Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রেকর্ড পতনে রুপি প্রায় ৯০-এর ঘরে, বিদেশে পড়াশোনা ও ভ্রমণে বড় ধাক্কা

ভারতীয় মুদ্রা রুপি ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপি প্রায় ৯০ এর কাছাকাছি চলে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে যাঁরা বিদেশে পড়াশোনা করতে চান বা যাঁদের বিদেশ সফরের পরিকল্পনা রয়েছে, তাঁদের বাজেটে বড় চাপ পড়তে চলেছে। ডলার ইউরো ও পাউন্ডের তুলনায় রুপির এই দুর্বলতা বিদেশি শিক্ষা ফি ভিসা খরচ বিমান ভাড়া ও দৈনন্দিন খরচ অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে। পাশাপাশি বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার খরচও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আমেরিকার সুদের হার বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের টাকা তুলে নেওয়াই রুপির এই পতনের মূল কারণ।

বিদেশে পড়াশোনা ও ছুটির বাজেটে কী প্রভাব পড়বে? বিস্তারিত বিশ্লেষণ

ভারতীয় মুদ্রা রুপি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক অধ্যায়ের মুখোমুখি। মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপি প্রায় ৯০-এর কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় দেশজুড়ে অর্থনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনে এই পরিবর্তনের প্রভাব কেবল শেয়ার বাজার বা আমদানি-রপ্তানির পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সরাসরি প্রভাব ফেলছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পর্যটক, ব্যবসায়ী এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক পরিকল্পনায়।

বিশেষ করে যাঁরা বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখছেন অথবা যাঁদের বিদেশ সফরের পরিকল্পনা রয়েছে, তাঁদের জন্য এই পরিস্থিতি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। রুপির মান যত দুর্বল হচ্ছে, ততই ডলার, ইউরো বা পাউন্ডে নির্ধারিত খরচ ভারতীয় মুদ্রায় আরও বেশি হয়ে উঠছে।
 

একইভাবে বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও বড় ধাক্কা লাগতে চলেছে। ইউরোপ আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে হোটেল বুকিং কেনাকাটা খাবারদাবার সব কিছুর খরচই আগের তুলনায় অনেক বেশি পড়বে। ফলে অনেক পরিবার হয়তো বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে বাধ্য হবে বলে মনে করছেন পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্তরা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রুপির এই পতনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান, আমেরিকার সুদের হার বৃদ্ধি, পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভারতীয় বাজার থেকে টাকা তুলে নেওয়া—সব মিলিয়েই রুপির উপর চাপ তৈরি হয়েছে।

তবে এই পরিস্থিতিতে কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। রুপি দুর্বল হলে ভারতের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়, যা রপ্তানিকারকদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। আইটি পরিষেবা ও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য এটি স্বল্পমেয়াদে লাভজনক হলেও সাধারণ ভোক্তার উপর এর প্রভাব বেশ নেতিবাচক।

সব মিলিয়ে, রুপির এই রেকর্ড পতন বিদেশে পড়াশোনা ও ভ্রমণ পরিকল্পনায় থাকা মানুষের জন্য বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনে রুপি কতটা স্থিতিশীল হয় এবং কেন্দ্রীয় সরকার ও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর অর্থনৈতিক মহলের।


কেন এত দুর্বল হল রুপি?

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রুপির এই রেকর্ড পতনের পেছনে একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ কাজ করছে।

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান। আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ স্তরে ধরে রাখায় ডলারের চাহিদা বেড়েছে। ফলে বিশ্বের প্রায় সব দেশের মুদ্রার উপর চাপ পড়েছে, রুপিও তার ব্যতিক্রম নয়।

দ্বিতীয়ত, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলারের দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে উদীয়মান বাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে টাকা তুলে নিচ্ছেন।

তৃতীয়ত, ভারতের আমদানি নির্ভরতা। অপরিশোধিত তেল, ইলেকট্রনিক্স, প্রতিরক্ষা সরঞ্জামসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য ভারতকে বিদেশের উপর নির্ভর করতে হয়। রুপি দুর্বল হলে এই আমদানির খরচ বেড়ে যায়, যা আবার বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ সৃষ্টি করে।


বিদেশে পড়াশোনার খরচ কতটা বাড়বে?

