আইনি জটিলতায় আর ভয় নেই। সাধারণ মানুষকে আইনি সহায়তা ও পরামর্শ দিতে ভারত সরকার চালু করল বিশেষ চ্যাটবট 'ন্যায় সেতু'। এখন থেকে আইনি প্রাথমিক ধারণা ও সাহায্য পাওয়া যাবে খুব সহজেই, সরাসরি আপনার হোয়াটসঅ্যাপে। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ কীভাবে গ্রামীণ ও সাধারণ মানুষের জীবনে বিচার ব্যবস্থাকে সহজ করে তুলবে, জানুন তার বিস্তারিত।
আপনার অনুরোধ অনুযায়ী, পুরো প্রতিবেদনটি সাধারণ অনুচ্ছেদ আকারে (কোনো বিশেষ চিহ্ন বা ফরম্যাটিং ছাড়া) নিচে দেওয়া হলো:
আইনি সাহায্য এবার হাতের মুঠোয়, চালু হলো বিশেষ হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটবট ন্যায় সেতু
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ভারত যখন ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্নে বিভোর, তখন সেই ডিজিটাল বিপ্লবের ঢেউ এবার আছড়ে পড়ল দেশের বিচার ব্যবস্থাতেও। প্রযুক্তির হাত ধরে জনজীবনকে আরও সহজ ও সাবলীল করার লক্ষ্যে ভারত সরকার এক বিশাল ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সাধারণ মানুষকে আইনি সহায়তা এবং পরামর্শ প্রদানের উদ্দেশ্যে বিচার বিভাগ চালু করেছে ন্যায় সেতু (Nyaya Setu) নামক একটি বিশেষ হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটবট। আমাদের দেশে আজও কোটি কোটি মানুষ বিচার ব্যবস্থার জটিলতাকে ভয় পান। আদালত, উকিল, মামলার খরচ এই শব্দগুলো শুনলেই সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। কিন্তু সেই ভয়কে জয় করতেই এবার আপনার স্মার্টফোনটি হয়ে উঠবে আপনার আইনি পরামর্শদাতা। হোয়াটসঅ্যাপের মতো জনপ্রিয় ও সহজলভ্য মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে সরকার বিচার ব্যবস্থাকে নিয়ে এসেছে আমজনতার ড্রয়িংরুমে।
ভারতবর্ষে আইনি পরিকাঠামো নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বেশ কিছু ভুল ধারণা ও ভীতি কাজ করে। প্রধানত ভাষার বাধা, খরচ ও সময়ের অভাব এবং দূরত্বের কারণে মানুষ আইনি সাহায্য নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। আইনের কঠিন পরিভাষা বা উকিলের ফিস দেওয়া অনেকের সাধ্যের বাইরে থাকে। এই সমস্যাগুলোর সমাধানেই ন্যায় সেতুর আবির্ভাব। বিচার বিভাগ এই চ্যাটবটটি এমনভাবে তৈরি করেছে যা বিচার পাওয়ার সহজতাকে নিশ্চিত করে। ন্যায় সেতু হলো একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটবট। এটি ভারত সরকারের বিচার বিভাগের একটি উদ্যোগ, যা সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে আইনি তথ্য ও পরামর্শ প্রদান করে। এটি ২৪ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৭ দিনই খোলা থাকে।
এই চ্যাটবটটি ব্যবহার করার জন্য নাগরিকদের তাদের ফোনে একটি নির্দিষ্ট নম্বর সেভ করতে হয়। নম্বরটি হলো ৭২১৭৭১১৮১৪ (7217711814)। এই নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে Hi লিখে পাঠালেই চ্যাটবটটি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ব্যবহারকারীর সাথে কথোপকথন শুরু করে। এই চ্যাটবটটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে ব্যবহারকারীরা খুব সহজেই তাদের আইনি সমস্যা বা প্রশ্ন সম্পর্কে জানতে পারেন। এখানে আইনি জটিলতা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে মুহূর্তের মধ্যে। এটি কেবল ইংরেজিতে নয়, ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষাতেও কাজ করার ক্ষমতা রাখে। এই চ্যাটবটটি দেওয়ানি, ফৌজদারি, পারিবারিক এবং কর্পোরেট আইন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রয়োজনে এটি ব্যবহারকারীকে টেলি-ল পরিষেবার মাধ্যমে প্যানেলভুক্ত আইনজীবীদের সাথে যুক্ত করে দেয়। অর্থাৎ, আপনি ঘরে বসেই অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিচার ব্যবস্থার এই আধুনিকীকরণের পথে ন্যায় সেতু কেবল একটি বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, এর পেছনে রয়েছে এক বৃহত্তর পরিকল্পনা। সুপ্রিম কোর্ট এবং বিচার বিভাগ গত কয়েক বছর ধরেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে সুবাস (SUVAS) এবং সুপেস (SUPACE)-এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ব্যবস্থা আদালতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা হাজার হাজার পাতার নথিপত্র চোখের নিমেষে অনুবাদ করতে পারে বা মামলার জট ছাড়াতে সাহায্য করে। ন্যায় সেতু সেই পরিকল্পনারই এক জনমুখী রূপ। এত দিন প্রযুক্তি কেবল বিচারক ও আইনজীবীদের সুবিধার্থে ব্যবহৃত হতো, কিন্তু এবার তা সরাসরি সাধারণ মানুষের কাজে লাগছে। এটি প্রমাণ করে যে প্রযুক্তি কেবল মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য নয়, বরং তা সবার জন্য।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে এই প্রযুক্তি কি আইনজীবীদের পেশায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি একেবারেই উল্টো। বরং এটি আইনজীবীদের কাজকে আরও সহজ ও মসৃণ করবে। প্রতিদিন আইনজীবীদের কাছে অসংখ্য তুচ্ছ বা সাধারণ প্রশ্ন আসে, যার উত্তর দিতে তাদের অনেকটা সময় ব্যয় হয়। চ্যাটবট যদি সেই প্রাথমিক উত্তরগুলো দিয়ে দেয়, তবে আইনজীবীরা জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন। এটি বিচার ব্যবস্থার সামগ্রিক গুণমান বাড়াতে সাহায্য করবে এবং মামলা নিষ্পত্তির হার ত্বরান্বিত করবে।
এছাড়াও, ভারতের মতো বিশাল দেশে যেখানে ইন্টারনেটের গতি সব জায়গায় সমান নয়, সেখানে হোয়াটসঅ্যাপের মতো কম ডেটা খরচ হওয়া অ্যাপ বেছে নেওয়াটা অত্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছে। তবে যাদের স্মার্টফোন নেই বা যারা প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বছন্দ নন, তাদের কথাও ভাবা হয়েছে। গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে থাকা কমন সার্ভিস সেন্টার বা সিএসসি-গুলোর মাধ্যমেও মানুষ এই সুবিধা নিতে পারবেন। সেখানে থাকা গ্রামীণ উদ্যোক্তারা সাধারণ মানুষকে তাদের প্রশ্ন টাইপ করে পাঠাতে এবং উত্তর বুঝিয়ে দিতে সাহায্য করবেন। এর ফলে প্রযুক্তির সুফল একদম শেষ প্রান্তের মানুষের কাছেও পৌঁছাবে, যাকে আমরা লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি বলে থাকি।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই উদ্যোগের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি দেশের উন্নয়নের সাথে তার বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও গতি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বিশ্ব ব্যাংকের ইজ অফ ডুইং বিজনেস সূচকে ভারতের অবস্থান আরও ভালো করার জন্য আইনি জটিলতা কমানো জরুরি। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা অনেক সময় আইনি ভয়ে ব্যবসা বাড়াতে চান না বা নতুন কোনো পদক্ষেপে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। হাতের মুঠোয় আইনি পরামর্শ থাকলে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। তারা জানবেন যে কোনো আইনি সমস্যায় পড়লে সমাধান হাতের কাছেই আছে। এটি দেশের অর্থনীতিতে এক ইতিবাচক গতি আনবে এবং নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণে মানুষকে উৎসাহিত করবে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই চ্যাটবটটি একদিন হয়তো সম্পূর্ণ ভয়েস কমান্ড বা মৌখিক নির্দেশেই কাজ করবে। তখন টাইপ করার প্রয়োজনও হবে না। শুধু মুখে প্রশ্ন বললেই উত্তর শোনা যাবে। এটি নিরক্ষর মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াবে। সরকার ইতিমধ্যেই ভাষিনী (Bhashini) প্রকল্পের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম অনুবাদের কাজ করছে, যা ন্যায় সেতুর সাথে যুক্ত হলে ভাষার ব্যবধান পুরোপুরি মুছে যাবে। তখন একজন তামিল ভাষী আইনজীবী সহজেই একজন বাংলা ভাষী মক্কেলের আইনি সমস্যার সমাধান করতে পারবেন প্রযুক্তির সহায়তায়।
