Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বিস্মৃত নটীকে ফিরিয়ে আনছেন গার্গী রায়চৌধুরী, মঞ্চে আসছে তারাসুন্দরী

গার্গী রায়চৌধুরী এবার মঞ্চে তুলে আনছেন ইতিহাসের প্রান্তে ঠাঁই পাওয়া নটী তারাসুন্দরীর জীবনকথা। গিরিশচন্দ্র ঘোষের যুগের এই বিস্মৃত অভিনেত্রীকে নতুন আলোয় দেখাতে চলেছেন তিনি নিজের লেখা ও অভিনয়ে তারাসুন্দরী নাটকে।

 

বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এক সময় চার নটীর নাম উচ্চারিত হত শ্রদ্ধাভরে—বিনোদিনী, তিনকড়ি দাসী, প্রভাদেবী ও তারাসুন্দরী। গিরিশচন্দ্র ঘোষের সময়ের সেই সুবর্ণ অধ্যায় আজও থিয়েটারপ্রেমীদের মুখে মুখে ফেরে, কিন্তু বিস্মৃতির ছায়া যেন বিশেষভাবে নেমে এসেছে এক নামের ওপর—তারাসুন্দরী। বিনোদিনী বা প্রভাদেবীর মতো তাঁর জীবন নিয়ে লেখা হয়নি কোনও আত্মজীবনী, হয়নি কোনও গবেষণা, মঞ্চে হয়নি কোনও পুনর্নির্মাণ। অথচ যাঁরা তাঁর অভিনয় দেখেছিলেন, তাঁদের বর্ণনায় তিনি ছিলেন সবচেয়ে বহুমুখী, সবচেয়ে সাহসী অভিনেত্রী।

দীর্ঘদিন পর সেই অন্ধকারে আলো ফেলতে এগিয়ে এসেছেন অভিনেত্রী গার্গী রায়চৌধুরী। টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে তাঁর শক্তিশালী অভিনয়ের জন্য তিনি বহুল পরিচিত, কিন্তু এবার তিনি ফিরছেন নিজের প্রিয় জায়গায়—মঞ্চে। আসন্ন নভেম্বরে তিনি নিয়ে আসছেন নতুন প্রযোজনা ‘তারাসুন্দরী’, যার মূল ভাবনা, সংলাপ ও প্রধান চরিত্র—সবই গার্গীর হাতে।

গার্গী জানালেন, এই নাটকের ভাবনা অনেক দিনের। “আমরা সবাই বিনোদিনীকে জানি, তাঁর আত্মজীবনী পড়েছি, তাঁকে নিয়ে কাজও হয়েছে প্রচুর। কিন্তু একই যুগে, একই মঞ্চে, যিনি ছিলেন সবচেয়ে ভার্সেটাইল অভিনেত্রী, সেই তারাসুন্দরী আজ প্রায় হারিয়ে গিয়েছেন ইতিহাসের প্রান্তে। তাঁর কোনও চিঠি নেই, কোনও আত্মকথা নেই, এমনকি তাঁর ছবি পর্যন্ত খুব কম পাওয়া যায়। এই শূন্যতার মধ্যেই তাঁকে খুঁজে বের করাটাই আমার কাছে চ্যালেঞ্জ ছিল,” বললেন গার্গী।

গবেষণায় জানা গেছে, বিনোদিনীর হাত ধরেই থিয়েটারে এসেছিলেন তারাসুন্দরী। গিরিশচন্দ্র ঘোষের নির্দেশনায় তাঁর প্রথম অভিনয় হয় ‘সীতা’ নাটকে। কণ্ঠে ছিল সুর, উচ্চারণে মাধুর্য, আর অভিনয়ে সাহস। তিনি একাই একাধিক চরিত্রে অভিনয় করতে পারতেন—কখনও ট্র্যাজেডি, কখনও কমেডি, আবার কখনও পৌরাণিক চরিত্রে যেন প্রাণ ঢেলে দিতেন। সমকালীন সংবাদপত্রেও তাঁর অভিনয়ের প্রশংসা ছাপা হয়েছিল, কিন্তু সময়ের স্রোতে সব হারিয়ে যায়।

তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। ক্লাসিক থিয়েটারের মালিক অমরেন্দ্র দত্তের সঙ্গে প্রেমে জড়ান তিনি। কিন্তু সেই সম্পর্ক পরিণতি পায়নি, বরং প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন তারাসুন্দরী। সমাজের চাপ উপেক্ষা করে সাহসিকতার সঙ্গে তিনি আদালতে মামলা করেন এবং জেতেনও। উনিশ শতকের কলকাতায়, যেখানে নটীদের সমাজে গ্রহণযোগ্যতা ছিল না, সেখানে এক নারী নিজের আত্মসম্মান রক্ষায় আইনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন—এমন ঘটনা বিরলই বলা চলে।

