Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

“বদলাচ্ছে বাংলা ধারাবাহিকের স্বাদ: নায়ক-নায়িকার জটিল প্রেম নয়, আসছে নতুন গল্পের হাওয়া”

বাংলা ধারাবাহিকের চেনা গল্পে বদল এনেছে নির্মাতারা। পুরোনো ক্লিশে প্লট ছেড়ে এখন জায়গা করে নিচ্ছে নতুন ধাঁচের গল্প, ফলে দর্শকদের বিরক্তিও কমছে ধীরে ধীরে।

বাংলা ধারাবাহিক বহু দশক ধরে বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। প্রতিদিন রাতের খাবারের টেবিলে বা সন্ধ্যার চায়ের কাপ হাতে টেলিভিশনের সামনে জমে থাকা দর্শকরা বছরের পর বছর গল্পের টানেই আবদ্ধ থেকেছেন। তবে সময় বদলায়, দর্শকের রুচি বদলায়, আর সেই রুচির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন আসে বিনোদনের মাধ্যমেও। বাংলা ধারাবাহিকের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এখনকার দর্শক আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন, দ্রুত বিরক্ত হন চেনা ধাঁচের গল্পে, এবং একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি তাঁরা আর মেনে নিতে চান না। ফলে নির্মাতাদের উপর চাপ বাড়ে, গল্পকারদের দায়িত্ব বাড়ে, আর চ্যানেল কর্তৃপক্ষও নতুন পরীক্ষায় নেমে পড়েন।

এক সময় বাংলা ধারাবাহিক মানেই দর্শকের মনে ছিল বদ্ধমূল কিছু ধারণা—নায়কের দুই বা তিন বিয়ে, শাশুড়ি-বৌমার অন্তহীন ঝগড়া, পরকীয়া, বৌদিকে ঘিরে সংসারের অশান্তি, কিংবা বৌমার ওপর অত্যাচার—এমন গল্পেই ভরপুর থাকত জনপ্রিয় সিরিয়ালের পর্ব। দিনের পর দিন একই গণ্ডিতে ঘুরপাক খাওয়া এইসব গল্প নিয়ে দর্শকের মধ্যে দারুণ একঘেয়েমি তৈরি হয়েছিল। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নানা ট্রোল, মিম, ব্যঙ্গচিত্রও দেখা যেত সেই পুরোনো ধাঁচের গল্পকে ঘিরে।

কিন্তু করোনা-পরবর্তী সময় বাংলা ধারাবাহিক জগতে যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। মহামারির সময় আমাদের জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে—কাজের ধরন বদলেছে, জীবনযাপনের ধারা বদলেছে, মানুষের সম্পর্ক, মূল্যবোধ, অগ্রাধিকার—সবকিছুর মধ্যেই এসেছে নতুন বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি বাংলা ধারাবাহিকেও পড়েছে। ফলে দর্শক চাইলেও বা না চাইলেও নির্মাতারা বাধ্য হয়েছেন গল্পের ধরন বদলাতে, চরিত্রগুলোকে বর্তমান সময়ের সঙ্গে মানানসই করতে, এবং গল্পকে আরও বাস্তবসম্মত ও আধুনিক করে তুলতে।

২০১৯ সাল অবধি অনেক ধারাবাহিক টানা তিন থেকে চার বছর সম্প্রচারিত হত। দর্শক একবার অভ্যস্ত হয়ে গেলে সেই গল্প চলতই। কিন্তু গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি পুরো বদলে যায়। এখন আর চ্যানেল কর্তৃপক্ষ বছরের পর বছর ধরে একই গল্প টেনে নিয়ে যেতে চান না। বহু ধারাবাহিক শুরু হওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ দর্শকের প্রতিক্রিয়া, টিআরপি রিপোর্ট এবং গল্পের গ্রহণযোগ্যতা এখন আগের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দর্শক যা চান না, তা আর কোনওভাবেই চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে চ্যানেল ও প্রযোজনা সংস্থাগুলি নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে—দর্শককে অন্য স্বাদের গল্প দেওয়া যায় কি না।

এমনই পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় বেশকিছু ধারাবাহিকতে, যেগুলি সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এক সময় বাংলা ছবিতে যেমন ‘বাণিজ্যিক ঘরানা’র একঘেয়েমি ভেঙে নতুন স্বাদ এনেছিল ‘ঊনিশে এপ্রিল’, ‘পারমিতার একদিন’-এর মতো কনটেন্ট-ড্রিভেন সিনেমা, তেমনই এখন ধারাবাহিকেও সেই ঘরানার পরিবর্তন লক্ষণীয়।

