মিমি চক্রবর্তী প্রথম অভিনয় শুরু করেছিলেন গানের ওপারে এ, ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে।১৫ বছর পর পুপে স্মৃতিতে আবেগে ভেসে উঠলেন মিমি।জলপাইগুড়ি থেকে আসা ভিডিও দেখে কেঁদে ফেললেন অভিনেত্রী।ঋতুদার সঙ্গে প্রথম কাজকে স্মরণ করে মিমি বললেন, তিনি আমার প্রথম শিক্ষক।
২০১০ সালের কথা। বাংলা টেলিভিশনের জগতে তখন নতুন এক ধারাবাহিকের আগমন ঘটেছিল—স্টার জলসার “গানের ওপারে”। এই ধারাবাহিকটি অন্যধরনের গল্প এবং নতুন চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকের মনে দাগ কাটতে সক্ষম হয়েছিল। দর্শকরা ‘পুপে’ আর ‘গোরা’-র গল্পকে, তাদের সংলাপ, সাজ-আঁশুভূষা, এবং মিউজিক্যাল মোডকে আজও ভুলতে পারেননি।
এই ধারাবাহিকটি শুধু গল্পের কারণে নয়, বরং এটি নতুন প্রতিভাদের জন্যও একটি মঞ্চ ছিল। পরিচালনা করেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ—যিনি নিজের স্বকীয় ধারায় গল্প বলার জন্য সুপরিচিত। এবং ঠিক এই ধারাবাহিকের মাধ্যমেই প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান আজকের জনপ্রিয় অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তী। তখন মিমির বয়স ছিল মাত্র ২০ বা ২১। অভিনয় জগতে তিনি তখন একেবারেই নতুন, কিন্তু ক্যামেরার সামনে তাঁর সাবলীলতা এবং স্বাভাবিক অভিনয় সবাইকে মুগ্ধ করেছিল।
মিমি চক্রবর্তী সম্প্রতি এই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেছেন, “আমি সত্যিই সৌভাগ্যবান যে ঋতুদার মতো একজন পরিচালকের সঙ্গে আমার প্রথম কাজের সুযোগ হয়েছিল। ওঁই আমার প্রথম শিক্ষক। ওঁর নির্দেশনায় শিখেছি যে ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিক থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।”
‘গানের ওপারে’ তখনকার বাংলা টেলিভিশনের জন্য এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। ধারাবাহিকের গল্প, চরিত্রের গভীরতা এবং সংলাপের সরল অথচ প্রাঞ্জল উপস্থাপনা দর্শকদের মনোরমভাবে আকর্ষণ করেছিল। পুপে এবং গোরা-র সম্পর্ক, তাদের জীবনের ছোট-বড় মুহূর্ত, সব কিছুই ধারাবাহিকটিকে এক চিরস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে গড়ে তুলেছিল।
মিমি বলেছিলেন, “আমি তখন সবকিছু নতুনভাবে অনুভব করছিলাম। প্রথম শটের আগেই নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত করতে চাইছিলাম। অভিনয়ের যে আনন্দ এবং ভয় একসাথে আসে, তা আমার কাছে তখন নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু ঋতুদা সবসময় আমাকে আশ্বস্ত করতেন এবং প্রয়োজন হলে ধৈর্য ধরে রিহার্সাল করাতেন।”
ধারাবাহিকের জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু মিউজিকাল দিকটাই নয়, বরং সেটের পরিবেশ এবং পরিচালকের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গিও একটি বড় ভূমিকা রেখেছিল। পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন কেবল গল্প বলার জন্য নয়, বরং নতুন অভিনেতাদের গড়ে তোলার জন্যও অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ। তিনি প্রতিটি অভিনেতাকে তাদের চরিত্রের সঙ্গে আত্মসাৎ করার সুযোগ দিতেন এবং তাদের অভিনয়কে প্রাকৃতিকভাবে পরিণত করার চেষ্টা করতেন।
সম্প্রতি জলপাইগুড়ি থেকে মিমির এক বোন তাঁকে একটি বিশেষ ভিডিও পাঠিয়েছেন। ভিডিওটি ছিল ‘গানের ওপারে’-র পুপে লুকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ‘আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী’-র সংযোজন। ভিডিওটি দেখে মিমি আবেগে ভেসে গিয়েছিলেন এবং তিনি লিখেছিলেন, “বিশ্বাস করুন, কেঁদে ফেলেছিলাম। মিস ইউ ঋতুদা। আমি জানি, তুমি দেখছ।”
