ট্রাম্পের কয়েক দিনেই খেল খতম হুঙ্কারের পরও ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়। ১০৮ দিনের লড়াই, কূটনৈতিক চাপ ও হিসাব-নিকাশ শেষে যুদ্ধ থেকে শান্তিসমঝোতার পথে এগোতে বাধ্য হয় ওয়াশিংটন।
ট্রাম্পের মুখে ছিল কঠোর হুঁশিয়ারি কয়েক দিনের মধ্যেই খেল খতম। কিন্তু বাস্তবের যুদ্ধক্ষেত্র, কূটনীতির টেবিল এবং আন্তর্জাতিক শক্তির অঙ্ক যে এত সহজ নয়, তা শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট হয়ে গেল ইরান সংঘাতের ১০৮ দিনের মাথায়। যে যুদ্ধকে শুরুতে দ্রুত সামরিক সাফল্যের গল্প হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিল ওয়াশিংটন, সেই সংঘাতই ধীরে ধীরে রূপ নেয় দীর্ঘস্থায়ী চাপ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, কূটনৈতিক দরকষাকষি এবং আঞ্চলিক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির এক জটিল অধ্যায়ে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ নয়, শান্তিসমঝোতার পথেই হাঁটতে বাধ্য হল আমেরিকা ও ইরান এমনটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন। Reuters এবং The Guardian-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক/ফ্রেমওয়ার্ক শান্তিচুক্তি নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে, যেখানে যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলা এবং পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার বিষয়গুলি গুরুত্ব পেয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তা ছিল অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। দাবি করা হয়েছিল, সামরিক চাপ, নৌ অবরোধ এবং কৌশলগত হামলার জোরে তেহরানকে দ্রুত নত হতে হবে। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে শুধু অস্ত্রের জোরেই সব হিসাব মেলে না। ইরান পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে, পশ্চিম এশিয়ার নানা প্রান্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, আর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা নতুন উদ্বেগ তৈরি করে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে টানাপড়েন আন্তর্জাতিক বাজারকে নাড়িয়ে দেয়। কারণ, এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ যাতায়াত করে। ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে এই সংঘাত শুধু আমেরিকা বনাম ইরানের সামরিক লড়াই নয়, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর।
শুরুতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাষা ছিল আক্রমণাত্মক। তিনি নিজেকে শক্তিশালী সিদ্ধান্তগ্রহণকারী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। ইরানকে দ্রুত চাপে ফেলে বড় কূটনৈতিক জয় তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলেই মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু ১০৮ দিনের মাথায় যে ছবি সামনে এসেছে, তা একেবারেই আলাদা। যুদ্ধ চলেছে, ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে, মিত্র দেশগুলির মধ্যেও মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে, আর শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই ফিরে আসতে হয়েছে। Al Jazeera-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের ১০৮তম দিনে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ থামানোর বিষয়ে একটি অস্থায়ী সমঝোতার কথা সামনে আসে, যদিও সময়সূচি ও শর্ত নিয়ে দু’পক্ষের বক্তব্যে কিছু পার্থক্য ছিল।
