ছবি, প্রচার, আর বিজ্ঞাপনের শুটিং সব মিলিয়ে ব্যস্ততায় ডুবে রুক্মিণী মৈত্র। নতুন ছবির চরিত্রের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের কোনও মিল আছে কি না, তা নিয়েই খোলাখুলি জানালেন অভিনেত্রী
ছোটবেলা থেকেই মুম্বই শহরের সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত এক টান। বহু মানুষের কাছে মুম্বই মানেই স্বপ্নের শহর, কারও কাছে কর্মব্যস্ত জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, আবার অনেকের কাছে বলিউডের চকচকে দুনিয়া। কিন্তু রুক্মিণী মৈত্রের কাছে এই শহরটা ছিল খুব ব্যক্তিগত, খুব আপন, অনেক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি দূরদেশ। সেই মুম্বই–প্রেমের শুরু হয় অনেক ছোট বেলায়, যখন বাবা তাঁকে বলতেন—পরীক্ষায় ভাল ফল করলে মুম্বই নিয়ে যাবেন, তাঁর পছন্দের খেলনা বা পোশাক কিনে দেবেন। সেই প্রতিশ্রুতি ছোট রুক্মিণীর কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার। তাই ছোট থেকেই তাঁর মনে মুম্বই মানেই জয়ের শহর—যে শহরে যাওয়ার অনুমতি মিলত শুধু সাফল্যের মাধ্যমে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই শহরটাই আজ তাঁর কর্মজীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজের সূত্রে, শুটিংয়ের প্রয়োজনেই হোক বা ব্র্যান্ড শুট—মুম্বই এখন তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি। অনুরাগীদের অভিযোগ যে তিনি কলকাতায় কম দেখা দেন, সেটাও তাই খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি কলকাতাতেই—কারণ মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে তাঁর নতুন ছবি ‘হাঁটি হাঁটি পা পা’, যা বাবা–মেয়ের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি। ছবির প্রচারে ব্যস্ত রুক্মিণীর মনে তাই বারবার ফিরে আসছে নিজের বাবার স্মৃতি।
২০১৭ সালে বাবাকে হারিয়েছেন অভিনেত্রী। সেই শোক যে কত গভীর, তা প্রকাশ করা যায় না কথায়। বাবা শুধু অভিভাবক ছিলেন না, ছিলেন তাঁর প্রথম বন্ধু, প্রথম উৎসাহদাতা। যখন পরীক্ষার ফল ভাল হত, বাবা বলতেন—“চলো, মুম্বই যাই।” সেই কথায় যে কী আনন্দ হত ছোট্ট রুক্মিণীর! মায়ের হাত ধরে স্কুল যাওয়ার পথে কিংবা ঘুমোতে যাওয়ার আগে বাবার সঙ্গে সেই মুম্বই ভ্রমণের গল্প নিয়েই চলত দীর্ঘ আলোচনা। তাই আজও যখন মুম্বই পৌঁছন, বিমানবন্দরে নামার মুহূর্তে বাবার মুখটা ভেসে ওঠে তাঁর মনে।
বর্তমানে প্রচার–ব্যস্ততার মাঝেও তিনি ভুলতে পারেন না, কী ভাবে পরিবার তাঁকে আগলে রেখেছে। বাবার মৃত্যুর পরে মা—মধুমিতা মৈত্র—দুই সন্তানকে দারুণ শক্ত হাতে সামলেছেন। মা–মেয়ের সম্পর্ক তাই আজ আরও গভীর, আরও কাটাছেঁড়া–মেশানো বন্ধুত্বের মতো। বহু সাক্ষাৎকারে রুক্মিণী নিজেই বলেছেন, মা তাঁর সেরা বন্ধু, সেরা সঙ্গী, সেরা শ্রোতা।
অর্ণব মিদ্যা পরিচালিত এই ছবি মূলত বাবা–মেয়ের সম্পর্কের সূক্ষ্ম নকশা তুলে ধরে। গল্পটি শুধু দায়িত্ব, কর্তব্য, বা প্রজন্মদ্বন্দ্বের নয়—এটি অনেক বেশি মানবিক। ছবিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে মা–বাবারাও মানুষ, তাঁদেরও অপূর্ণতা আছে, চাওয়া–পাওয়া আছে, একাকিত্ব আছে। তাঁরা কেবল অভিভাবকের স্তম্ভ নন—তাঁদেরও লাগে সঙ্গ, বোঝাপড়া, ভালবাসার হাতটা।
