বিশ্বকাপ ফাইনালের দিনই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নজির গড়লেন এক কিউয়ি পেসার। টানা পাঁচ বলে পাঁচ উইকেট নিয়ে তিনি তৈরি করলেন নতুন বিশ্বরেকর্ড, যা আগে কখনও দেখা যায়নি ক্রিকেট ইতিহাসে। তাঁর এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে রীতিমতো চমকে গিয়েছে ক্রিকেট দুনিয়া।
ক্রিকেট বিশ্বে প্রতিদিনই নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। কিন্তু কিছু কিছু রেকর্ড থাকে, যা শুধু সংখ্যার হিসেবেই নয়, ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে। এমনই এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড তৈরি করলেন নিউজিল্যান্ডের তরুণ পেসার Brett Randell।
বিশ্ব ক্রিকেট যখন তাকিয়ে আছে ICC Men's T20 World Cup-এর ফাইনালের দিকে, ঠিক সেই দিনেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এমন এক নজির তৈরি হল, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। মাত্র ৫ বলে ৫ উইকেট নিয়ে ২৫৪ বছরের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লিখলেন এই কিউই পেসার।
এই রেকর্ড তৈরি হয়েছে নিউজিল্যান্ডের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির টুর্নামেন্ট Plunket Shield-এর একটি ম্যাচে। ম্যাচটি হয়েছিল Napier-এ, যেখানে মুখোমুখি হয়েছিল Central Stags এবং Northern Districts।
রবিবার ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর ছিল India national cricket team এবং New Zealand national cricket team-এর বিশ্বকাপ ফাইনালের দিকে। ভারত যদি এই ম্যাচ জিততে পারে, তাহলে টানা দ্বিতীয়বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের নজির গড়বে।
শুধু তাই নয়, দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জেতার ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে। অধিনায়ক Suryakumar Yadav-এর নেতৃত্বে টিম ইন্ডিয়া সেই লক্ষ্যে মাঠে নামছে।
কিন্তু ঠিক সেই সময়েই নিউজিল্যান্ডের এক ঘরোয়া ম্যাচে ঘটে গেল এমন এক ঘটনা, যা বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন আলোচনার জন্ম দিল।
ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে Central Stags দল। তারা প্রথম ইনিংসে তোলে ৩৭৩ রান। স্কোরটি যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও ম্যাচের আসল নাটক শুরু হয় যখন Northern Districts ব্যাট করতে নামে।
প্রথমদিকে ম্যাচ স্বাভাবিকভাবেই এগোচ্ছিল। কিন্তু এরপরই বল হাতে ঝড় তোলেন Brett Randell।
তৃতীয় ওভারের শেষ বলে তিনি বোল্ড করেন Henry Cooper-কে। সেই উইকেট যেন ছিল আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস।
এরপর নিজের পরবর্তী ওভারে যা ঘটল, তা ক্রিকেট ইতিহাসে বিরল।
নিজের পরের ওভারে পরপর উইকেট নিতে শুরু করেন রান্ডেল।
তিনি আউট করেন
Jeet Raval
Joe Carter
Robert O'Donnell
Christian Clark
এই চারটি উইকেট আসে টানা চার বলে।
এর আগের ওভারের শেষ বলসহ মোট ৫ বলে ৫ উইকেট নিয়ে ফেলেন তিনি। ক্রিকেট ইতিহাসে এই ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ইতিহাস শুরু হয় ১৭৭২ সালে। অর্থাৎ প্রায় ২৫৪ বছর ধরে চলা এই ক্রিকেট ফরম্যাটে এমন কীর্তি আগে কেউ করতে পারেননি।
বিশ্বের হাজার হাজার প্রথম শ্রেণির ম্যাচে বহু কিংবদন্তি বোলার খেলেছেন—
তবুও কেউ ৫ বলে ৫ উইকেট নিতে পারেননি।
সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালেন ব্রেট রান্ডেল।
রেকর্ড এখানেই থেমে থাকেনি।
এই ম্যাচেই তিনি আরেকটি অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েন।
মাত্র ৮ বলে ৬ উইকেট নিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস তৈরি করেন।
এই ধরনের বিধ্বংসী স্পেল ক্রিকেট ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়।
এই ম্যাচে তাঁর বোলিং ফিগার ছিল —
১১ ওভার
২৫ রান
৭ উইকেট
যা যে কোনও প্রথম শ্রেণির ম্যাচে অসাধারণ পারফরম্যান্স হিসেবে ধরা হয়।
এক পর্যায়ে তাঁর বোলিং ফিগার ছিল —
২.৪ ওভার
১ মেডেন
২ রান
৫ উইকেট
এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় কতটা বিধ্বংসী ছিল তাঁর স্পেল।
রান্ডেলের তাণ্ডবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে Northern Districts।
মাত্র ৯ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলে তারা।
পুরো দল অলআউট হয়ে যায় মাত্র ৮২ রানে।
ফলে তাদের ফলো-অন করতে বাধ্য হতে হয়।
এই স্পেলই পুরো ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেয়।
