রোগিণীর মৃত্যুকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ চিকিৎসাধীন অবস্থায় নার্সের মারধর ও পরিবারের সঙ্গে দুর্ব্যবহার। বিষয়টি জানিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসাধীন যুবতীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হল মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালে। অভিযোগের তীর গিয়ে ঠেকেছে কর্তব্যরত নার্সের দিকে। মৃতার পরিবারের দাবি, চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই যুবতীকে মারধর করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, রোগীর পরিবারের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এই ঘটনাকে ঘিরে রবিবার সকাল থেকেই হাসপাতাল চত্বরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভে সামিল হন মৃতার পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বৈশাখী খান নামে এক যুবতী দিন দুয়েক আগে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছিল বলে পরিবারের দাবি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে চিকিৎসকেরা তড়িঘড়ি তাঁকে সিসিইউতে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নেন। চিকিৎসকেরা শুরু থেকেই পরিবারকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, বৈশাখীর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
মৃতার স্বামী আজিজুল খান ওরফে লাল্টু জানান, চিকিৎসকেরা তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলেন। কী অবস্থায় রোগী আছেন, কী ধরনের চিকিৎসা চলছে, সবটাই স্পষ্ট করে জানানো হয়েছিল। এই কারণে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে হাসপাতালের নার্সিং স্টাফদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন পরিবারের সদস্যেরা।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, সিসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৈশাখীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। এমনকি তাঁকে শারীরিক ভাবে মারধর করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তাঁরা। মৃতার স্বজনদের বক্তব্য, তাঁরা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললে নার্সদের তরফে অশালীন আচরণ করা হয়। রোগীর স্বামীর অভিযোগ, সাহায্য চাইতে গেলে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং একাধিকবার অপমানজনক মন্তব্য করা হয়েছে।
এই ঘটনার পর বৈশাখীর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে বলে পরিবারের দাবি। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতাল চত্বরে ক্ষোভে ফেটে পড়েন পরিবারের সদস্যেরা। রবিবার সকালে মৃতার পরিবার হাসপাতালের বাইরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। তাঁদের দাবি ছিল, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্ত নার্সের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিক্ষোভের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান স্থানীয় কাউন্সিলর মিতালি বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মৃতার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের অভিযোগ শোনেন। পরিবারকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি। কাউন্সিলর জানান, বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের নজরে আনা হবে। প্রয়োজনে উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবিও তোলা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
বৈশাখীর পরিবারের দাবি, এই ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সরকারি হাসপাতালগুলিতে রোগী এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে প্রায়শই দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠে আসে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে যায়। এই ঘটনায় তাঁরা চান, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনও রোগী বা তাঁর পরিবারকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে মৃতার পরিবারের তরফে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রে নার্সের বিরুদ্ধে মারধর এবং দুর্ব্যবহারের বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পরিবার চাইছে, ওই অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত শুরু হোক এবং দোষী প্রমাণিত হলে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হোক।
এদিকে হাসপাতাল চত্বরে উত্তেজনা ছড়ালেও চিকিৎসা পরিষেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক ছিল প্রশাসন। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। পুলিশকেও মোতায়েন করা হয় এলাকায়। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
এই ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সরকারি হাসপাতালে রোগী সুরক্ষা এবং আচরণবিধি নিয়ে। বিশেষ করে সিসিইউয়ের মতো সংবেদনশীল বিভাগে কর্মরত নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের আচরণ কতটা মানবিক হওয়া উচিত, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। রোগীর শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সুরক্ষাও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, তা এই ঘটনা আবার মনে করিয়ে দিয়েছে।
স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত একাংশের মতে, অতিরিক্ত কাজের চাপ, কর্মীসংকট এবং মানসিক চাপের ফলে অনেক সময় নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের আচরণে রুক্ষতা দেখা যায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে রোগী বা তাঁর পরিবারের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন অভিযোগ উঠলে তা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
বৈশাখীর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পরিবার এখনও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। স্বামী আজিজুল খান জানান, তাঁরা শুধু ন্যায়বিচার চান। তাঁদের দাবি, যদি সত্যিই নার্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। যাতে ভবিষ্যতে কেউ রোগী বা তাঁর পরিবারের সঙ্গে এমন আচরণ করার সাহস না পায়।