এই ১০৮ দিনের সংঘাত আসলে ট্রাম্পের কৌশলের সীমাবদ্ধতাও সামনে এনে দিয়েছে। যুদ্ধ শুরু করা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু যুদ্ধ শেষ করা অনেক বেশি কঠিন আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই পুরনো সত্য আবারও প্রমাণিত হল। কারণ, একবার সামরিক সংঘাত শুরু হলে সেখানে শুধু দুই দেশের সিদ্ধান্তই কার্যকর থাকে না। মিত্র দেশ, প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি, আঞ্চলিক গোষ্ঠী, জ্বালানি বাজার, মানবাধিকার প্রশ্ন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সব মিলিয়ে যুদ্ধের অঙ্ক দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। আমেরিকার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সামরিক প্রভাব কমানো। কিন্তু শান্তিচুক্তির আলোচনায় সেই বিষয়গুলিই আবার দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। Reuters-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার মতো বিষয় থাকলেও বহু মূল প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত।
এখানেই বড় প্রশ্ন তাহলে এত দিনের যুদ্ধের লাভ কী? ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো দাবি করবে, সামরিক চাপের কারণেই ইরান আলোচনায় ফিরেছে। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, যদি শেষ পর্যন্ত আলোচনাই করতে হয়, তবে ১০৮ দিনের যুদ্ধ, প্রাণহানি, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার দায় কে নেবে? যুদ্ধের প্রথম দিকে যে দ্রুত জয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে পূরণ হয়নি। বরং একাধিক পর্যায়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা, ইসরায়েলের অবস্থান, লেবাননকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা এবং ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করেছে। The Guardian-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চুক্তির কাঠামো তৈরি হলেও ইসরায়েলের আপত্তি ও লেবানন-সংক্রান্ত উত্তেজনা এই প্রক্রিয়াকে জটিল করেছে।
ইরানের দিক থেকেও এই সমঝোতা শুধু আত্মসমর্পণের গল্প নয়। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে বলে এসেছে, তারা চাপের মুখে নয়, সমতার ভিত্তিতে আলোচনায় বিশ্বাসী। যুদ্ধের সময় ইরান নিজেকে প্রতিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। পশ্চিমী নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ এবং আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার মাঝেও ইরান তার অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। এখন যদি আলোচনার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, সম্পদ মুক্তি বা অর্থনৈতিক স্বস্তির কোনও পথ খোলে, তবে তেহরান সেটিকে নিজস্ব কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করতে পারে। অর্থাৎ, দু’পক্ষই নিজেদের জয়ী হিসেবে দেখাতে চাইবে। কিন্তু বাস্তবের বিচার করলে দেখা যায়, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে সাধারণ মানুষ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আমেরিকার মিত্রদের ভূমিকা। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে তার প্রধান নিরাপত্তা-হুমকি হিসেবে দেখে। ফলে ইরান-আমেরিকা শান্তিসমঝোতার কোনও প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলের আপত্তি বা সংশয় অস্বাভাবিক নয়। বিশেষত লেবানন ও হিজবুল্লা প্রশ্নে ইসরায়েলের অবস্থান কঠোর। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, লেবাননকে যুদ্ধবিরতির কাঠামোর মধ্যে আনা নিয়ে ইসরায়েলের আপত্তি ছিল। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন বৃহত্তর সংঘাত থামাতে চাইছে কারণ দীর্ঘ যুদ্ধ আমেরিকার জন্যও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে চাপের কারণ হয়ে উঠছিল। এই দ্বন্দ্বই দেখিয়ে দেয়, পশ্চিম এশিয়ার কোনও যুদ্ধকে শুধু একক দেশের সিদ্ধান্তে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এখানে প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু পক্ষের স্বার্থ।
ট্রাম্পের জন্য এই সমঝোতা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের শুরুতে কঠোর অবস্থান নিয়ে তিনি দেশীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী নেতৃত্বের ভাবমূর্তি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সংঘাত আমেরিকার অভ্যন্তরেও প্রশ্ন তুলেছে কেন যুদ্ধ এত লম্বা হল, মূল লক্ষ্য কতটা পূরণ হল, আর শেষ পর্যন্ত চুক্তি যদি আগের আলোচনার পথেই ফিরে যায়, তবে যুদ্ধের প্রয়োজন কতটা ছিল? Reuters-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি ঘিরে আমেরিকার অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী মহল এবং কিছু মিত্রের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে, কারণ তারা মনে করছে চুক্তি ইরানের আচরণে বড় পরিবর্তন আনতে যথেষ্ট নয়।
