বিয়ে ভাঙার পর প্রথমবার প্রকাশ্যে সামনে এলেন স্মৃতি মন্ধানা। একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে পলাশ প্রসঙ্গে নীরব থাকলেও নিজের একমাত্র ভালবাসার কথাই শোনালেন ভারতের বিশ্বকাপজয়ী এই তারকা ক্রিকেটার
বিয়ে ভাঙার বিতর্কের মধ্যে প্রথমবার প্রকাশ্যে সামনে এলেন ভারতের বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেটার স্মৃতি মন্ধানা। পলাশ মুচ্ছলের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিয়ে ভেঙে যাওয়ার জল্পনা কয়েক সপ্তাহ ধরে শিরোনামে থাকলেও, বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে তিনি নিজেকে নিয়ে যাবতীয় আলোচনার দিক ঘুরিয়ে দিলেন একেবারে অন্য পথে। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একটিও শব্দ উচ্চারণ না করলেও, মন্ধানার কণ্ঠে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ল তাঁর একমাত্র ভালবাসার কথা—ক্রিকেট। ঝড়ের সময় যেভাবে মানুষ আশ্রয় খোঁজে, ঠিক তেমনই মন্ধানার জীবনে ক্রিকেটই হয়ে উঠেছে তাঁর সবথেকে নিরাপদ জায়গা।
‘অ্যামাজন সম্ভব সামিট’-এ বক্তৃতা দিতে গিয়ে মন্ধানা বলেন, “আমার মনে হয় না, ক্রিকেটের থেকে বেশি আমি কিছু ভালবাসি। ভারতের জার্সি পরে খেলা আমার কাছে সবচেয়ে গর্বের।” তাঁর কথাতেই বোঝা যাচ্ছিল, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলির ব্যক্তিগত অস্থিরতার মাঝেও ক্রিকেটই তাঁকে শক্তি জোগাচ্ছে। তিনি আরও জানান, মাঠে নামলে তাঁর জীবনের যাবতীয় সমস্যা দূরে সরে যায়। ব্যাট হাতে নিলেই মনোযোগ স্থির হয়ে যায় জয়ের লক্ষ্যে। এই খেলাই তাঁকে আবার নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়, নতুন করে গড়ে তোলে।
অনুষ্ঠানে মন্ধানা এ-ও জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া। “জানি অনেকেই বুঝবে না, কিন্তু তখন থেকেই আমার একটাই স্বপ্ন ছিল—ভারতের হয়ে বিশ্বকাপ জেতা।” তাঁর পরিশ্রম, দৃঢ়তা এবং নিষ্ঠাই তাঁকে আজ দেশের অন্যতম সেরা ব্যাটারে পরিণত করেছে। ভারতের জার্সি পরে ১২ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার তাঁর জীবনে যেমন সাফল্যের স্মৃতি এনেছে, তেমনই হতাশার রাতও দেখিয়েছে। কিন্তু তিনি কখনও বিশ্বাস হারাননি। “বিশ্বাস ছিল, তাই শেষ পর্যন্ত জিতেছি,” বলেই নিজের সাফল্যের রহস্য ব্যাখ্যা করেন তিনি।
বিয়ে ভাঙার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরে পরের দিনই নেটে অনুশীলনে দেখা গিয়েছিল মন্ধানাকে। সে দৃশ্যই স্পষ্ট করেছিল—তিনি ব্যক্তিগত যন্ত্রণায় ভেঙে পড়েননি, বরং আরও শক্ত হয়ে নিজের খেলায় মন দিয়েছেন। একদিকে যখন পলাশ মুচ্ছলকে ঘিরে প্রকাশ্যে আসছে একাধিক বিতর্ক, অন্যদিকে মন্ধানা নিজেকে নিয়ে চলা জল্পনাকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলেছেন নিজের লক্ষ্যের পথে।
এদিন অনুষ্ঠানে তিনি বরাবরের মতোই শান্ত, সংযত এবং পেশাদার আচরণ বজায় রাখেন। কোনও ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর না দিলেও ক্রিকেট নিয়ে তাঁর আবেগ বারবার ফুটে ওঠে। তিনি জানান, খেলাই তাঁর মন, তাঁর চেতনা, তাঁর পরিচয়। দেশের হয়ে খেলাটাই তাঁর কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান।
আগামী ২১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হতে চলেছে ভারত-শ্রীলঙ্কা মহিলাদের টি-টোয়েন্টি সিরিজ। সিরিজের আগে মন্ধানা ইতিমধ্যেই অনুশীলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তাঁর অনুশীলনের ছবি ও ভিডিও সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। একদিকে ব্যক্তিগত জীবনের উথালপাথাল, অন্যদিকে কঠোর অনুশীলন—এই দুইয়ের মাঝেই তিনি প্রমাণ করছেন প্রকৃত পেশাদারিত্ব।
