Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মেঘালয়ের অবৈধ কয়লাখনিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ কমপক্ষে ১৮ শ্রমিকের মৃত্যু উদ্ধারযুদ্ধ জারি

মেঘালয়ের পূর্ব জয়ন্তিয়া হিলস জেলার থাংস্কু গ্রামে একটি অবৈধ কয়লাখনিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৮ জন শ্রমিক প্রাণ হারান এবং বেশ কয়েকজন আটকা পড়ে আছেন। উদ্ধার কাজ চলছে, এবং স্থানীয় প্রশাসন তৎপরভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে।

মেঘালয়ের অবৈধ কয়লাখনিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ কমপক্ষে ১৮ শ্রমিকের মৃত্যু উদ্ধারযুদ্ধ জারি
দুর্ঘটনা

মেঘালয়ের পূর্ব জয়ন্তিয়া হিলস জেলা আবারও রক্তাক্ত। অবৈধ কয়লাখনিতে ডিনামাইট বিস্ফোরণের জেরে প্রাণ হারালেন অন্তত ১৮ জন শ্রমিক। গুরুতর জখম অবস্থায় একজনকে উদ্ধার করে শিলংয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এখনও বহু শ্রমিক নিখোঁজ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, লাগাতার বৃষ্টি এবং ধসের আশঙ্কায় উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

কীভাবে ঘটল ভয়াবহ বিস্ফোরণ

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, থাংস্কু গ্রামের একটি পরিত্যক্ত পাহাড়ের নিচে অবৈধভাবে কয়লা উত্তোলনের সময় ডিনামাইট ব্যবহার করা হচ্ছিল। আচমকাই শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে খনির ভেতরের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। শ্রমিকদের চিৎকারে গোটা এলাকা কেঁপে ওঠে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বিস্ফোরণের শব্দ কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায়। পাহাড়ের গা থেকে ধোঁয়া ও ধুলোর কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। আতঙ্কে গ্রামবাসীরা নিরাপদ দূরত্বে সরে যান।

মৃতদের পরিচয় ও নিখোঁজ শ্রমিকরা

পুলিশ জানিয়েছে, মৃত শ্রমিকদের অধিকাংশই পাশ্ববর্তী অসমের বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ এই অবৈধ খনিতে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখনও যাঁরা নিখোঁজ, তাঁদের সংখ্যা সরকারি ভাবে নিশ্চিত করা না হলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু শ্রমিক আটকে রয়েছেন।

মেঘালয়ের ডিজিপি আই নোংরাং বলেন, “এখনও পর্যন্ত ১৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকাজ চলছে। তবে আবহাওয়া ও এলাকার দুর্গমতা বড় বাধা।”

উদ্ধার অভিযান ও চ্যালেঞ্জ

জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF), রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা দল (SDRF) ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। কিন্তু সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ, পানিতে ভর্তি খনি এবং ধসের ঝুঁকি উদ্ধারকারীদের জীবনও বিপন্ন করে তুলছে।

ভারি যন্ত্রপাতি পৌঁছনো কঠিন। অনেক জায়গায় কেবল হাতুড়ি ও কাটার দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

প্রতিকূল আবহাওয়া বাড়াচ্ছে বিপদ

পূর্ব জয়ন্তিয়া হিলস অঞ্চলে টানা বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে রয়েছে। ফলে নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা প্রবল। প্রশাসন নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ধীরে, কিন্তু সতর্কতার সঙ্গে কাজ চালাচ্ছে।

অবৈধ কয়লাখনি: এক পুরনো অভিশাপ

এই দুর্ঘটনা নতুন নয়। পূর্ব জয়ন্তিয়া হিলস দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ কয়লাখনির জন্য কুখ্যাত। ২০১৪ সালে পরিবেশ দূষণ, নদী বিষাক্ত হওয়া এবং শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (NGT) মেঘালয়ে কয়লা খনির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।

কিন্তু বাস্তবে সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়নি বলেই অভিযোগ। রাতের অন্ধকারে, প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে চলছে কয়লা উত্তোলন।

পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব

অবৈধ কয়লাখনির ফলে নদীর জল দূষিত হচ্ছে, বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানীয় জলের সংকট বাড়ছে, চাষযোগ্য জমি নষ্ট হচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, “এই ধরনের খনিতে কোনও নিরাপত্তা মানা হয় না। শ্রমিকদের জীবন এখানে সবচেয়ে সস্তা।”

শ্রমিকদের অসহায় বাস্তবতা

বেশিরভাগ শ্রমিকই দরিদ্র পরিবারের মানুষ। দৈনিক মজুরির লোভে তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই খনিতে নামেন। কোনও বিমা নেই, কোনও সুরক্ষা সরঞ্জাম নেই—মৃত্যুই যেন এখানে নিয়তি।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

এই ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতেও তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, প্রশাসনের মদতেই অবৈধ খনন চলছে। সরকারের তরফে তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে বহু

শেষ কথা

থাংস্কু গ্রামের এই দুর্ঘটনা শুধু একটি খবর নয়—এটি এক নির্মম বাস্তবতার দলিল। যতদিন না অবৈধ কয়লাখনি পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে, ততদিন এই ধরনের মৃত্যুমিছিল থামবে না।

আজ ১৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু—কাল সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে। প্রশ্ন একটাই, আর কত প্রাণ গেলে নড়বে প্রশাসন?