তবে শান্তিসমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হওয়া নিঃসন্দেহে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের জন্য স্বস্তির খবর। হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার কথা সামনে আসা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনা জ্বালানি দামের ওপর চাপ তৈরি করেছিল। যদি সত্যিই স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং সমুদ্রপথ স্বাভাবিক হয়, তবে বিশ্ববাজারে কিছুটা স্থিতি ফিরতে পারে। কিন্তু এখানেও সতর্কতা জরুরি। কারণ, প্রাথমিক চুক্তি বা ফ্রেমওয়ার্ক মানেই স্থায়ী শান্তি নয়। পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনা, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যাচাই-বাছাই, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের শর্ত এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির ভূমিকা এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির পরও আরও প্রযুক্তিগত আলোচনা দরকার হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, যুদ্ধের ভাষা যত সহজ, শান্তির ভাষা তত কঠিন। “খেল খতম” বলে যুদ্ধ শুরু করা যায়, কিন্তু যুদ্ধ থামাতে লাগে দরকষাকষি, ছাড়, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা এবং বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সাহস। ট্রাম্পের হুঙ্কার তাই শেষ পর্যন্ত কূটনীতির টেবিলে এসে থেমেছে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য একটি বড় শিক্ষা সামরিক শক্তি যতই প্রবল হোক, স্থায়ী সমাধান তৈরি হয় আলোচনার মাধ্যমেই। ইরানকে দ্রুত চাপে ফেলার পরিকল্পনা যদি থেকেও থাকে, তা ১০৮ দিনের বাস্তবতায় এসে বদলে গিয়েছে। এখন ওয়াশিংটন ও তেহরান দু’পক্ষকেই প্রমাণ করতে হবে, তারা সত্যিই যুদ্ধের পথ ছেড়ে স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটতে চায় কি না।
তবে সংশয় এখনও কাটেনি। কারণ, পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাস বলছে, অনেক যুদ্ধবিরতি কাগজে যত শক্তিশালী দেখায়, মাঠে ততটা স্থায়ী হয় না। ছোট কোনও হামলা, ভুল বোঝাবুঝি, আঞ্চলিক মিত্রদের আগ্রাসী পদক্ষেপ বা রাজনৈতিক চাপ আবারও পরিস্থিতি ঘোরালো করে তুলতে পারে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব, পারমাণবিক সমঝোতা এবং আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা এই চারটি প্রশ্নই ভবিষ্যতের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে। একদিকে ইরান চাইবে অর্থনৈতিক স্বস্তি ও মর্যাদাপূর্ণ সমঝোতা; অন্যদিকে আমেরিকা চাইবে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক সাফল্যের ছবি। ফলে আগামী দিনগুলিই বলে দেবে, এই ১০৮ দিনের যুদ্ধ সত্যিই শান্তির পথে শেষ হচ্ছে, নাকি এটি কেবল আরেকটি অস্থায়ী বিরতি।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ‘কয়েক দিনের খেল খতম’ হুঁশিয়ারি শেষ পর্যন্ত বাস্তবের কঠিন পরীক্ষায় পুরোপুরি মেলেনি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে, কৌশল বদলেছে, আন্তর্জাতিক চাপ বেড়েছে, আর শেষ পর্যন্ত শান্তিসমঝোতার পথেই ফিরতে হয়েছে। ইরান আক্রমণ থেকে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা এই ১০৮ দিনের পথ দেখিয়ে দিল, বিশ্বরাজনীতিতে শুধু শক্তির প্রদর্শন যথেষ্ট নয়। যুদ্ধের ময়দানে আগুন জ্বালানো সহজ, কিন্তু সেই আগুন নেভাতে লাগে অনেক বেশি হিসাব, ধৈর্য এবং কূটনৈতিক পরিণতি। তাই এই সমঝোতা যদি সত্যিই স্থায়ী রূপ পায়, তবে সেটি শুধু আমেরিকা বা ইরানের জন্য নয়, গোটা পশ্চিম এশিয়া এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও বড় স্বস্তির বার্তা হয়ে উঠতে পারে।