দেশের আকাশপথে এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে ইন্ডিগোর ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল এবং দেরির জেরে। ৮ ডিসেম্বরের সকাল থেকে দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদসহ দেশের প্রায় সব ব্যস্ততম বিমানবন্দরে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হতে থাকে। দিনের প্রথম ভাগেই বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যায়, আর দুপুর নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫০টিরও বেশি। যার ফলে হাজার হাজার যাত্রী বিমানবন্দরে আটকে পড়েন কারও ছিল জরুরি মেডিকেল ট্রিটমেন্ট, কারও ব্যবসায়িক সফর, কারও আবার পারিবারিক অনুষ্ঠান।
ভারতের বিমান পরিবহণ ক্ষেত্রে ইন্ডিগো দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নামগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতিদিন শত শত অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করে এই সংস্থা। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে হঠাৎ এক দিনের “অস্বাভাবিক বিশৃঙ্খলা” পুরো দেশের বিমান পরিষেবাকে কাঁপিয়ে দিল। দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদ—দেশের সব ব্যস্ততম বিমানবন্দরেই সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হতে থাকে। কোনওটির ক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরি, কোথাও আবার সম্পূর্ণ বাতিল।
হাজার হাজার যাত্রী বিমানবন্দরে আটকে পড়েন—কারও হাতে গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল অ্যাপয়েন্টমেন্ট, কারও বিদেশ যাত্রা, কারও আবার জরুরি ব্যবসায়িক কাজ। সেই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হতে শুরু করে অভিযোগ, ক্ষোভ, প্রতিবাদ।
সরকার তৎক্ষণাৎ ঘটনাটির ওপর নজর দেয় এবং DGCA (Directorate General of Civil Aviation) জরুরি বৈঠক ডাকে। অন্যদিকে, এয়ারলাইন কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দিতে দিশেহারা হয়ে পড়ে।
এই ৪,০০০ শব্দের প্রতিবেদনটি দেশের ইতিহাসে অন্যতম এই ‘ফ্লাইট মেল্টডাউন’-এর প্রতিটি দিক তুলে ধরছে:
কী ঘটেছিল
কেন ঘটেছিল
কার উপর দায়
যাত্রীদের সমস্যা
সরকারের ভূমিকা
ভবিষ্যতের সমাধান
৮ ডিসেম্বর ভোর থেকেই দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে ব্যস্ততা ছিল স্বাভাবিক মতোই। দিল্লির টার্মিনাল ১ ও ২-তে চেক-ইন লাইনে ভিড়, মুম্বাইয়ের T2-তে লং উইকএন্ডের যাত্রী চাপ, বেঙ্গালুরুতে টেক পার্ক কর্মীদের ভ্রমণ—সবই সাধারণ দিনের মতো।
কিন্তু সকাল ৭টা নাগাদ আকস্মিকভাবে ‘ফ্লাইট ডিলে’ বোর্ডে একের পর এক ইন্ডিগো ফ্লাইটের নাম জ্বলজ্বল করতে থাকে। এরপরই শুরু হয় বাতিলের ধাপ।
প্রথমে ১৫–২০টি
এক ঘণ্টার মধ্যে ৫০+
তার পরপরই ২০০+
দুপুর নাগাদ সংখ্যাটি ছাড়িয়ে যায় ৪৫০টিরও বেশি
যারা সকাল সকাল পৌঁছে ছিলেন, তারা প্রথমে বিষয়টিকে স্বাভাবিক প্রযুক্তিগত দেরি ভেবেছিলেন। কিন্তু যখন নাগাড়ে ঘোষণা হতে থাকে—
“এই ফ্লাইটটি বাতিল করা হয়েছে”—
