ভাঙা আশা আর গভীর ভয়ের মাঝেও রণদীপের নিঃশব্দ ভরসায় লিনের জীবনে ফিরে আসে বিশ্বাস, ভালোবাসা আর নতুন আলো।
লিন কোনো দিন ভাবেনি মাতৃত্বের পথে প্রথম পদক্ষেপটাই এতটা ভেঙে দেবে তাকে। প্রথমবার যখন পরীক্ষার রিপোর্টে পজিটিভ লাইন দেখেছিল, সে মুহূর্তে তার চোখে ছিল স্বপ্ন—ছোট ছোট জামা, ভবিষ্যতের নাম, ঘরের কোণে রাখা দোলনা। রণদীপ তখনো অফিসের কাজে ব্যস্ত, কিন্তু ফোনে খবরটা শুনেই তার কণ্ঠ বদলে গিয়েছিল। দু’জনেই বিশ্বাস করতে পারছিল না, তাদের জীবনে এত বড় সুখ এসে গেছে।
কিন্তু সুখ সব সময় সতর্ক করে আসে না। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই স্বপ্নে ফাটল ধরতে শুরু করে। লিনের শরীর আগের মতো থাকছিল না। বারবার পরীক্ষা, বারবার হাসপাতাল। শেষদিন, চিকিৎসকের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর, লিনের কান্না যেন আর থামছিল না। শব্দহীন কান্না—যেখানে দম আটকে আসে, কিন্তু গলা দিয়ে কিছু বেরোয় না। রণদীপ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, অথচ কীভাবে হাত বাড়িয়ে দেবে, কোন শব্দে তাকে আগলে রাখবে—কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না।
সেই দিনটার পর তাদের সংসার বদলে গেল। বাড়িতে আগের মতো হাসি নেই, ছোটখাটো কথোপকথন নেই। লিন যেন নিজের ভেতরেই গুটিয়ে গেল। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে সে প্রশ্ন করত—“আমি কি পারব?” প্রশ্নটার উত্তর কেউ দিত না। রণদীপ চেষ্টা করত স্বাভাবিক থাকতে, কিন্তু রাতে লিন ঘুমিয়ে পড়লে তাকেও ভেঙে পড়তে হতো।
এই সময়টায় রণদীপই ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল। সে বুঝেছিল, যদি সে ভেঙে পড়ে, তবে লিন আর উঠতে পারবে না। হাসপাতালে যাওয়া, রিপোর্ট সংগ্রহ, ডাক্তার দেখানো—সবকিছু নিজের কাঁধে তুলে নিল সে। লিনকে সে খুব বেশি প্রশ্ন করত না, শুধু পাশে বসে থাকত। অনেক সময় নীরবতাই সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হয়ে ওঠে।
সময় গড়াল। লিনের শরীর ধীরে ধীরে সেরে উঠল, কিন্তু মনের ক্ষত সারতে আরও সময় লাগল। কাউকে দেখলেই তার মনে হতো—সবাই কি জানে? সবাই কি তার ব্যর্থতাটা দেখছে? এই ভয়টা রণদীপ বুঝত। তাই সে লিনকে কোথাও একা যেতে দিত না, আবার জোর করেও কিছু করাত না। সবকিছু তার গতিতে হতে দিয়েছিল।
একদিন সকালে, অনেক দ্বিধা নিয়ে, লিন আবার পরীক্ষা করল। সে আসলে ফলাফল দেখতে চায়নি। রিপোর্টটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে ছিল। শেষে যখন চোখ পড়ল, তার হাত কাঁপতে লাগল। আবার সেই পজিটিভ লাইন। প্রথমে সে ভেবেছিল ভুল দেখছে। বুকের ভেতর ভয় আর উত্তেজনা একসাথে চেপে বসল। ধীরে ধীরে সে রিপোর্টটা রণদীপের দিকে বাড়িয়ে দিল।
রণদীপের প্রতিক্রিয়া ছিল একেবারে আলাদা। সে চুপ করে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে ছিল, তারপর হেসে ফেলল—কিন্তু সেই হাসির মধ্যে জল ছিল। সে লিনের হাত শক্ত করে ধরে বলেছিল, “এইবার আমরা সাবধানে চলব। এইবার তুমি একা না। আমি আছি।”
