ডিজিটাল যুগে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা হাতের মুঠোয় এসে পৌঁছেছে ঠিকই, কিন্তু সেই সুবিধার সুযোগ নিচ্ছে সাইবার অপরাধীরা। সতর্ক হোন! নকল ব্যাঙ্কিং অ্যাপেই উধাও হচ্ছে আপনার সঞ্চয় এই সতর্কবার্তা এখন খুবই প্রাসঙ্গিক, কারণ প্রতিদিনই বাড়ছে ভুয়ো অ্যাপের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনা। সাধারণ মানুষ যেভাবে অনলাইন ব্যাঙ্কিংয়ের ওপর নির্ভর করছেন, সেই একই গতিতে বাড়ছে সাইবার অপরাধের কৌশলও। নকল ব্যাঙ্কিং অ্যাপগুলি দেখতে একেবারে আসল ব্যাঙ্কের অ্যাপের মতো, একই রকম লোগো, রঙ, ডিজাইন ও অপশন। ফলে ব্যবহারকারীরা ভুল বুঝে সেই অ্যাপ ডাউনলোড করে ফেলছেন এবং অজান্তেই প্রতারকদের হাতে তুলে দিচ্ছেন নিজের ব্যাঙ্কের যাবতীয় তথ্য। এই ধরনের ভুয়ো অ্যাপ সাধারণত অননুমোদিত লিঙ্ক, অচেনা ওয়েবসাইট বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইনস্টল হয়। ইনস্টল হওয়ার পর অ্যাপটি আপনার ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড, ওটিপি, এটিএম পিন, এমনকি কেওয়াইসি ডকুমেন্ট পর্যন্ত সংগ্রহ করে। ব্যবহারকারী যখন এই তথ্য দিতে শুরু করেন, ঠিক তখনই হ্যাকাররা রিয়েল টাইমে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে লগ ইন করে টাকা ট্রান্সফার করে দেয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে খালি হয়ে যায় সঞ্চয়ের অ্যাকাউন্ট। আরও ভয়ানক বিষয় হলো, অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তাঁরা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কারণ প্রতারকরা এমনভাবে অ্যাপ তৈরি করে যে, তা আসল অ্যাপের মতোই কাজ করতে থাকে, ফলে সন্দেহের সুযোগ থাকে না। অনেকে আবার ভুয়ো কাস্টমার কেয়ার নম্বর বা ব্যাঙ্ক প্রতিনিধির পরিচয়ে ফোন করে নকল অ্যাপ ডাউনলোড করিয়ে নেয়। এসব প্রতারণা আটকাতে ব্যাঙ্ক ও সাইবার সেলের পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে, কিন্তু এখনো বহু মানুষ অজান্তে জাল অ্যাপ ব্যবহার করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাঙ্কিং অ্যাপ সবসময় গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকেই ডাউনলোড করা উচিত। কোনো লিঙ্ক বা বার্তা দেখে অ্যাপ ইনস্টল করা বিপজ্জনক। ফোনে কোনো অজানা নম্বর থেকে কেওয়াইসি আপডেট বা অ্যাকাউন্ট ব্লকের নামে অ্যাপ ডাউনলোড করার অনুরোধ এলে তা অবশ্যই উপেক্ষা করতে হবে। কোনো সমস্যায় পড়লে সরাসরি ব্যাঙ্কের অফিসিয়াল হেল্পলাইন নম্বরে যোগাযোগ করা উচিত। নিজের ব্যাঙ্ক ডিটেইলস কখনোই কাউকে শেয়ার করা যাবে না এই সচেতনতা আজ অত্যন্ত জরুরি। আজকের দিনে আপনার সঞ্চয় আপনাকেই রক্ষা করতে হবে। সতর্ক থাকুন, নিরাপদ থাকুন।