চিরসখা  বন্ধুত্ব থেকে পরিণত প্রেম, অন্যরকম দাম্পত্যের গল্প

এই ধারাবাহিকে কমলিনী ও স্বতন্ত্রের সম্পর্কের গল্প নজর কেড়েছে। কমলিনী তিন সন্তানের মা। স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাঁর পরিবারকে সামলানোর দায়িত্ব স্বতন্ত্রের উপরই আসে। সময়ের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে যে গভীরতা তৈরি হয়, তা খুব সূক্ষ্মভাবে দেখানো হয়েছে। ছোটপর্দায় আগে এই ধরনের সম্পর্কের পরিণতি দেখানো হয়নি। স্বতন্ত্র-কমলিনীর বিয়ে, তাঁদের তিন সন্তানের প্রতিক্রিয়া, সমাজের মানসিকতা—সব মিলিয়ে গল্পটি নতুনত্ব এনেছে।

দর্শকের প্রতিক্রিয়াওই প্রমাণ করে এই ধরনের গল্পের প্রতি মনোযোগ বাড়ছে। আগে হয়তো এই বয়সে প্রেম, সম্পর্ক, বিয়ে নিয়ে সিরিয়ালে গল্প দেখালে সমাজের একাংশ সমালোচনায় মুখর হত। কিন্তু এখন দর্শক নিজেই অনেক বেশি মুক্তমনা, বাস্তববাদী এবং সাংগঠনিক বৈচিত্র্যকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।

পরিণীতা : বন্ধুত্ব, বিয়ে, লুকানো সম্পর্ক আধুনিক দাম্পত্যের জটিলতায় ঘেরা গল্প

পরিণীতা ধারাবাহিকের কেন্দ্রীয় চরিত্র রায়ান এবং পারুল। ছোট শহর থেকে কলকাতায় পড়তে এসে পারুল যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু রায়ানের সঙ্গে বিয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে—তা শুধু রোমান্টিক নয়, বাস্তবতারও এক প্রতিচ্ছবি। শহরের আলো-ঝলমলে জীবনের মধ্যে দুই তরুণ-তরুণী বিয়ে করলেও তৎক্ষণাৎ পরিবার বা বন্ধুমহলকে জানাতে সাহস না পাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। সমাজের চাপ, ভবিষ্যতের ভয়, ক্যারিয়ার—সব মিলিয়ে এই সমীকরণ আধুনিক প্রজন্মের বাস্তব অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন।

বিয়ের পরেও রায়ান-পরিণীতার গোপন সম্পর্ক, তাঁদের আবেগ, সিদ্ধান্ত—সবই দর্শকদের আগ্রহ ধরে রেখেছে। বহু সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিকটি টিআরপি তালিকার শীর্ষে রয়েছে, যা প্রমাণ করে নতুন ধরনের গল্প মানুষ উপভোগ করছেন।

জোয়ার ভাঁটা : দুই বোন, প্রতিশোধ, সংগ্রাম নারীকেন্দ্রিক গল্পের নতুন ছাপ

এক সময় দর্শকের ধারণা ছিল, দুই সমসাময়িক নায়িকা কখনোই একই ধারাবাহিকে সমান গুরুত্ব পান না। তাঁদের মধ্যে সবসময় প্রতিযোগিতা বা হিংসার গল্পই দেখানো হয়। কিন্তু জোয়ার ভাঁটা সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। এই ধারাবাহিকে দুই বোনের গল্প দেখানো হচ্ছে যাঁরা বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে লড়াই করছে। বোনদের বন্ধন, তাঁদের শক্তি, তাঁদের লক্ষ্য—এসবই গল্পটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

গল্পটি শুধু ব্যক্তিগত প্রতিশোধের নয়, সমাজের অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোরও গল্প। দর্শকও তা বেশ সাদরে গ্রহণ করেছেন।

কনে দেখা আলো  হাস্যরস, ভুল বোঝাবুঝি আর নতুন মুখের আগমন

যদিও টিআরপি তালিকায় এই ধারাবাহিক খুব ভালো ফল করতে পারেনি, কিন্তু শুরুর আগে থেকেই ‘কনে দেখা আলো’ নিয়ে আলোচনা ছিল তুঙ্গে। প্রচারে প্রকাশিত ঝলকে অনেকে ‘লাপতা লেডিজ়’ ছবির সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। একইসঙ্গে অভিনেতা অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে সাইনা চট্টোপাধ্যায়ের ছোটপর্দায় অভিষেক নিয়েও দর্শকদের আগ্রহ ছিল। গল্পে নতুন বিয়ের পর বর-কনের অদলবদল হাস্যরসের পাশাপাশি সামাজিক বার্তাও রেখেছিল।

