Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বিজেপি আসার পর এসপ্ল্যানেডের বদলে যাওয়া ছবি কার্যত ফাঁকা চত্বর ঘিরে জোর চর্চা

একসময়ের ভিড়ে ঠাসা এসপ্ল্যানেড এলাকায় এখন অনেকটাই ফাঁকা দৃশ্য। প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও উচ্ছেদ অভিযানের পর বদলে গেছে শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকার চেহারা।

political developments

বিজেপি আসার পর এসপ্ল্যানেডের বদলে যাওয়া ছবি, ফাঁকা চত্বর ঘিরে শুরু জোর আলোচনা

কলকাতার প্রাণকেন্দ্র বলা হয় এসপ্ল্যানেডকে। শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা হিসেবে বহু বছর ধরে পরিচিত এই অঞ্চল প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত, ব্যবসা, বাস পরিষেবা, ফুটপাতের দোকান, হকারদের ভিড় এবং রাজনৈতিক জমায়েতের সাক্ষী থেকেছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের ঢল, যানজট, দোকানপাটের কোলাহল এবং অবিরাম ব্যস্ততাই ছিল এসপ্ল্যানেডের পরিচিত ছবি। কিন্তু সম্প্রতি সেই চেনা ছবিতে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রশাসনিক কড়াকড়ি, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং রাস্তা পরিষ্কারের অভিযানের পর অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গিয়েছে শহরের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর সেই পরিবর্তন ঘিরেই এখন শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।

শহরের বহু পুরনো বাসিন্দাদের মতে, একসময় এসপ্ল্যানেড এমন একটি এলাকা ছিল যেখানে হাঁটার জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে যেত। ফুটপাত জুড়ে অস্থায়ী দোকান, রাস্তার ধারে হকারদের সারি, বিভিন্ন ধরনের ছোট ব্যবসা এবং যাত্রীদের বিশাল ভিড়ের কারণে প্রায় সারাদিনই ব্যস্ত থাকত এলাকা। অফিস টাইমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠত। ধর্মতলা চত্বর, বাস স্ট্যান্ড, মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন এলাকা এবং বড় বড় বিপণির সামনে উপচে পড়ত মানুষের ভিড়। সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই বদলে গিয়েছে।

প্রশাসনের তরফে সম্প্রতি শুরু হয়েছে বড়সড় উচ্ছেদ ও পরিষ্কার অভিযান। ফুটপাত দখল করে থাকা বহু অস্থায়ী দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাস্তার পাশে জমে থাকা অবৈধ কাঠামো ভাঙার কাজও হয়েছে একাধিক জায়গায়। এর ফলে বহু বছর পর এসপ্ল্যানেডের রাস্তাঘাট ও ফুটপাত অনেকটাই খোলা এবং ফাঁকা দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের একাংশ এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানালেও অন্য একটি অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ছোট ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

প্রতিদিন এসপ্ল্যানেডে যাতায়াত করা বহু মানুষ জানিয়েছেন, এখন আগের তুলনায় হাঁটাচলা অনেক সহজ হয়েছে। ফুটপাত দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা যাচ্ছে। আগে যেখানে দোকান ও ভিড়ের কারণে পথচারীদের রাস্তায় নেমে হাঁটতে হত, এখন সেখানে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। যানজটও কিছুটা কমেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

বাসচালক ও পরিবহণ কর্মীদের একাংশের মতে, এসপ্ল্যানেডে দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত ভিড় এবং অবৈধ দখল বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাস ঢোকা এবং বের হওয়ার সময় প্রায়ই সমস্যার মুখে পড়তে হত। এখন রাস্তা কিছুটা ফাঁকা হওয়ায় যান চলাচল তুলনামূলক সহজ হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।

তবে এই পরিবর্তনের অন্য একটি দিকও সামনে আসছে। ফুটপাতের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করা বহু ছোট ব্যবসায়ী ও হকারদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, হঠাৎ উচ্ছেদের ফলে তাদের রুজি-রোজগারের বড় ক্ষতি হয়েছে। বহু বছর ধরে যারা ছোট দোকান চালিয়ে সংসার চালাতেন, তারা এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

এক হকারের কথায়, “আমরা বহু বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। হঠাৎ করে সব সরিয়ে দিলে আমরা কোথায় যাব?” আবার অন্যদিকে কিছু সাধারণ নাগরিকের মত, শহরকে সুশৃঙ্খল রাখতে অবৈধ দখলমুক্ত করা জরুরি ছিল। কারণ ফুটপাত পথচারীদের জন্য, সেটি পুরোপুরি দখল হয়ে গেলে সাধারণ মানুষেরই সমস্যা বাড়ে।

এসপ্ল্যানেড শুধুমাত্র একটি ব্যবসায়িক এলাকা নয়, এটি কলকাতার রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু রাজনৈতিক মিছিল, সভা এবং আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল। ফলে এখানে প্রশাসনিক পরিবর্তন বা বড়সড় অভিযান সবসময়ই মানুষের নজর কেড়ে নেয়।

শহর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কলকাতার মতো পুরনো শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অনিয়ন্ত্রিত দখলের কারণে ফুটপাত ও রাস্তার উপর চাপ ক্রমশ বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত পুনর্বিন্যাস না হওয়ায় সমস্যা আরও জটিল হয়েছে। তাই শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিকে নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বহুদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছিল।

