১৭ই মে ২০২৬ কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনের ইতিহাসে আজ এক যুগান্তকারী দিন। দীর্ঘ কয়েক দশকের বেআইনি জবরদখল এবং জঞ্জালের অবসান ঘটিয়ে কাল রাতে পূর্ব রেল এবং রাজ্য প্রশাসনের পূর্ণ সহযোগিতায় শিয়ালদহ স্টেশন চত্বরকে সম্পূর্ণভাবে জবরদখল মুক্ত করা হয়েছে। ক্লিন শিয়ালদহ গড়ে তোলার এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপে প্রতিদিন যাতায়াত করা লক্ষ লক্ষ যাত্রীর স্বাচ্ছন্দ্য এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হলো। সাধারণ মানুষ আজ সকালে এক নতুন এবং উন্মুক্ত শিয়ালদহ দেখে আনন্দে আত্মহারা।
কলকাতা ১৭ই মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী শহর কলকাতার লাইফলাইন বা জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশনের ইতিহাসে আজকের দিনটি এক অত্যন্ত গৌরবময় এবং অভাবনীয় অধ্যায় হিসেবে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কলকাতা শহর এবং তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো এই শিয়ালদহ স্টেশন। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনটি তার নিজস্ব রূপ এবং স্বাচ্ছন্দ্য হারিয়ে ফেলেছিল বেআইনি জবরদখলকারী এবং অস্থায়ী হকারদের অবাধ রাজত্বের কারণে। তবে আজ ১৭ই মে ২০২৬ সকালে শিয়ালদহ স্টেশনে যাতায়াতকারী নিত্যযাত্রীরা যখন ট্রেন থেকে প্ল্যাটফর্মে পা রাখলেন বা স্টেশনের বাইরে বেরোলেন, তখন তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠল এক সম্পূর্ণ নতুন এবং অচেনা ছবি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে, বর্তমান রাজ্য প্রশাসনের পূর্ণ সহযোগিতা এবং সদিচ্ছার ওপর ভিত্তি করে গত রাতে পূর্ব রেল বা ইস্টার্ন রেলওয়ে এক অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং বিশাল উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে শিয়ালদহ স্টেশন চত্বরকে সম্পূর্ণভাবে জবরদখল মুক্ত করে এক নতুন ক্লিন শিয়ালদহ এর জন্ম দিয়েছে। সাধারণ মানুষ আজ এক উন্মুক্ত, পরিষ্কার এবং নিরাপদ শিয়ালদহ স্টেশন দেখে রীতিমতো অবাক এবং চরম আনন্দিত।
শিয়ালদহ স্টেশন কেবল একটি রেলওয়ে স্টেশন নয়, এটি হলো সমগ্র দক্ষিণবঙ্গ এবং পূর্ব ভারতের অন্যতম ব্যস্ত এবং প্রাণবন্ত ট্রানজিট হাব। প্রতিদিন শিয়ালদহ মেইন, শিয়ালদহ নর্থ এবং শিয়ালদহ সাউথ শাখা দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ কলকাতা শহরে প্রবেশ করেন নিজেদের রুটিরুজির তাগিদে। কেউ নদীয়া, কেউ উত্তর চব্বিশ পরগনা, আবার কেউ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সুন্দরবন এলাকা থেকে প্রতিদিন কাকভোরে উঠে লোকাল ট্রেন ধরে শিয়ালদহে আসেন। কিন্তু এই লক্ষ লক্ষ যাত্রীর প্রতিদিনের যাতায়াতের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, প্রবেশদ্বার এবং বাইরের সংযোগকারী রাস্তাগুলোর ওপর গড়ে ওঠা হাজার হাজার বেআইনি দোকান এবং অস্থায়ী কাঠামো। বাঁশ, পলিথিন এবং ত্রিপল দিয়ে তৈরি এই অসংখ্য জবরদখলকারী দোকানগুলো স্টেশনের সৌন্দর্যের পাশাপাশি যাত্রীদের হাঁটার পথকে আক্ষরিক অর্থেই অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। অফিস যাওয়ার ব্যস্ত সময়ে বা উৎসবের দিনগুলোতে এই সরু এবং অবরুদ্ধ পথ দিয়ে যাতায়াত করা সাধারণ যাত্রীদের কাছে এক চরম নরক যন্ত্রণার সমান ছিল। সামান্য একটু দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করলেই হকারদের সাথে বচসা বা ধাক্কাধাক্কি ছিল প্রতিদিনের ঘটনা।
