গত পাঁচ আর্থিক বছরে ভারতের জাতীয় মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়েতে মোট টোল আদায় হয়েছে ২.২৭ লক্ষ কোটি টাকা, যা সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রক MoRTH ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে রাজ্যসভায় প্রকাশ করেছে। সবচেয়ে বেশি টোল আদায় হয় এমন কিছু প্লাজার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে।
গত পাঁচ বছরের আর্থিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের জাতীয় মহাসড়ক এবং এক্সপ্রেসওয়েতে মোট টোল আদায় প্রায় ২.২৭ লক্ষ কোটি টাকা ছিল। সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রক MoRTH ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে এই পরিসংখ্যান রাজ্যসভায় উপস্থাপন করেছে। ২০২০ ও ২০২১ থেকে ২০২৪ ও ২০২৫ পর্যন্ত এই পরিমাণের মধ্যে রয়েছে সবথেকে বেশি টোল আদায় হওয়া কিছু বিশেষ টোল প্লাজার উল্লেখযোগ্য তথ্য। দেশজুড়ে এমন কিছু টোল পয়েন্ট রয়েছে যেখানে সর্বোচ্চ টোল আদায় হয়েছে, এবং বিশেষভাবে এই প্লাজাগুলি শুধু আয়ের ক্ষেত্রে নয়, ভৌগোলিক অবস্থান এবং বাণিজ্যিক গুরুত্বের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গুজরাতে অবস্থিত ভরথানা টোল প্লাজাটি জাতীয় মহাসড়ক ৪৮ NH 48 এর ভদোদরা-ভারুচ অংশে অবস্থিত, এবং এটি ভারতের সর্বোচ্চ আয়ের টোল প্লাজা। ২০১৯ ও ২০২০ থেকে ২০২৩ ও ২০২৪ পর্যন্ত এখানে মোট ২০৪৩.৮১ কোটি টাকা টোল আদায় হয়েছে, যার মধ্যে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ৪৭২.৬৫ কোটি টাকাও অন্তর্ভুক্ত। এই উচ্চ আদায় মূলত ভারী যানবাহনের কারণে, যেখানে বার্ষিক প্রায় ১ কোটি যানবাহন পারাপার করে, যার অধিকাংশই বাণিজ্যিক ট্রাক ও মালবাহী যানবাহন। গুজরাতের উৎপাদন কেন্দ্র এবং বন্দরগুলির যেমন কান্দলা এবং মুন্দ্রা সঙ্গে সংযোগের কারণে এই রুটটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প পরিবহন করিডোর হিসেবে পরিচিত। এটি দিল্লি-মুম্বই হাইওয়ের অংশ হওয়ায় রুটটি প্রায়ই অত্যন্ত ব্যস্ত থাকে।
রাজস্থানের শাহজাহানপুর টোল প্লাজা, যা জাতীয় সড়ক ৪৮ এর গুরগাঁও কোটপুতলি জয়পুর অংশে অবস্থিত, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টোল আদায়কারী প্লাজা হিসেবে পরিচিত। ২০১৯ ও ২০২০ থেকে ২০২৩ ও ২০২৪ পর্যন্ত এখানে ১,৮৮৪.৪৬ কোটি টাকা টোল আদায় হয়েছে। এর কৌশলগত অবস্থান দৃষ্টিনন্দন, কারণ এটি দিল্লি এনসিআরকে জয়পুর এবং মুম্বইয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করে, ফলে এখানে যাত্রী, পর্যটক এবং বাণিজ্যিক যানবাহনের প্রবাহ যথেষ্ট। দিল্লি-জয়পুর মহাসড়ক হওয়ার কারণে এটি বাণিজ্যিক এবং পর্যটকদের জন্য অন্যতম প্রধান রুট।
পশ্চিমবঙ্গের জলধুলাগুড়ি টোল প্লাজাটি জাতীয় সড়ক-১৬ এর ধনকুনি-খড়গপুর অংশে অবস্থিত এবং এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ আয়কারী টোল প্লাজা। ২০১৯ ও ২০২০ থেকে ২০২৩ ও ২০২৪ পর্যন্ত এখানে ১৫৩৮.৯১ কোটি টাকা টোল আদায় হয়েছে। কলকাতা এবং চেন্নাইসহ অন্যান্য পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় এখানকার যানবাহন প্রবাহও অনেক বেশি, যার মধ্যে ট্রাক, বাস এবং পণ্যবাহী যানবাহনের সংখ্যা বেশি। হাওড়ার কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় হলদিয়া ও কলকাতা বন্দরের সঙ্গে সম্পর্কিত মালবাহী চলাচলও এই প্লাজার আয় বাড়াতে সহায়ক।
উত্তরপ্রদেশের বড়জোর টোল প্লাজা, যা জাতীয় সড়ক ১৯ এর ইটাওয়া-চকেরি-কানপুর অংশে অবস্থিত, চতুর্থ স্থানে রয়েছে। গত পাঁচ বছরে এখানে ১,৪৮০.৭৫ কোটি টাকা টোল আদায় হয়েছে। এর অবস্থান ভারতের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডে হওয়ায়, যা দিল্লিকে কলকাতার সঙ্গে সংযুক্ত করে, ভারী বাণিজ্যিক যানবাহনের প্রবাহের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। কানপুরের শিল্প অঞ্চল এবং উত্তরপ্রদেশের কৃষি কেন্দ্রের সঙ্গে এর সংযোগ এই আদায়ের বৃদ্ধি ঘটায়।
