Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

আদানিদের সঙ্গে আলোচনা সেরেই বড় দাবি শুভেন্দুর, তাজপুর নয়—১০ কিমি দূরে হতে পারে নতুন গভীর সমুদ্রবন্দর

তাজপুর গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জমি রাজ্য সরকারের কাছে নেই, ফলে বিকল্প স্থানের ভাবনা সামনে এসেছে।

তাজপুরে বহু প্রতীক্ষিত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প নিয়ে বড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দীর্ঘদিন ধরে পূর্ব মেদিনীপুরের তাজপুরে আন্তর্জাতিক মানের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। রাজ্যের অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার নবান্নে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তাজপুরে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলা বাস্তবসম্মত নয়। পরিবর্তে সরকার তাজপুর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে দাদনপাত্রবাড় এলাকাকে কেন্দ্র করে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

নবান্নে বন্দর, উপকূলবর্তী অঞ্চল, নদীবন্দর এবং কলকাতার নদীসংলগ্ন এলাকার উন্নয়ন নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, তাজপুর প্রকল্প নিয়ে আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গেও তাঁর বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে পরিমাণ জমির প্রয়োজন, তা রাজ্য সরকারের হাতে নেই। সেই কারণেই আদানি গোষ্ঠীও প্রকল্পটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি পূর্ণাঙ্গ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য কয়েক হাজার একর জমির প্রয়োজন হয়। তাজপুরে সেই পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ বা ব্যবস্থাপনা করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য নয়। এই বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সরকার বিকল্প পরিকল্পনার পথে হাঁটছে। দাদনপাত্রবাড় এলাকায় রাজ্যের নিজস্ব মালিকানাধীন প্রায় ১৭০০ একর জমি রয়েছে, যা নতুন বন্দরের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে জমি সংক্রান্ত জটিলতা অনেকটাই কমবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়বে বলে মনে করছে সরকার।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় জাহাজ মন্ত্রকের সঙ্গে আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের সঙ্গে বৈঠকে নতুন পরিকল্পনার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এবং প্রাথমিক অনুমোদনও মিলেছে। ফলে প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই প্রকল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারের মতে, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করেই উপকূলীয় উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলতে চায় রাজ্য।

শুধু নতুন বন্দর নির্মাণ নয়, একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সামুদ্রিক ও নদীবন্দর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ নিয়েও বড় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, কলকাতা খুব শীঘ্রই দেশের ‘ওয়াটার মেট্রো’ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে। বর্তমানে দেশের ১৭টি শহরে ওয়াটার মেট্রো পরিষেবা চালু রয়েছে। কেন্দ্রীয় জাহাজ মন্ত্রকের উদ্যোগে কলকাতা হবে দেশের ১৮তম শহর যেখানে এই আধুনিক জলপরিবহণ ব্যবস্থা চালু হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াটার মেট্রো চালু হলে কলকাতা এবং হাওড়া সহ গঙ্গার দুই তীরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী দ্রুত, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে যাতায়াত করতে পারবেন। এর ফলে সড়কপথের উপর চাপও কমবে এবং শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এ ছাড়াও কেন্দ্রের ‘সাগরমালা ২’ প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, অতীতে ‘সাগরমালা ১’ প্রকল্পে রাজ্য অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু নতুন পর্যায়ে রাজ্য সক্রিয়ভাবে যুক্ত হবে। এর জন্য আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে প্রায় ২২,৭০০ কোটি টাকার একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হবে।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপকূলবর্তী এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, মৎস্য অবকাঠামো গড়ে তোলা, জেটি নির্মাণ, মাছ সংরক্ষণ কেন্দ্র তৈরি, পর্যটন উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সাগর, কাকদ্বীপ, নামখানা, নয়াচর, খেজুরি থেকে শুরু করে ওড়িশা সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তীর্ণ উপকূল অঞ্চলের উন্নয়নে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছে সরকার।

বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের উন্নয়নের উপর। মুখ্যমন্ত্রী জানান, উপকূল অঞ্চলের হাজার হাজার মৎস্যজীবী এখনও নানা অবকাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি হন। মাছ ধরার পর সংরক্ষণ, পরিবহণ, বাজারজাতকরণ এবং নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। নতুন প্রকল্পের আওতায় এসব ক্ষেত্রেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা হবে। ফলে উপকূলীয় অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

news image
আরও খবর

বৈঠকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ৪৪টি নতুন জেটি নির্মাণের বিষয়ে। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। মুখ্যমন্ত্রী জানান, সম্প্রতি ৪১টি জেটির অনুমোদন মিলেছে এবং খুব দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু হবে। নদীপথে পরিবহণ, পণ্য পরিবহণ এবং যাত্রী পরিষেবার ক্ষেত্রে এই জেটিগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