বিয়ে ভাঙার খবরে সৃষ্ট আলোড়ন থামার আগেই মন্ধানার এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা দেখিয়ে দিল—তিনি ভাঙেন না, বরং আরও শক্ত হয়ে ফিরে আসেন। ক্রিকেটই তাঁর সবচেয়ে বড় ভালবাসা, সবচেয়ে বড় শক্তি—এদিনের বক্তব্য যেন সেই বার্তাই আরও দৃঢ়ভাবে পৌঁছে দিল সকলের কাছে।
পলাশ মুচ্ছলকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন স্মৃতি মন্ধানা নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এখনও পর্যন্ত একটিও শব্দ খরচ করেননি। বিয়ে স্থগিত হওয়া, পলাশের বাড়তি সম্পর্কের অভিযোগ, পরিবারের পক্ষ থেকে গোপনীয়তার আবেদন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে যেখানে ভারতের মহিলা ক্রিকেটের অন্যতম বড় তারকা সম্পূর্ণ নীরবতা বেছে নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে এসে তাঁর সেই নীরবতা আরও শক্ত হলো। পলাশের নাম উচ্চারণও করলেন না। বিয়ে ভাঙার প্রসঙ্গেও কোনও মন্তব্য করলেন না। বরং তিনি মন দিলেন তাঁর একমাত্র প্রেম—ক্রিকেটে।
‘অ্যামাজ়ন সম্ভব সামিটে’ যোগ দিয়ে স্মৃতি মন্ধানা একেবারে সরলভাবে জানালেন—
“ক্রিকেটের থেকে বেশি আমি কিছু ভালবাসি না। ভারতের জার্সি পরে খেলা আমার কাছে সবচেয়ে বড় সম্মান। ক্রিকেট আমার ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যাকেও দূরে সরিয়ে রাখে। জীবনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।”
এই কয়েকটি কথায় যেন প্রকাশ পেল মন্ধানার মনের গভীর ক্ষত—যে ক্ষত লুকোতে হয়তো তিনি ক্রিকেটকেই বেছে নিয়েছেন। বিয়ে ভাঙার জল্পনা, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আঘাত—এসবের মাঝেও যে মাঠই তাঁর আশ্রয়স্থল, তা স্পষ্ট করে দেন তিনি।
৭ ডিসেম্বর সকালে স্মৃতি মন্ধানা তাঁর বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ঘোষণা দেন। আর ঠিক পরের দিনই অর্থাৎ ৮ ডিসেম্বর নেটে অনুশীলনে দেখা যায় তাঁকে। তাঁর এই দ্রুত ফেরা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল—কেন তিনি এত তাড়াতাড়ি মাঠে ফিরলেন?
মন্ধানার উত্তর খুবই সোজা—
ক্রিকেটই তাঁর একমাত্র ভরসা, একমাত্র শক্তি।
তিনি বলেছেন,
“ছোট থেকেই ক্রিকেট পাগল ছিলাম। কেউ হয়তো বিশ্বাস করবে না, কিন্তু শিশু বয়স থেকেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম।”
তাঁর কথায় জানা গেল, এই স্বপ্নই তাঁকে প্রতিটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
ভারতের জার্সি পরে ১২ বছর ধরে খেলছেন স্মৃতি মন্ধানা। এই সময়ে তাঁকে দেখেছে দেশ—
উত্থান
ব্যর্থতা
আঘাত
প্রত্যাবর্তন
এবং অবশেষে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ
দীর্ঘ যাত্রায় কতবারই না হতাশা এসেছে। কিন্তু নিজের কথাতেই—
“বিশ্বাস ছিল, তাই জিতেছি।”
মন্ধানার জীবনে এই বিশ্বাসই যেন সবচেয়ে বড় শক্তি। ব্যক্তিগত জীবনে ধাক্কা আসলেও ক্রিকেট তাঁকে আবারও দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
২৩ নভেম্বর বিয়ের কথা ছিল মন্ধানার। হলদি, সঙ্গীত—সবই হয়েছে জাঁকজমক করে। ঠিক সেই দিন দুপুরে নাটকীয় মোড় নেয় ঘটনাবলী। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন মন্ধানার বাবা। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় জরুরি ভিত্তিতে। এরপরই মন্ধানা পরিবার জানায়—বিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত।
এতদিনের প্রস্তুতি, আনন্দ, উচ্ছ্বাস—সব থমকে যায় এক মুহূর্তে।
বিয়ের অনুষ্ঠান স্থগিত হওয়ার পরই সামনে আসতে থাকে নতুন তথ্য।
পলাশ মুচ্ছলের সঙ্গে অন্য মহিলাদের সম্পর্ক
দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব
মন্ধানা–পলাশের দূরত্ব
এসব নিয়ে মিডিয়া সরগরম হয়ে ওঠে। খবর আসতে থাকে চারদিক থেকে। ভারতীয় ক্রিকেটাররা নীরব থাকলেও সমর্থকরা নেটে সরব। প্রশ্নের ঝড় ওঠে—কী হয়েছে তাঁদের মধ্যে?