হরিয়ানার ঘরাউন্ডা টোল প্লাজা, যা জাতীয় সড়ক ৪৪ এর পানিপথ জলন্ধর অংশে অবস্থিত, পঞ্চম স্থানে রয়েছে। ২০১৯ ও ২০২০ থেকে ২০২৩ ও ২০২৪ পর্যন্ত এখানে ১,৩১৪.৩৭ কোটি টাকা টোল আদায় হয়েছে। দিল্লি চণ্ডীগড় করিডোরে এর অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি যাত্রী, পর্যটক এবং মালবাহী যানবাহনের জন্য আকর্ষণীয়। পানিপথের মতো হরিয়ানার শিল্প এলাকা এবং দিল্লি-এনসিআরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে, ভারী যানবাহন প্রবাহকে সমর্থন করে।
গুজরাতে অবস্থিত চোরিয়াসি টোল প্লাজাটি NH 48 এর ভারুচ-সুরাত অংশে অবস্থিত, এবং এটি ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে। এখানে পাঁচ বছরে আনুমানিক ১,২৬১ কোটি টাকা টোল আদায় হয়েছে। সুরাতের টেক্সটাইল এবং হীরক শিল্পকে বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করার কারণে ভারী বাণিজ্যিক যানবাহনের প্রবাহ এই প্লাজার আয় বাড়াতে সহায়ক।
এই তথ্যগুলো দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টোল প্লাজার সর্বোচ্চ টোল আদায়ের ভিত্তিতে এবং তাদের কৌশলগত অবস্থানের বিবেচনায় তৈরি করা হয়েছে।
ভারতের জাতীয় মহাসড়ক এবং এক্সপ্রেসওয়েগুলিতে টোল আদায়ের এই বিশাল পরিমাণ সরকারী উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলির সাফল্য এবং এগুলির গুরুত্বকে প্রমাণ করে। এটি শুধু আয়ের উৎস নয়, দেশের বাণিজ্যিক এবং শিল্পকেন্দ্রের মেরুদণ্ড হিসেবেও কাজ করছে। তবে, এর সাথে সাথে কিছু স্থানে যানজট এবং নির্মাণ কাজের কারণে বিলম্ব বা সমস্যাও দেখা যায়, যার ফলে টোল আদায় আরও সুসংগঠিত এবং বাধাহীন করার জন্য বর্তমান পাইলট প্রকল্পগুলো চালু করা হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই টোল আদায় আরও বৃদ্ধি পাবে, এবং এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠবে। দেশের বিভিন্ন জাতীয় মহাসড়ক এবং এক্সপ্রেসওয়ের উন্নয়ন এবং আধুনিকীকরণ, সঙ্গে যানবাহন সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমের সম্প্রসারণের কারণে, টোল আদায়ের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে। এই আয়ের একটি বড় অংশ সরকারকে বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন অবকাঠামো প্রকল্প তৈরি করতে সহায়তা করবে, যার ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শক্তিশালী হবে।
ভারতের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়ন। দেশের জন্য জরুরি মহাসড়ক এবং এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, যা সরকারি বাজেটের মাধ্যমে সরবরাহ করা কঠিন। তবে, টোল আদায় সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আয় উৎস হিসাবে কাজ করছে। টোল আদায় বৃদ্ধি পেলে, দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে তহবিলের অভাব কমে যাবে এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলি দ্রুত বাস্তবায়িত হবে।
বর্তমানে ভারতে বিভিন্ন মহাসড়ক এবং এক্সপ্রেসওয়ে আধুনিকীকরণ এবং উন্নয়ন কাজ চলছে। এই উন্নয়নের ফলে, যানবাহন চলাচল দ্রুততর হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি আরো দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাবে। এর পাশাপাশি, নতুন রাস্তা নির্মাণের ফলে ব্যবসায়িক এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশ হবে, যা আরও বেশি টোল আদায়ের সম্ভাবনা তৈরি করবে।
টোল প্লাজা পরিচালনা, মেরামত এবং উন্নয়ন কাজের জন্য বহু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে সরাসরি টোল প্লাজা অপারেটর, কর্মী, মেকানিক, সিকিউরিটি গার্ড, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং অন্যান্য সহায়ক কর্মীরা যুক্ত হবেন। এছাড়াও, যেহেতু অধিকাংশ টোল প্লাজা জাতীয় মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ের প্রধান স্থানে অবস্থিত, সেখানে এলাকার ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়ন করবে।
