Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

আইপিএলে দাপট বাড়ছে অভিষেক, বৈভবদের মতো বাঁহাতিদের, নেপথ্যে অধিনায়কদের ভুল পরিকল্পনা!

চলতি আইপিএলে একটি বিষয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। প্রতিযোগিতা যত এগোচ্ছে ততই দেখা যাচ্ছে বাঁহাতি ক্রিকেটারদের দাপট। অভিষেক শর্মা, বৈভব সূর্যবংশীদের ব্যক্তিগত দক্ষতাই নয়, নেপথ্যে বিপক্ষ অধিনায়কদের ভুল পরিকল্পনাও।চলতি আইপিএলে একটি বিষয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। প্রতিযোগিতা যত এগোচ্ছে ততই দেখা যাচ্ছে বাঁহাতি ক্রিকেটারদের দাপট। অভিষেক শর্মা, বৈভব সূর্যবংশী, তিলক বর্মা, যশস্বী জয়সওয়ালেরা প্রায় প্রতি ম্যাচেই সাফল্য পাচ্ছেন। শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত দক্ষতাই নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে বিপক্ষ অধিনায়কদের ভুল পরিকল্পনাও।

দেখা গিয়েছে, বাঁহাতি ব্যাটারদের সামনে দলের সেরা স্পিনারকে কিছুতেই আনছেন না অধিনায়কেরা। চেষ্টা করছেন আংশিক সময়ের বোলারদের দিয়ে কাজ চালাতে। রেখে দিচ্ছেন সেরা বোলারদের। দিল্লি বনাম হায়দরাবাদ ম্যাচে সেটা বোঝা গিয়েছে। বাঁহাতিদের সামনে দিল্লির অধিনায়ক অক্ষর পটেল নিজেকে বা কুলদীপ যাদবকে না এলে ঠেলে দিয়েছেন নীতীশ রানাকে। সেই পরিকল্পনা কাজে লাগেনি।

বাঁহাতিদের বিরুদ্ধে ডান হাতি বোলারেরা চেষ্টা করছেন অফস্টাম্পের বাইরে ইয়র্কার ফেলতে। শরীর বা মারার জায়গা লক্ষ্য করে বল করছেন না। বল ইনসুইংও করাতে পারছেন না। এতে বাঁহাতিরা ক্রিজ়ে জমে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

এখনও পর্যন্ত সেরা ব্যাটারদের প্রথম ১০ জনের তালিকায় ছ’জন বাঁহাতি। ৩২৩ রান নিয়ে অভিষেক শীর্ষে। বৈভবের রয়েছে ২৪৬ রান। এ ছাড়া যশস্বী (২২৩), কুপার কনোলি (২২৩), প্রিয়াংশ আর্যরাও (২১১) রয়েছেন। চমকের ব্যাপার হল, ছ’জনের মধ্যে চার জনই ওপেনার। তাঁরা বেশি বল খেলার সুযোগ পান। বিশেষ করে পাওয়ার প্লে-তে। ফলে গোটা প্রতিযোগিতাতেই তাঁদের রান বেশি হয়। বাঁহাতিদের সামনে কোনও আগ্রাসী বোলারকে আনার সাহস এখনও পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।

বাঁহাতি ওপেনার থাকলে সুবিধাও হয়ে যাচ্ছে। পয়েন্ট তালিকায় নীচের দিকে থাকা দু’টি দলে দুই ওপেনার ডান হাতি। চেন্নাইয়ে রুতুরাজ গায়কোয়াড় এবং সঞ্জু স্যামসন এবং কলকাতায় অজিঙ্ক রাহানে ও ফিন অ্যালেট/টিম সেইফার্ট। তবে উল্টো চিত্রও রয়েছে। মুম্বইয়ে রায়ান রিকেলটন, কুইন্টন ডি ককেরা থাকলেও দলকে বেশি জেতাতে পারেননি। কুইন্টনের শতরান সত্ত্বেও হারতে হয়েছে মুম্বইকে। সেই মুম্বইয়েরই তিলক শতরান করে দলকে জিতিয়েছেন।এই বিষয়ে রবিচন্দ্রন অশ্বিন বলেছেন, “প্রধান বোলারদের দিয়ে বল না করিয়ে এটাই প্রমাণ করা হচ্ছে যে, দলের বোলারদের উপর অধিনায়কের আস্থা নেই। বোলারদের পাশে থাকতেই হবে। রান হজম করতেই পারে। সেটা খেলারই অংশ। কিন্তু বল না দেওয়া মানে তো অবিশ্বাস করা।”

