Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বঙ্গবিভূষণ নচিকেতা শ্রীজাত পরম পেলেন বঙ্গভূষণ ভাষা দিবসে বঙ্গসম্মানের তালিকায় রয়েছেন আর কারা

একুশে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বাংলার এক ঝাঁক তারকাকে এ বছরের বঙ্গবিভূষণ ও বঙ্গভূষণ সম্মাননায় ভূষিত করল রাজ্য সরকার। তালিকায় রয়েছেন সঙ্গীতজগতের ও বিনোদন জগতের একাধিক কতী মানুষ।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বাঙালির আবেগের দিন। ভাষার জন্য আত্মবলিদানের ইতিহাস স্মরণ করে এই দিনটি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে সংস্কৃতি, সাহিত্য, সঙ্গীত ও শিল্পকলার এক সমবেত উদ্‌যাপন। এই বিশেষ দিনেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে ঘোষণা করা হয় ‘বঙ্গ সম্মান’। চলতি বছরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সঙ্গীত ও বিনোদনজগতের একঝাঁক কৃতী ব্যক্তিত্বকে বঙ্গবিভূষণ ও বঙ্গভূষণ সম্মাননায় ভূষিত করে রাজ্য সরকার বাংলা সংস্কৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানাল।

সম্মানের তাৎপর্য

‘বঙ্গবিভূষণ’ ও ‘বঙ্গভূষণ’— এই দুই সম্মান শুধু পুরস্কার নয়, বরং এক ধরনের স্বীকৃতি, যা শিল্পীর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতার প্রতি সমাজের কৃতজ্ঞতার প্রতিফলন। এই সম্মান প্রাপকদের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সাংস্কৃতিক মহলে তৈরি হয় আলোচনার ঝড়। কারণ, এই তালিকায় থাকেন এমন সব মানুষ, যাঁরা নিজেদের কর্মের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন।

পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়: অভিনয়ের বহুস্তরীয় যাত্রা

এ বছর বঙ্গভূষণ সম্মান পেয়েছেন অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। প্রায় তিন দশকের দীর্ঘ কেরিয়ারে তিনি বাংলা চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও ওয়েব সিরিজ়ের জগতে এক পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য মুখ। ছোটবেলায় অভিনয় শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে নিজেকে বারবার নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। সমান্তরাল সিনেমা থেকে বাণিজ্যিক ছবি— সব ধারাতেই তাঁর সাবলীল উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

শুধু টালিগঞ্জ নয়, মুম্বইয়েও তিনি নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন। হিন্দি ছবিতেও অভিনয় করে জাতীয় স্তরে নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছেন। পরিচালক হিসেবেও তাঁর সৃজনশীলতা প্রশংসিত। ফলে এই সম্মান তাঁর দীর্ঘ পরিশ্রম ও বহুমাত্রিক প্রতিভার স্বীকৃতি বলেই মনে করছেন অনুরাগীরা।

সঙ্গীতের জগতে বঙ্গবিভূষণ

গানের জগতে অনন্য অবদানের জন্য এ বছর বঙ্গবিভূষণ সম্মান পেয়েছেন একাধিক শিল্পী। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শিবাজী চট্টোপাধ্যায়, শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়, নচিকেতা চক্রবর্তী, ইমন চক্রবর্তী, লোপামুদ্রা মিত্র এবং গায়ক তথা রাজনীতিক বাবুল সুপ্রিয়। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে বাংলা সঙ্গীতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন।

শিবাজী চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরে বাংলা গানের ভুবনে সক্রিয়। শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সমানভাবে শ্রোতাদের মন জয় করেছেন। নচিকেতা চক্রবর্তী তাঁর ব্যতিক্রমী গানের কথা ও সুরের মাধ্যমে নব্বইয়ের দশকে এক নতুন ধারার সূচনা করেন। সমাজ-বাস্তবতা, ব্যক্তিগত আবেগ ও প্রতিবাদ— সব মিলিয়ে তাঁর গান আজও সমান জনপ্রিয়।