তবে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যেহেতু ভারী যানবাহন, ট্রাক এবং বাণিজ্যিক গাড়ি এসব টোল প্লাজার মাধ্যমে চলে, তাই এ সমস্ত পরিবহন সংস্থাগুলোর মধ্যে মালবাহী পরিবহন সংক্রান্ত কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, যা ভারতের সড়ক পরিবহণ খাতের শক্তিশালীকরণের দিকে অগ্রসর হবে।
ভারতের জাতীয় মহাসড়ক এবং এক্সপ্রেসওয়ের আধুনিকীকরণের ফলে বাণিজ্যিক পরিবহন ব্যবস্থায় বিপুল উন্নতি হবে। যানবাহন চলাচল সহজ হবে, এবং সময় বাঁচবে, যা সরাসরি ব্যবসা পরিচালনায় সহায়ক হবে। ভারী ট্রাক, মালবাহী যানবাহন এবং পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত হলে দেশের অর্থনীতির উন্নতি হবে, এবং উৎপাদন এবং রফতানির হারও বৃদ্ধি পাবে।
নতুন এবং আধুনিক সড়কগুলির মাধ্যমে সঠিক সময়ে পণ্য পৌঁছানো ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। উদাহরণস্বরূপ, শিল্প অঞ্চলগুলির জন্য সড়ক পরিবহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পণ্য দ্রুত বাজারে নিয়ে আসে, যা শিল্পকারখানার জন্য আর্থিক লাভের সুযোগ তৈরি করে। ভারতীয় উৎপাদন এবং রফতানির বৃদ্ধির সাথে সাথে, টোল প্লাজার মাধ্যমে আদায় হওয়া অর্থ দেশের বাজেটে বড় ভূমিকা পালন করবে।
যেহেতু ভারী যানবাহন, ট্রাক, এবং পণ্যবাহী গাড়ি দেশের সড়কগুলোতে চলাচল করছে, সুতরাং টোল আদায়ের পরিমাণে বৃদ্ধির পাশাপাশি সড়কগুলোর উপর চাপও বৃদ্ধি পাবে। এটা শুধুমাত্র আয়ের বিষয় নয়, বরং সড়কগুলোর সুরক্ষা এবং টেকসই রক্ষণাবেক্ষণের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এবং আপগ্রেড করা সড়কগুলির মাধ্যমে যানবাহনগুলির সংখ্যা বাড়ানো হলেও, পরিবহণ সিস্টেমের উপযুক্ত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।
অতএব, টোল আদায় বাড়ানোর সাথে সাথে সড়ক নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি এবং সিস্টেম ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে আরো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে যানজট, দুর্ঘটনা, এবং সড়ক ব্যাঘাত কমানো যায় এবং টোল প্লাজা পরিচালনাও নির্বিঘ্ন হয়।
বাধামুক্ত টোল আদায় MLFF প্রযুক্তি এবং সিসি টিভি নজরদারি ব্যবস্থা প্রযুক্তির অগ্রগতির জন্য টোল প্লাজা পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা করেছে। MLFF Multi Lane Free Flow সিস্টেমের মাধ্যমে, যানবাহন কোন বাধার সম্মুখীন না হয়ে, সোজা টোল প্লাজা অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে দীর্ঘ লাইন, যানজট এবং সময়ের অপচয় কমে যাবে, এবং টোল আদায় আরও সঠিক ও দ্রুত হবে।
এই প্রযুক্তি শুধুমাত্র টোল আদায়ের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে না, বরং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে, যা দেশের সড়ক পরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও নিরাপদ করবে। সেইসাথে, ডেটা সিস্টেমের মাধ্যমে যানবাহনের গতিবিধি ট্র্যাকিং করা যাবে, যা দেশের সড়ক ব্যবস্থার উন্নতির জন্য সহায়ক।
টোল আদায় দেশের রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই রাজস্বের একটি অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, ও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা যাবে, যা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহায়তা করবে। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্ভব হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের সার্বিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
সাধারণভাবে, টোল আদায় বৃদ্ধি শুধুমাত্র সড়ক উন্নয়নের জন্য নয়, বরং দেশীয় অর্থনীতির প্রতিটি খাতে একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করবে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং অগ্রগতিতে অবদান রাখবে।