এই মুহূর্তটি প্রমাণ করে যে ‘গানের ওপারে’ শুধুমাত্র একটি টেলিভিশন ধারাবাহিক নয়, বরং এটি মিমি চক্রবর্তীর জীবনেও একটি চিরস্থায়ী ছাপ রেখেছে। অভিনেত্রী বলেন, “আমি এখনও মনে করি, আমার অভিনয় যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আমি ঋতুদা থেকে পেয়েছি। তাঁর ধৈর্য, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, এবং ক্যামেরার সামনে প্রাকৃতিক থাকার উপায়—সবকিছুই আজও আমার সঙ্গে রয়েছে।”
মিমি চক্রবর্তীর ক্যারিয়ারের শুরু ‘গানের ওপারে’ থেকে হলেও, পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রে নিজের স্থায়ী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন। প্রথম অভিজ্ঞতার প্রভাব তাকে ধারাবাহিকভাবে শিখতে এবং নতুন চরিত্রে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ দেয়।
মিমি বলেন, “প্রথম কাজটা সবসময় বিশেষ। কারণ তখন তুমি এখনও কিছু জানো না, কিন্তু শেখার আগ্রহ, উত্তেজনা এবং ভয়—সব কিছু একসাথে থাকে। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে পরবর্তী বছরগুলোতে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। এখন আমি যখন নতুন চরিত্রে অভিনয় করি, তখনও মনে হয় ঋতুদার শিখানো প্রতিটি জিনিস আমাকে সাহায্য করছে।”
‘গানের ওপারে’ শুধুমাত্র মিমির জন্য নয়, দর্শকদের জন্যও বিশেষ। ধারাবাহিকের গল্প, গান এবং চরিত্র আজও অনেকের মনে একটি স্মরণীয় জায়গা ধরে রেখেছে। মিমি বলেন, “প্রতিটি বার যখন কেউ আমার কাছে এই ধারাবাহিকের কথা উল্লেখ করে, তখন মনে হয় যেন সময় ফিরে এসেছে। এটি আমার কাছে শুধুমাত্র একটি পেশাদার অভিজ্ঞতা নয়, বরং এক আবেগঘন স্মৃতি।”
মিমির জন্য ঋতুপর্ণ ঘোষ শুধুমাত্র পরিচালক ছিলেন না, বরং একজন গুরু এবং মেন্টর। মিমি বলেন, “তিনি আমাদের কেবল অভিনয় শেখাতেন না, বরং জীবন এবং পেশাদারিত্বের দিকেও দৃষ্টি দিতেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, কখনো হোঁচট খেলে লজ্জা পেতে নয়, বরং তা থেকে শেখার চেষ্টা করতে হবে।”
মিমি চক্রবর্তীর কথায়, ঋতুদা ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যিনি নতুন অভিনেতাদের ভয়কে আশা এবং সুযোগে পরিণত করতে জানতেন। তাঁর নির্দেশনা ছিল প্রায়শই সরল, কিন্তু গভীরভাবে প্রভাবশালী।
১৫ বছর পরও সেই প্রথম অভিজ্ঞতার স্মৃতি মিমির মনে জীবন্ত। ছোট ছোট মুহূর্তগুলো—প্রথম শটের উত্তেজনা, সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক, এবং ক্যামেরার সামনে নিজের প্রকাশ—সবই এখনও তাঁকে স্পর্শ করে। ভিডিওটি দেখার সময় মিমি কেঁদে ফেলেছিলেন—এটি শুধু অতীতকে স্মরণ করার আবেগ নয়, বরং সেই সময়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
“আমি জানি ঋতুদা আমাদের দেখছেন,” মিমি লিখেছেন। এটি প্রমাণ করে যে পরিচালক এবং তাঁর ছাত্রদের মধ্যে যে সংযোগ তৈরি হয়, তা কেবল পেশাগত নয়, বরং আবেগঘন ও চিরস্থায়ী।
‘গানের ওপারে’ এবং ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে প্রথম কাজ মিমি চক্রবর্তীর জীবন ও ক্যারিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে থাকবে। শুধুমাত্র প্রথম অভিজ্ঞতার জন্য নয়, বরং সেই সময়ের শেখানো মূল্যবোধ, সহানুভূতি, এবং প্রফেশনাল আচরণ তাঁকে আজকের সফল অভিনেত্রী হিসেবে গড়ে তুলেছে।
মিমি চক্রবর্তীর আবেগঘন স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রারম্ভিক অভিজ্ঞতা কেবল একটি যাত্রার শুরু নয়, বরং তা জীবনের একটি চিরন্তন অংশ হয়ে থাকে। দর্শক, সহকর্মী এবং পরিচালক—সবাই মিলে একটি স্মরণীয় অধ্যায় সৃষ্টি করেন, যা সময়ের পরিপ্রেক্ষিতেও অবিস্মরণীয় থাকে।
আজ, মিমি চক্রবর্তীর চোখে সেই ছোট্টো ২০ বছরের মেয়ে এখনও জীবন্ত—উত্তেজিত, ভয়াভীত, কিন্তু স্বপ্নে ভরা। এবং দর্শকের মনে সেই ‘পুপে’ চরিত্রও এখনও জ্বলজ্বলে রয়ে গেছে।