যে সময়ে রুক্মিণী নিজের বাবার স্মৃতি ভেবে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন, সেই সময়ে এই ছবির বিষয়বস্তু তাঁর কাছে আরও ব্যক্তিগত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি নিজেই বলেন—
“অনেক সময় আমরা ভুলে যাই—মা–বাবা হওয়ার থেকেও বড় জিনিস হলো তাঁরা মানুষ। তাঁরা সব কথা সন্তানদের বলতে পারেন না। তাঁদেরও একাকিত্ব থাকে, তাঁদেরও সঙ্গীর প্রয়োজন হতে পারে।”
ছবির টিজ়ার বেরোতেই অনেকেই তুলনা করেছেন ‘পিকু’-র সঙ্গে। বাবা–মেয়ের সম্পর্ক, দায়িত্ব, টানাপোড়েন—সব যেন মনে করিয়ে দেয় সুজিত সরকারের আইকনিক ছবিটি। তবে রুক্মিণীর মতে, তাঁদের গল্প সম্পূর্ণ আলাদা, আরও বাস্তব, আরও ঘরোয়া, আরও ভারতীয় পরিবারের প্রতিচ্ছবি।
ব্যক্তিগত জীবনে রুক্মিণী ও তাঁর মায়ের সম্পর্ক নিয়ে বরাবরই আগ্রহ থাকে অনুরাগীদের। অনেক কথা শেয়ার করেন তাঁরা, কিন্তু কিছু অনুভূতি থাকে অপ্রকাশিত। রুক্মিণীর মনে মাঝেমধ্যেই আসে সেই ভাবনা—মায়ের কি একা লাগে?
তিনি বলেন—
“আমার তো এখন কাজ আছে, বন্ধু আছে, নিজের একটা জগৎ আছে। কিন্তু মায়ের কি একা লাগে? সব কথা কি আমার সঙ্গে বলতে পারে?”
এটাই ছবির গল্পের সঙ্গে তাঁর বাস্তব জীবনের যোগসূত্র। ফলে সাংবাদিকের প্রশ্ন এলে, যদি কখনও বাস্তবে এমন পরিস্থিতি হয়—মায়ের জীবনে কোনো নতুন বন্ধু বা সঙ্গী এলে—তিনি কি মানিয়ে নিতে পারবেন?
রুক্মিণীর উত্তর খুব মানবিক, খুব বাস্তব—
“সত্যিই জানি না। ক্যামেরার সামনে অনেক কিছুই সহজ, কিন্তু বাস্তবে কেমন লাগবে বলতে পারি না। হয়তো মানিয়ে নিতে পারতাম, হয়তো সময় লাগত।”
এই স্বীকারোক্তি তাঁর পরিণত ভাবনার প্রমাণ দেয়। কোনো নাটকীয়তা নেই, নেই কৃত্রিম নিখুঁততা। আছে শুধু এক মেয়ের মন, বাবাকে হারানোর কষ্ট, মায়ের একাকিত্ব নিয়ে উদ্বেগ, আর সম্পর্ক নিয়ে স্বাভাবিক দ্বিধা।
গত কয়েক মাস ধরে সোশ্যাল মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমে বারবার উঠে এসেছে রুক্মিণীর নাম। কখনও দেবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে জল্পনা, কখনও কেন তিনি কম কাজ করছেন—এই প্রশ্নে বিরক্ত হয়েছেন অনেকে কিন্তু নায়িকা নিজের ভঙ্গিমায় সব সামলেছেন।
তিনি বলেন—
“মানুষ জানে না হয়তো—আমি কোনও দিনই খুব সোশ্যাল মিডিয়া–অ্যাকটিভ নই। তাই কাজ থাকলে তখনই দেখা যায়। কিন্তু কেন সে নিয়ে এত আলোচনা হয় জানি না।”
বছরের শুরুতে মুক্তি পাওয়া তাঁর ছবি ‘বিনোদিনী, একটি নটীর উপাখ্যান’, এবং বছরের শেষে আসছে ‘হাঁটি হাঁটি পা পা’। দুটো ছবিই জাতীয় স্তরে প্রশংসা পাচ্ছে। তাই নেতিবাচক কথা পাত্তাই দিতে চান না তিনি।
“হাজারটা ভাল কথা বলা হয়। একটি খারাপ মন্তব্যে কেন গুরুত্ব দেব? আমি মেয়ে—but বোকা মেয়ে নই।”
এই সংলাপই যেন তাঁর বর্তমান অবস্থান—আত্মবিশ্বাসী, স্থির, এবং কাজে মনোযোগী।
অনুরাগীদের চিরাচরিত প্রশ্ন—তিনি কি মুম্বইতেই এখন পাকাপাকি ভাবে থাকেন?