ইমন চক্রবর্তী আধুনিক বাংলা গানের অন্যতম উজ্জ্বল নাম। তাঁর কণ্ঠে আধুনিকতা ও শাস্ত্রীয়তার এক সুন্দর মেলবন্ধন দেখা যায়। লোপামুদ্রা মিত্র কবিতাকে সুরে বেঁধে শ্রোতাদের সামনে পরিবেশন করে এক আলাদা ঘরানা তৈরি করেছেন। অন্য দিকে, বাবুল সুপ্রিয় গানের পাশাপাশি রাজনীতির ময়দানেও পরিচিত মুখ হলেও তাঁর সঙ্গীতজীবনের অবদান অনস্বীকার্য।

চিত্রকলা ও সাহিত্যেও স্বীকৃতি

শুধু সঙ্গীত নয়, চিত্রকলা ও সাহিত্যক্ষেত্রেও এ বছর সম্মান জানানো হয়েছে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের। চিত্রকর গণেশচন্দ্র হালুই তাঁর ক্যানভাসে যে রঙের জাদু সৃষ্টি করেছেন, তা আন্তর্জাতিক মহলেও সমাদৃত। কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় সমকালীন বাংলা কবিতার এক উল্লেখযোগ্য কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতায় যেমন ব্যক্তিগত আবেগ, তেমনই সামাজিক সচেতনতার ছাপ স্পষ্ট।

বঙ্গভূষণ সম্মানপ্রাপ্ত শিল্পীরা

পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের পাশাপাশি বঙ্গভূষণ সম্মান পেয়েছেন গায়ক মনোময় ভট্টাচার্য, রাঘব চট্টোপাধ্যায়, রূপঙ্কর বাগচি, কার্তিক দাস বাউল ও অদিতি মুন্সী।

মনোময় ভট্টাচার্যের প্রায় তিন দশকের কেরিয়ারে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও আধুনিক বাংলা গানের এক বিশেষ স্থান রয়েছে। তাঁর কণ্ঠের গভীরতা ও আবেগ শ্রোতাদের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।

রূপঙ্কর বাগচি জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী। বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠে একাধিক হিট গান রয়েছে। তাঁর গায়কির স্বাতন্ত্র্য তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

news image
আরও খবর

অদিতি মুন্সীর যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি রিয়্যালিটি শো থেকে। সেখান থেকে কীর্তন শিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তা, পরে রাজনৈতিক অঙ্গনে পদার্পণ— তাঁর পথচলা বহুমুখী। এ বার বঙ্গভূষণ সম্মান তাঁর শিল্পীসত্তার স্বীকৃতি।

রাঘব চট্টোপাধ্যায় আধুনিক বাংলা গানের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠ। সুর ও আবেগের মেলবন্ধনে তিনি শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যান। কার্তিক দাস বাউল বাউল সঙ্গীতের ধারাকে জীবন্ত রেখে চলেছেন। গ্রামীণ সুরকে শহুরে মঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ভাষা দিবস ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধন

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এই সম্মান প্রদানের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। শিল্পীরা তাঁদের কাজের মাধ্যমে ভাষাকে জীবন্ত রাখেন, নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেন। ফলে ভাষা দিবসে তাঁদের সম্মান জানানো মানে বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন।
 

উপসংহার

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ‘বঙ্গ সম্মান’ প্রদান শুধু একটি প্রশাসনিক অনুষ্ঠান নয়, এটি আসলে বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক গভীর প্রকাশ। ভাষার জন্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে স্মরণ করে যে দিনটি আমরা উদ্‌যাপন করি, সেই দিনেই শিল্পী, সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ ও সংস্কৃতিসেবীদের সম্মান জানানো— এর মধ্যে রয়েছে এক গভীর প্রতীকী অর্থ। কারণ ভাষা কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; ভাষা বেঁচে থাকে গান, কবিতা, অভিনয়, চিত্রকলার মতো সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়েই।