যেখানে ম্যাচটি সমানে সমান লড়াইয়ের দিকে এগোচ্ছিল, সেখানে রান্ডেলের আগুনে বোলিং মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসে Central Stags-এর হাতে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই স্পেল অনেক দিন পর্যন্ত ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে থাকবে।
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের সামনে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন রান্ডেল।
তিনি বলেন—
“আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না কী হয়েছে। এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য একটি মুহূর্ত।”
তিনি আরও বলেন—
“হ্যাটট্রিকের পরেও আমি শুধু একই জায়গায় বল করে গিয়েছি। আমাদের সবসময় বলা হয় উইকেট পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত কিছু করতে না। তাই আমি শুধু পরিকল্পনা অনুযায়ী বল করেছি।”
রান্ডেলের কথায় বোঝা যায়, তিনি অতিরিক্ত কিছু করার চেষ্টা করেননি। বরং ধারাবাহিকভাবে একই লাইন ও লেংথ বজায় রেখেছিলেন।
এই রেকর্ড প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ক্রিকেট বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
অনেকেই বলছেন, আধুনিক ক্রিকেটে এত রকম ডাটা ও বিশ্লেষণের যুগে এমন ঘটনা প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু রান্ডেল সেই অসম্ভবকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পারফরম্যান্স রান্ডেলের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
এ ধরনের পারফরম্যান্স একজন বোলারের আত্মবিশ্বাসকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অনেকে মনে করছেন, ভবিষ্যতে তিনি নিউজিল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন।
ক্রিকেট ইতিহাসে অনেক অসাধারণ বোলিং স্পেল দেখা গেছে।
কিন্তু
৫ বলে ৫ উইকেট
৮ বলে ৬ উইকেট
এই দুটি রেকর্ড একই ম্যাচে হওয়া সত্যিই বিরল।
এ কারণেই রান্ডেলের এই কীর্তিকে অনেকেই “ক্রিকেটের অলৌকিক মুহূর্ত” বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, এই রেকর্ড তৈরি হয়েছে এমন এক দিনে যখন বিশ্ব ক্রিকেটের নজর ছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের দিকে।
ক্রিকেটপ্রেমীরা যখন ভারত বনাম নিউজিল্যান্ড ম্যাচ নিয়ে ব্যস্ত, তখনই নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ঘটে গেল এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
ক্রিকেট এমন একটি খেলা যেখানে প্রতিদিন নতুন গল্প তৈরি হয়।
কিন্তু কিছু গল্প থাকে যা বছরের পর বছর মানুষ মনে রাখে।
ব্রেট রান্ডেলের ৫ বলে ৫ উইকেট নেওয়ার কীর্তি ঠিক তেমনই একটি গল্প।
২৫৪ বছরের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ইতিহাসে যা কখনও ঘটেনি, তা করে দেখিয়েছেন তিনি।
এই স্পেল শুধু একটি ম্যাচের ফলাফল বদলায়নি, বরং ক্রিকেট ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে।
এখন দেখার বিষয়, ভবিষ্যতে এই তরুণ পেসার আরও কত বড় সাফল্য অর্জন করতে পারেন।
ক্রিকেট ইতিহাসে মাঝে মাঝেই এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা খেলাটিকে আরও রহস্যময় ও রোমাঞ্চকর করে তোলে। ব্রেট রান্ডেলের এই পারফরম্যান্সও ঠিক তেমনই একটি ঘটনা, যা আগামী বহু বছর ধরে আলোচনায় থাকবে। অনেক ক্রিকেট বিশেষজ্ঞের মতে, এমন বিধ্বংসী স্পেল কেবল দক্ষতার ফল নয়, এর সঙ্গে মানসিক দৃঢ়তা, সঠিক পরিকল্পনা এবং ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রান্ডেল যেভাবে ধারাবাহিকভাবে একই লাইন ও লেংথে বল করে গেছেন, তাতেই ব্যাটসম্যানরা চাপে পড়ে ভুল করতে বাধ্য হন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ধরনের রেকর্ড তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পারে যে কঠোর পরিশ্রম, নিয়মিত অনুশীলন এবং সঠিক কৌশল মেনে চললে ক্রিকেটে অসম্ভব বলে কিছু নেই। নিউজিল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেট বরাবরই প্রতিভা তৈরির জন্য পরিচিত, এবং রান্ডেলের এই কীর্তি সেই ধারাকেই আরও শক্তিশালী করে তুলল।
ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে এই ম্যাচটি এখন এক বিশেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে যখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হবে, তখন ব্রেট রান্ডেলের এই অবিশ্বাস্য স্পেলের কথা অবশ্যই উঠে আসবে। কারণ ৫ বলে ৫ উইকেট নেওয়া শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি ক্রিকেট ইতিহাসের এক অনন্য মাইলফলক। এই অবিশ্বাস্য স্পেল প্রমাণ করে ক্রিকেটে যে কোনও মুহূর্তেই ইতিহাস তৈরি হতে পারে, আর ব্রেট রান্ডেল সেই ইতিহাসের নায়ক হয়ে থাকবেন।