বর্তমানে এসপ্ল্যানেড এলাকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজও জোরকদমে চলছে। রাস্তার ধারে জমে থাকা আবর্জনা সরানো হয়েছে। অনেক জায়গায় নতুন করে রং করা হচ্ছে। পথচারীদের জন্য ফুটপাত পরিষ্কার রাখার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, শুধু উচ্ছেদ নয়, এলাকাকে আরও সুন্দর এবং আধুনিক রূপ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়াতেও এসপ্ল্যানেডের নতুন ছবিকে ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা। কেউ ফাঁকা রাস্তার ছবি পোস্ট করে লিখছেন “নতুন এসপ্ল্যানেড”, আবার কেউ বলছেন “এত ফাঁকা ধর্মতলা আগে কখনও দেখা যায়নি”। অনেকেই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না, ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের দিকেও নজর দিতে হবে।

news image
আরও খবর

বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের উন্নয়ন এবং ছোট ব্যবসায়ীদের জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ কলকাতার অর্থনীতির একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক ব্যবসার উপর নির্ভরশীল। ফুটপাতের দোকান, ছোট স্টল এবং অস্থায়ী ব্যবসা বহু মানুষের জীবিকার উৎস। তাই উন্নয়নের পরিকল্পনা করার সময় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক প্রবীণ নাগরিক মনে করছেন, এসপ্ল্যানেডের অতিরিক্ত ভিড় এবং অব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই বড় সমস্যা ছিল। বিশেষ করে উৎসবের মরশুম বা অফিস টাইমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত। তাই এখন রাস্তা ও ফুটপাত কিছুটা খোলা হওয়ায় সাধারণ মানুষের সুবিধা হচ্ছে।

অন্যদিকে কিছু সমাজকর্মীর বক্তব্য, শুধুমাত্র উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, বিকল্প পুনর্বাসন এবং সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। নাহলে কিছুদিন পর আবার একই সমস্যা ফিরে আসতে পারে।

এসপ্ল্যানেডের পরিবর্তিত ছবি কলকাতার নগর উন্নয়ন নিয়ে নতুন বিতর্কও তৈরি করেছে। শহরকে আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন করার জন্য কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ কতটা প্রয়োজন, আর সেই পদক্ষেপের ফলে সাধারণ মানুষের উপর কী প্রভাব পড়ছে — এই দুই বিষয় নিয়েই এখন আলোচনা চলছে বিভিন্ন মহলে।

প্রশাসনের দাবি, এই অভিযান শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নয়। শহরের আরও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ধাপে ধাপে একই ধরনের অভিযান চালানো হতে পারে। লক্ষ্য হল যানজট কমানো, ফুটপাত মুক্ত করা এবং নাগরিক পরিষেবা উন্নত করা।

এদিকে সাধারণ মানুষের একাংশের মতে, এসপ্ল্যানেডে বর্তমানে যে ফাঁকা ও পরিষ্কার পরিবেশ দেখা যাচ্ছে, তা দীর্ঘদিন বজায় থাকলে শহরের সৌন্দর্য অনেকটাই বাড়বে। পর্যটকদের কাছেও কলকাতার ভাবমূর্তি উন্নত হবে বলে মনে করছেন তারা।

কলকাতার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এসপ্ল্যানেড। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আধুনিক কলকাতার বিকাশ — সবকিছুর সাক্ষী এই অঞ্চল। তাই এই এলাকার যেকোনও পরিবর্তন শহরের সামগ্রিক চেহারার উপরও প্রভাব ফেলে।

বর্তমানে সন্ধ্যার সময় এসপ্ল্যানেডের অনেক অংশ আগের তুলনায় অনেক বেশি খোলা দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে ভিড়ের চাপে চলাচল করা কঠিন ছিল, এখন সেখানে তুলনামূলক স্বস্তি অনুভব করছেন সাধারণ মানুষ। তবে অনেকেই মনে করছেন, এই পরিবর্তন ধরে রাখতে নিয়মিত নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।

উপসংহার

এসপ্ল্যানেডের বদলে যাওয়া এই ছবি এখন কলকাতার অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের ভিড়, অবৈধ দখল এবং বিশৃঙ্খলার বদলে এখন অনেকটাই ফাঁকা ও গোছানো পরিবেশ চোখে পড়ছে। প্রশাসনের এই পদক্ষেপে একদিকে যেমন সাধারণ পথচারী ও যাত্রীদের সুবিধা হচ্ছে, অন্যদিকে ছোট ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।

শহরের উন্নয়নের জন্য পরিকল্পিত পদক্ষেপ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সেই উন্নয়নের সঙ্গে মানবিক ভারসাম্য বজায় রাখাও সমান জরুরি। কারণ শহর শুধু রাস্তা ও বিল্ডিং দিয়ে তৈরি হয় না, শহর তৈরি হয় সেখানে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে নিয়েই।

বর্তমানে এসপ্ল্যানেডে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা যদি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে বজায় রাখা যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই এলাকা আরও আধুনিক ও সুশৃঙ্খল রূপ পেতে পারে। কলকাতার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে এসপ্ল্যানেডের এই নতুন চেহারা নিঃসন্দেহে শহরের পরিবর্তনের এক বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে।

Preview image