চলতি বছরের সম্মানপ্রাপকদের তালিকা প্রমাণ করে, বাংলা সংস্কৃতি কত বহুমাত্রিক ও প্রাণবন্ত। একদিকে যেমন অভিনয়ের জগতে দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করা শিল্পী, অন্যদিকে তেমনই সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারায় সমান দক্ষ কণ্ঠশিল্পী— সকলেই এই সম্মানের মাধ্যমে এক মঞ্চে মিলিত হয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের কাজের ধরন আলাদা, সৃজনশীলতার ভাষা আলাদা, কিন্তু সবার মূল সূত্র এক— বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অগাধ ভালবাসা।

এই সম্মান তাঁদের ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতি হলেও, তা একই সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতির ধারাবাহিকতারও উদ্‌যাপন। একজন শিল্পীর পথচলা কখনও সহজ হয় না। দীর্ঘদিনের সাধনা, অনুশীলন, সংগ্রাম, প্রত্যাখ্যান— সব কিছুর মধ্য দিয়ে তৈরি হয় তাঁর পরিচিতি। সেই পথের স্বীকৃতি যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের তরফে আসে, তখন তা কেবল একটি পুরস্কার নয়, বরং এক প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে এই সম্মান এক বড় বার্তা বহন করে— নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতা কখনও বৃথা যায় না। যারা আজ সঙ্গীত শিখছে, অভিনয়ের ক্লাস করছে, কবিতা লিখছে বা রংতুলি হাতে ক্যানভাসে স্বপ্ন আঁকছে, তাদের কাছে এই পুরস্কারপ্রাপ্তরা একেকটি জীবন্ত উদাহরণ। তাঁদের সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে, বাংলা ভাষায় কাজ করেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্য অর্জন সম্ভব।

এ ছাড়াও, এই সম্মান বাংলা সংস্কৃতির ঐক্য ও বৈচিত্র্যকেও সামনে আনে। রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে আধুনিক গান, বাউল থেকে কীর্তন, সমান্তরাল সিনেমা থেকে জনপ্রিয় ধারার ছবি— সব ধারাই এখানে সমান মর্যাদা পেয়েছে। অর্থাৎ সংস্কৃতির কোনও একক রূপ নয়, বরং তার বহুস্বরকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

মাতৃভাষা দিবসে এই উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ভাষার মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব কেবল ইতিহাসের স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বর্তমানের সৃষ্টিশীল কাজের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। শিল্পীরাই সেই দায়িত্ব পালন করেন নীরবে, প্রতিদিন। তাঁদের গান, অভিনয়, কবিতা বা ছবির মাধ্যমে বাংলা ভাষা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায় আরও আধুনিক, আরও প্রাসঙ্গিক রূপে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এ বছরের ‘বঙ্গ সম্মান’ কেবল সম্মাননা প্রদান নয়, এটি বাংলা সংস্কৃতির এক উৎসব। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভাষা ও সংস্কৃতি কোনও স্থির বিষয় নয়; তা ক্রমাগত বিকশিত হয়, নতুন প্রতিভার স্পর্শে সমৃদ্ধ হয়। আর সেই বিকাশের নেপথ্যে যাঁরা নিরলস কাজ করে চলেছেন, তাঁদের সম্মান জানানো মানেই আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে আরও দৃঢ় করা।

এই স্বীকৃতি শিল্পীদের যেমন গর্বিত করে, তেমনই বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাকেও আরও সমৃদ্ধ করে তোলে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার শপথের পাশাপাশি শিল্প ও সংস্কৃতির এই উদ্‌যাপনই প্রমাণ করে— বাংলা ভাষা শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়, বর্তমানের সৃজনশীলতায়ও সমান শক্তিশালী, জীবন্ত ও গৌরবান্বিত।

Preview image