ভারত ও রাশিয়ার ২৩তম বার্ষিক শিখর বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে মোট ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, অর্থনীতি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসব ক্ষেত্রেই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এই বৈঠকে প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, যুদ্ধ সরঞ্জাম সার্ভিসিং হাব, এবং সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশ ঘোষণা করেছে ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দেওয়া হবে।
ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ক আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অক্ষ। দুই দেশের দীর্ঘকালীন কৌশলগত অংশীদারিত্ব বহু পর্যায় অতিক্রম করেছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভৌগোলিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও এই সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে স্থিতিশীল থেকেছে। এই প্রেক্ষাপটে সদ্য সমাপ্ত ভারত–রাশিয়া ২৩তম বার্ষিক শিখর বৈঠক দুই দেশের বন্ধুত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে ১৬টি বিস্তৃত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে—যা প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, অর্থনীতি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গভীর ও বাস্তবসম্মত নতুন দিক উন্মোচন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে হওয়া এই বৈঠক শুধু চুক্তি–স্বাক্ষরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এতে উঠে এসেছে ভবিষ্যৎ ভারত–রাশিয়া সম্পর্কের রূপরেখা, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় দু’দেশের অবস্থান এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক সহযোগিতার লক্ষ্য।
বিশ্বরাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল।
একদিকে রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে আছে, অন্যদিকে ভারত জিও–পলিটিক্সে একটি স্বাধীন ও বহু–মেরু (Multipolar) কৌশল অনুসরণ করছে। এই সময় দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে।
ভারত যেমন রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সহযোগিতায় দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বজায় রেখেছে, তেমনই রাশিয়া ভারতের বাজার, প্রযুক্তি–সহযোগিতা, ফার্মা–উৎপাদন, IT, শিক্ষা ও শ্রমশক্তিকে অত্যন্ত মূল্যায়ন করে।
এই বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশ—
তাদের পুরনো কৌশলগত সম্পর্ককে পুনর্গঠিত করছে
নতুন প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং স্বাস্থ্য–সুরক্ষায় ভরসা বাড়াচ্ছে
বৈশ্বিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথ নীতি তৈরির প্রচেষ্টা দেখাচ্ছে
The Hindu–র মতে, “১৬টি চুক্তির স্বাক্ষর ভবিষ্যৎ দশকে ভারত–রাশিয়া সম্পর্ককে নতুন স্তরে নিয়ে যাবে।”
বৈঠকে স্বাক্ষরিত মোট ১৬টি চুক্তি ৭টি প্রধান খাতে বিভক্ত:
– যৌথ উৎপাদন
– প্রযুক্তি স্থানান্তর
– প্রতিরক্ষা সামগ্রী সার্ভিসিং ও রিপেয়ার হাব
– যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন ও সাইবার নিরাপত্তায় সহযোগিতা
– দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার রোডম্যাপ
– রুপি–রুবেল বাণিজ্য ব্যবস্থার উন্নতি
– ডিজিটাল পেমেন্ট–এ সহযোগিতা
– ই–কমার্স, লজিস্টিকস, মেরিটাইম করিডর উন্নয়ন
– তেল, গ্যাস ও পারমাণবিক জ্বালানি খাতে নতুন চুক্তি
– দূর–উত্তর অঞ্চলে (Arctic) জ্বালানি অনুসন্ধান
– যৌথ ভ্যাকসিন উন্নয়ন
– হাসপাতাল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অংশীদারিত্ব
– মেডিক্যাল প্রযুক্তি স্থানান্তর
– বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে MoU
– ছাত্র–বিনিময় কর্মসূচি
– কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ বিজ্ঞান, পরমাণু গবেষণায় যৌথ গবেষণা
– ৩০ দিনের ই–ভিসা সুবিধা
– গ্রুপ ট্যুরিজম সহজীকরণ
– চলচ্চিত্র সহযোগিতা
– বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থায় যৌথ অবস্থান
– সন্ত্রাসবাদ দমন
– দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরেশিয়া অঞ্চলে শান্তি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি
ভারত–রাশিয়ার সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল প্রতিরক্ষা খাত।
বর্তমানে ভারতের ৬৫%–এর বেশি সামরিক সরঞ্জাম রাশিয়া থেকে আসে।
