মৌসুমি পরিবর্তনে বাড়ে নানা অসুখের ঝুঁকি। তাই ইমিউনিটি শক্ত রাখা জরুরি। ঘুমের আগে এক কাপ দুধে কয়েকটি পরিচিত উপাদান মিশিয়ে খেলে প্রাকৃতিকভাবে বাড়তে পারে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
শীতের আগমন মানেই কিছু স্থির সত্য। হাওয়ায় শুষ্কতা বাড়ে, তাপমাত্রা কমে, দিনে–রাতে তাপমাত্রার পার্থক্য তীব্র হয়, বাতাসে ভাসমান জীবাণুর প্রকোপও কয়েকগুণ বাড়ে। ফল—হাঁচি, কাশি, জ্বর, সর্দি, ফ্লু, হজমের সমস্যা, ত্বকের র্যাশ বা ফুস্কুড়ি—এই সমস্ত সমস্যাই যেন মানুষের প্রায় দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে গ্রীষ্মপ্রধান দেশের মানুষের শরীরে শীতকে সহ্য করার ক্ষমতা সীমিত। অতএব তাপমাত্রার যেকোনও বদলই সহজেই জীবাণুর আক্রমণ বাড়ায় এবং শরীরের প্রতিরোধবর্ম দুর্বল হলে সংক্রমণ দমন করার ক্ষমতার অভাব দেখা দেয়।
রোগ প্রতিরোধ শক্তি বা ইমিউনিটি আসলে এক জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া। কখনও শরীরে প্রদাহ (inflammation) বেড়ে গেলে, কখনও কমে গেলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যধিক সক্রিয় হয়ে উঠলে অটোইমিউন সমস্যা দেখা দেয়, আবার কম সক্রিয় হলে রোগ দমন করার শক্তি কমে যায়। শীতকালে এই ভারসাম্য আরও বিঘ্নিত হয়। তাই এই সময়টায় ইমিউন সিস্টেমকে মজবুত রাখতে হলে জীবনযাপনে এবং খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা জরুরি।
দিল্লির পুষ্টিবিদ এবং ইন্ডিয়ান ডায়েটেটিক্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ভবেশ গুপ্ত জানিয়েছেন, রাতে ঘুমের আগে এক কাপ গরম দুধের সঙ্গে কয়েকটি সহজ, পরিচিত উপাদান মিশিয়েই বাড়ানো যেতে পারে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। দুধের মধ্যে থাকা প্রোটিন, ক্যালশিয়াম, অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন–মিনারেল শরীরকে শুধু পুষ্টিই দেয় না, বরং রাতভর পুনরায় শক্তি জোগানোর জন্য বিশেষভাবে কাজ করে। আর তার সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ বাড়ানো উপাদান যোগ হলে পানীয়টি হয়ে ওঠে আরও কার্যকর।
এখন আমরা বিস্তারিতভাবে জানব—কেন শীতে ইমিউনিটি কমে, এবং কোন কোন উপাদান দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে রোগ প্রতিরোধ শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
(গভীর বিশ্লেষণ)**
শীতকালে শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়। অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ধরে রাখতেই শরীর অধিক শক্তি ব্যবহার করে। ফলে জৈবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা যে শক্তি নিয়ে কাজ করে, তা কিছুটা কমে যায়।
ঠান্ডা পরিবেশে অনেক ভাইরাস—বিশেষত ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ ভাইরাস—অধিক সক্রিয় থাকে। তারা দীর্ঘক্ষণ বাতাসে ভাসতে পারে, সংক্রমণক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে।
শীতে সূর্যের আলো কম পাওয়া যায়। Vitamin D কমলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়।
শীতকালে মানুষ ঘরের মধ্যে বেশি থাকে, জানলা-দরজা বন্ধ থাকে। ফলে বাতাস চলাচল কম হয়, জীবাণু জমে থাকে।
গরমের তুলনায় শীতে লোভনীয়, ভারী, তৈলাক্ত খাবার বেশি খাওয়া হয়—যা হজমে সমস্যা করে এবং ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে।
শীতে অনেকেই দেরিতে ঘুমাতে যান, অতিরিক্ত কম্বল ব্যবহার করে অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম কম হলে ইমিউনিটি কমে।
এ সমস্ত কারণ মিলিয়ে শীতকালে রোগের প্রকোপ বাড়ে আর ইমিউনিটি দুর্বল হয়ে পড়ে।
অনেক সংস্কৃতিতে রাতের দুধকে সুস্বাস্থ্যের প্রতীক মনে করা হয়। এর পিছনে শক্ত বৈজ্ঞানিক কারণও আছে।
দুধ ঘুম বাড়ায় (ট্রিপটোফ্যান ও সেরোটোনিনের জন্য)
বিপাকক্রিয়া উন্নত করে
পেশির ক্ষয় পূরণ করে
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে
হাড় ও পেশি শক্তিশালী রাখে
এখন দেখা যাক—কোন কোন চেনা উপকরণ দুধের সঙ্গে মিশলে ইমিউনিটির জন্য কার্যকর হয়।
জাফরান বা কেশরকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট হিসেবে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
কেরোটিনয়েড
ক্রোসিন
পিক্রোক্রোসিন
স্যাফরানাল
এগুলি শরীরের কোষকে ফ্রি-র্যাডিক্যালের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
স্নায়ুকে শিথিল করে
ঘুমের মান উন্নত করে