রবিচন্দ্রন অশ্বিনের এই মন্তব্যটি আধুনিক ক্রিকেটে অধিনায়কত্ব, বোলিং ব্যবস্থাপনা এবং দলগত আস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। Ravichandran Ashwin শুধু একজন অভিজ্ঞ স্পিনার নন, তিনি খেলার গভীর বিশ্লেষক হিসেবেও পরিচিত। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে বোঝা যায়, বর্তমান ক্রিকেটে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অনেক অধিনায়ক হয়তো তাৎক্ষণিক ফলাফলের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দলের আত্মবিশ্বাস এবং ভারসাম্যের কথা ভুলে যাচ্ছেন।

প্রথমত, অশ্বিন যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন, তা হল অধিনায়কের আস্থা। একটি ক্রিকেট দলের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে অধিনায়ক এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্কের উপর। যখন একজন অধিনায়ক তার প্রধান বোলারদের দিয়ে নিয়মিত বল করান না, তখন সেটা শুধু একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত থাকে না—তা একটি বার্তা হয়ে দাঁড়ায়। এই বার্তা হল, “আমি তোমার উপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছি না।” একজন বোলারের জন্য এটি অত্যন্ত হতাশাজনক হতে পারে, বিশেষ করে যদি সে দলের প্রধান অস্ত্র হয়।

ক্রিকেট এমন একটি খেলা যেখানে প্রতিটি খেলোয়াড়ের একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা থাকে। একজন প্রধান বোলারের কাজ হল চাপের মুহূর্তে দলকে উইকেট এনে দেওয়া বা রান আটকানো। যদি সেই সময় তাকে বলই না দেওয়া হয়, তাহলে তার দক্ষতা ব্যবহার করার সুযোগই থাকে না। এতে করে শুধু ম্যাচের ফলাফল নয়, খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন বোলার যখন জানে যে অধিনায়ক তাকে বিশ্বাস করছেন না, তখন সে নিজের খেলাতেও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

অশ্বিনের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল “রান হজম করতেই পারে, সেটা খেলারই অংশ।” আধুনিক টি-২০ বা একদিনের ক্রিকেটে বোলারদের উপর চাপ অনেক বেশি। ব্যাটসম্যানরা আগ্রাসী হয়ে উঠেছে, মাঠ ছোট হয়েছে, নিয়মও অনেকটাই ব্যাটসম্যানদের পক্ষে। এই পরিস্থিতিতে একজন বোলার যদি কিছু রান দিয়ে দেয়, তা অস্বাভাবিক নয়। বরং এটা খেলার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু যদি একজন অধিনায়ক শুধু এই কারণেই বোলারকে সরিয়ে দেন, তাহলে তিনি খেলার প্রকৃত বাস্তবতাকে অস্বীকার করছেন।

একজন ভালো অধিনায়ক জানেন যে খেলার প্রতিটি মুহূর্তে সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হবে না। কখনও কখনও বোলাররা খারাপ দিন কাটাবে, কখনও ব্যাটসম্যানরা ব্যর্থ হবে। কিন্তু দলের নেতা হিসেবে তার কাজ হল খেলোয়াড়দের পাশে থাকা এবং তাদের আত্মবিশ্বাস বজায় রাখা। যদি একজন বোলার খারাপ বল করে, তাহলে তাকে সমর্থন দেওয়া উচিত, যাতে সে পরের ওভারে আরও ভালোভাবে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু যদি তাকে বল দেওয়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে তার উন্নতির সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়।

