সলমন আঘার নেতৃত্বে বিশ্বকাপের জন্য ১৫ সদস্যের দল ঘোষণা করল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। নকভির বয়কট-ইঙ্গিতের পর পাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্তের কথা উঠলেও, বিতর্কের মাঝেই স্কোয়াড প্রকাশ করে বোর্ড, যা ক্রিকেট মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে যখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে, ঠিক সেই সময়ই বড় সিদ্ধান্ত নিল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। বিশ্বকাপে পাকিস্তান আদৌ অংশ নেবে কি না, তা নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা চরমে, তখনই সালমন আঘার নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের দল ঘোষণা করে দিল পিসিবি। ক্রিকেট ও রাজনীতির এই দ্বন্দ্বে পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নকভি সম্প্রতি এক মন্তব্যে জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপে পাকিস্তান খেলবে কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে পাকিস্তান সরকার। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, বাংলাদেশকে ‘অন্যায়ভাবে’ বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় পাকিস্তান অসন্তুষ্ট। এই পরিস্থিতিতে তারা বিশ্বকাপে অংশ নেবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু সেই মন্তব্যের ঠিক পরদিনই পিসিবি বিশ্বকাপের জন্য ১৫ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষণা করে দেয়। ফলে ক্রিকেট মহলে প্রশ্ন উঠছে—এটা কি কেবল ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত, না কি রাজনৈতিক চাপের মধ্যেই বোর্ডের কৌশলগত পদক্ষেপ?
পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে রাজনীতি নতুন বিষয় নয়। অতীতেও একাধিকবার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ক্রিকেটকে প্রভাবিত করেছে। এবারের পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় পাকিস্তান যে ক্ষুব্ধ, তা নকভির মন্তব্যেই স্পষ্ট। পাকিস্তানের অনেক প্রাক্তন ক্রিকেটার ও বিশ্লেষক মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু ক্রিকেট নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির ফল।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হয়েছিল গভীর অনিশ্চয়তা। ক্রিকেটপ্রেমীরা আশঙ্কা করেছিলেন, পাকিস্তান হয়তো বিশ্বকাপ বয়কট করতে পারে। কিন্তু দল ঘোষণা করে পিসিবি যেন একদিকে অনিশ্চয়তা কমানোর চেষ্টা করল, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের অবস্থানও স্পষ্ট করল।
পিসিবি ঘোষিত পাকিস্তানের ১৫ সদস্যের দল—
সালমন আঘা (অধিনায়ক)
আবরার আহমেদ
বাবর আজম
ফাহিম আশরাফ
ফখর জামান
খাজা মহম্মদ নাফে (উইকেটরক্ষক)
মহম্মদ নওয়াজ
মহম্মদ সলমন মির্জা
নাসিম শাহ
সাহেবজাদা ফারহান (উইকেটরক্ষক)
সাইম আইয়ুব
শাহিন শাহ আফ্রিদি
শাদাব খান
উসমান খান
উসমান তারিক
এই স্কোয়াডে অভিজ্ঞতা ও তরুণদের মিশ্রণ স্পষ্ট। তবে সবচেয়ে বড় চমক হল—দলে জায়গা হয়নি দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মহম্মদ রিজওয়ান ও হারিস রউফের।
পাকিস্তানের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে মহম্মদ রিজওয়ান দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। ওপেনার হিসেবে বাবর আজমের সঙ্গে তাঁর জুটি পাকিস্তানের অন্যতম শক্তি ছিল। কিন্তু এবার তাঁকে স্কোয়াডের বাইরে রাখায় বিস্মিত হয়েছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।
একইভাবে হারিস রউফের বাদ পড়া পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণে বড় ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে। রউফের গতি ও ডেথ ওভারে কার্যকারিতা পাকিস্তানের বোলিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর অনুপস্থিতিতে পেস আক্রমণের দায়িত্ব মূলত শাহিন শাহ আফ্রিদি ও নাসিম শাহের ওপরই পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের নির্বাচক কমিটির সাহসী কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ।
যদিও অধিনায়কত্বের দায়িত্ব সালমন আঘার হাতে, তবুও পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা বাবর আজম। সম্প্রতি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিকে সর্বকালের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় নিজের জায়গা আরও শক্ত করেছেন তিনি।
বাবরের অভিজ্ঞতা পাকিস্তানের জন্য বড় অস্ত্র হতে পারে। বিশেষ করে ভারত, আমেরিকা বা নেদারল্যান্ডসের মতো দলের বিরুদ্ধে ম্যাচে তাঁর ইনিংস পাকিস্তানের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
পাকিস্তানের স্কোয়াডে অলরাউন্ডারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। দলে রয়েছেন—
ফাহিম আশরাফ
শাদাব খান
মহম্মদ নওয়াজ
এই তিনজনই ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই অবদান রাখতে সক্ষম। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে অলরাউন্ডারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কঠিন ম্যাচে তারা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
শক্তিশালী পেস আক্রমণ (আফ্রিদি ও নাসিম শাহ)
বাবর আজমের অভিজ্ঞতা
অলরাউন্ডারদের উপস্থিতি
তরুণ খেলোয়াড়দের আগ্রাসী মানসিকতা
রিজওয়ান ও রউফের অনুপস্থিতি
নতুন অধিনায়ক হিসেবে সালমন আঘার অভিজ্ঞতার অভাব
মিডল অর্ডারে ধারাবাহিকতার প্রশ্ন
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মানসিক চাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের স্কোয়াড ভারসাম্যপূর্ণ হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দুর্বলতা রয়েছে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তান রয়েছে গ্রুপ এ-তে। এই গ্রুপে রয়েছে—
ভারত
নেদারল্যান্ডস
আমেরিকা
নামিবিয়া
পাকিস্তান
২০০৯ সালের চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ৭ ফেব্রুয়ারি কলম্বোয় নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে।
ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ নিয়ে আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই শুধু ক্রিকেট নয়, বরং আবেগ, উত্তেজনা ও রাজনীতির মিশেল।
