়ে শুরু করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।