তখনই যাত্রীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা ছড়াতে শুরু করে।
দিল্লিতে দিনে মোট ১৩৪টি ইন্ডিগো ফ্লাইট বাতিল হয়—
৭৫টি ডিপারচার
৫৯টি অ্যারাইভাল
যাত্রীরা টার্মিনালে ভিড় জমিয়ে অভিযোগ করেন—
কেউ ৬ ঘণ্টা ধরে লাইনে
কেউ বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে
কেউ মেডিকেল ট্রিটমেন্টে যাচ্ছিলেন
এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের জন্য জল, সাহায্য ডেস্ক খুললেও তা ছিল পর্যাপ্ত নয়।
বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়।
একের পর এক যাত্রীর ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল
লাউঞ্জ ভর্তি
বোর্ডিং গেটের সামনে ভিড়
ক্রমাগত ঘোষণা চলছে
এক যাত্রী বলেন—
“মুম্বাইয়ের মতো শহরে এমন বিশৃঙ্খলা কল্পনাও করা যায় না।”
এখানে সবচেয়ে বেশি বাতিল হয়—১২৭টি ফ্লাইট
IT সিটির কর্মীরা অসহায় হয়ে পড়েন কারণ ৮০% অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক ফ্লাইটই ইন্ডিগোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়—
পাইলটদের নির্দিষ্ট সময়ের বেশি ফ্লাই করানো যাবে না—এই নিয়ম বহুদিন ধরেই আছে, কিন্তু এবার তা আরও কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ করা হয়।
ফলে—
অনেক সিনিয়র পাইলট ডিউটি করতে পারেননি
ক্রু শিডিউল ভেঙে পড়ে
জরুরি রিপ্লেসমেন্ট পাওয়া যায়নি
ইন্ডিগোর কয়েকটি রুটে যথেষ্ট স্টাফ ছিল না
যে পাইলটরা অন্য শহরে পৌঁছে পরবর্তী রুট ধরবেন—
তাদের আগের ফ্লাইটই বাতিল হওয়ায় শৃঙ্খল ভেঙে যায়।
একটি ফ্লাইট বাতিল →
পাইলট পৌঁছতে পারলেন না →
পরবর্তী তিনটি ফ্লাইট বাতিল →
শত শত যাত্রী আটকে গেলেন।
সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত X (Twitter), Facebook, Instagram ভরে যায় অভিযোগে।
যাত্রীরা লাইভ ভিডিও করে জানান—
“আমার ৫ ঘণ্টা ধরে কোনও স্টাফ নেই সামনে।”
“বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, জল-পানির ব্যবস্থা নেই।”
“আমাদের বলা হয়েছে—‘ফ্লাইট বাতিল, বাড়ি যান।’ এটা কেমন উত্তর?”
কেউ কেউ ইন্ডিগোকে ‘অবহেলা’, ‘অদক্ষতা’, ‘স্টাফ সংকট লুকানোর চেষ্টা’ ইত্যাদি কঠোর শব্দে সমালোচনা করেন।
বিকেলের দিকে ইন্ডিগো দীর্ঘ বিবৃতি দেয়—
যাত্রীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা
পরিস্থিতি ‘অপ্রত্যাশিত’
নিয়ম মেনে ক্রুদের বিশ্রাম দিতে বাধ্য
ইতিমধ্যে ₹৬১০ কোটির বেশি টিকিট রিফান্ড প্রক্রিয়া করা হয়েছে
এয়ারলাইন জানায়, যাত্রী নিরাপত্তা সর্বাগ্রে—
সেই কারণে কড়া FDTL নিয়ম ভাঙা সম্ভব ছিল না।
যাত্রীদের ক্ষোভ বাড়তে থাকায় DGCA সরাসরি হস্তক্ষেপ করে—
ইন্ডিগোকে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে
ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি রোধে পরিকল্পনা জমা দিতে হবে
ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে
“জনগণের নিরাপত্তা, সুবিধা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এক মহিলা যাত্রী বলেন—
“আমার কেমোথেরাপির তারিখ বদলানো যায় না। কিন্তু ইন্ডিগো আমাকে কোনও বিকল্প দেয়নি।”
কলকাতার শুভম সেন জানান—
“একদিন পর আমার বিয়ে। কিন্তু আজ সকাল থেকে আটকে আছি।”
অনেক পরিবার অভিযোগ করেন—
“লাউঞ্জ থেকে থেকে বলছে—সিট নাই, জল নাই, স্টাফ নাই।”
IT ও কর্পোরেট মিটিং পিছিয়েছে
পর্যটন সেক্টরে ক্ষতি
ফ্লাইট অপারেশন ব্যাহত হওয়ায় কার্গো পরিবহণ ক্ষতিগ্রস্ত
বিদেশি যাত্রীরা ভারতের বিমান পরিষেবা নিয়ে আস্থা হারাচ্ছেন
ইন্ডিগো জানায়—
ধীরে ধীরে ফ্লাইট পুনরুদ্ধার
পাইলট শিডিউল রিসেট
অতিরিক্ত স্টাফ ডাকা হচ্ছে
আগামী ৪৮ ঘণ্টায় স্বাভাবিক হবে বলে আশা
এয়ারলাইনের স্টাফ ব্যাকআপ আরও বাড়ানো প্রয়োজন
FDTL নিয়ম প্রয়োগের আগে আগাম পরিকল্পনা জরুরি
যাত্রী হেল্পলাইন উন্নত করা উচিত
ফ্লাইট বাতিল হলে রিয়েল-টাইম নোটিফিকেশন আবশ্যক
সরকারকে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে
ইন্ডিগো জানিয়েছে, কঠোরভাবে কার্যকর হওয়া Flight Duty Time Limitations (FDTL) বা পাইলট ডিউটি টাইম রুলসের কারণে অনেক পাইলটকে বিশ্রামে পাঠাতে হয়, ফলে ক্রু শিডিউল ভেঙে পড়ে এবং এই ডোমিনো ইফেক্ট তৈরি হয়। যদিও যাত্রীরা অভিযোগ করছেন—এয়ারলাইন আগে থেকেই সতর্ক করতে পারত, পর্যাপ্ত সাহায্য ডেস্ক খোলা হয়নি, এবং রিফান্ডের প্রসেস যথেষ্ট ধীর। ইতিমধ্যেই ইন্ডিগো দাবী করেছে যে তারা ₹৬১০ কোটির বেশি টিকিট রিফান্ড প্রক্রিয়া করছে।
দিল্লি বিমানবন্দরে ১৩৪টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়, মুম্বাইতে দেখা যায় তীব্র ভিড়, বেঙ্গালুরুতে IT কর্মীরা গুরুতর সমস্যায় পড়েন। সোশ্যাল মিডিয়ায় যাত্রীদের ক্ষোভ ঝড় তোলে—কেউ বলছেন ৬ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন, কেউ শিশুদের নিয়ে দুর্ভোগের কথা জানাচ্ছেন।
সরকার ও DGCA ইতিমধ্যেই ইন্ডিগোর কাছে রিপোর্ট চেয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। DGCA পরিষ্কার জানিয়েছে—যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সুবিধার সঙ্গে কোনও আপস বরদাস্ত করা হবে না। একই সঙ্গে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের প্রতি পরামর্শ জারি করেছে—যাত্রার আগে অবশ্যই ফ্লাইটের স্ট্যাটাস চেক করতে।
এই ঘটনাটি ভারতীয় বিমান পরিষেবা ব্যবস্থার পরিকল্পনা, অপারেশন, এবং ক্রু ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে বড়সড় ত্রুটিকে সামনে এনে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে—এমন পরিস্থিতি এড়াতে এয়ারলাইনের ব্যাকআপ স্টাফ, রিয়েল-টাইম নোটিফিকেশন ব্যবস্থা, এবং যাত্রী সহায়তা পরিষেবা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
এই ঘটনাটি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে—
ভারতের বিমান পরিবহণ ব্যবস্থায় এখনো নানা খামতি রয়েছে।
ইন্ডিগো যতো বড়ই ব্র্যান্ড হোক, হঠাৎ সংকটে পুরো অবকাঠামো ভেঙে পড়ে।
যাত্রীদের ক্ষোভ, সরকারের কড়া অবস্থান এবং আর্থিক ক্ষতি—
সব মিলিয়ে এটি ২০২৫ সালের অন্যতম বড় বিমান–সংকট হিসেবে ইতিহাসে থেকে যাবে।