এই শীর্ষ বৈঠকে তিনটি বড় কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—
ভারত ও রাশিয়া একসঙ্গে আরও বেশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করবে।
এর মাধ্যমে—
Make in India ত্বরান্বিত হবে
আমদানি–নির্ভরতা কমবে
প্রযুক্তি দেশীয় শিল্পে ছড়িয়ে পড়বে
রাশিয়া ভারতকে শুধু সরঞ্জাম দেবে না, বরং প্রযুক্তিও দেবে।
রাশিয়া ভারতের ভেতরে কয়েকটি সার্ভিসিং হাব স্থাপন করবে, যাতে সেনাবাহিনীর যন্ত্রপাতির মেরামত দ্রুত হয়।
ভারত–রাশিয়ার বার্ষিক শিখর বৈঠক বহু বছর ধরে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম মঞ্চ। এই বছর স্বাক্ষরিত ১৬টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মধ্যে বাণিজ্য, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জ্বালানি ক্ষেত্র বিশেষভাবে সময়োপযোগী। The Hindu তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে—এই বৈঠক দুই দেশের নেতৃত্বকে শুধু নতুন চুক্তি স্বাক্ষরেই নয়, বরং ভবিষ্যতের যৌথ উচ্চাভিলাষের দিকে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
বর্তমানে ভারত–রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ৬৫–৭০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করে।
বিশেষ করে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রপ্তানি–সহযোগী হয়ে ওঠে।
এই বৈঠকে দুই দেশ ঘোষণা করেছে—
এর অন্তর্গত উদ্যোগগুলো—
ডলার–নির্ভরতা কমিয়ে local currency trade–এর ওপর জোর দেওয়া হবে।
এতে আমদানি–রপ্তানি ব্যয় কমবে এবং নিষেধাজ্ঞার চাপ কমবে।
UPI–র মতো ভারতীয় সিস্টেম এবং রাশিয়ার Mir Payment System–এর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা হবে।
Russia–India Maritime Corridor ও Vladivostok–Chennai Sea Route দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়িত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে—
“ভারত–রাশিয়া বাণিজ্য সম্পর্ক এখন এক নতুন রূপ নিচ্ছে—যা ভবিষ্যতে ইউরেশিয়ান অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে ভারতের অবস্থানকে শক্ত করবে।”
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ।
রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক।
এই কারণে জ্বালানি সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
রাশিয়ার Arctic LNG Projects–এ ভারত বিনিয়োগ বাড়াবে।
রাশিয়ার Eastern Siberia থেকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হবে।
কুদানকুলাম নিউক্লিয়ার প্রকল্পের অতিরিক্ত ইউনিট দ্রুত সম্পন্ন হবে।
নতুন পারমাণবিক যৌথ উদ্যোগ পরিকল্পনা করা হয়েছে।
“জ্বালানি সহযোগিতাই ভারত–রাশিয়া সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি।”
ভারত ও রাশিয়া উভয় দেশই স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং মেডিক্যাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে শক্তিশালী।
চুক্তিগুলির মধ্যে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ—
নতুন প্রজন্মের ভ্যাকসিন উৎপাদনে দুই দেশ গবেষণা করবে।
প্রাইভেট ও সরকারি হাসপাতালগুলির মধ্যে সিস্টার–হাসপাতাল MoU স্বাক্ষরিত হয়েছে।
ডায়াগনস্টিক যন্ত্র, রোবোটিক সার্জারি ও পাবলিক হেলথ ডেটা ম্যানেজমেন্টে সহযোগিতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে—
“ভারত–রাশিয়া স্বাস্থ্য চুক্তি শুধু কূটনৈতিক সাফল্য নয়; এটি দুই দেশের মানুষের জীবনে বাস্তব প্রভাব ফেলবে।”
শিক্ষা ও বিজ্ঞান গবেষণায় ভারত ও রাশিয়ার দীর্ঘ সহযোগিতার ইতিহাস রয়েছে।
এই বৈঠকে স্বাক্ষরিত শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলির মধ্যে রয়েছে—
IIT, IISc এবং শীর্ষ রাশিয়ান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে যৌথ গবেষণা।
STEM subjects–এ যৌথ ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু হবে।
রাশিয়া মহাকাশ প্রযুক্তিতে ভারতের অন্যতম পুরনো অংশীদার।
গগনযান–এর পরবর্তী ধাপেও যৌথ কাজের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—
গ্রুপ ট্যুরিজম আরও সহজ হবে।
দুই দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যৌথভাবে সিনেমা তৈরি করতে পারবে।
উৎসব, প্রদর্শনী, সংগীত, নাচ, পেইন্টিং—সব ক্ষেত্রেই নতুন অংশীদারিত্ব।
ভারত ও রাশিয়া উভয়ই বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় "স্বাধীন ও বহুমেরু রাজনীতি" সমর্থন করে।
এই বৈঠকে দুই নেতা জোর দিয়েছেন—