কম্পাস  নায়িকার স্টিরিওটাইপ ভেঙে বাস্তব চরিত্র নির্মাণ

বাংলা ধারাবাহিকের নায়িকা মানেই ছিলেন ঝাঁ চকচকে রূপ, নিখুঁত সাজ, চোখে-মুখে গ্ল্যামার এই ধারণা বহু বছর ধরে ছিল। ‘কম্পাস’ সেই বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে। ছোট করে কাটা চুল, চোখে চশমা, সাদামাটা পোশাক নায়িকার এই লুক দর্শকদের চমকে দিয়েছে। শুধু লুক নয়, গল্পেও পরিবর্তন এসেছে। এখানে দেখানো হয়েছে, স্বামী নতুন বৌকে না মেনে নিলেও শাশুড়ি তার পাশে দাঁড়াচ্ছে ঢাল হয়ে। শাশুড়ি-বৌমার সম্পর্ক নিয়ে বাংলা ধারাবাহিকে প্রচুর নেতিবাচক গল্প দেখানো হয়েছে আগে। কিন্তু এই ধারাবাহিকে সম্পর্কটি ইতিবাচক, সহমর্মী এবং বাস্তবসম্মত।

news image
আরও খবর

যদিও টিআরপি খুব বেশি নয়, তবে ‘কম্পাস’ তার গল্পের জন্যই আলোচনায় রয়েছে।


বাংলা ধারাবাহিকের সামগ্রিক পরিবর্তন কেন এত প্রয়োজনীয় ছিল?

বাংলা ধারাবাহিকের গল্পে এই পরিবর্তন শুধু চ্যানেলের সিদ্ধান্ত নয়, সময়ের দাবি। দর্শক এখন বিশ্বের নানা দেশের ওয়েব সিরিজ, সিনেমা, ডকুমেন্টারি দেখে ফেলে। ফলে তাঁদের চিন্তাভাবনার পরিধি বেড়েছে, রুচির পরিবর্তন হয়েছে। তাঁরা আর আগের মতো অযৌক্তিক প্লট, অতিরঞ্জিত চরিত্র, অবাস্তব ঘটনা দেখতে চান না।

মূল কারণগুলো হচ্ছে

  • দর্শকের বদলানো চাহিদা

  • আধুনিক সমাজের বাস্তবতা

  • সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব

  • আন্তর্জাতিক কনটেন্টের সঙ্গে প্রতিযোগিতা

  • চ্যানেলের আর্থিক চাপ

  • ওয়েব প্ল্যাটফর্মের উন্নতি

  • গল্পে বৈচিত্র্যের চাহিদা

ফলে এখন বাংলা ধারাবাহিক নির্মাতারা চরিত্র, পরিস্থিতি, সম্পর্ক সবকিছুই নতুনভাবে ভাবছেন। আগে যে চরিত্রগুলো একমাত্রিক ছিল, এখন সেগুলো বহুস্তরীয়। সম্পর্ক এখন শুধুই প্রেম-অপ্রেমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বন্ধুত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, আত্মসম্মান এসব বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে।


পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ

যদি এই গতি বজায় থাকে, তাহলে বাংলা ধারাবাহিক আগামী দিনে আরও বেশি বৈচিত্র্যময় গল্প নিয়ে আসবে। বাস্তবসম্মত চরিত্র, সচেতনতামূলক কনটেন্ট, মানসিক স্বাস্থ্যের মতো ইস্যু, নারীকেন্দ্রিক গল্প, এবং মধ্যবয়সী বা প্রবীণদের গল্পও বেশি করে দেখা যাবে।

সব মিলিয়ে বাংলা ধারাবাহিকের গল্পে পরিবর্তন এসেছে, এবং এই পরিবর্তন দর্শককেও নতুন করে টেলিভিশনের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে। একসময় যেখানে সমালোচনার ঝড় ছিল, এখন সেখানে প্রশংসার হাওয়া—আর এতেই বোঝা যায় বদলে যাওয়া গল্পেরা সত্যিই বাংলা ধারাবাহিকের ভিতকে আরও সমৃদ্ধ করছে। ফলে নির্মাতারা আরও সাহসীভাবে নতুন বিষয়, চরিত্র ও সম্পর্ক তুলে ধরতে পারছেন। দর্শকের বৈচিত্র্যময় রুচিকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি হচ্ছে আধুনিক, সংবেদনশীল এবং বাস্তবসম্মত কাহিনি। এই ধারাবাহিক বদলের ধারা আগামী দিনে বাংলা টেলিভিশনের মান আরও উন্নত করবে বলেই মনে করছেন অনেকে।

Preview image