পুতিনের ‘আস্থাভাজন’ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ভ্লাদিমির আলেক্সেয়েভ ২০২৩ সালে ভাড়াটে সেনা ওয়াগনারের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোঝিনের ‘বিদ্রোহ’ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তিবৈঠকেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি।পরবর্তী রুশ সেনাপ্রধান হিসাবে তাঁর নাম নিয়ে জল্পনা ছিল। শুক্রবার সকালে মস্কোর সামরিক আবাসন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘আস্থাভাজন’ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ভ্লাদিমির আলেক্সেয়েভ। এই ঘটনায় ইউক্রেনের মদতপুষ্ট ঘাতকবাহিনীর হাত রয়েছে বলে রুশ সরকারি সংবাদ মাধ্যমের একাংশের ইঙ্গিত।
রাশিয়ার সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাস’ জানাচ্ছে, উত্তর-পশ্চিম মস্কোর ওই আবাসনে ঢুকে আলেক্সেয়েভকে পর পর গুলি করে আততায়ী। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পুতিন-ঘনিষ্ঠ এই লেফটেন্যান্ট জেনারেল ভ্লাদিমির আলেক্সেয়েভ ২০২৩ সালে ইয়েভগেনি প্রিগোঝিনের ভাড়াটে সেনা ওয়াগনারের ‘বিদ্রোহ’ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। প্রাথমিক ভাবে প্রিগোঝিনের সঙ্গে আলোচনা করতে আলেক্সেয়েভকেই পাঠিয়েছিলেন পুতিন।২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিয়েছিলেন পুতিন। তার পর থেকে টানা দু’বছর সামনের সারিতে থেকে রুশ সেনাকে পরিচালনা করেছেন আলেক্সেয়েভ। তাঁর নেতৃত্বেই ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শহর মারিয়ুপোল দখল করেছিল রুশ সেনা। গত বছর ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি বৈঠকেও রুশ প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন এই সেনাকর্তা। প্রসঙ্গত, গত চার বছরের সংঘাত পর্বে ইউক্রেন বেশ কয়েক বার রাশিয়ার সেনাকর্তাদের উপর হামলা চালানোর দাবি করেছে। এ বার কিভের তরফে এখনও কোনও বিবৃতি মেলেনি।২০২৪ সালে মস্কোর একটি আবাসিক ভবনের বাইরে ইগর কিরিলভ নামের এক রুশ জেনারেলকে হত্যার দায়ে গত জানুয়ারিতে উজবেকিস্তানের এক নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা এসবিইউ-এর দাবি, তারাই ওই হামলা চালিয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মস্কোয় গাড়ির নীচে রাখা আইইডি বিস্ফোরণে রুশ সেনার প্রশিক্ষণ বিভাগের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফানিল সারভারভ নিহত হয়েছিলেন। জানুয়ারির শেষ পর্বে রুশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছিল, সেন্ট পিটার্সবার্গে এক জন রুশ সেনা আধিকারিকের উপর হামলা চালানোর চেষ্টা প্রতিহত করেছে তারা। ঘটনাচক্রে, আবুধাবিতে আমেরিকার মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি বৈঠকের মধ্যেই আবার নিশানা হলেন এক রুশ সেনাকর্তা।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই যুদ্ধক্ষেত্রের সীমা বহু দূর অতিক্রম করেছে। ডনবাস, খারকিভ বা খেরসনের ময়দান ছাড়িয়ে সংঘাতের প্রভাব পৌঁছে গেছে রাজধানী মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ এমনকি বিদেশের কূটনৈতিক মঞ্চ পর্যন্ত। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে—রুশ সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা একের পর এক নাশকতা, হত্যাচেষ্টা ও গুপ্ত হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছেন। এতে যুদ্ধের প্রকৃতি আরও জটিল, অদৃশ্য এবং ‘শ্যাডো ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধের রূপ নিচ্ছে।
২০২৪ সালে মস্কোর একটি আবাসিক ভবনের বাইরে রুশ জেনারেল ইগর কিরিলভকে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড ছিল না—এটি ছিল রাশিয়ার নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে ঢুকে পড়া শত্রুপক্ষের সক্ষমতার প্রতীক।