সালমন আঘাকে অধিনায়ক করে পাকিস্তান এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছে। তিনি আগে কখনও বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে অধিনায়কত্ব করেননি। ফলে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বোর্ডের আস্থা তাঁর ওপরেই।
বিশ্লেষকদের মতে, সালমন আঘার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—
দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা
রাজনৈতিক চাপ সামলানো
তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা
পাকিস্তানের দল ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলেও আলোচনার ঝড় উঠেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ খেলবে, কারণ বিশ্বকাপ বয়কট করা তাদের জন্য বড় আর্থিক ও কূটনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে, কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, পাকিস্তান বোর্ড দল ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC)-এর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের সম্ভাবনা বরাবরই রহস্যময়। তারা কখনও অপ্রত্যাশিতভাবে চ্যাম্পিয়ন হয়, আবার কখনও গ্রুপ পর্বেই বিদায় নেয়।
এই স্কোয়াড নিয়ে পাকিস্তান কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে—
বাবর আজমের ফর্ম
আফ্রিদি-নাসিমের বোলিং
মিডল অর্ডারের পারফরম্যান্স
অধিনায়ক সালমন আঘার সিদ্ধান্ত
যদি এই চারটি বিষয় সঠিকভাবে কাজ করে, তবে পাকিস্তান বিশ্বকাপে বড় চমক দিতে পারে।
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তার মাঝেই পাকিস্তানের দল ঘোষণা শুধু একটি ক্রিকেটীয় ঘটনা নয়, বরং রাজনীতি ও কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি বড় বার্তা। নকভির মন্তব্য, রিজওয়ান ও রউফের বাদ পড়া, সালমন আঘার নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার আগেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান বিশ্বকাপে কীভাবে পারফর্ম করবে, তা সময়ই বলবে। তবে একথা নিশ্চিত—এই বিশ্বকাপে পাকিস্তান শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তার মাঝেই পাকিস্তানের দল ঘোষণা শুধু একটি ক্রিকেটীয় ঘটনা নয়, বরং রাজনীতি ও কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি বড় বার্তা। নকভির মন্তব্য, রিজওয়ান ও রউফের বাদ পড়া, সালমন আঘার নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার আগেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
এই পরিস্থিতি পাকিস্তান ক্রিকেটের এক জটিল বাস্তবতা তুলে ধরছে, যেখানে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বোর্ডের অভ্যন্তরীণ কৌশল সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্রিকেট যেখানে সাধারণত খেলোয়াড়দের দক্ষতা ও দলের পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে, সেখানে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সেই হিসাব অনেকটাই বদলে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের দল ঘোষণার এই সময়টা মোটেই স্বাভাবিক নয়। একদিকে বিশ্বকাপ বয়কটের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা, অন্যদিকে আচমকা স্কোয়াড প্রকাশ—এই দ্বৈত অবস্থান পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের ভেতরের দ্বন্দ্বকেই সামনে এনে দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বোর্ড একদিকে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলেও অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে চেয়েছে।
এদিকে দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলিও বিতর্ক বাড়িয়েছে। রিজওয়ান ও হারিস রউফের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের বাদ পড়া শুধু ক্রিকেটীয় নয়, বরং কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। পাকিস্তান হয়তো নতুন যুগের দিকে এগোতে চাইছে, যেখানে তরুণ খেলোয়াড়দের উপর ভর করে ভবিষ্যতের দল গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এই ধরনের পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সালমন আঘার নেতৃত্বও পাকিস্তান ক্রিকেটের জন্য এক নতুন অধ্যায়। তিনি প্রতিভাবান ক্রিকেটার হলেও অধিনায়ক হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা সীমিত। বিশ্বকাপের মতো চাপপূর্ণ আসরে তাঁকে শুধু দলের নেতৃত্বই নয়, বরং রাজনৈতিক ও মানসিক চাপ সামলানোর দায়িত্বও নিতে হবে। এই দায়িত্ব কতটা সফলভাবে তিনি পালন করতে পারবেন, তার উপর অনেকটাই নির্ভর করবে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ।
পাকিস্তানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলগত ঐক্য বজায় রাখা। যখন দলের ভেতরে অভিজ্ঞ ও তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা প্রয়োজন, তখন বাইরের বিতর্ক সেই ভারসাম্যকে আরও নড়বড়ে করে দিতে পারে। ক্রিকেট ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, অতিরিক্ত বিতর্ক ও চাপ দলের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে পাকিস্তান ক্রিকেটের ইতিহাস বলে, এই দলটি বরাবরই অপ্রত্যাশিত। কখনও তারা সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করে দুর্দান্ত সাফল্য এনে দেয়, আবার কখনও নিজেরাই নিজেদের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই বিশ্বকাপেও পাকিস্তানের ভাগ্য নির্ভর করবে তাদের মানসিক দৃঢ়তা, নেতৃত্বের দক্ষতা এবং মাঠের পারফরম্যান্সের উপর।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান বিশ্বকাপে কীভাবে পারফর্ম করবে, তা সময়ই বলবে। তবে একথা নিশ্চিত—এই বিশ্বকাপে পাকিস্তান শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে। তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি ম্যাচ এবং প্রতিটি বক্তব্য ক্রিকেট বিশ্বে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দেবে। আর সেই কারণেই পাকিস্তানের বিশ্বকাপ অভিযান শুধু একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নয়, বরং এক বৃহত্তর রাজনৈতিক ও ক্রীড়ানাট্যের অংশ হয়ে উঠছে।