এই বেআইনি জবরদখলের কারণে শিয়ালদহ স্টেশনের ভেতরে এবং বাইরে এক অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর এবং দমবন্ধ করা পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। জবরদখলকারী দোকানগুলোর কারণে স্টেশনের মূল ভবন বা হেরিটেজ বিল্ডিংটি বাইরে থেকে দেখাই যেত না। এর পাশাপাশি এই দোকানগুলোর ফেলে দেওয়া জঞ্জাল, পচা সবজি এবং প্লাস্টিকের কারণে স্টেশনের নিকাশি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। সামান্য বৃষ্টি হলেই শিয়ালদহ স্টেশনের বাইরের ট্যাক্সি স্ট্যান্ড এবং বাস স্ট্যান্ড চত্বরে জল জমে যেত। শুধু তাই নয়, এই ঘিঞ্জি এবং অবরুদ্ধ পরিবেশের সুযোগ নিয়ে স্টেশন চত্বরে পকেটমার এবং অসামাজিক কার্যকলাপ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। মহিলা এবং বয়স্ক যাত্রীরা এই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করতে অত্যন্ত ভয় পেতেন। কোনো জরুরি অবস্থায় যদি স্টেশনে অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ঢোকার প্রয়োজন হতো, তবে জবরদখলের কারণে তা একপ্রকার অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত। পূর্ব রেল কর্তৃপক্ষ একাধিকবার এই জবরদখল সরানোর চেষ্টা করলেও, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং স্থানীয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বাধার কারণে সেই সমস্ত প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছিল।
কিন্তু এবার রাজ্যের প্রশাসনিক সমীকরণে এক বিশাল এবং ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান রাজ্য সরকার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এবং কঠোরভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, সাধারণ মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য এবং রাজ্যের উন্নয়নের প্রশ্নে কোনো রকম আপোষ বা বেআইনি কাজ বরদাস্ত করা হবে না। রাজ্য প্রশাসনের এই সহযোগিতামূলক এবং কড়া বার্তার পরেই শিয়ালদহ স্টেশনকে জবরদখল মুক্ত করার ক্ষেত্রে আর কোনো বাধা অবশিষ্ট ছিল না। পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজার এবং রাজ্য পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের মধ্যে একাধিক গোপন এবং অত্যন্ত ফলপ্রসূ বৈঠকের পর গতকাল রাতে এই ঐতিহাসিক উচ্ছেদ অভিযানের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করা হয়। রাজ্য সরকার পূর্ব রেলকে আশ্বস্ত করেছিল যে, জবরদখলকারীদের সরানোর সময় রাজ্য পুলিশের তরফ থেকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা প্রদান করা হবে যাতে কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা বা আইন শৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে। এই সমন্বয় এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর এক অত্যন্ত ইতিবাচক এবং শক্তিশালী দিককে তুলে ধরেছে।
গতকাল শনিবার গভীর রাতে যখন শিয়ালদহ স্টেশন চত্বর ধীরে ধীরে জনশূন্য হতে শুরু করে এবং লোকাল ট্রেনের আনাগোনা কমে আসে, ঠিক তখনই শুরু হয় এই বিশাল এবং অভাবনীয় অপারেশন। পূর্ব রেলের নিজস্ব রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স বা আরপিএফ, গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশ বা জিআরপি এবং কলকাতা পুলিশের বিশাল কমব্যাট ফোর্স একসাথে শিয়ালদহ স্টেশনের চারপাশে এক দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে। এই বিশাল পুলিশি প্রহরার মধ্যে দিয়ে স্টেশনের বাইরের চত্বরে প্রবেশ করে একাধিক পেলোডার, বুলডোজার এবং কর্পোরেশনের বড় বড় ডাম্পার লরি। রাতের অন্ধকারের নিস্তব্ধতা ভেঙে বুলডোজারের গর্জনে শুরু হয় এক নতুন শিয়ালদহ গড়ার কাজ। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এবং কোনো রকম হিংসাত্মক ঘটনা ছাড়াই একে একে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা সমস্ত বেআইনি দোকানপাট এবং অস্থায়ী কাঠামো। শিয়ালদহ মেইন গেট, ভিআইপি গেট সংলগ্ন এলাকা, ট্যাক্সি স্ট্যান্ড এবং সাউথ সেকশনের দিকে যাওয়ার রাস্তার ওপর থেকে সমস্ত ত্রিপল এবং বাঁশের কাঠামো সরিয়ে ফেলা হয়।