সেই দিন থেকেই রণদীপ বদলে গেল। আগেও সে যত্নশীল ছিল, কিন্তু এবার যেন প্রতিটা মুহূর্ত সে হিসেব করে চলতে লাগল। লিন কখন ওষুধ খাবে, কী খাবে, কতটা বিশ্রাম দরকার—সব সে লিখে রাখত। ফোনে অ্যালার্ম সেট করত, যাতে একটুও ভুল না হয়। রাতে লিন ঘুমালে সে ফোনের আলো কমিয়ে দিত, ঘরের আলো নিভিয়ে দিত, যেন কোনো অপ্রয়োজনীয় বিরক্তি না হয়।
লিনের ভয় কিন্তু পুরোপুরি যায়নি। মাঝে মাঝে রাতের বেলা সে হঠাৎ জেগে উঠত, বুক ধড়ফড় করত। তখন রণদীপ কিছু না বলে তার হাত ধরে থাকত। কোনো প্রতিশ্রুতি দিত না, শুধু উপস্থিত থাকত। এই উপস্থিতিটাই ধীরে ধীরে লিনের ভয়কে নরম করে দিচ্ছিল।
চেকআপের দিনগুলো ছিল সবচেয়ে কঠিন। হাসপাতালের করিডরে বসে থাকা, রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা—সবকিছু লিনকে প্রথম অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিত। রণদীপ তখন ইচ্ছে করে হালকা কথা বলত, কখনো ভবিষ্যতের ছোট ছোট পরিকল্পনার কথা তুলত। “সব ঠিক থাকলে এখানে একটা ছোট খাট রাখব”, কিংবা “তুমি চাইলে ঘরের দেয়ালটা হালকা রঙ করব”—এইসব কথা লিনকে বর্তমানের ভয়ের বাইরে একটু হলেও নিয়ে যেত।
প্রথমবার মা হওয়ার খবরটা সে পেয়েছিল খুব সাধারণ এক সকালে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে পরীক্ষার স্ট্রিপে দুটো লাইন দেখে প্রথমে সে হেসেছিল, তারপর কেঁপে উঠেছিল। ভয় আর আনন্দ একসঙ্গে এসে বুকের ভেতর গুলিয়ে গিয়েছিল। রণদীপ তখন অফিসে। ফোনে খবরটা দিতেই ও প্রান্তে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকার পর সে শুধু বলেছিল, “আমি আসছি।” সেই আসার মধ্যে যে কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা ছিল—তারা তখনো বুঝে ওঠেনি।
সেই কয়েকটা সপ্তাহ ছিল আলোয় ভরা। লিন সাবধানে হাঁটত, সাবধানে বসত। রণদীপ হঠাৎ করেই দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছিল—যেন অদৃশ্য কিছু ভেঙে না যায়। রাতে তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলত। কার মতো চোখ হবে, কোন নামটা ভালো শোনায়, জানালার পাশে ছোট খাট রাখবে কি না—এইসব ছোট ছোট কথা। সুখ তখন শব্দে খুব বড় ছিল না, কিন্তু অনুভবে ছিল গভীর।
তারপর ধীরে ধীরে অস্বস্তি শুরু হলো। শরীর ক্লান্ত থাকত, মন অস্থির থাকত। ডাক্তার বদল, পরীক্ষা বদল—সবকিছু দ্রুত ঘটতে লাগল। লিন তখনো বিশ্বাস করতে চাইছিল সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কিছু কিছু সত্য এমন হয়, যেগুলো বিশ্বাস দিয়ে বদলানো যায় না।
যেদিন সব শেষ হয়ে গেল, সেদিনটা খুব সাধারণই ছিল। কোনো ঝড়, কোনো অশুভ ইঙ্গিত নয়। শুধু চিকিৎসকের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর লিন বুঝেছিল—তার ভেতরে আর কেউ নেই। সেই শূন্যতা শব্দে বোঝানো যায় না। সে কাঁদছিল না জোরে, কিন্তু চোখের জল থামছিল না। রণদীপ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, অথচ সে নিজেও যেন অসহায় এক দর্শক।