বিয়ের নতুন একটি সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে উঠে আসে ৭ ডিসেম্বর। কিন্তু সেদিন সকালেই বোমা ফাটান স্মৃতি মন্ধানা।
তিনি লেখেন—
“গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমার জীবন নিয়ে জল্পনা চলছে। এখন স্পষ্ট করে বলা দরকার—বিয়ে বাতিল করা হয়েছে।”
একই দিনে পলাশ মুচ্ছলও একই ঘোষণা করেন।
মন্ধানা আরও লিখেছিলেন—
তিনি ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নীরবই থাকতে চান
উভয় পরিবারের গোপনীয়তা রক্ষা করার অনুরোধ করেন
তাঁর মনোযোগ ক্রিকেটেই থাকবে
তিনি ভারতকে আরও বহুদিন প্রতিনিধিত্ব করতে চান
যে পরিমাণ অভিজ্ঞতা, পরিণত ভাবনা ও সংযম তিনি এই বার্তায় দেখিয়েছেন, তা তাঁর ব্যক্তিত্বকেই ফুটিয়ে তোলে।
বিয়ে ভাঙার পর সমালোচনার ঝড়, সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি, সমাজমাধ্যমের আলোচনা—এসবের মধ্যেও স্মৃতি মন্ধানা নিজের পথ বেছে নিয়েছেন।
তিনি বলেছেন,
“আমরা সকলেই একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্য নিয়ে বাঁচি। আমার লক্ষ্য হলো ভারতের হয়ে যতদিন পারি খেলা, দেশের জন্য ট্রফি জেতা।”
এই কথায় ক্রিকেট ভক্তরা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। তাঁদের কাছে স্মৃতি শুধু একজন ক্রিকেটার নন—একটি প্রেরণা।
২১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হবে ভারত–শ্রীলঙ্কা টি-টোয়েন্টি সিরিজ। হরমনপ্রীত কৌরের নেতৃত্বে মাঠে নামবে ভারতীয় মহিলা দল। সহ-অধিনায়ক হিসেবে থাকবেন মন্ধানা।
যে ঝড় তাঁকে নাড়িয়ে দিয়েছে মানসিকভাবে, সেই ঝড় কাটিয়ে তিনি আবারও ফিরে এসেছেন প্রস্তুতি পর্বে।
নেটে ব্যাটিং
ফিটনেস ট্রেনিং
ফিল্ডিং ড্রিল
এসবের ভিডিও ইতিমধ্যেই ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়ায়। ক্রিকেটপ্রেমীরাও পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁকে।
বৃহস্পতিবার মুম্বই বিমানবন্দর থেকে বেরোতে দেখা যায় মন্ধানাকে।
মুখে মাস্ক
ঘাড়ে ব্যাকপ্যাক
চোখে ক্লান্তির ছাপ
ক্যামেরা এড়িয়ে দ্রুত গাড়িতে উঠে যাওয়া
পাপারাৎজিদের ডাকেও সাড়া দেননি তিনি। কোনও সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরও দেননি। তবু তাঁর সেই সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে।
এ যেন নীরব, দৃঢ়, শক্তিশালী এক স্মৃতি মন্ধানার ছবি।
এত বড় একটি সম্পর্কের ভাঙন যে কারোর জন্যই মানসিকভাবে কঠিন। তার উপর যখন তা হয় জনসমক্ষে—তখন চাপ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু স্মৃতি মন্ধানা একটিও অভিযোগ না করে, একটিও বিবাদ না বাড়িয়ে যে পরিমাণ সংযম ধরে রেখেছেন, তা প্রশংসনীয়।
অভিযোগগুলোকে অগ্রাহ্য করে তিনি বরং নজর দিলেন—
স্বপ্নে
লক্ষ্যে
ক্রিকেটে
দেশের প্রতি দায়িত্বে
একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদের প্রকৃত পরিচয় এখানেই।
স্মৃতি মন্ধানার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আমাদের একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়—ব্যক্তিগত ঝড় তাঁকে ভেঙে দিতে পারে না। ক্রিকেট তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, আবেগ, পরিচয়, পরম ভালোবাসা।
তিনি বলেছেন—
“ক্রিকেট আমার ব্যক্তিগত জীবনকে দূরে সরিয়ে দেয়। আমাকে এগিয়ে যেতে শেখায়।”
হয়তো এই এক সত্যই তাঁকে নতুন করে তৈরি করছে।
হয়তো এই মাঠেই তিনি নিজেকে খুঁজে পাবেন।
হয়তো এখানেই তিনি ফিরে পাবেন নিজের ভিতরের আলো।
বিয়ে ভাঙা—একটি অধ্যায়ের শেষ।
কিন্তু ক্রিকেট?
সেটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়—এবং সেটি চলছে আরও উজ্জ্বলভাবে