হজমশক্তি বাড়ায়
প্রদাহ কমায়
স্ট্রেস কমিয়ে ইমিউনিটি বাড়ায়
রাতে গরম দুধে ২–৩টি জাফরান মিশিয়ে খেলে শরীরে উষ্ণতা বাড়ে এবং মন-শরীর দুই-ই শান্ত হয়।
মধুর মধ্যে রয়েছে—
ফ্ল্যাভোনয়েড
অ্যান্টি-ব্যাক্টেরিয়াল কমপাউন্ড
প্রোবায়োটিক উপাদান
খনিজ
শীতকালে মধু সংক্রমণ প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
গলা শান্ত করে
সর্দি–কাশি কমায়
শরীরে তাপ উৎপন্ন করে
ঘুম বাড়ায়
ব্যাক্টেরিয়া দমন করে
এক কাপ ঈষদুষ্ণ দুধে এক চা চামচ কাঁচা মধু মিশিয়ে খেলে ইমিউনিটি বৃদ্ধি পায় ও শ্বাসযন্ত্র সুস্থ থাকে।
ভেজানো কাঠবাদামের গুণ অগণিত। বাদামে প্রচুর রয়েছে—
ভিটামিন ই
ওমেগা-৩
ম্যাগনেশিয়াম
প্রোটিন
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায়
স্নায়ুর স্বাস্থ্য উন্নত করে
হাড় ও পেশি মজবুত করে
রক্তশর্করা ঠিক রাখে
ত্বক সুস্থ রাখে
দুধে বাদাম মিশিয়ে খেলে শীতকালে ত্বক ও শরীর দুটোই থাকে সতেজ।
তুলসী ভারতের ঐতিহ্যিক ভেষজ সম্পদ। তুলসীতে রয়েছে—
ভিটামিন সি
জিঙ্ক
ইউজেনল
অ্যান্টিভাইরাল ও অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল উপাদান
নাকের সর্দি কমায়
গলা ও শ্বাসযন্ত্র পরিষ্কার রাখে
ফুসফুসের প্রদাহ কমায়
ভাইরাস প্রতিরোধে সাহায্য করে
দুধে কয়েকটি তুলসীপাতা ফুটিয়ে খেলে শ্বাসযন্ত্র শক্তিশালী হয়।
গোল্ডেন মিল্ক বা হলুদ-দুধের প্রচলন বহু পুরনো। আধুনিক গবেষণা আরও বলে—এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে অসাধারণ।
হলুদের কুরকুমিন—এক শক্তিশালী প্রদাহনাশক।
এটি—
ভাইরাস দমন করে
ব্যথা কমায়
হজম ভালো করে
শরীরকে ভিতর থেকে উষ্ণ রাখে
গোলমরিচের পাইপেরিন কুরকুমিনের শোষণ ২,০০০% বাড়িয়ে দেয়।
আদা—
অ্যান্টিভাইরাল
অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল
অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি
গলাব্যথা কমাতে কার্যকর
শ্বাসযন্ত্র পরিষ্কার রাখে
ফুসফুসে জমা সর্দি কমায়
সংক্রমণ প্রতিরোধ করে
শরীরকে শীতের সঙ্গে লড়তে সাহায্য করে
ফলে এটি শীতে ইমিউনিটি বুস্টারের মতো কাজ করে।
ঘুম ইমিউনিটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ট্রিপটোফ্যান যুক্ত দুধ ও স্নায়ুশিথিলকারী মসলা মিলে ঘুম ভাল হয়।
রাতে মস্তিষ্ক ও শরীর মেরামতির কাজ করে। দুধের পুষ্টিগুণ সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
শরীর রাতভর খাবার হজম করে, পুষ্টি শোষণ করে—ফলে ইমিউনিটি শক্তিশালী হয়।
রাতে সর্দি বাড়ে। উষ্ণ দুধ ও মসলার সংমিশ্রণ সেটি নিয়ন্ত্রণ করে।
১ কাপ দুধ
২–৩টি জাফরান
ফুটিয়ে গরম গরম পান করুন
দুধ ঈষদুষ্ণ হলে তবেই মধু মেশান
ফুটন্ত দুধে মধু দেবেন না
৪–৫টি ভেজানো বাদাম বেটে দুধে দিন
দুধে ৩–৪টি তুলসীপাতা দিয়ে ফুটিয়ে নিন
দুধ
আধ চা চামচ হলুদ
এক চিমটে গোলমরিচ
সামান্য আদা
শীতে রোগের প্রকোপ বাড়লেও প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় ছোট ছোট পরিবর্তন আনা গেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে ঘুমের আগে এক কাপ দুধে জাফরান, হলুদ, আদা, মধু, বাদাম বা তুলসীপাতার মতো চেনা উপকরণ মিশিয়ে খেলে শরীরে উষ্ণতা বাড়ে, শ্বাসযন্ত্র সুস্থ থাকে, হজমশক্তি উন্নত হয় এবং ঘুমের মান বাড়ে—যা সম্মিলিতভাবে ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে।
শীতে সুস্থ থাকতে হলে খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি এই ধরনের প্রাকৃতিক টোটকাও বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। শরীরকে ভিতর থেকে শক্তিশালী রাখতে নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত জলপান এবং ভিটামিন-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়াও সমান জরুরি। বিশেষ করে ভিটামিন সি, জিঙ্ক, প্রোটিন এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টসমৃদ্ধ খাবার শীতকালে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে শীতের সময় অনেকেই অলস হয়ে পড়েন, ফলে প্রতিদিন অন্তত ২০–৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করাও অত্যন্ত উপকারী। বাইরে থেকে ঠান্ডা লাগা রোধ করতে পর্যাপ্ত পোশাক পরা, ধুলো–ধোঁয়া থেকে দূরে থাকা এবং স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ করাও প্রয়োজন। এসব মিলিয়ে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ঘরোয়া উপায়ে ইমিউনিটি বাড়ালে শীতের সময় অসুখবিসুখ অনেকটাই দূরে রাখা যায়।