 

অবৈধ কয়লাখনির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু শ্রমিক মৃত্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়। এই অনিয়ন্ত্রিত খননের ফলে গোটা এলাকার পরিবেশ ব্যবস্থা কার্যত ধ্বংসের মুখে। পাহাড় কেটে, গভীর সুড়ঙ্গ খুঁড়ে কয়লা উত্তোলনের ফলে আশপাশের নদী ও ঝরনার জল মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। কয়লার বর্জ্য, অ্যাসিডিক জল এবং খনির মাটি নদীতে মিশে জল কালচে হয়ে উঠছে। বহু জায়গায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও ব্যাহত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একসময়ের স্বচ্ছ নদীর জল এখন আর পানযোগ্য নয়, এমনকি গবাদি পশুকেও সেই জল খাওয়াতে ভয় পাচ্ছেন তাঁরা।

পরিবেশবিদদের মতে, এই ধরনের অবৈধ খনন কার্যকলাপ পরিবেশগত বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে পুরো অঞ্চলকে। বনভূমি উজাড় হয়ে যাচ্ছে নির্বিচারে। গাছ কেটে রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে, পাহাড়ের ঢাল ভেঙে পড়ছে, যার ফলে ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়ছে বহুগুণ। বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই মাটি সরে গিয়ে চাষযোগ্য জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল বহু পরিবার আজ রোজগারের রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে।

স্থানীয় গ্রামবাসীদের দাবি, অবৈধ কয়লাখনির জেরে ভূগর্ভস্থ জলস্তরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় কুয়ো ও নলকূপ শুকিয়ে যাচ্ছে। পানীয় জলের জন্য মানুষকে দূর দূরান্ত থেকে জল আনতে হচ্ছে। এই জলসংকট শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যের উপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। চর্মরোগ, পেটের অসুখ এবং শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা বাড়ছে বলে অভিযোগ।

পরিবেশবিদ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, এই অবৈধ খনিগুলিতে শ্রমিকদের জন্য কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। কোনও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মানা হয় না, নেই কোনও সেফটি অডিট বা জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা। অপ্রশিক্ষিত শ্রমিকদের হাতে ডিনামাইট তুলে দেওয়া হচ্ছে, যা যে কোনও সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাঁদের কথায়, “এখানে শ্রমিকদের জীবন সবচেয়ে সস্তা। যতক্ষণ কাজ হচ্ছে, ততক্ষণই তাঁদের মূল্য।”

বেশিরভাগ শ্রমিকই আসেন দরিদ্র পরিবার থেকে। অসম, বিহার বা উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জীবিকার সন্ধানে তাঁরা এখানে পৌঁছন। দৈনিক কয়েকশো টাকার মজুরির লোভে তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিতে বাধ্য হন। পরিবারের পেট চালানোর তাগিদে তাঁরা জানেন বিপদ আছে, তবু পিছিয়ে আসার উপায় নেই। কোনও বিমা নেই, নেই চিকিৎসার নিশ্চয়তা। দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশাও ক্ষীণ।

এই শ্রমিকদের অনেকেই অস্থায়ী তাঁবু বা অস্বাস্থ্যকর ঘরে বসবাস করেন। চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছয় না বললেই চলে। কোনও দুর্ঘটনার পর আহতদের হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় প্রাণহানির আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। থাংস্কু গ্রামের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় সেই চিত্র আবারও স্পষ্ট হয়েছে।

এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং এক দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠছেই। নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এত বড় আকারে অবৈধ খনন চলছে, তা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। অনেকের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও কিছু অসাধু চক্রের মদতেই এই অবৈধ ব্যবসা রমরমিয়ে চলছে।

থাংস্কু গ্রামের এই দুর্ঘটনা তাই শুধু একটি খবর নয়—এটি এক নির্মম বাস্তবতার দলিল। এটি মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের নামে কীভাবে মানুষের জীবন ও প্রকৃতি দুটোই বলি দেওয়া হচ্ছে। যতদিন না অবৈধ কয়লাখনি পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে, ততদিন এই ধরনের মৃত্যুমিছিল থামবে না বলেই আশঙ্কা।

আজ ১৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু গোটা এলাকাকে শোকস্তব্ধ করেছে। কাল হয়তো সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে। প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভাঙা স্বপ্ন, অসহায় পরিবার আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। 

এই মর্মান্তিক ঘটনার পরেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, দায়িত্ব কার? বারবার প্রাণহানির ঘটনার পর তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনও স্থায়ী সমাধান চোখে পড়ে না। অবৈধ কয়লাখনি বন্ধে প্রশাসনিক তৎপরতা যতটা প্রয়োজন, তা এখনও অনুপস্থিত বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু উদ্ধারকাজ শেষ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা।

এই দুর্ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, অর্থনৈতিক স্বার্থের কাছে কতটা অসহায় হয়ে পড়ছে মানবজীবন। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষাকে অগ্রাধিকার না দিলে ভবিষ্যতেও এমন ঘটনাই বারবার ঘটবে। থাংস্কুর এই ট্র্যাজেডি যেন প্রশাসনের কাছে শেষ সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে—যাতে আর কোনও পরিবারকে প্রিয়জন হারানোর শোক বইতে না হয়।

Preview image