Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

গরমের মাঝে বড় স্বস্তির খবর! দক্ষিণবঙ্গের ১১ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস, ভিজবে কলকাতাও

দক্ষিণবঙ্গের ১১ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস দিল আবহাওয়া দফতর। ৪০-৬০ কিমি বেগে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টিতে কমতে পারে তাপমাত্রা। কলকাতাতেও মিলতে পারে গরম থেকে স্বস্তি।

গরমে হাঁসফাঁস করছে দক্ষিণবঙ্গ। গত কয়েকদিন ধরে তাপমাত্রার পারদ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় অস্বস্তি বেড়েছে সাধারণ মানুষের। সকাল থেকেই প্রখর রোদ, তার সঙ্গে বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ঘাম ও গুমোট গরমে কার্যত নাজেহাল অবস্থা শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই। এমন পরিস্থিতির মাঝেই স্বস্তির খবর শোনাল আবহাওয়া দফতর। দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে হাওয়া অফিস। জানা গিয়েছে, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি হতে পারে দক্ষিণবঙ্গের ১১ জেলায়। এর জেরে বেশ কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত কমতে পারে তাপমাত্রা। কলকাতাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাতেও মিলতে পারে স্বস্তি।

আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া অনুকূল আবহাওয়াগত পরিস্থিতি এবং জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস দক্ষিণবঙ্গের উপর সক্রিয় হওয়ায় এই ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দুপুরের পর থেকে আকাশে মেঘ জমা, বজ্রগর্ভ মেঘের সৃষ্টি এবং কালবৈশাখী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। হাওয়া অফিস সূত্রে খবর, দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু জায়গায় শিলাবৃষ্টির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

যে ১১টি জেলায় এই ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে জানানো হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান এবং ঝাড়গ্রাম। এই জেলাগুলিতে ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন। বিশেষ করে খোলা জায়গায় না থাকা, গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার এড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কলকাতার আবহাওয়াতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। গত কয়েকদিন ধরে মহানগরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছিল। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় অনুভূত তাপমাত্রা আরও বেশি মনে হচ্ছিল। তবে ঝড়-বৃষ্টির জেরে আগামী কয়েকদিনে কলকাতার তাপমাত্রা ২ থেকে ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত কমতে পারে বলে পূর্বাভাস। বিকেলের দিকে আকাশ মেঘলা থাকবে এবং বজ্রবিদ্যুৎ-সহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এই সময়টায় দক্ষিণবঙ্গে কালবৈশাখীর প্রবণতা বাড়ে। গরমে ভূমির তাপমাত্রা অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ার ফলে উপরের স্তরে নিম্নচাপের পরিস্থিতি তৈরি হয়। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাস সেই উত্তপ্ত বায়ুর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হয় এবং তার ফলেই কালবৈশাখী ঝড়-বৃষ্টির সৃষ্টি হয়। এই ধরনের আবহাওয়া সাধারণত বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে বেশি সক্রিয় হয়।

গ্রামের চাষিরাও এই বৃষ্টির অপেক্ষায় ছিলেন। কারণ দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় জমিতে জলসংকট তৈরি হচ্ছিল। গরমের তীব্রতায় অনেক ফসলের ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। আবহাওয়া দফতরের এই পূর্বাভাসে কিছুটা আশার আলো দেখছেন কৃষকরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৃষ্টি গরম কমানোর পাশাপাশি কৃষিকাজেও কিছুটা উপকারে আসতে পারে। তবে ঝড়ের বেগ বেশি হলে কাঁচা ফসল বা ফলের বাগানে ক্ষতির আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে। তাই আগাম সতর্কতা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে শহরাঞ্চলেও ঝড়-বৃষ্টি নিয়ে শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। কলকাতা পুরসভা এবং বিভিন্ন পুর প্রশাসনের তরফে নিকাশি ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ ভারী বৃষ্টি হলে জল জমার সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিদ্যুৎ দফতরকেও সতর্ক রাখা হয়েছে যাতে ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ পরিষেবায় বড় ধরনের সমস্যা না হয়। দমকল এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকেও প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরম এবং আর্দ্রতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে হিট স্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি এবং নানা শারীরিক সমস্যার প্রবণতা বাড়ছিল। বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বেশি হচ্ছিল। তাই এই বৃষ্টি ও তাপমাত্রা কমার সম্ভাবনা কিছুটা স্বস্তি দিলেও আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনের কারণে সর্দি-কাশি বা ভাইরাল জ্বরের প্রবণতাও বাড়তে পারে। ফলে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টা দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ায় বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টিও হতে পারে। মৎস্যজীবীদেরও সমুদ্রে যেতে সতর্ক করা হয়েছে, কারণ ঝোড়ো হাওয়ার প্রভাব উপকূলবর্তী এলাকাতেও পড়তে পারে। বিশেষ করে দীঘা, মন্দারমণি ও সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় আবহাওয়ার উপর নজর রাখতে বলা হয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়াতেও ইতিমধ্যেই ঝড়-বৃষ্টির খবর ঘিরে চর্চা শুরু হয়েছে। একদিকে গরম থেকে মুক্তির আশায় খুশি মানুষ, অন্যদিকে ঝড়ের তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। অনেকেই আগের বছরের কালবৈশাখীর স্মৃতি টেনে এনে সতর্ক থাকার কথা বলছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে এখন আবহাওয়ার আচরণ অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ফলে ঝড়-বৃষ্টির তীব্রতাও আগের তুলনায় অনেক সময় বেশি হচ্ছে।