নায়িকার উত্তর—
“না। কাজের প্রয়োজনে যাই, আবার কলকাতায়ও আসি। আমি কোথায় থাকি সেটা জানার প্রয়োজন নেই কারও।”
ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তিনি সব সময়ই নিভৃতচারী। তাঁর একান্ত সময়টা পরিবার, বন্ধু এবং নিজের জগৎ নিয়েই কাটে। আর কাজ এলে তখনই আলোচনার কেন্দ্রে আসেন।
রুক্মিণী মৈত্র শুধু একজন অভিনেত্রী নন—তিনি এক মেয়ে, এক বন্ধু, এক দায়িত্ববান মানুষ, যাঁর জীবনে টলমল করছে বাবার স্মৃতি, মায়ের প্রতি গভীর টান, প্রেম ও সম্পর্ক নিয়ে নানা টানাপোড়েন, এবং অবশ্যই নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার লড়াই। তাঁর হাসির আড়ালে থাকে কিছু দুঃখ, কিছু অতৃপ্তি, কিছু দ্বিধা—যা তাঁকে আরও মানবিক, আরও বাস্তব করে তোলে।
‘হাঁটি হাঁটি পা পা’ শুধু তাঁর নতুন ছবি নয়—এটি যেন তাঁর নিজের জীবনের একটি অধ্যায়ও। এই ছবির মাধ্যমে তিনি যেন আবার একবার বাবার কাছে ফিরে যেতে চান, আর মায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের ভয়, উৎকণ্ঠা, ইচ্ছে ও অসম্পূর্ণতা—সবকিছুকে এক অন্য দৃষ্টিতে দেখতে চান।
ছবির প্রচারের ব্যস্ততার মধ্যেও তাই রুক্মিণীর চোখে বারবার চলে আসে স্মৃতির বিস্ফোরণ—ছোট্ট মেয়ে রুক্মিণী, পরীক্ষার শেষে বাবার হাত ধরে মুম্বই যাওয়া, বাবার সঙ্গে হাসিমুখে পছন্দের পোশাক কেনা, আর আজ—সেই স্মৃতি, সেই ভালোবাসা নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকা একজন সফল অভিনেত্রী।
সেই পুরোনো স্মৃতিগুলোই এখন যেন তাঁর শক্তির উৎস। প্রচারের ব্যস্ততা, ক্যামেরার ঝলক, মুম্বই–কলকাতা যাতায়াতের ঘূর্ণির মধ্যেও রুক্মিণী বুঝতে পারেন—বাবার অনুপস্থিতি তাঁকে যেমন ভেঙেছে, তেমনই আরও গভীর করেছে। মানুষের সম্পর্ক, একাকিত্ব, বাবা-মেয়ের নিঃশর্ত স্নেহ—সবকিছু তিনি আজ ভিন্ন দৃষ্টি দিয়ে দেখেন। তাই ‘হাঁটি হাঁটি পা পা’-র চরিত্রে প্রবেশ করার সময় তাঁর মনে হয়েছে—এই গল্পটা কেবল একটা সিনেমার গল্প নয়; এটি তাঁর নিজেরও একটা পথচলার প্রতিচ্ছবি।
রুক্মিণী বলেন, অভিনয় করতে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছিল, যদি বাবা আজ থাকতেন, এই ছবিটা দেখে কতটাই না খুশি হতেন! মেয়ের সাফল্যে তাঁর চোখ নিশ্চয়ই ভিজে উঠত। তিনি জানেন—বাস্তবের সেই স্নেহ ফিরে পাওয়া যায় না, কিন্তু শিল্পের মাধ্যমে তাকে ফিরে দেখা যায়, ছুঁয়ে দেখা যায়। তাই এই ছবি তাঁর কাছে খুব ব্যক্তিগত। যেন পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা বাবাকে আরেকবার আলিঙ্গন করার সুযোগ।
আর সেই কারণেই ছবির প্রচারে তিনি যতই ব্যস্ত থাকুন, মনটা বারবার ছুটে যায় অতীতে—সেই মানুষটার কাছে, যাঁর হাত ধরেই তাঁর প্রথম স্বপ্ন দেখা। আজ তিনি সফল, প্রতিষ্ঠিত, জনপ্রিয়—কিন্তু অন্তরে এখনও রয়ে গিয়েছে সেই মেয়েটি, যে পরীক্ষার ভাল ফলের অপেক্ষায় থাকত, আর মুম্বই যাওয়ার আনন্দে রাত জেগে পরিকল্পনা করত।