রুপির পতনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে বিদেশে পড়াশোনার খাতে। বর্তমানে আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পড়াশোনার জন্য বিপুল সংখ্যক ভারতীয় ছাত্রছাত্রী যাচ্ছেন।

বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির টিউশন ফি সাধারণত ডলার, পাউন্ড বা ইউরোতে নির্ধারিত হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কোনও কোর্সের বার্ষিক ফি ৩০ হাজার ডলার হয়, তাহলে ডলার প্রতি ৭৫ টাকায় সেই খরচ ছিল প্রায় ২২.৫ লক্ষ টাকা। কিন্তু ডলার যদি ৯০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তাহলে সেই একই ফি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৭ লক্ষ টাকার বেশি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় হোস্টেল বা ভাড়া, খাবার, স্বাস্থ্য বিমা, বইপত্র, যাতায়াত এবং ব্যক্তিগত খরচ। ফলে মোট ব্যয় অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারকে তাই শিক্ষা ঋণের পরিমাণ বাড়াতে হচ্ছে অথবা বিকল্প পরিকল্পনা করতে বাধ্য হতে হচ্ছে।


শিক্ষা ঋণ ও EMI-এর উপর প্রভাব

রুপি দুর্বল হওয়ার ফলে শিক্ষা ঋণের উপরেও চাপ বাড়ছে। যাঁরা বিদেশে পড়াশোনার জন্য ইতিমধ্যেই শিক্ষা ঋণ নিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের EMI বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে যদি ঋণটি বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্গে যুক্ত হয়।

news image
আরও খবর

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিও এখন আরও সতর্কভাবে ঋণ অনুমোদন করছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অতিরিক্ত গ্যারান্টি বা জামানত দিতে হচ্ছে। ফলে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।


বিদেশ ভ্রমণের বাজেটে কী প্রভাব পড়বে?

শুধু পড়াশোনাই নয়, রুপির দুর্বলতার বড় প্রভাব পড়ছে বিদেশ ভ্রমণের উপরেও। ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করা ভারতীয় পর্যটকদের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে।

বিমানের টিকিট, হোটেল বুকিং, খাবার, স্থানীয় যাতায়াত এবং কেনাকাটা—সব কিছুই বিদেশি মুদ্রায় নির্ধারিত। ফলে রুপি দুর্বল হলে একই ভ্রমণের জন্য আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অনেক পরিবার তাই বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল বা পিছিয়ে দিচ্ছে।

পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্তদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিদেশ ভ্রমণের চাহিদা কমতে পারে এবং তার প্রভাব পড়তে পারে ট্রাভেল এজেন্সি ও এয়ারলাইন্স ব্যবসার উপর।


সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব

রুপি দুর্বল হওয়ার প্রভাব কেবল বিদেশে পড়াশোনা বা ভ্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়ার ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে।

ইলেকট্রনিক পণ্য, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, বিদেশি ব্র্যান্ডের পোশাক ও গ্যাজেটের দাম বাড়তে পারে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহণ খরচ বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের উপর।


রপ্তানিকারকদের জন্য কি কোনও সুবিধা আছে?

সব দিক থেকে রুপির দুর্বলতা যে নেতিবাচক, তা নয়। রুপি দুর্বল হলে ভারতের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়। এর ফলে তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা, টেক্সটাইল, ওষুধ শিল্প এবং অন্যান্য রপ্তানিমুখী খাত কিছুটা সুবিধা পেতে পারে।

বিশেষ করে আইটি ও সফটওয়্যার পরিষেবা সংস্থাগুলি, যাদের আয় মূলত ডলারে হয়, তারা স্বল্পমেয়াদে লাভবান হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে যদি আমদানির খরচ অত্যধিক বেড়ে যায়, তাহলে এই সুবিধাও সীমিত হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


RBI ও সরকারের ভূমিকা

রুপির এই পতনের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকার ও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। RBI অতীতেও একাধিকবার বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে হস্তক্ষেপ করে রুপিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার, সুদের হার নীতি এবং আর্থিক সংস্কারের মাধ্যমে রুপিকে কিছুটা স্থিতিশীল করা সম্ভব। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনুকূল না হলে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তন আশা করা কঠিন।


কী করা উচিত শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের?

এই পরিস্থিতিতে আর্থিক বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিচ্ছেন। বিদেশে পড়াশোনা করতে ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে আগে থেকেই বাজেট পরিকল্পনা করা, স্কলারশিপ ও অনুদানের সুযোগ খোঁজা এবং শিক্ষা ঋণের শর্ত ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।

পর্যটকদের ক্ষেত্রে বিদেশ ভ্রমণের আগে মুদ্রা বিনিময়ের হার নজরে রাখা, আগাম বুকিং করা এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।


উপসংহার

সব মিলিয়ে বলা যায়, রুপির এই রেকর্ড পতন ভারতের অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত। বিদেশে পড়াশোনা ও ভ্রমণের স্বপ্ন দেখা মানুষের জন্য এটি যেমন আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে, তেমনই সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে।

আগামী দিনে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের নীতি এবং সরকারের পদক্ষেপের উপরই নির্ভর করবে রুপি কতটা দ্রুত স্থিতিশীল হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন ও পরিকল্পিত আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে—এটাই বিশেষজ্ঞদের মূল বার্তা।

Preview image