এই উচ্ছেদ অভিযানের সময় পুলিশ এবং রেল প্রশাসনের আধিকারিকরা অত্যন্ত মানবিক এবং পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তারা হকারদের নিজেদের মালপত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিয়েছিলেন এবং মাইকিং করে তাদের এলাকা ছেড়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। যেহেতু রাজ্য প্রশাসনের কড়া নির্দেশ ছিল, তাই কোনো রাজনৈতিক দল বা স্থানীয় নেতা এই উচ্ছেদ অভিযানে বাধা দেওয়ার সাহস দেখাতে পারেননি। সারারাত ধরে চলা এই অক্লান্ত পরিশ্রমের পর যখন ভোরের আলো ফুটল, তখন শিয়ালদহ স্টেশনের রূপ দেখে উপস্থিত পুলিশ কর্মী এবং রেল আধিকারিকরাই রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেলেন। শিয়ালদহ স্টেশনের সেই প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী মূল ভবনটি আজ দীর্ঘ বছর পর কোনো রকম বাধা ছাড়াই সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। স্টেশনের সামনের রাস্তাটি যে এত চওড়া এবং বিশাল, তা হয়তো বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই আগে কোনোদিন উপলব্ধি করতে পারেননি। রাতের মধ্যেই কর্পোরেশনের সাফাই কর্মীরা সমস্ত জঞ্জাল পরিষ্কার করে রাস্তা জল দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছেন।
আজ রবিবার সকালে যখন প্রথম লোকাল ট্রেনের যাত্রীরা শিয়ালদহ স্টেশনে এসে নামলেন, তারা আক্ষরিক অর্থেই চমকে উঠলেন। প্রতিদিন যে সরু এবং অন্ধকার পথ দিয়ে তাদের ঠেলাঠেলি করে বেরোতে হতো, আজ সেই পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং আলোকিত। রানাঘাট থেকে আসা এক প্রবীণ নিত্যযাত্রী লেন্সপিডিয়া এর প্রতিনিধিকে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে জানালেন, আমি গত চল্লিশ বছর ধরে এই শিয়ালদহ স্টেশনে যাতায়াত করছি। আমার চোখের সামনে এই স্টেশনটাকে ধীরে ধীরে জবরদখলকারীদের হাতে নষ্ট হয়ে যেতে দেখেছি। আজ সকালে ট্রেন থেকে নেমে আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল যেন আমি বিদেশের কোনো স্টেশনে এসে নেমেছি। এত পরিষ্কার, এত সুন্দর শিয়ালদহ আমি আমার যৌবনকালেও দেখিনি। রাজ্য সরকার এবং রেল প্রশাসনকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ এবং স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস প্রমাণ করে যে প্রশাসনের এই পদক্ষেপ কতটা যুগান্তকারী এবং প্রয়োজনীয় ছিল।
ক্লিন শিয়ালদহ গড়ার এই উদ্যোগ কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছে প্রতিদিন যাতায়াত করা লক্ষ লক্ষ যাত্রীর নিরাপত্তা এবং স্বাচ্ছন্দ্য। জবরদখল মুক্ত হওয়ার ফলে এখন স্টেশনে ঢোকা এবং বেরোনোর রাস্তাগুলো সম্পূর্ণ বাধামুক্ত হয়েছে। এর ফলে অফিস টাইমে বা উৎসবের দিনে স্টেশনে পদপিষ্ট হওয়ার মতো কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনার আশঙ্কা আর রইল না। যাত্রীরা এখন অত্যন্ত নিশ্চিন্তে এবং দ্রুতগতিতে নিজেদের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারবেন। এছাড়া স্টেশন চত্বর পরিষ্কার থাকায় পকেটমার এবং দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমে যাবে বলে পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা মনে করছেন। স্টেশনের বাইরের ট্যাক্সি স্ট্যান্ড এবং বাস স্ট্যান্ড এলাকা উন্মুক্ত হওয়ার ফলে এখন ট্রাফিক ব্যবস্থা অনেক বেশি সুশৃঙ্খল হবে। শিয়ালদহ উড়ালপুল