Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রূপ নিয়ে কটু মন্তব্যে ভেঙে পড়েছিলেন মাধুরী মায়ের এক পরামর্শেই ঘুরে যায় জীবন

তেজ়াব মুক্তির আগে হতাশায় ভেঙে পড়েছিলেন মাধুরী দীক্ষিত। সেই সময় তাঁর রূপ ও ঠোঁট নাকের গঠন নিয়ে একের পর এক কটু মন্তব্য শুনতে হয়েছিল অভিনেত্রীকে।

বলিউড হোক বা বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ—আজকের বিনোদন দুনিয়ায় অভিনেত্রীদের চেহারা নিয়ে আলোচনা যেন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময় বদলেছে, বদলেছে সৌন্দর্য নিয়ে ভাবনার ধরনও। ‘ফিলার্স’, ‘নোজ় জব’, ‘লিপ জব’, ‘চিবুক ঠিক করা’—এই শব্দগুলো এখন আর শুধুই ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলের ফিসফাসে সীমাবদ্ধ নেই। বরং প্রকাশ্যেই এ নিয়ে আলোচনা করছেন বহু অভিনেত্রী। কেউ অকপটে স্বীকার করছেন নিজের সিদ্ধান্তের কথা, কেউ আবার তুলে ধরছেন সমাজ ও ইন্ডাস্ট্রির চাপের গল্প।

পর্দার সামনে নিখুঁত দেখানোর অদম্য তাগিদ অনেককেই ঠোঁট, নাক কিংবা মুখাবয়বের গঠনে বদল আনতে আগ্রহী করে তুলছে। ক্যামেরার ক্লোজ়-আপ, সোশ্যাল মিডিয়ার নিরন্তর বিচার আর সৌন্দর্যের একরৈখিক মানদণ্ড—সব মিলিয়ে অভিনেত্রীদের উপর চাপ দিন দিন বাড়ছেই। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যখন অধিকাংশই বাহ্যিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছেন, ঠিক তখনই একেবারে ভিন্ন সুরে কথা বললেন অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিত।

মাধুরীর মতে, সৌন্দর্যের কোনও একমাত্র সংজ্ঞা নেই। প্রত্যেক মানুষের চেহারা, গঠন ও অভিব্যক্তি আলাদা, আর সেটাই স্বাভাবিক। তাঁর বিশ্বাস, যে যেমন, তাকে ঠিক তেমন ভাবেই নিজেকে গ্রহণ করা উচিত। নিজেকে বদলানোর আগে নিজের ভিতরের শক্তি ও প্রতিভাকে চিনে নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি। মাধুরীর কথায়, বাহ্যিক খুঁত বলে যেগুলো ধরা হয়, সেগুলিই অনেক সময় একজন অভিনেত্রীকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।

আজও পর্দায় তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে দেয়, সৌন্দর্য শুধু নিখুঁত গঠনের নাম নয়—আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিত্ব আর অভিনয়ের গভীরতাই আসল আকর্ষণ। এই প্রবণতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে মাধুরী দীক্ষিতের বক্তব্য নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—নিজের স্বতন্ত্রতাই সবচেয়ে বড় শক্তি, সেটিকে কখনও নষ্ট করা উচিত নয়।

আজ যাঁকে ‘ধক ধক গার্ল’, ‘চিরসবুজ সৌন্দর্যের প্রতীক’ বলা হয়, সেই মাধুরী দীক্ষিতের অভিনয়জীবনের শুরুর দিনগুলো মোটেও মসৃণ ছিল না। পর্দার বাইরে তাঁকেও শুনতে হয়েছিল কটু মন্তব্য, বিদ্রুপ আর উপদেশের নামে আঘাত। বিশেষ করে তাঁর রূপ, ঠোঁট ও নাকের গঠন নিয়ে চলত নানা আলোচনা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই অভিজ্ঞতার কথা খোলাখুলি ভাগ করে নিলেন মাধুরী নিজেই।