news image
আরও খবর

তবে সব মিলিয়ে দক্ষিণবঙ্গের মানুষের কাছে এই বৃষ্টির খবর নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তির। দীর্ঘ গরমের পর যদি কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়, তাহলে আবহাওয়ায় অনেকটাই পরিবর্তন আসবে। সন্ধ্যার পর ঠান্ডা হাওয়া, মেঘলা আকাশ এবং বৃষ্টিভেজা পরিবেশে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবেন সাধারণ মানুষ। কলকাতাসহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় এখন সবার নজর আকাশের দিকেই। কবে নামবে বৃষ্টি, কতটা কমবে তাপমাত্রা এবং ঝড়ের প্রভাব কতটা হবে—সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা বাংলা।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, এই ধরনের প্রাক-বর্ষার বৃষ্টি বর্ষা আগমনের পূর্বাভাসও অনেক সময় বহন করে। যদিও এখনও বর্ষা ঢুকতে কিছুটা সময় বাকি, তবু এই ঝড়-বৃষ্টি দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়াকে সাময়িকভাবে অনেকটাই স্বস্তিদায়ক করে তুলতে পারে। আগামী কয়েকদিনে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে আবহাওয়া দফতর। প্রয়োজন অনুযায়ী জেলাগুলির জন্য নতুন সতর্কতাও জারি করা হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, গরমে অতিষ্ঠ দক্ষিণবঙ্গের জন্য এই ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস এক বড় স্বস্তির বার্তা। তবে স্বস্তির সঙ্গে সতর্কতাও জরুরি। কারণ কালবৈশাখীর সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার ধ্বংসাত্মক রূপও কম ভয়ংকর নয়। তাই প্রশাসনের নির্দেশ মেনে সচেতন থাকাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে দৈনন্দিন জীবনেও। বিশেষ করে অফিসযাত্রী, স্কুল-কলেজের পড়ুয়া এবং ব্যবসায়ীদের জন্য ঝড়-বৃষ্টির সময় কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। বিকেলের দিকে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি শুরু হলে রাস্তায় যানজট বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কলকাতা ও শহরতলির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় জল জমলে যান চলাচলেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রয়োজন ছাড়া ঝড়ের সময় বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। যারা বাইরে থাকবেন, তাঁদের ছাতা বা রেনকোট সঙ্গে রাখার কথা বলা হয়েছে।

রেল ও বিমান পরিষেবাতেও সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অতীতে বহুবার দেখা গিয়েছে, কালবৈশাখীর জেরে ট্রেন দেরিতে চলেছে কিংবা বিমান ওঠানামায় সমস্যা হয়েছে। ঝোড়ো হাওয়ার কারণে গাছ পড়ে রেললাইনে বাধা সৃষ্টি হওয়ার ঘটনাও নতুন নয়। ফলে প্রশাসন আগাম প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। বিদ্যুৎবাহী তার, পুরনো গাছ বা দুর্বল কাঠামোর দিকে নজর রাখা হচ্ছে যাতে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানাচ্ছেন, দক্ষিণবঙ্গের উপর বর্তমানে যে আবহাওয়াগত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা আগামী কয়েকদিন বজায় থাকতে পারে। ফলে একদিন বৃষ্টির পরই গরম পুরোপুরি বিদায় নেবে, এমনটা নয়। তবে তাপমাত্রা ওঠানামা করবে এবং মাঝেমধ্যেই বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি হতে পারে। এতে দিনের বেলায় গরম কিছুটা থাকলেও রাতের দিকে আবহাওয়া তুলনামূলক আরামদায়ক হবে।

কলকাতার পাশাপাশি হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সুন্দরবন এলাকায় নদীপথে যাতায়াতকারীদের বিশেষভাবে সাবধান থাকতে বলা হয়েছে। নদীতে ছোট নৌকা বা ট্রলার নিয়ে না নামার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ ঝোড়ো হাওয়ার গতি হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। মৎস্যজীবীদেরও সমুদ্রের আবহাওয়া সম্পর্কে নিয়মিত আপডেট নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই বৃষ্টি পরিবেশের জন্যও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। দীর্ঘদিনের ধুলো, দূষণ এবং গরমের কারণে শহরের বায়ুমানের অবনতি হচ্ছিল। বৃষ্টির ফলে বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা অনেকটাই কমবে এবং পরিবেশ তুলনামূলক পরিষ্কার হবে। গাছপালাও নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে। শহরের পার্ক, রাস্তার ধারের গাছ এবং গ্রামীণ এলাকার ফসলের ক্ষেত এই বৃষ্টিতে উপকৃত হতে পারে।

তবে বজ্রপাতের ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় প্রতি বছর বজ্রপাতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। তাই খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক এবং গ্রামীণ এলাকার মানুষদের বিশেষ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বজ্রপাত শুরু হলে মোবাইল ব্যবহার কমানো, খোলা জায়গা এড়িয়ে চলা এবং নিরাপদ বাড়ি বা পাকা আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ায় যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে, তা গরমে ক্লান্ত মানুষের কাছে নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। তবে এই স্বস্তির মাঝেও সতর্কতা জরুরি। কারণ প্রকৃতির রূপ যেমন মন ভালো করে দেয়, তেমনই তার রুদ্ররূপ মুহূর্তের মধ্যে বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই আবহাওয়া দফতরের আপডেটের উপর নজর রাখা এবং প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

Preview image