গার্গীর মতে, “সম্ভবত এই আত্মসম্মানবোধই তাঁর পতনের কারণ। তিনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের জন্য এক অস্বস্তিকর প্রশ্নচিহ্ন হয়ে উঠেছিলেন। তাই তাঁকে ইচ্ছে করেই আড়াল করা হয়।”

গার্গী নিজেই এই নাটকের চিত্রনাট্য লিখেছেন। নাটকের কাঠামো নন-লিনিয়ার—অর্থাৎ সময়ের সোজা রেখায় নয়, বরং স্মৃতি, স্বপ্ন ও বাস্তবের ভেতর দিয়ে গল্প এগোবে। এতে একদিকে যেমন দেখা যাবে উনিশ শতকের থিয়েটার জগৎ, অন্যদিকে সমকালীন এক অভিনেত্রীর (অর্থাৎ গার্গীর) নিজের জীবনের সাযুজ্যও উঠে আসবে।

তিনি বলেন, “এই নাটকে আমি শুধু তারাসুন্দরীর গল্প বলছি না, আমি বলছি এক নারীর লড়াইয়ের গল্প। যে সময়েই হোক না কেন, সমাজে নারীকে তার নিজের জগৎ তৈরি করতে হলে লড়তে হয়—এটাই সময়ের সত্য।”

নাটকের মঞ্চসজ্জা ও আলোক বিন্যাসে থাকছে এক নতুনত্ব। পরিচালক হিসেবে গার্গী পেয়েছেন তরুণ থিয়েটারকর্মী অভিরূপ ভট্টাচার্যকে, যিনি মঞ্চের ভিজুয়াল ভাষায় নিয়ে এসেছেন সিনেমাটিক টাচ। মঞ্চে থাকবে সাদা-কালো প্রক্ষেপণ, যেখানে পুরনো থিয়েটারঘরের চিত্র ফুটে উঠবে।

সঙ্গীতে কাজ করছেন সুরজিত মুখোপাধ্যায়, যিনি বলেছেন, “গার্গীদি চেয়েছিলেন এমন একটা মিউজিক লেয়ার, যা উনিশ শতকের মঞ্চসঙ্গীতের ছোঁয়া রাখবে, কিন্তু আধুনিক দর্শকের কানেও বেমানান লাগবে না। তাই আমরা তবলার পাশাপাশি ব্যবহার করেছি চেলো আর হারমোনিয়াম। একটা কাব্যিক দ্যোতনা রাখার চেষ্টা করেছি।”

গার্গী রায়চৌধুরী শুধু একজন অভিজ্ঞ অভিনেত্রীই নন, তিনি নিজে একাধারে পরিচালক, লেখক ও মঞ্চকর্মীও। এই নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁকে দেখা যাবে নাট্যকার হিসেবেও। তাঁর কথায়, “তারাসুন্দরী আমাকে টেনেছে তাঁর দ্বৈততার জন্য। একদিকে তিনি ছিলেন অতুলনীয় কমেডি অভিনেত্রী—মঞ্চে হাসি ফোটাতে পারতেন। অন্যদিকে ব্যক্তিজীবনে ছিলেন ট্র্যাজেডির প্রতীক। এক চোখে তাঁর হাসি, আর এক চোখে জল—এই বৈপরীত্যটাই আমার নাটকের প্রাণ।”

অভিনয়ের প্রস্তুতি নিয়েও বললেন তিনি—“তারাসুন্দরীর ভাষা, দেহভঙ্গি, সেই সময়ের থিয়েটার স্টাইল—সবটাই আলাদা। আমরা আজকাল যেভাবে বাস্তবধর্মী অভিনয় করি, তখন কিন্তু তা ছিল অনেক নাটকীয়, অনেক আলংকারিক। সেই স্বাদটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি, কিন্তু একই সঙ্গে চাই সমকালীন সংযোগও বজায় থাকুক।”

নাটকের একটি বড় থিম হল নারীর আত্মসম্মান। গার্গী মনে করেন, তারাসুন্দরীর জীবন একরকম প্রতিরোধের ইতিহাস। “তিনিই প্রথম নটী যিনি আদালতে নিজের সম্মানের জন্য লড়েছিলেন। এই সাহসিকতা আজকের নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে। সমাজ তখন তাঁকে উপেক্ষা করেছে, কিন্তু ইতিহাস তাঁকে ভুলে গেলে চলবে না,” বললেন তিনি।

news image
আরও খবর

তিনি আরও যোগ করলেন, “আমরা এখনো দেখি—একজন নারী নিজের সিদ্ধান্তে দৃঢ় হলে সমাজ তাকে ‘দুর্বিনীত’ বলে চিহ্নিত করে। তারাসুন্দরীর সময়েও তাই হয়েছিল। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। আমার মনে হয়, এই স্পিরিটটাই আজও প্রাসঙ্গিক।”