হত্যার ধরন, পরিকল্পনা এবং টার্গেট নির্বাচনের নির্ভুলতা বিশ্লেষকদের মতে অত্যন্ত পেশাদার গোয়েন্দা অপারেশনের ইঙ্গিত দেয়। পরে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে উজবেকিস্তানের এক নাগরিককে এই হত্যার দায়ে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরও বড় চমক আসে যখন ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা এসবিইউ (SBU) দাবি করে—এই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তারাই জড়িত।
আন্তর্জাতিক গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে সরাসরি দায় স্বীকার বিরল। সাধারণত রাষ্ট্রগুলি ‘প্লজিবল ডিনায়াবিলিটি’ বজায় রাখে। কিন্তু এসবিইউ-এর দাবি যুদ্ধের নতুন মনস্তাত্ত্বিক কৌশলও হতে পারে।
এর মাধ্যমে তিনটি বার্তা দেওয়া হয়েছে:
রাশিয়ার ভেতরেও তারা আঘাত হানতে সক্ষম
রুশ সামরিক নেতৃত্ব নিরাপদ নয়
যুদ্ধ শুধু ফ্রন্টলাইনে সীমাবদ্ধ নয়
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মস্কোতেই আরেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। রুশ সেনার প্রশিক্ষণ বিভাগের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফানিল সারভারভ গাড়ির নীচে রাখা আইইডি বিস্ফোরণে নিহত হন।
এই হামলার বৈশিষ্ট্য:
লক্ষ্যভিত্তিক হত্যা
সামরিক পরিকল্পনাকারীকে টার্গেট
রাজধানীর ভেতরে অপারেশন
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রশিক্ষণ বিভাগের প্রধানকে হত্যা মানে ভবিষ্যৎ সেনা প্রস্তুতিকে আঘাত করা।
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের টার্গেট করার পেছনে কৌশলগত কারণ থাকে:
কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল দুর্বল করা
পরিকল্পনা ব্যাহত করা
মনোবল ভাঙা
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ভীতি সৃষ্টি
এটি প্রচলিত যুদ্ধের পাশাপাশি ‘ডিসরাপশন ওয়ারফেয়ার’-এর অংশ।
২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষদিকে রুশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জানায়—সেন্ট পিটার্সবার্গে এক রুশ সেনা আধিকারিকের ওপর হামলার চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে।
এটি দেখায়:
হামলার ধারাবাহিকতা
একাধিক শহরে নেটওয়ার্ক সক্রিয়
নিরাপত্তা বাহিনী উচ্চ সতর্কতায়
যুদ্ধ এখন শহরের ভেতরে:
গাড়িবোমা
টার্গেটেড শুটিং
বিষপ্রয়োগ
গুপ্ত বিস্ফোরণ
এগুলো ক্লাসিক ইন্টেলিজেন্স অপারেশন।
ঘটনাচক্রে, আবুধাবিতে আমেরিকার মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি বৈঠক চলাকালীন আবার এক রুশ সেনাকর্তা নিশানা হন।
টাইমিংটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সম্ভাব্য বার্তা:
আলোচনার মাঝেও চাপ বজায়
কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা
শক্তির প্রদর্শন
এই হামলাগুলো শুধু শারীরিক ক্ষতি নয়—মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও ফেলে।
রুশ সেনা নেতৃত্বের মধ্যে:
নিরাপত্তা উদ্বেগ
চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা
সিদ্ধান্ত গ্রহণে চাপ
এই ঘটনাগুলো প্রশ্ন তুলছে:
নিরাপত্তা বলয় কতটা শক্ত?
গোয়েন্দা ফাঁক কোথায়?
বিদেশি নেটওয়ার্ক কতটা সক্রিয়?
উজবেক নাগরিক গ্রেফতার হওয়া দেখায়:
তৃতীয় দেশের নাগরিক ব্যবহার
ভাড়াটে নেটওয়ার্ক
ডিনায়াবিলিটি স্ট্র্যাটেজি
বর্তমান সংঘাতের তিন স্তর:
প্রচলিত যুদ্ধ
সাইবার যুদ্ধ
গুপ্ত নাশকতা
এই ধরনের হামলা:
যুদ্ধবিরতি কঠিন করে
অবিশ্বাস বাড়ায়
আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করে
আবুধাবি বৈঠকে মার্কিন মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু হামলার ঘটনা দেখায়:
মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন
নিয়ন্ত্রণ সব পক্ষের হাতে নেই
টার্গেটেড হত্যা আন্তর্জাতিক আইনে বিতর্কিত।
প্রশ্ন ওঠে:
এটি কি যুদ্ধাপরাধ?
নাকি বৈধ সামরিক কৌশল?
রাশিয়া সাধারণত:
সন্ত্রাসবাদ বলে চিহ্নিত করে
কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দেয়
নিরাপত্তা জোরদার করে
সম্ভাব্য পদক্ষেপ:
ভিআইপি মুভমেন্ট গোপন
রুট পরিবর্তন
গাড়ি স্ক্যানিং
ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বৃদ্ধি
যদি এসবিইউ জড়িত হয়:
কম খরচে বড় প্রভাব
উচ্চপদস্থ ক্ষতি
মিডিয়া মনোযোগ
দায় স্বীকারও প্রচারের অংশ হতে পারে।
সম্ভাবনা:
আরও টার্গেটেড হামলা
বিদেশে রুশ কর্মকর্তাদের ওপর আঘাত
পাল্টা গুপ্ত অপারেশন
এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে:
কূটনীতিক নিরাপত্তা
সামরিক সফর
আন্তর্জাতিক সম্মেলন
সবকিছুকে প্রভাবিত করে।
রুশ সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর ধারাবাহিক হামলা দেখায়—রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ আর শুধু সীমান্তের যুদ্ধ নয়। এটি এখন গোয়েন্দা, মনস্তাত্ত্বিক ও নগরভিত্তিক ছায়াযুদ্ধের রূপ নিয়েছে।
ইগর কিরিলভ হত্যাকাণ্ড থেকে ফানিল সারভারভ বিস্ফোরণ, সেন্ট পিটার্সবার্গ হামলা প্রতিহত হওয়া এবং যুদ্ধবিরতি বৈঠকের মাঝেই নতুন টার্গেট—সব মিলিয়ে বোঝা যায় সংঘাতের গভীরতা কতটা।
যুদ্ধ থামাতে কূটনীতি যত জরুরি, ততই জরুরি গুপ্ত সংঘাত নিয়ন্ত্রণ। নচেৎ আলোচনার টেবিল যতই বসুক, ছায়াযুদ্ধ চলতেই থাকবে।
রুশ সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর ধারাবাহিক এই হামলাগুলির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রযুক্তি ও আধুনিক গোয়েন্দা কৌশলের ব্যবহার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টার্গেটেড অ্যাসাসিনেশন বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলার ক্ষেত্রে নজরদারি প্রযুক্তি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং লোকেশন ইন্টেলিজেন্স বড় ভূমিকা নিচ্ছে। কোনও সামরিক আধিকারিকের যাতায়াতের রুট, নিরাপত্তা দুর্বলতা, ব্যক্তিগত অভ্যাস—সবকিছু বিশ্লেষণ করে হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে ব্যক্তিগত জীবনও এখন নিরাপত্তার বলয়ের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।
এছাড়া এই ধরনের হামলা রাশিয়ার সামরিক প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যদি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, তাহলে কৌশলগত পরিকল্পনা ও যুদ্ধ পরিচালনায় তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে, কারণ নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বিবেচনা করতে হচ্ছে প্রতিটি পদক্ষেপে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত রুশ সামরিক বা কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা জোরদার করতে হচ্ছে। একইসঙ্গে রাশিয়াও সন্দেহভাজন নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে বিদেশি মাটিতে পাল্টা গুপ্তচর অভিযান চালাতে পারে—যা সংঘাতকে আরও আন্তর্জাতিক রূপ দিতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই হামলাগুলি জনমত প্রভাবিত করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। যখন কোনও দেশের ভেতরে উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা নিহত হন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। এর ফলে সরকারকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে জনচাপ তৈরি হয়, যা যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতেও পারে।
সবশেষে বলা যায়, রুশ সামরিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা শুধু সামরিক কৌশল নয়—এটি বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টির একটি পদ্ধতি। শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব মিলিয়ে এটি আধুনিক যুদ্ধের এক জটিল ও গভীর রূপ, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও নাড়া দিতে পারে।