কল্পনা করুন একজন কলেজ ছাত্রীর কথা, যে অনলাইনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যারেসমেন্টের শিকার হচ্ছে কিন্তু বুঝতে পারছে না এটি সাইবার ক্রাইমের আওতায় পড়ে কি না বা পুলিশের কাছে কীভাবে অভিযোগ করতে হয়। সে ন্যায় সেতুর মাধ্যমে নিজের পরিচয় গোপন রেখেই জেনে নিতে পারে তার করণীয় কী। অথবা একজন বৃদ্ধ পেনশনভোগী, যার টাকা আটকে আছে দপ্তরের গাফিলতিতে। তিনি কার কাছে অভিযোগ করবেন বা কনজিউমার ফোরামে যাবেন কি না, তা জানতে এই চ্যাটবট ব্যবহার করতে পারেন। এই ছোট ছোট সমাধানগুলোই মানুষের জীবনে বড় স্বস্তি নিয়ে আসে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনে।
পরিশেষে, ন্যায় সেতু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আইন কোনো ভয়ের বস্তু নয়, বরং এটি একটি সামাজিক চুক্তি যা আমাদের জীবনকে সুরক্ষিত রাখে। প্রযুক্তির হাত ধরে সেই সুরক্ষা যখন সহজলভ্য হয়, তখন গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়। আজকের এই ডিজিটাল পদক্ষেপ আগামী প্রজন্মের জন্য এক সুস্থ, সুন্দর ও ন্যায়পরায়ণ সমাজ গড়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করল। আমরা আশা করতে পারি, খুব শীঘ্রই ভারতের প্রতিটি নাগরিক, সে ধনী হোক বা দরিদ্র, ন্যায়বিচারের সমান সুযোগ পাবে এবং সংবিধান প্রদত্ত অধিকারগুলো পূর্ণাঙ্গরূপে উপভোগ করতে পারবে।
ন্যায় সেতু ব্যবহার করা অত্যন্ত সহজ। প্রথমে আপনার মোবাইলে ৭২১৭৭১১৮১৪ নম্বরটি সেভ করতে হবে। এরপর হোয়াটসঅ্যাপ খুলে ওই নম্বরে একটি Hi বা Namaste লিখে পাঠাতে হবে। চ্যাটবটটি আপনাকে স্বাগত জানাবে এবং আপনার পছন্দের ভাষা নির্বাচন করতে বলবে। এরপর আপনি কোন বিষয়ে জানতে চান তা মেনু থেকে নির্বাচন করবেন। সবশেষে আপনার প্রশ্নটি লিখলে বা অডিও মেসেজ পাঠালে চ্যাটবট আপনাকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে এবং বিচার ব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ভারতের মতো দেশে, যেখানে আজও জনসংখ্যার একটি বড় অংশ গ্রামে বাস করে, সেখানে ন্যায় সেতু এক বিপ্লব ঘটাতে পারে। এখন গ্রামের একজন কৃষক বা শহরের কোনো গৃহবধূ সহজেই তাদের আইনি অধিকার সম্পর্কে জানতে পারবেন।
আইনি পরামর্শের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই চ্যাটবটটি ব্যবহারকারীদের তথ্যের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। হোয়াটসঅ্যাপের এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন প্রযুক্তি এখানেও কার্যকর থাকবে। ন্যায় সেতুর সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে আমাদের সমাজের নারীদের ওপর। অনেক নারী পারিবারিক সহিংসতা বা কর্মক্ষেত্রে হেনস্থার শিকার হয়েও আইনি প্রক্রিয়া না জানার কারণে চুপ থাকেন। এই চ্যাটবটটি তাদের জন্য এক নীরব রক্ষাকবচ হতে পারে। একজন নারী এখন ঘরের কোণে বসেই জানতে পারবেন পারিবারিক হিংসা প্রতিরোধ আইন সম্পর্কে এবং কীভাবে নিজের নাম গোপন রেখে আইনি সাহায্য চাওয়া যায়।
কেবল সমস্যার সমাধান নয়, এই উদ্যোগের একটি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হলো আইনি সাক্ষরতা বৃদ্ধি করা। ন্যায় সেতু মানুষের আইনি জ্ঞানের অভাব দূর করতে পারে। এটি কেবল বিপদে পড়লে ব্যবহার করার টুল নয়, বরং অবসর সময়েও কেউ চাইলে এটি ব্যবহার করে ভারতের সংবিধান ও সাধারণ আইনকানুন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারেন। শহরের কর্পোরেট অফিস থেকে শুরু করে গ্রামের ছোট ব্যবসায়ী সবারই আইনের প্রয়োজন হয়। নতুন স্টার্টআপ বা ব্যবসায়ীদের জন্য জিএসটি বা ট্রেড লাইসেন্স বোঝা বেশ কঠিন, যা এই চ্যাটবট সহজ করে দিতে পারে। অন্যদিকে, আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্যও এটি আশার আলো হিসেবে কাজ করবে।
পরিশেষে বলা যায়, ন্যায় সেতু কেবল একটি সফটওয়্যার নয়, এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে বিশ্বাস পুনঃস্থাপনের একটি মাধ্যম। বিচার ব্যবস্থা যে কেবল ধনীদের জন্য নয়, বরং তা যে প্রতিটি ভারতীয়র অধিকার এই বার্তাটিই প্রযুক্তির মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার এই নতুন অধ্যায় যদি সফল হয়, তবে আমরা এমন এক ভারতের সাক্ষী থাকব যেখানে বিচারপ্রার্থীকে আর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হবে না, বরং ন্যায়বিচার নিজেই পৌঁছে যাবে তার হাতের মুঠোয়।