আজকের পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নগদ টাকার ব্যবহার কমে গিয়ে মানুষ এখন আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন মোবাইল ব্যাঙ্কিং এবং ডিজিটাল লেনদেনের ওপর। রিচার্জ হোক, বিল পরিশোধ, ইনস্যুরেন্স, স্কুল ফি বা দৈনন্দিন কেনাকাটা সবই এখন মোবাইলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। একসময় যে কাজের জন্য ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো, তা আজ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেরে ফেলা যায়। এই সুবিধাই আমাদের দিনকে সহজ করেছে, কিন্তু সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে এসেছে নতুন এক অদৃশ্য বিপদ নকল বা ভুয়ো ব্যাঙ্কিং অ্যাপের প্রতারণা। মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ অর্থ, আর সেই অর্থ আজ মাত্র একটি ভুল ট্যাপ বা ভুল অ্যাপ ইনস্টলের কারণে পুরোপুরি উধাও হয়ে যেতে পারে।
ডিজিটাল ব্যাঙ্কিংয়ের এই সুবিধার জগতে অনেকেই ভেবেছিলেন অনলাইন ব্যাঙ্কিং তাদের জীবনকে মুক্তি দিয়েছে ঝামেলা থেকে। কিন্তু সুবিধার এই আবরণে এমন এক ভয়ঙ্কর হুমকি লুকিয়ে রয়েছে, যা প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে গ্রাস করছে অজ্ঞাতসারে। এমনই এক ঘটনার শিকার হয়ে কলকাতার এক প্রাইভেট কোম্পানির কর্মচারীর অ্যাকাউন্ট থেকে এক মুহূর্তে উধাও হয়ে গিয়েছিল তাঁর বহু বছরের সঞ্চয়। তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি যে যেই অ্যাপটি তিনি ডাউনলোড করেছিলেন তা আসলে তাঁর ব্যাঙ্কের অ্যাপ নয়, বরং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তৈরি একটি ভুয়ো অ্যাপ। এমন প্রতারকদের দাপট আজ শুধু শহরেই নয়, গ্রামাঞ্চলেও ভয়ানকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
নকল ব্যাঙ্কিং অ্যাপগুলি দেখতে এমনভাবে তৈরি করা হয় যে আসল অ্যাপের সঙ্গে তফাৎ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রতারকরা যেভাবে আসল লোগো, রঙ, ইন্টারফেস, এমনকি ব্যাঙ্কের অফিসিয়াল ভাষাও নকল করে নেয়, তাতে সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে প্রতারণা ধরে ফেলা কঠিন হয়ে পড়ে। অ্যাপটি ইনস্টল করলেই শুরু হয় ধীরে ধীরে বিপদের মুহূর্ত। প্রথমে ব্যবহারকারীর কাছে লগ ইনের নাম করে চাওয়া হয় ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড, তারপর আসে ডেবিট কার্ড নম্বর, তার পরেই ওটিপি। ব্যবহারকারী ভেবে নেন যে সব ঠিকভাবেই চলছে, কারণ অ্যাপটি যেন সত্যিই কাজ করছে। অথচ সেই মুহূর্তেই তাঁর দেওয়া প্রতিটি তথ্য সরাসরি পাঠানো হচ্ছে প্রতারকদের সার্ভারে, যেখানে মুহূর্তে তারা তার অ্যাকাউন্টে লগ ইন করে শুরু করে টাকা লোপাট।
মানুষের ভয়, উদ্বেগ, লোভ এই তিনকে হাতিয়ার করে প্রতারকরা কাজ করে। আপনার কেওয়াইসি সংযুক্ত নেই অ্যাকাউন্ট ব্লক হয়ে যাবে , “ব্যাঙ্ক সার্ভার আপডেট করুন এমন ভুয়ো বার্তায় মানুষ সহজেই আতঙ্কিত হয়। এই ভয়ই মানুষকে ভুল পথে চালিত করে। অনেকেই না বুঝে লিঙ্কে ক্লিক করেন, আবার অনেক সময় ব্যাঙ্ক কর্মকর্তার নামে ফোন করে যে অ্যাপ ইনস্টল করিয়ে নেওয়া হয়, তা আসলে ফাঁদের প্রথম ধাপ। প্রতারকরা মানুষের মনস্তত্ত্ব বেশ ভালোই বোঝে। তাই যে ভাষায়, যে ভঙ্গিতে কথা বলে, তা শুনে যে কেউই ভাবতে পারেন হয়তো সত্যিই ব্যাঙ্ক থেকে ফোন এসেছে। মানুষের এই বিশ্বাসকেই অস্ত্র করে প্রতারকরা দিনে দিনে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জালিয়াতির মাত্রা বাড়িয়ে তুলছে।