থেকে নেমে আসা গাড়িগুলো এখন আর যানজটে আটকে থাকবে না, যা সমগ্র মধ্য এবং উত্তর কলকাতার ট্রাফিক ব্যবস্থায় এক বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পূর্ব রেলের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, জবরদখল মুক্ত করার এই কাজ কেবল শুরু মাত্র। ক্লিন শিয়ালদহ এর এই রূপ ধরে রাখার জন্য এখন থেকে প্রতিনিয়ত কড়া নজরদারি চালানো হবে। আরপিএফ এবং জিআরপি কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে কোনোভাবেই কোনো হকার বা জবরদখলকারী পুনরায় স্টেশন চত্বরে নিজেদের অস্থায়ী দোকান বসাতে না পারে। এর জন্য স্টেশন চত্বরে অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে এবং রাউন্ড দ্য ক্লক বা চব্বিশ ঘণ্টা পাহারার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ভারত সরকারের অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের আওতায় শিয়ালদহ স্টেশনকে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার যে ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করা হয়েছে, এই জবরদখল উচ্ছেদ হলো সেই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আগামী দিনে এই উন্মুক্ত স্থানগুলোতে যাত্রীদের বসার জন্য আধুনিক লাউঞ্জ, সুন্দর বাগান, ঝর্ণা এবং পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হবে যাতে শিয়ালদহ স্টেশন কলকাতার অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়।
তবে এই উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণতান্ত্রিক এবং কল্যাণকামী রাষ্ট্রে উন্নয়ন এবং মানবিকতার মধ্যে এক সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। যে সমস্ত হকারদের আজ উচ্ছেদ করা হলো, তাদের রুটিরুজির একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। রাজ্য প্রশাসন এবং রেল কর্তৃপক্ষের উচিত এই সমস্ত গরিব হকারদের জন্য একটি নির্দিষ্ট এবং সুশৃঙ্খল হকিং জোন তৈরি করে দেওয়া, যেখানে তারা নিজেদের বৈধ ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন এবং যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যেরও কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না। শহরের উন্নয়ন কখনোই গরিব মানুষের পেটে লাথি মেরে হতে পারে না। মুখ্যমন্ত্রী বারবার জানিয়েছেন যে প্রশাসন হকারদের বিরোধী নয়, কিন্তু বেআইনিভাবে রাস্তা দখল করে মানুষের চলাচলের পথ অবরুদ্ধ করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। তাই সঠিক পুনর্বাসন নীতির মাধ্যমেই এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব।
আজকের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে রাজ্যের বর্তমান প্রশাসনের সহযোগিতামূলক নীতির এক বিশাল ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্র এবং রাজ্যের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে রেলওয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক কাজ থমকে ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার প্রমাণ করে দিয়েছে যে সাধারণ মানুষের কল্যাণের স্বার্থে সমস্ত রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে একসাথে কাজ করা সম্ভব। শিয়ালদহের এই মডেল এখন হাওড়া এবং কলকাতা স্টেশনের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে স্টেশনগুলোতেও প্রয়োগ করার কথা ভাবা হচ্ছে। ডিজিটাল মিডিয়া এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোতে আজ সকাল থেকেই ক্লিন শিয়ালদহ এর ছবি এবং ভিডিও ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম যারা পরিষ্কার এবং আধুনিক পরিকাঠামো দেখতে অভ্যস্ত, তারা সরকারের এই সাহসী পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করছেন। তারা নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে বিফোর এবং আফটার বা আগে ও পরের ছবি শেয়ার করে প্রশাসনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন।