গঙ্গাসাগর এবং কপিল মুনির আশ্রম সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, এই ধর্মীয় ও পর্যটন কেন্দ্রগুলির উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্র সরকার ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। গঙ্গাসাগর মেলাকে আন্তর্জাতিক মানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিণত করার জন্য কেন্দ্র সব ধরনের সহযোগিতা করবে। এতে পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটবে এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।

বলাগড় এলাকায় বন্দর-সংক্রান্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদীভাঙন রোধের জন্য নতুন প্রকল্প শুরু করার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। নদীভাঙন দীর্ঘদিন ধরে বহু মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে তুলেছে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা হবে।

কলকাতার ঐতিহ্যবাহী নদীঘাটগুলির পুনর্নির্মাণ এবং সৌন্দর্যায়ন নিয়েও বিস্তারিত পরিকল্পনা সামনে এসেছে। বাগবাজার ঘাট, শোভাবাজার ঘাট, আহিরিটোলা ঘাট, মল্লিকঘাট, বাবুঘাট, রামকৃষ্ণপুর ঘাট এবং বান্দা ঘাটকে নতুন রূপ দেওয়ার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, দুর্গাপুজোর আগেই অধিকাংশ কাজ সম্পূর্ণ করা।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই ঘাটগুলির উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পরিকাঠামোগত পরিবর্তন নয়, বাংলার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং মা সারদা দেবীর স্মৃতিকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হবে। এর ফলে ঘাটগুলি শুধু যাতায়াত বা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

নবান্নের বৈঠকে কলকাতা শহরের জমি জবরদখল এবং বিপজ্জনক বাড়িতে বসবাসের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে আলোচনা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, পুরসভাকে এই সমস্যার সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেও সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। যদি প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া যায়, তাহলে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য নতুন আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হবে।

কলকাতা বন্দরে অবৈধ সিন্ডিকেট, তোলাবাজি এবং বেআইনি কার্যকলাপ রুখতেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, বন্দর কর্তৃপক্ষ, কলকাতা পুরসভা, পুলিশ, সিআইএসএফ, কাস্টমস এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলি সমন্বিতভাবে কাজ করবে। এর ফলে বন্দরের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ আরও স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল হবে।

এ ছাড়াও রাজ্যে পৃথক জাহাজ দফতর গঠনের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বর্তমানে এই বিষয়ে কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। রাজ্যের সামুদ্রিক অর্থনীতি, নদীবন্দর ব্যবস্থাপনা এবং উপকূলীয় উন্নয়নকে আরও কার্যকর করতে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। উপযুক্ত আধিকারিক নিয়োগ করে এই দফতরকে শক্তিশালী করা হবে।

সব মিলিয়ে নবান্নের বৈঠক থেকে যে বার্তা উঠে এসেছে, তা হল পশ্চিমবঙ্গের বন্দর, উপকূলীয় অর্থনীতি, নদীপথ যোগাযোগ এবং সামুদ্রিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে একটি বৃহৎ রোডম্যাপ তৈরি করছে সরকার। তাজপুরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে দাদনপাত্রবাড়কে কেন্দ্র করে নতুন প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ। আগামী কয়েক বছরে এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি, বাণিজ্য, পর্যটন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেতে পারে বলেই মনে করছেন প্রশাসনিক মহল এবং বিশেষজ্ঞরা।বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে রাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। দাদনপাত্রবাড় এলাকায় পর্যাপ্ত জমি থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা তুলনামূলকভাবে কম হবে। একই সঙ্গে নতুন বন্দর গড়ে উঠলে পূর্ব মেদিনীপুর এবং সংলগ্ন উপকূল অঞ্চলে শিল্প বিনিয়োগের সম্ভাবনাও বাড়বে। পরিবহণ, লজিস্টিকস, গুদামজাতকরণ, মৎস্যশিল্প এবং পর্যটনের মতো ক্ষেত্রেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। রাজ্য সরকার আশা করছে, কেন্দ্রের সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

Preview image