সেই ব্যর্থতার পর তাদের ঘরে নীরবতা নেমে এলো। নীরবতা মানে কথা না বলা নয়—নীরবতা মানে এমন সব কথা, যেগুলো বলা যায় না। লিন ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে গুটিয়ে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে চিনতে পারত না। তার মনে হতো, তার শরীর তাকে ঠকিয়েছে। এই অপরাধবোধটা ছিল অযৌক্তিক, কিন্তু তবু সত্য।
রণদীপ তখন নিজের কষ্টটাকে আলাদা করে ভাবেনি। সে বুঝেছিল, এই সময়ে তাকে শক্ত হতে হবে। লিন যদি ভেঙে পড়ে, তবে তাকে ধরে রাখার মতো কেউ দরকার। সে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরত, রান্না শিখেছিল, ওষুধের নাম মুখস্থ করে ফেলেছিল। লিনকে সে খুব বেশি প্রশ্ন করত না। শুধু পাশে থাকত—চুপচাপ, নির্ভরযোগ্যভাবে।
সময় এমন এক জিনিস, যা কাউকে থামিয়ে রাখে না। মাসের পর মাস কেটে গেল। লিনের শরীর সেরে উঠল, কিন্তু মন তখনো পিছনে পড়ে ছিল। কোনো শিশুর কান্না শুনলে বুক কেঁপে উঠত। কোনো অন্তঃসত্ত্বা নারী দেখলে চোখ সরিয়ে নিত। রণদীপ এইসব লক্ষ করত, কিন্তু কিছু বলত না। সে জানত, সব প্রশ্নের উত্তর শব্দে দেওয়া যায় না।
এই সময়টায় রণদীপই আবার আশা কথাটা ফিরিয়ে আনল। খুব জোর করে নয়, খুব ধীরে। “আমরা আবার চেষ্টা করতে পারি,” সে একদিন বলেছিল। লিন কিছু বলেনি। তার চোখে ভয় ছিল। রণদীপ তখন আর কিছু বলেনি। শুধু বলেছিল, “তোমার সময় নাও।”
এই সময় নেওয়াটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, বিশ্রাম—সবকিছু মিলিয়ে একটা নতুন প্রস্তুতি শুরু হলো। লিন ধীরে ধীরে নিজের শরীরের ওপর রাগ কমাতে শিখছিল। রণদীপ প্রতিটা রিপোর্ট নিজে পড়ত, প্রতিটা ডাক্তারের কথা মন দিয়ে শুনত। লিনের জন্য সে একটা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
অনেকদিন পর, আবার সেই সকালটা এলো। লিন আবার পরীক্ষা করেছিল, কিন্তু এবার কোনো উত্তেজনা ছিল না। সে প্রায় ফলাফল দেখতেই চাইছিল না। দুটো লাইন দেখা গেল, কিন্তু সে হাসেনি। তার হাত কাঁপছিল। সে জানত, সুখের সঙ্গে ভয়ও এবার দ্বিগুণ।
রণদীপ যখন রিপোর্টটা হাতে নিল, তার প্রতিক্রিয়া ছিল অদ্ভুতভাবে শান্ত। সে গভীর শ্বাস নিয়েছিল, তারপর লিনের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “এইবার আমরা একসঙ্গে চলব। ধীরে।” এই ধীরতার মধ্যেই ছিল সবচেয়ে বড় আশ্বাস।
এই দ্বিতীয় যাত্রা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। কোনো বড় উচ্ছ্বাস ছিল না, কোনো ঘোষণা ছিল না। শুধু সতর্কতা, যত্ন আর অদ্ভুত এক ধরনের নীরব প্রতিজ্ঞা। রণদীপ প্রতিটা দিন যেন হিসেব করে কাটাতে লাগল। খাবার তালিকা, ঘুমের সময়, ওষুধের ঘন্টা—সবকিছু সে নিজে দেখত। লিনের শরীরের সামান্য পরিবর্তনও তার চোখ এড়াত না।
রাতে লিন ঘুমোতে পারত না অনেক সময়। দুঃস্বপ্নে ভেঙে যেত। রণদীপ তখন কিছু বলত না। শুধু তার হাত ধরে রাখত। এই হাত ধরা ছিল কোনো সমাধান নয়, কিন্তু ভয়ের মধ্যে একটা স্থিরতা এনে দিত।
চেকআপের দিনগুলো ছিল সবচেয়ে কঠিন। হাসপাতালের করিডরগুলো লিনের কাছে ভয়ংকর লাগত। প্রথম অভিজ্ঞতার স্মৃতি ফিরে আসত। রণদীপ তখন ইচ্ছে করেই সাধারণ কথা বলত—আবহাওয়া, অফিসের ছোটখাটো ঘটনা, ভবিষ্যতের নিরীহ পরিকল্পনা। এই সাধারণতাই লিনকে বর্তমানের ভয়ে আটকে থাকতে দিত না।
মাসের পর মাস কেটে গেল। প্রতিটা ভালো রিপোর্ট ছিল একটা ছোট বিজয়। তারা কোনোদিন সেটা বড় করে উদযাপন করেনি। শুধু বাড়ি ফিরে একসঙ্গে চা খেয়েছে, একসঙ্গে একটু নিশ্চিন্তে নিঃশ্বাস নিয়েছে।
এই সময়টায় তাদের সম্পর্কও বদলে গেল। তারা কম কথা বলত, কিন্তু বেশি বুঝত। ভালোবাসা এখন আর শুধু আবেগ নয়, দায়িত্বও। লিন বুঝতে পারছিল, সে একা শক্ত হতে পারছে না—কিন্তু একসঙ্গে হলে সম্ভব।
ভয় পুরোপুরি যায়নি। হয়তো যাবে না কোনোদিনই। কিন্তু ভয় আর একা নয়। তার পাশে আছে বিশ্বাস। রণদীপের চোখে এখনো উদ্বেগ থাকে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি থাকে দৃঢ়তা। সে জানে, ফলাফল তার হাতে নেই, কিন্তু যত্নটা তার হাতেই।
এই দ্বিতীয় সুযোগটা শুধু মাতৃত্বের সম্ভাবনা নয়। এটা তাদের দু’জনের নতুন করে বাঁচার শিক্ষা। তারা শিখেছে, সব স্বপ্ন পূরণ হয় না, কিন্তু ভাঙা স্বপ্নের পরেও আবার দাঁড়ানো যায়। শিখেছে, ভালোবাসা মানে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে—এই নিশ্চয়তা নয়, বরং সব ঠিক না থাকলেও পাশে থাকার অঙ্গীকার।
লিন এখনো মাঝে মাঝে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরে তাকিয়ে ভাবে—ভবিষ্যৎ কেমন হবে, সে জানে না। কিন্তু এই অজানার মধ্যেই সে এক ধরনের শান্তি খুঁজে পাচ্ছে। কারণ এবার সে একা নয়।
ভয়ের ওপর দিয়েই বিশ্বাস জন্মায়। আর বিশ্বাসের হাত ধরেই আসে নতুন আলো। লিন আর রণদীপের গল্প সেই আলোয় লেখা—নীরব, ধৈর্যশীল, গভীর।
এই যাত্রায় রণদীপ বুঝেছিল, ভালোবাসা মানে শুধু আনন্দ ভাগ করা নয়, ভয়ের সময় পাশে দাঁড়ানো। লিনও শিখছিল নতুন করে বিশ্বাস করতে। নিজের শরীরকে, নিজের মনকে, আর সবচেয়ে বড় কথা—রণদীপকে।
মাসের পর মাস কেটে গেল। প্রতিটা দিন ছিল সাবধানে রাখা, আগলে রাখা। ছোট ছোট সাফল্য—ভালো রিপোর্ট, স্বাভাবিক আল্ট্রাসাউন্ড—তাদের কাছে উৎসবের মতো লাগত। বড় কোনো উদযাপন নয়, শুধু দু’জনের চোখের ভাষায় একটা স্বস্তি।
এই দ্বিতীয় সুযোগটা তাদের সম্পর্ককেও বদলে দিয়েছে। তারা এখন কম কথা বলে, কিন্তু গভীরভাবে বোঝে। আগের মতো স্বপ্ন দেখে, কিন্তু আরও বাস্তবভাবে। লিন জানে সামনে পথ এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়, কিন্তু সে এটুকু জানে—এই পথে সে একা হাঁটছে না।
ভয়ের ওপর দিয়েই বিশ্বাস জন্মায়। লিন আর রণদীপের গল্পটা সেই কথাই বলে। ভাঙনের পরেও যদি কেউ হাত ধরে থাকে, তাহলে দ্বিতীয় সুযোগ শুধু সম্ভাবনা নয়—একটা নতুন শুরু হয়ে ওঠে।