শিয়ালদহ স্টেশন চত্বরের এই নতুন রূপ শহরের পর্যটন এবং অর্থনীতিতেও এক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কলকাতার মতো একটি ঐতিহাসিক শহরে যখন কোনো বাইরের পর্যটক শিয়ালদহ স্টেশনে এসে নামেন, তখন স্টেশনের বাইরের পরিবেশ শহরের প্রথম ইম্প্রেশন বা ধারণা তৈরি করে। এতদিন সেই ধারণা খুব একটা সুখকর ছিল না। কিন্তু এখন উন্মুক্ত এবং সুন্দর শিয়ালদহ স্টেশন কলকাতার ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিক স্তরে অনেক বেশি উজ্জ্বল করবে। এছাড়া শিয়ালদহ সংলগ্ন কোলে মার্কেট বা শিয়ালদহ বাজারের মতো বিশাল বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে এখন পণ্যবাহী গাড়িগুলোর যাতায়াত অনেক বেশি মসৃণ হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে এক বিশাল গতি প্রদান করবে।
পরিবেশগত দিক থেকেও এই জবরদখল উচ্ছেদ এক বিশাল বড় পদক্ষেপ। স্টেশনের বাইরে যত্রতত্র প্লাস্টিক এবং বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশের যে ভয়ানক ক্ষতি হচ্ছিল, তা এবার বন্ধ হবে। পূর্ব রেলের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা এখন অনেক সহজে এবং দ্রুত স্টেশনের চারপাশ পরিষ্কার রাখতে পারবেন। স্বচ্ছ ভারত অভিযানের যে মূল লক্ষ্য, শিয়ালদহ স্টেশন আজ সেই লক্ষ্যের দিকে এক বিশাল পদক্ষেপ গ্রহণ করল। সাধারণ নাগরিকদেরও উচিত এই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে রেল প্রশাসনকে সম্পূর্ণ সাহায্য করা। স্টেশন চত্বরে যত্রতত্র পানের পিক ফেলা বা নোংরা আবর্জনা ফেলা থেকে আমাদের সকলকেই বিরত থাকতে হবে। একটি শহরকে পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব কেবল প্রশাসনের নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের প্রাথমিক কর্তব্য।
পরিশেষে এটা অত্যন্ত গর্বের সাথে বলা যায় যে, আজকের এই ১৭ই মে তারিখটি শিয়ালদহ স্টেশন এবং কলকাতার বুকে এক নতুন যুগের সূচনা করল। জবরদখলকারী তোলার ক্ষেত্রে যে আর কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বাধা নেই, তা আজ কাল রাতের এই ঐতিহাসিক অভিযানের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। পূর্ব রেল এবং রাজ্য প্রশাসনের এই যৌথ এবং সহযোগিতামূলক উদ্যোগ বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত সফল মডেল হিসেবে পরিগণিত হবে। যে শিয়ালদহ স্টেশন একদিন জঞ্জাল এবং ভিড়ের জন্য মানুষের বিরক্তির কারণ ছিল, আজ সেই শিয়ালদহ স্টেশন তার নতুন এবং উন্মুক্ত রূপ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এক বিশাল আনন্দের সঞ্চার করেছে। যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য এবং নিরাপত্তা আজ সম্পূর্ণভাবে সুনিশ্চিত। আমরা লেন্সপাদিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে পূর্ব রেল এবং রাজ্য সরকারের এই সাহসী এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাচ্ছি এবং আশা করছি শিয়ালদহ স্টেশনের এই ক্লিন এবং সুন্দর রূপ আগামী দিনেও অমলিন থাকবে। আসুন আমরা সবাই মিলে আমাদের প্রিয় শহর কলকাতাকে আরও সুন্দর এবং পরিষ্কার করে তোলার এই যাত্রায় শামিল হই। বিস্তারিত খবরের জন্য এবং নতুন ক্লিন শিয়ালদহ এর লাইভ ভিডিও ও যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া দেখতে কমেন্ট বক্সে থাকা লিঙ্কে এখনই ক্লিক করুন এবং চোখ রাখুন আমাদের ডিজিটাল পর্দায়।