দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিমান সংস্থা IndiGo কে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন সংকট। গত কয়েক দিন ধরে সারা দেশে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল ও দেরির ফলে বিমানবন্দরগুলোতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। একদিনে বাতিল হয়েছে এক হাজারেরও বেশি ফ্লাইট, আর কয়েক দিনের মধ্যে বাতিল ও দেরি মিলিয়ে সংখ্যা ছুঁয়েছে প্রায় চার হাজার।
গত কয়েক দিনের ঘটনায় ভারতীয় বিমান পরিবহণ ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ এবং ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিমান সংস্থা IndiGo একের পর এক ফ্লাইট বাতিল করতে শুরু করলে মুহূর্তের মধ্যে দেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর অচল পরিস্থিতিতে পৌঁছে যায়।
মাটি থেকে আকাশ—দুই জায়গাতেই যাত্রীদের মধ্যে অসহায়তা, ক্ষোভ এবং আতঙ্ক তীব্র আকার ধারণ করে।
এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা থেকে স্পষ্ট—IndiGo–র এই বিপর্যয় শুধুমাত্র সংস্থাগত ব্যর্থতা নয়, এটি দেশের বিমান শিল্পে একটি মৌলিক দুর্বলতার প্রতিফলন।
এমন বিশৃঙ্খলা ভারতীয় বিমান শিল্পে আগে কখনো দেখা যায়নি।
সংকটের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নতুন Flight Duty Time Limitations (FDTL) নিয়ম, যেটি পাইলটদের বিশ্রাম시간 বাড়ানো ও রাতের উড়ান সীমিত করার নির্দেশ দেয়। অভিযোগ উঠেছে—এই নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগে IndiGo পর্যাপ্ত ক্রু ও পাইলট প্রস্তুত রাখেনি। রোস্টার পরিকল্পনার ঘাটতি, হঠাৎ কর্মী অনুপস্থিতি, এবং ব্যাকআপ টিম না থাকার ফলে ফ্লাইট নেটওয়ার্ক একযোগে ভেঙে পড়ে।
বিমানবন্দরগুলোতে আটকে পড়া যাত্রীরা মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। অনেকেই জানান—চেক-ইন করার পর জানতে পারছেন, ফ্লাইট বাতিল। লাগেজ ফেরত পেতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। খাবার, জল বা সঠিক তথ্যের অভাব নিয়ে ক্ষোভ জানান যাত্রীরা।
এদিকে DGCA ইতিমধ্যেই IndiGo–র CEO–কে শোকজ নোটিস পাঠিয়েছে। কেন আগাম পরিকল্পনা করা হয়নি, কেন যাত্রীদের তথ্য দেওয়া হয়নি এবং কেন এত বড় নেটওয়ার্ক বিপর্যয় হলো—এই বিষয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জবাব চেয়েছে DGCA।
কেন্দ্রীয় সরকারও দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। রিফান্ড দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ, বিমান ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, বিমানবন্দরে যাত্রী সুবিধা নিশ্চিত করা, এমনকি বিকল্প হিসেবে বিশেষ ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। সরকারের স্পষ্ট বার্তা—
“যাত্রী হয়রানি সহ্য করা হবে না।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু IndiGo নয়—ভারতীয় বিমান শিল্পের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। পাইলটের অভাব, অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং অতিরিক্ত IndiGo–নির্ভরতা এই সংকটকে আরও প্রকট করেছে।
সংকটের সূত্রপাত হয় পাইলটদের কাজের নতুন নিয়মনীতির কারণে, যা Flight Duty Time Limitations (FDTL) নাম দিয়ে পরিচিত। নতুন নিয়মে রাতের ল্যান্ডিং সংখ্যা কমানো হয়, এবং পাইলট ও ক্রু–দের বিশ্রাম সময় বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
সাধারণত বড় বিমান সংস্থাগুলো নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগে তাদের সম্পূর্ণ ক্রু অপারেশন পুনর্গঠন করে, শিফট রোস্টার বদলায় এবং অতিরিক্ত জনবল প্রস্তুত রাখে।
কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে—
এর ফলে:
পাইলটের অভাব দেখা দেয়
রোস্টার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে
বহু ক্রু একযোগে ডিউটিতে অনুপস্থিত
জরুরি ফ্লাইট শিডিউল করতে ব্যর্থ হয় সংস্থা
ফলাফল—দেশের বিমানবন্দরে মাথায় হাত যাত্রীদের।
সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী:
একটি দিনেই বাতিল হয়েছে ১০০০টিরও বেশি ফ্লাইট
তিন দিনে বাতিল হয়েছে প্রায় ২৩০০ ফ্লাইট
দেরি হয়েছে ৩৭০০–এর বেশি ফ্লাইট
IndiGo–র বাজারভাগ যেহেতু ৬৫%, তাই তাদের ফ্লাইট না চললে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহণ প্রায় স্থবির হয়ে যায়।
এয়ারপোর্টগুলোতে হাজারো মানুষ আটকে থাকেন—
দিল্লি (T3 টার্মিনাল)
মুম্বাই
বেঙ্গালুরু
কলকাতা
আহমেদাবাদ
হায়দরাবাদ
চণ্ডীগড়
গোয়া
চেন্নাই
সমস্ত জায়গাতেই দেখা যায় লম্বা লাইন, চিৎকার, কান্না ও বিশৃঙ্খলা।
ডজন ডজন যাত্রী সাংবাদিকদের বলেন—
“চেক–ইন করার পর জানলাম ফ্লাইট বাতিল। এখন লাগেজ ফিরে পাচ্ছি না।”
“বাচ্চা নিয়ে অপেক্ষা করছি তিন ঘণ্টা। কেউ কোনো তথ্য দিচ্ছে না।”
“আমার কানাডা কানেক্টিং ফ্লাইট মিস হয়ে গেল।”
“মা হাসপাতালে ভর্তি, জরুরি ভিত্তিতে যেতে হবে। IndiGo বলছে অপেক্ষা করুন।”
একজন বৃদ্ধ মহিলা বলেন—
“অ্যাক্সেসিবিলিটি নেই, খাবার নেই, চেয়ার নেই। এভাবে কীভাবে একজন বৃদ্ধ মানুষ অপেক্ষা করবে?”
এই মানবিক দিকটি পুরো সংকটকে আরও গভীর করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, IndiGo–র মূল ভুলগুলো:
নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগেই সংস্থার উচিত ছিল অতিরিক্ত পাইলট ও ক্রু প্রস্তুত রাখা।
কিন্তু তারা করেনি।
IndiGo ভারতের সবচেয়ে বড় বিমান সংস্থা।
এই অবস্থায় তাদের সিস্টেমে আরও বেশি সতর্কতা থাকা উচিত ছিল।
যাত্রীরা বারবার অভিযোগ করেছেন—
আপডেট দেওয়া হয়নি
হেল্প ডেস্কে উত্তর পাওয়া যায়নি
রিফান্ড দেওয়া হয়নি
লাগেজ ফেরত দেওয়া হয়নি
অনেক চেক–ইন সিস্টেম, তথ্য–দেওয়া সিস্টেম অটোমেটেড। সংকটের মুহূর্তে তা ভেঙে পড়ে।
DGCA সরাসরি IndiGo–র CEO Pieter Elbers–কে চিঠি পাঠায়:
কেন এমন সংকট তৈরি হলো?
সংস্থা কি আগাম পরিকল্পনা করেনি?
যাত্রীদের কেন তথ্য দেওয়া হয়নি?
নিরাপত্তা বজায় রাখা গেছে কি না?
২৪ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
DGCA–র ভাষায়—
“IndiGo demonstrated substantial operational failure.”
এই মন্তব্যই প্রকাশ করে—সংস্থা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছালে কেন্দ্রীয় সরকার হস্তক্ষেপ করে।
৭ ডিসেম্বরের মধ্যে সব রিফান্ড প্রসেস করতে হবে
এয়ার ভাড়া নিয়ন্ত্রণে আনা হবে
যাত্রীদের খাবার–জল ও বসার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক
রেলওয়ে বিশেষ ট্রেন চালাবে আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য
এয়ারপোর্ট অথরিটি ২৪x৭ কন্ট্রোল রুম দেবে
এছাড়া মন্ত্রী বলেছে—
“যাত্রী হয়রানি বরদাস্ত করা হবে না।”
বিমান বিশেষজ্ঞদের মতে শুধুমাত্র তিন দিনে—
IndiGo–র ক্ষতি: ₹300–400 কোটি
যাত্রীদের আর্থিক ক্ষতি: ₹900 কোটি–এর বেশি
হোটেল বুকিং বাতিল: লাখের বেশি
ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর ক্ষতি: ব্যাপক
ভারতীয় বিমান শিল্প এই সঙ্কটে বড় ধাক্কা খেয়েছে।
না।
এই সংকট দেখিয়ে দিয়েছে—
ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১৫০০ নতুন পাইলট প্রয়োজন, অথচ প্রশিক্ষিত হয় ৫০০–৬০০।
বিমান যাত্রী সংখ্যা বেড়েছে ২৫–৩০%, কিন্তু বিমানবন্দর সুবিধা বাড়ছে খুব কম হারে।
দেশের ৬৫% বাজার এক সংস্থার হাতে থাকলে, একটি ত্রুটি = পুরো সিস্টেমের ভাঙন।
অনেক বিমান ভাড়া নিয়ে চালানো হয়, ফলে গ্রাউন্ডিং হলে নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে।
কর্মী–সংকট বা প্ল্যানিং–ত্রুটি যাই হোক, যাত্রীরা বলছেন—
“IndiGo আমরা বিশ্বাস করি বলে টিকিট কাটি। তারা আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে।”
কেউ কেউ আবার বলেছেন—
“ক্রু–রা বলছে Amader kichu korar nei. আপনারা কোম্পানির কাছে যান.”
IndiGo প্রথম দুই দিন ক্ষমা না চাওয়ায় সমালোচনা আরও বাড়ে।
সরকার বলেছে—
IndiGo–কে ক্রু সংখ্যা বাড়াতে হবে
নতুন নিয়ম অনুযায়ী অপারেশন স্থিতিশীল করতে হবে
যাত্রী সুরক্ষা আইন মানতে হবে
প্রয়োজন হলে জরিমানা ধার্য করা হবে
বিশেষজ্ঞদের মতে—
“পরিস্থিতি পুরো স্বাভাবিক হতে আরও ৭–১০ দিন সময় লাগতে পারে।”
IndiGo–র এই বিপর্যয় দেখিয়ে দিয়েছে—
বৃহৎ সংস্থাও পরিকল্পনার অভাবে ভেঙে পড়তে পারে
যাত্রী–অধিকার আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন
বিমান শিল্পে অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ
সরকারকে আগাম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে
প্রযুক্তি ও মানবসম্পদের সমন্বয় প্রয়োজন
এই সংকট শুধুই IndiGo–র নয়—এটি ভারতীয় বিমান পরিবহণ ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।