গার্গী স্বীকার করেন, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও এই নাটকে অনেকটা মিশে আছে। “অবশ্যই প্রেম এসেছে জীবনে,” বললেন তিনি হাসতে হাসতে, “কিন্তু প্রেমে ভেসে যাওয়ার মতো মেয়ে আমি নই। আমি জানি কোথায় সীমা টানতে হয়। সম্ভবত এই বাস্তববোধই আমাকে বারবার বাঁচিয়েছে। তারাসুন্দরীও এমনই ছিলেন—তিনি ভালোবাসতেন, কিন্তু কাউকে নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেননি।”

এই স্বনির্ভর মানসিকতাই গার্গীকে বারবার নতুন পথে হাঁটতে অনুপ্রাণিত করেছে। সিনেমা, টেলিভিশন, ওয়েব—সব জায়গাতেই তিনি নিজের ছাপ রেখেছেন। কিন্তু মঞ্চের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আজও অটুট। “মঞ্চ আমার কাছে প্রার্থনার জায়গা,” বলেন তিনি, “এখানে আমি সবচেয়ে বেশি সত্যি থাকি। আলো নিভে গেলে, শুধু দর্শক আর আমি—এই সংযোগটাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।”

নাটকটির মহড়া চলছে পূর্ণোদ্যমে। গার্গীর সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করবেন সুদীপ মুখোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্তগুপ্ত, ঈশিতা দত্ত ও আরও অনেকে। পোশাক-নকশা করছেন ইন্দ্রানী দাসগুপ্ত, যিনি জানিয়েছেন, “আমরা চেষ্টা করছি উনিশ শতকের থিয়েটার পোষাকের ঐতিহ্য বজায় রাখতে, কিন্তু সামান্য আধুনিক ছোঁয়া রাখব যাতে দর্শক সংযোগ হারায় না।”

প্রযোজনা করছে অরুণোদয় থিয়েটার গ্রুপ, যাদের সঙ্গে গার্গীর এটি দ্বিতীয় কাজ। প্রযোজক সুশান্ত দে বলেন, “তারাসুন্দরী নাটক শুধু একটি ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণ নয়, এটি এক রকম শ্রদ্ধাঞ্জলি। আমরা চাই আজকের প্রজন্ম বুঝুক, সেই সময়ের নারীরা কতটা এগিয়ে ছিলেন।”

মঞ্চায়ন হবে কলকাতার অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে, আগামী নভেম্বরে। প্রথম শো-র টিকিট ইতিমধ্যেই আগাম বুকিং শুরু হয়েছে।

সমালোচকদের মতে, এই প্রযোজনার সময় এসেছে একেবারে ঠিক মুহূর্তে। যখন নারী-অভিনেত্রীর লড়াই, সামাজিক অবস্থান ও ইতিহাস পুনরায় আলোচনায় আসছে, তখন তারাসুন্দরীর মতো চরিত্রের পুনর্মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।

থিয়েটার গবেষক অরিন্দম চক্রবর্তী বলেন, “গার্গী রায়চৌধুরী যেভাবে তারাসুন্দরীকে ফিরিয়ে আনছেন, সেটি শুধু নস্টালজিয়া নয়—এটি এক সামাজিক পুনর্নির্মাণ। ইতিহাসে যে জায়গায় নারীকে অবদমিত করা হয়েছে, গার্গী সেই জায়গায় আলো ফেলছেন।”

গার্গী জানেন, এটি সহজ পথ নয়। “যে চরিত্রকে ইতিহাস প্রায় মুছে ফেলেছে, তাকে জীবন্ত করে তুলতে গেলে শুধু গবেষণা নয়, দরকার সংবেদনশীলতা। আমি চেষ্টা করছি, যেন দর্শক শুধু একজন অভিনেত্রীর গল্প না দেখে—দেখে এক যুগের, এক সমাজের প্রতিচ্ছবি।”

তিনি আরও বলেন, “আমি চাই, মেয়েরা যেন তারাসুন্দরীকে দেখে অনুপ্রেরণা পায়। যেন বুঝতে পারে, আত্মসম্মান হারিয়ে কিছু পাওয়া যায় না। নিজের মর্যাদা রক্ষার লড়াইটাই আসল শিল্প।”

অভিনেত্রীর চোখে তখন এক অদ্ভুত দীপ্তি। হয়তো সেই দীপ্তিই তারাসুন্দরীর হাসি আর চোখের জলের মিশ্রণ থেকে উঠে আসছে।

নভেম্বরের মঞ্চে আলো জ্বলবে যখন, গার্গী রায়চৌধুরী দাঁড়াবেন তাঁর সৃষ্ট চরিত্র হয়ে—তারাসুন্দরী, যে হয়তো একদিন হারিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আজ আবার ফিরে আসছে—নতুন আলোয়, নতুন কণ্ঠে, নতুন আত্মবিশ্বাসে।

Preview image