news image
আরও খবর

এখানে অধিনায়কত্বের একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে। একজন খেলোয়াড় যখন অনুভব করে যে তার অধিনায়ক তাকে সমর্থন করছেন, তখন সে আরও ভালো পারফরম্যান্স দেওয়ার চেষ্টা করে। এই বিশ্বাস তাকে সাহস দেয়, নতুন কিছু চেষ্টা করার আত্মবিশ্বাস দেয়। কিন্তু যখন সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন খেলোয়াড়ের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা তার পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অশ্বিনের বক্তব্য বর্তমান ক্রিকেটের একটি প্রবণতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। আজকাল অনেক অধিনায়ক ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত বদলান। কোনও বোলার একটি ওভারে বেশি রান দিলে তাকে সরিয়ে অন্য কাউকে আনা হয়। এই ধরনের “রিঅ্যাকটিভ ক্যাপ্টেনসি” অনেক সময় দলের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে। কারণ এতে করে বোলাররা জানে না তারা কতটা সময় পাবে, ফলে তারা নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বল করতে পারে না।

অন্যদিকে, অতীতে আমরা অনেক সফল অধিনায়ককে দেখেছি যারা তাদের বোলারদের উপর অগাধ বিশ্বাস রাখতেন। তারা জানতেন যে একটি খারাপ ওভার মানেই খারাপ বোলার নয়। তারা তাদের প্রধান বোলারদের উপর আস্থা রাখতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাদেরই দায়িত্ব দিতেন। এই আস্থার ফলেই অনেক বোলার নিজেদের সেরাটা দিতে পেরেছেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দলের ভারসাম্য। যদি প্রধান বোলারদের ব্যবহার না করা হয়, তাহলে অন্য বোলারদের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে করে পুরো বোলিং ইউনিটের ভারসাম্য নষ্ট হয়। একটি দলের সাফল্যের জন্য প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক বোলারকে ব্যবহার করা, এবং সেই সিদ্ধান্তের পেছনে থাকা উচিত আস্থা ও পরিকল্পনা।

অশ্বিনের এই মন্তব্য থেকে আরও একটি বিষয় পরিষ্কার হয়—ক্রিকেট শুধু পরিসংখ্যানের খেলা নয়, এটি মানুষের খেলা। এখানে আবেগ, বিশ্বাস, এবং সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক বেশি। একজন অধিনায়ক যদি শুধু সংখ্যার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তিনি খেলার মানবিক দিকটি উপেক্ষা করছেন। একজন বোলার শুধু একটি সংখ্যা নয়; সে একজন মানুষ, যার অনুভূতি, আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক অবস্থা রয়েছে।

এই প্রসঙ্গে বলা যায়, একজন অধিনায়কের দায়িত্ব শুধু ম্যাচ জেতা নয়, বরং একটি শক্তিশালী দল গঠন করা। একটি দল তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার প্রতিটি সদস্য নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং জানে যে তাদের উপর বিশ্বাস রাখা হচ্ছে। যদি সেই বিশ্বাস না থাকে, তাহলে দল কখনওই তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না।

অশ্বিনের বক্তব্য বিশেষ করে তরুণ বোলারদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তারা এখনও শিখছে, নিজেদের দক্ষতা উন্নত করছে। যদি এই সময় তারা অধিনায়কের সমর্থন না পায়, তাহলে তাদের উন্নতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একজন তরুণ বোলারকে সুযোগ দেওয়া এবং তার পাশে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এভাবেই ভবিষ্যতের তারকা তৈরি হয়।

সবশেষে বলা যায়, অশ্বিনের এই মন্তব্য শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ম্যাচ বা দলের জন্য নয়, বরং পুরো ক্রিকেট বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ক্রিকেটে আস্থা, সমর্থন এবং ধৈর্যের গুরুত্ব কতটা বেশি। একজন অধিনায়ক যদি তার বোলারদের উপর বিশ্বাস রাখেন, তাহলে সেই বিশ্বাসই একদিন দলের সাফল্যের ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে।

সুতরাং, “বল না দেওয়া মানে অবিশ্বাস”—এই কথাটি শুধু একটি বাক্য নয়, এটি একটি দর্শন। এটি আমাদের শেখায় যে একজন নেতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার দলের উপর বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসই একটি দলকে সাধারণ থেকে অসাধারণ করে তুলতে পারে।

Preview image