মাধুরীর কথায়, ‘তেজ়াব’ ছবিটি মুক্তির আগে তিনি মানসিকভাবে ভীষণই ভেঙে পড়েছিলেন। তখন তিনি অভিনয়জগতে একেবারেই নতুন। পরিচিত মুখ নন, হাতে সাফল্যের তকমা নেই। সেই সময় চারপাশ থেকে একের পর এক মন্তব্য এসে তাঁর আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাচ্ছিল। কেউ বলতেন তাঁর নাক ঠিক নয়, কেউ আবার ঠোঁটের গঠন নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। দিনের পর দিন এই ধরনের কথা শুনে তাঁর মন খারাপ হয়ে যেত। নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হত।

মাধুরী বলেন, “তখন সদ্য অভিনয়জীবনে পা রেখেছি। চারপাশের মানুষজনের কথা খুব প্রভাব ফেলত। অনেকেই এসে সরাসরি বলতেন, ‘নাকটা ঠিক করো’, ‘ঠোঁটটা সুন্দর নয়’। সেই সময় এসব কথা শুনে খুব কষ্ট পেতাম। ভাবতাম, হয়তো সত্যিই আমি পর্দার জন্য উপযুক্ত নই।”

ঠিক সেই সময়েই মাধুরীর জীবনে সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে দাঁড়ান তাঁর মা। মেয়ের হতাশা, আত্মবিশ্বাসের টানাপড়েন সবটাই বুঝতে পারতেন তিনি। আর তখনই তিনি এমন এক পরামর্শ দেন, যা মাধুরীর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়।

মাধুরী জানান, “মা আমাকে খুব শান্তভাবে বলেছিলেন—একটা ছবি যদি হিট হয়ে যায়, তা হলে আর কেউ তোমার নাক, ঠোঁট বা চেহারা নিয়ে কথা বলবে না। তখন সবাই শুধু তোমার কাজটাই দেখবে।” এই কথাটা তখন খুব সাধারণ মনে হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটাই বাস্তব হয়ে ওঠে।

‘তেজ়াব’ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর পরিস্থিতি একেবারে বদলে যায়। ছবিটি বক্স অফিসে সুপারহিট হয়। ‘এক দু তিন’ গানে মাধুরীর নাচ রাতারাতি তাঁকে তারকা করে তোলে। দর্শক, সমালোচক—সবাই মাধুরীর অভিনয়, অভিব্যক্তি আর পর্দার উপস্থিতিতে মুগ্ধ হয়ে যান। আশ্চর্যের বিষয়, যাঁরা আগে তাঁর নাক বা ঠোঁট নিয়ে কথা বলতেন, তাঁদের মুখও তখন বন্ধ হয়ে যায়।

news image
আরও খবর

মাধুরী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “মায়ের কথাই সত্যি হয়েছিল। ছবিটি সফল হওয়ার পর আর কেউ আমার চেহারা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। তখন সবাই শুধু আমার কাজটাই দেখেছে।” এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বিশ্বাস করেন, একজন অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে আসল বিচার হওয়া উচিত তাঁর কাজ, প্রতিভা আর পরিশ্রম।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের উদ্দেশেও একই পরামর্শ দিতে চান মাধুরী। তাঁর মতে, নিজেকে বদলানোর আগে নিজের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস রাখা জরুরি। ভাল কাজ করলে, দর্শকের মন ছুঁতে পারলে, বাহ্যিক খুঁত আপনা থেকেই গুরুত্ব হারায়।

মাধুরী দীক্ষিতের বক্তব্যে বারবারই উঠে আসে আত্মবিশ্বাস আর নিজস্বতাকে আঁকড়ে ধরার কথা। তাঁর কথায়, “যদি তুমি ভাল কাজ করো, তা হলে সব সমালোচনা আপনিই চাপা পড়ে যায়। আর যদি দেখতে একটু অন্যরকম হও, সেটাই তো তোমার নতুনত্ব। সবাই যদি একরকম হয়, তা হলে আলাদা করে চেনা যাবে কীভাবে?” মাধুরীর মতে, নিজের স্বতন্ত্রতাকে নষ্ট করা মানে শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন নয়, নিজের পরিচয় ও ব্যক্তিত্বকেই ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলা। একজন শিল্পীর ক্ষেত্রে এই স্বতন্ত্রতাই তাঁকে আলাদা করে তুলে ধরে, দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে প্রতিটি মুহূর্তে তুলনা, মন্তব্য আর বিচার যেন নিত্যসঙ্গী। উচ্চ রেজ়োলিউশনের ক্যামেরা, ফিল্টারহীন ক্লোজ়-আপ আর সৌন্দর্যের কৃত্রিম মানদণ্ড অভিনেত্রীদের উপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করছে। পর্দায় নিখুঁত দেখানোর তাগিদে অনেকেই নিজের শরীর বা চেহারা নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে মাধুরীর বক্তব্য এক ধরনের মানসিক স্বস্তি দেয়।