এই ঘটনার পর মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসা পরিষেবা এবং প্রশাসনিক নজরদারি আরও জোরদার করার দাবি উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত নজরদারি এবং অভিযোগ গ্রহণের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখতে হবে। যাতে কোনও অভিযোগ উপেক্ষিত না হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চিকিৎসাধীন যুবতীর মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত শোকের ঘটনা নয়। এটি সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা, রোগী সুরক্ষা এবং মানবিক আচরণের প্রশ্নকেও সামনে এনে দিয়েছে। তদন্তের ফল কী দাঁড়ায়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই এখন নজর গোটা মেদিনীপুর জেলার।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো এবং আচরণবিধি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। বিশেষ করে জেলা স্তরের বড় সরকারি হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়লেও সেই অনুপাতে পরিকাঠামো ও জনবল বাড়েনি বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তারই ফল হিসেবে অনেক সময় চিকিৎসক এবং নার্সদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। কিন্তু সেই চাপের দায় কোনও ভাবেই রোগী বা তাঁর পরিবারের উপর গিয়ে পড়া উচিত নয় বলে মত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।
বৈশাখীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ অনুযায়ী, সিসিইউয়ের মতো সংবেদনশীল বিভাগে যেখানে রোগী শারীরিক ও মানসিক ভাবে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় থাকেন, সেখানে আরও বেশি মানবিক আচরণ প্রয়োজন। পরিবারের দাবি, বৈশাখী তখন কথা বলার অবস্থায়ও ছিলেন না। সেই অবস্থায় তাঁর সঙ্গে কোনও রকম শারীরিক আচরণ হলে তা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।
এই ঘটনার পর হাসপাতালের অন্যান্য রোগীর পরিবারগুলিও মুখ খুলতে শুরু করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানিয়েছেন, এর আগেও তাঁরা নার্সিং স্টাফদের আচরণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে ভয় এবং চিকিৎসা পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় কেউই প্রকাশ্যে অভিযোগ জানাননি। বৈশাখীর মৃত্যুর পর সেই চাপা ক্ষোভই যেন সামনে চলে এসেছে।
হাসপাতাল চত্বরে বিক্ষোভ চলাকালীন রোগীর পরিবারগুলির হাতে একাধিক প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। সেখানে ন্যায়বিচারের দাবি জানানো হয়। অনেকের বক্তব্য ছিল, চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে তাঁদের কোনও অভিযোগ নেই। বরং চিকিৎসকেরাই বারবার রোগীর অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট করে জানাচ্ছিলেন। কিন্তু নার্সিং স্টাফদের আচরণ তাঁদের মানসিক ভাবে ভেঙে দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, সরকারি হাসপাতালে রোগীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলার জন্য নির্দিষ্ট কাউন্সেলিং ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। যাতে রোগীর অবস্থা, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি স্পষ্ট ভাবে জানানো যায়। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমবে এবং উত্তেজনাও এড়ানো সম্ভব হবে।
এই ঘটনার পর স্বাস্থ্য দফতরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিক ভাবে কীভাবে তদন্ত শুরু হয়, অভিযুক্ত কর্মীদের সাময়িক ভাবে সরানো হয় কি না, সেই সব বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা প্রয়োজন বলে মত বিশেষজ্ঞদের। অনেক সময় অভিযোগ জমা দিলেও তদন্ত দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে, যার ফলে পরিবারগুলির মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে।
বৈশাখীর পরিবারের দাবি, তাঁরা চান না এই ঘটনা রাজনৈতিক রঙ নিক। তাঁদের একটাই দাবি, সত্য উদঘাটন হোক এবং ভবিষ্যতে যাতে আর কোনও পরিবারকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়। স্বামী আজিজুল খান বলেন, আমার স্ত্রী আর ফিরবে না। কিন্তু যদি আমাদের লড়াইয়ের ফলে অন্য কোনও রোগী সুরক্ষিত থাকে, সেটাই আমাদের সান্ত্বনা।
এই ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করার দাবি উঠেছে। হাসপাতালের একাধিক কর্মী জানিয়েছেন, এমন অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। সত্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাঁদের দাবি, তদন্ত যেন নিরপেক্ষ হয় এবং কোনও পক্ষকে অযথা হয়রানি না করা হয়।
মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র। আশপাশের একাধিক জেলা থেকে রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। সেই কারণে এখানে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের আস্থা যাতে নষ্ট না হয়, সেই বিষয়টি প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য পরিষেবা মানে শুধু ওষুধ আর যন্ত্র নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিশ্বাস, সহানুভূতি এবং নিরাপত্তার অনুভূতি। রোগী এবং তাঁর পরিবার সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় হাসপাতালের দ্বারস্থ হন। সেই জায়গায় যদি তাঁরা নিজেদের অপমানিত বা নিরাপত্তাহীন মনে করেন, তাহলে গোটা ব্যবস্থার উপরই প্রশ্ন উঠে যায়।
বৈশাখীর মৃত্যুর ঘটনায় এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। অভিযোগের তদন্ত কত দ্রুত শেষ হয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তার উপরই নির্ভর করবে প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা। একই সঙ্গে এই ঘটনা স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত সকলের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চিকিৎসাধীন যুবতীর মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগ শুধু একটি হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এটি রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির ব্যবস্থাপনা, কর্মীদের আচরণ এবং রোগী সুরক্ষার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। তদন্তের ফলাফল এবং প্রশাসনের পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে বৈশাখীর পরিবার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ।