Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ওড়িশায় বাঙালি শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু, আধার কার্ড চাওয়ার অভিযোগে উত্তেজনা

ওড়িশায় এক বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। নিহতের সহকর্মীর অভিযোগ, হামলাকারীরা আগে তাঁর কাছে আধার কার্ড দেখতে চেয়েছিল। পরিচয় যাচাইয়ের পরই হামলা চালানো হয় বলে দাবি। ঘটনায় পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

ওড়িশায় এক বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘিরে নতুন করে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজ্য ও রাজ্যের বাইরের শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক। নিহত শ্রমিকের সহকর্মীর বিস্ফোরক অভিযোগ—হামলাকারীরা আক্রমণের আগে তাঁর কাছে আধার কার্ড দেখতে চেয়েছিল। এই দাবি সামনে আসতেই ঘটনাটি আর নিছক একটি খুনের ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং তা রূপ নিচ্ছে পরিচয়, ভাষা ও পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত এক গুরুতর সামাজিক প্রশ্নে।

ঘটনাটি ঘটে ওড়িশার একটি কর্মক্ষেত্রে, যেখানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে গিয়ে কাজ করছিলেন একদল পরিযায়ী শ্রমিক। প্রতিদিনের মতোই সেদিনও স্বাভাবিক কাজকর্ম চলছিল। হঠাৎ করেই কয়েকজন দুষ্কৃতী সেখানে এসে হাজির হয় বলে অভিযোগ। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রথমে কথা কাটাকাটি, তারপর পরিচয় সংক্রান্ত প্রশ্ন, আর তার পরেই আচমকা হামলা। সেই হামলায় গুরুতর জখম হন ওই বাঙালি শ্রমিক। দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি।

নিহতের সহকর্মী জানিয়েছেন, হামলাকারীরা সরাসরি আধার কার্ড দেখতে চেয়েছিল। কেন আধার কার্ড দেখতে চাওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তবে সহকর্মীদের দাবি, পরিচয় যাচাইয়ের পরই পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায় এবং আক্রমণ শুরু হয়। এই বক্তব্য সামনে আসতেই সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে যে, বিষয়টি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আক্রোশ বা স্থানীয় বিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আতঙ্ক ছড়ায় ওই এলাকায় কাজ করা অন্যান্য পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে। অনেকেই কাজ ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ আবার বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের বক্তব্য, বাইরের রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা বহুদিন ধরেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, কিন্তু এই ধরনের ঘটনা সেই ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিল।

পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনযাত্রা এমনিতেই কঠিন। নিজ রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে গিয়ে কাজ করা মানেই ভাষাগত সমস্যা, সংস্কৃতিগত পার্থক্য এবং বহুক্ষেত্রে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। তার উপর যদি নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠে আসে, তাহলে সেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নিহত শ্রমিকের পরিবারও একই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তাঁদের বক্তব্য, রুজির টানে পরিবারের সদস্যকে বাইরে পাঠানো ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না, কিন্তু এমন পরিণতি হবে তা কল্পনাও করা যায়নি।

এই ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক রাজনৈতিক দল দাবি করেছে, বাইরের রাজ্যে কর্মরত বাঙালি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে হবে। কেউ কেউ আবার এই ঘটনাকে ভাষাগত বিদ্বেষ বা পরিচয় ভিত্তিক হিংসার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার দাবি তুলেছেন।

অন্যদিকে, ওড়িশা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং দোষীদের চিহ্নিত করতে সবরকম চেষ্টা চলছে। পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আধার কার্ড সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের তরফে নিশ্চিতভাবে বলা হয়নি যে, পরিচয় যাচাইয়ের কারণেই এই হামলা হয়েছে।

এই ঘটনার সামাজিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক কাজ করেন। নির্মাণ, শিল্প, হোটেল, কারখানা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাঁদের অবদান অপরিসীম। অথচ সামাজিক স্বীকৃতি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে তাঁরা প্রায়ই অবহেলিত। মাঝে মধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হামলার খবর সামনে আসে, যা জাতীয় স্তরে উদ্বেগ বাড়ায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচয়পত্র বা আধার কার্ড চাওয়ার অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তাহলে তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। আধার একটি জাতীয় পরিচয়পত্র, কিন্তু সেটিকে ব্যবহার করে কাউকে লক্ষ্যবস্তু করা হলে তা সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের সামিল। নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এই ধরনের ঘটনা সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দিকেই ইঙ্গিত করে।

নিহত শ্রমিকের পরিবার এখন শোকে ভেঙে পড়েছে। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, তাঁদের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে তাঁরা হারিয়েছেন। শুধু ন্যায়বিচার নয়, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিয়েও তাঁরা চিন্তিত। পরিবারটির দাবি, দোষীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনও পরিবারকে এই ধরনের ঘটনার শিকার হতে না হয়।

news image
আরও খবর

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের সংগঠনগুলিও সক্রিয় হয়েছে। একাধিক সংগঠন দাবি তুলেছে, বাইরের রাজ্যে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য বিশেষ হেল্পলাইন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের সচেতন করাও জরুরি, যাতে তাঁরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অবগত থাকেন।

ঘটনাটি নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল, পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যা কেবল অর্থনৈতিক নয়, তা গভীরভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক। ভাষা, পরিচয়, সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে তাঁদের পথচলা সহজ নয়। এই ধরনের হামলার ঘটনা সেই সমস্যাগুলিকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

সব মিলিয়ে, ওড়িশায় বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু শুধুমাত্র একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা নয়। এটি দেশের পরিযায়ী শ্রমিক ব্যবস্থার এক করুণ বাস্তবতার প্রতিফলন। তদন্তের ফলাফল কী দাঁড়ায়, দোষীরা আদৌ শাস্তি পায় কি না—সেদিকে নজর থাকবে সকলের। তবে এই ঘটনার অভিঘাত দীর্ঘদিন ধরে থেকে যাবে, বিশেষ করে সেই সব পরিবারের মনে, যাঁরা জীবিকার তাগিদে প্রিয়জনকে রাজ্যের বাইরে পাঠাতে বাধ্য হন।

নিহত শ্রমিকের গ্রামে এখনও শোকের আবহ। প্রতিবেশীরা জানাচ্ছেন, খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন তিনি। পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই রাজ্যের বাইরে কাজে গিয়েছিলেন। তাঁর উপার্জনের উপর নির্ভর করত গোটা পরিবার। এখন সেই পরিবার শুধু প্রিয়জনকে হারায়নি, ভবিষ্যতের আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখেও পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি তুলেছেন, পরিবারটিকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং সরকারি সহায়তা দেওয়া হোক।

পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা সমাজকর্মীদের মতে, এই ঘটনা একা নয়। অতীতেও বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের উপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলি চাপা পড়ে যায় বা স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এই ধরনের ঘটনা যদি বারবার ঘটে, তাহলে তা গোটা দেশের শ্রমিক ব্যবস্থার উপর প্রশ্নচিহ্ন তুলে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে রাজ্য ও কেন্দ্র—দু’পক্ষেরই ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য যে সমস্ত প্রকল্প ও আইন রয়েছে, সেগুলির বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। শুধু কাজের সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, নিরাপত্তা ও মর্যাদাও নিশ্চিত করা জরুরি—এই দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য রাজ্যগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। কোনও শ্রমিক যদি অন্য রাজ্যে গিয়ে সমস্যায় পড়েন, তাহলে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত। পাশাপাশি, শ্রমিকদের সচেতন করাও জরুরি—তাঁরা কোথায় অভিযোগ জানাবেন, কীভাবে আইনি সহায়তা পাবেন, সেই তথ্য সহজলভ্য হওয়া দরকার।

তদন্তের ফলাফল কী দাঁড়ায়, দোষীরা শাস্তি পায় কি না, প্রশাসন ভবিষ্যতে কী পদক্ষেপ নেয়—সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে বহু মানুষ। তবে এর পাশাপাশি সমাজের মনোভাব বদলানোও জরুরি। ভিন রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকরা কেউ বাইরের মানুষ নন, তাঁরাও এই দেশের নাগরিক—এই বোধ যতদিন না শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততদিন এই ধরনের ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

ওড়িশায় এই বাঙালি শ্রমিকের মৃত্যু তাই শুধুমাত্র একটি অপরাধের ঘটনা নয়, বরং তা দেশের সামাজিক বাস্তবতার একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি। পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজন, নিরাপত্তাহীনতা এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের অনিশ্চিত জীবন—সব মিলিয়ে এই ঘটনা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে—পরিযায়ী শ্রমিকরা কি সত্যিই নিরাপদ? পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে বিচার করার এই প্রবণতা কি সমাজের গভীরে আরও ভয়ংকর বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার দায় শুধু প্রশাসনের নয়, গোটা সমাজেরই। জীবিকার খোঁজে রাজ্যের বাইরে যাওয়া কি আজও একজন সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন নজর গোটা দেশের।

Preview image