তিনি মনে করিয়ে দেন, সৌন্দর্য কোনও স্থায়ী বিষয় নয়। বয়স, সময় আর পরিস্থিতির সঙ্গে তার সংজ্ঞা বদলায়। কিন্তু প্রতিভা, পরিশ্রম আর ব্যক্তিত্ব দীর্ঘদিন মানুষের মনে থেকে যায়। একজন অভিনেত্রীর প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে থাকে তাঁর অভিনয় দক্ষতা, অভিব্যক্তি আর আত্মবিশ্বাসে—কেবলমাত্র নিখুঁত মুখাবয়বে নয়। নিজের শরীর বা চেহারা নিয়ে লজ্জিত হওয়ার কোনও কারণ নেই বলেই মনে করেন মাধুরী।

বরং নিজের যেটুকু আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে, সেটাকেই শক্তিতে বদলে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সেই আলাদা হওয়াটাই একজন শিল্পীকে ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। মাধুরীর এই দর্শন নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন, নিজের স্বতন্ত্রতাকে সম্মান করুন, কারণ সেটাই আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ।

মাধুরী দীক্ষিতের জীবনের এই অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, সাফল্য কখনওই একদিনে ধরা দেয় না। তার আগে পেরোতে হয় বহু কঠিন সময়—সন্দেহ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং চারপাশ থেকে ছুটে আসা কটু কথার আঘাত। বিশেষ করে বিনোদন জগতের মতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও চেহারাকেন্দ্রিক ইন্ডাস্ট্রিতে এই লড়াই আরও তীব্র হয়ে ওঠে। প্রতিটি নতুন মুখকেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণের পাশাপাশি লড়তে হয় সমাজের তৈরি করা সৌন্দর্যের ছাঁচের সঙ্গে। মাধুরীও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না।

‘তেজ়াব’ ছবির আগে একসময় তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছিলেন—আদৌ কি তিনি এই জগতের জন্য উপযুক্ত? রূপ, গঠন, গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয়ের জাল তাঁকে ঘিরে ধরেছিল। কিন্তু সেই কঠিন সময়েই নিজের উপর বিশ্বাস হারাননি তিনি। পরিবারের সমর্থন, বিশেষ করে মায়ের একটি সহজ অথচ দৃঢ় পরামর্শ, তাঁর মানসিক শক্তির মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। সময় প্রমাণ করে দেয়, আত্মবিশ্বাস আর কঠোর পরিশ্রমের জোরেই সব সমালোচনার জবাব দেওয়া সম্ভব।

‘তেজ়াব’ মুক্তির পর পরিস্থিতি বদলে যায়। যাঁরা একসময় তাঁর চেহারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাঁরাই পরে মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন তাঁর অভিনয়, নাচ আর পর্দার উপস্থিতি। যে মাধুরী একদিন নিজেকে নিয়ে সংশয়ে ভুগেছিলেন, তিনিই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন বলিউডের অন্যতম আইকনিক অভিনেত্রী—যাঁর নাম আজও সাফল্য, সৌন্দর্য ও দক্ষতার প্রতীক।

এই গল্প শুধু মাধুরী দীক্ষিতের একার নয়। এটি প্রতিটি তরুণ শিল্পীর গল্প, যাঁরা প্রতিদিন নিজেদের চেহারা, প্রতিভা কিংবা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে লড়াই করে চলেছেন। সমাজের চাপ, তুলনা আর সমালোচনার মাঝেও নিজের স্বতন্ত্রতাকে আঁকড়ে ধরাই সবচেয়ে বড় সাহস। মাধুরীর মায়ের সেই সহজ অথচ গভীর পরামর্শ আজও সমান প্রাসঙ্গিক—ভাল কাজই শেষ পর্যন্ত সব প্রশ্নের সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্থায়ী উত্তর হয়ে ওঠে।

Preview image