সমস্যার মূল কারণ হলো অল্প ডেটায় মানুষ ডিজিটাল ব্যাঙ্কিংয়ের সুবিধা পেলেও ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতনতা তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। গ্রামের দিকে তো আরও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। সেখানে আইটি সচেতনতা কম, অথচ সবাই ফোনে ব্যাঙ্কিং করছে। ফলে নতুন প্রতারণা, নতুন কৌশল, নতুন ধরনের অ্যাপ এ সবই সাধারণ মানুষকে সহজেই টার্গেট বানাচ্ছে। আজকের দিনে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে মানুষ বুঝতেই পারছেন না কোন অ্যাপ সত্যি আর কোনটি মিথ্যে। কারণ প্রতারকরা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে, যেটা আসল প্রতিষ্ঠানগুলোর থেকেও কখনও কখনও উন্নত।
নকল ব্যাঙ্কিং অ্যাপ সাধারণত প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোরে থাকে না। এগুলো ডাউনলোড করানো হয় ভুয়ো লিঙ্কের মাধ্যমে, যা আসে হোয়াটসঅ্যাপ, এসএমএস, ই মেইল বা সোশ্যাল মিডিয়ার বার্তায়। এমনকি কখনও কখনও দেখা যায় গুগলে সার্চ করলে উপরে উঠে আসে ভুয়ো ব্যাঙ্কিং ওয়েবসাইট, যেখানে থাকে ডাউনলোড লিঙ্ক। সেখান থেকেই সহজেই কেউ ইনস্টল করে ফেলে জাল অ্যাপ। আশ্চর্য হলেও সত্যি, প্রযুক্তি যতটা উন্নত হয়েছে, প্রতারকরাও ততটাই উন্নত পথে হেঁটে গেছে।
এই নকল অ্যাপগুলো ফোনে ঢুকেই প্রথমে বিভিন্ন পারমিশন চায়। ব্যবহারকারীরা গুরুত্ব না দিয়েই পারমিশন অনুমোদন করে দেন। অথচ সেই পারমিশন দিয়েই অ্যাপটি শুরু করে নজরদারি। ফোনে আসা প্রতিটি বার্তা, প্রতিটি নোটিফিকেশন, ওটিপি, এমনকি স্ক্রিনে যা দেখা যাচ্ছে তাও রেকর্ড করে অ্যাপটি পাঠিয়ে দেয় প্রতারকদের কাছে। ফলে ব্যবহারকারী যা ই লিখুন না কেন, প্রতারকরা সবই রিয়েলটাইমে দেখে ফেলতে পারে। এমনকি ব্যাঙ্কের সিকিউরিটি পেজে ঢুকেও কোনও তথ্য গোপন থাকে না।
ব্যাঙ্ক এবং আরবিআই বারবার সতর্ক করেও পরিস্থিতি তেমন বদলাচ্ছে না। কারণ সাধারণ মানুষ এখনো বিশ্বাস করেন যে ব্যাঙ্ক হয়তো সত্যিই ফোন করতে পারে। অনেকে জানেন না যে ব্যাঙ্ক কখনো ফোন করে ওটিপি চায় না, ব্যাঙ্ক কখনো কোনও অ্যাপ ইনস্টল করাতে বলে না, এবং কোনও কেওয়াইসি আপডেটের জন্য লিঙ্ক পাঠায় না। মানুষের এই অজ্ঞতাই প্রতারকদের সুবিধা দেয়। আর তারা এই সুযোগের পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করে।
সাইবার সেলের রিপোর্ট বলছে ভারতে প্রতিদিন শত শত মানুষ নকল ব্যাঙ্কিং অ্যাপের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। ক্ষতির পরিমাণ কখনো কয়েক হাজার, কখনো কয়েক লক্ষ, আবার কখনো মানুষের বহু বছরের সঞ্চয়। অথচ বেশিরভাগ মানুষই লজ্জা বা অজ্ঞতার কারণে অভিযোগ করেন না। অনেকেই মনে করেন টাকা ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়, তাই চুপ থাকাই ভালো। কিন্তু এই চুপ থাকা প্রতারকদের আরও সুযোগ করে দেয় নতুন শিকার খুঁজে বের করার।
মানুষ প্রতারিত হওয়ার মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো প্রচণ্ড তাড়াহুড়া। আধুনিক মানুষের জীবনে সময়ের অভাব এতটাই যে তারা মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে কাজ করতে গিয়েই ভুল করে বসেন। লিঙ্কে ক্লিক করার আগে ভাবার সময় পাওয়া যায় না। অনেকে আবার প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত বিশ্বাস করেন। এই বিশ্বাসই মাঝে মাঝে তাদের ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। কেউ কেউ আবার খুব কম মূল্যে লোন পাওয়ার লোভে নকল অ্যাপ ডাউনলোড করেন। আবার অনেকেরই ধারণা থাকে আমার তো সঞ্চয় কম, আমাকে কে প্রতারণা করবে কিন্তু প্রতারকদের কাছে প্রতিটি অ্যাকাউন্টই লাভজনক, যতটুকুই থাকুক না কেন।
সব মিলিয়ে মানুষের এই প্রতিদিনের ভুল এবং সচেতনতার অভাবই প্রতারকদের শিকার হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। আর মানুষের অসচেতনতার ফল হয় ভয়ঙ্কর। পরিবারের সমস্ত সঞ্চয় মুহূর্তে হারিয়ে গেলে যে মানসিক অবস্থার সৃষ্টি হয় তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। অনেকেই হতাশায় ভেঙে পড়েন, অনেকে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনিও আজকের ব্যস্ত পৃথিবীতে মানসিক চাপ প্রচুর, তার ওপর আর্থিক ক্ষতির চাপ মানুষকে সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
কিন্তু এই প্রতারণা থেকে রক্ষা পাওয়া খুব কঠিন নয়। প্রয়োজন শুধু সচেতনতার। মানুষ যদি বুঝতে শেখেন কোন বার্তায় সন্দেহ থাকা উচিত, কোন লিঙ্কে ক্লিক করা উচিত নয়, কোন অ্যাপ কোথা থেকে ইনস্টল করতে হয়, তাহলে অনেকাংশেই প্রতারণা আটকানো সম্ভব। আসল কথা হলো, ব্যাঙ্ক কখনো লিঙ্ক পাঠিয়ে কাজ করায় না। ব্যাঙ্কের অফিসিয়াল অ্যাপ শুধুমাত্র প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোরে থাকে। ব্যাঙ্ক কখনো ফোন করে ওটিপি বা পিন চায় না। মানুষের এই কয়েকটি বিষয় মনে থাকলেই বড় বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
শেষ পর্যন্ত বলতে হয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে, তেমনই উন্নত হচ্ছে প্রতারণার কৌশলও। প্রতারকদের কাছ থেকে নিজেকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় হলো সতর্কতা। নিজের ফোন, নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, নিজের সঞ্চয় এসব বাঁচানোর দায়িত্ব মানুষের নিজেরই। নকল ব্যাঙ্কিং অ্যাপের মতো বিপদ আজ চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। বাস্তবতা হলো, এক ক্লিক ভুল করলেই সর্বনাশ, আর এক মুহূর্ত সচেতন থাকলেই রক্ষা।