Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

টাটার ন্যানো ইভি ধামাকা ৩ লাখে ইলেকট্রিক গাড়ি বুকিং শুরু আজ থেকেই এবং মধ্যবিত্তের স্বপ্নপূরণের দ্বিতীয় অধ্যায়

ভারতীয় অটোমোবাইল শিল্পে আজ এক ঐতিহাসিক দিন। টাটা মোটরস তাদের আইকনিক ব্র্যান্ড ন্যানো কে ফিরিয়ে আনল সম্পূর্ণ নতুন ইলেকট্রিক অবতারে। যার দাম শুরু হচ্ছে মাত্র ৩ লাখ টাকা থেকে এবং রেঞ্জ ৩০০ কিলোমিটার। রতন টাটার স্বপ্নকে নতুন প্রযুক্তির মোড়কে বাস্তবায়িত করে টাটা মোটরস আজ প্রমাণ করল যে সাধারণ মানুষের গাড়ি কেবল স্বপ্ন নয় তা বাস্তব। আজ দুপুর ১২টা থেকে শুরু হয়েছে বুকিং এবং ইতিমধ্যেই ভেঙে পড়েছে সার্ভার।

২০০৮ সালে যখন প্রথম টাটা ন্যানো বাজারে এসেছিল তখন সেটি ছিল একটি আবেগ। রতন টাটার স্বপ্ন ছিল ভারতের প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারের হাতে একটি গাড়ি তুলে দেওয়া যাতে তারা স্কুটারের অনিরাপদ যাত্রা থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেই স্বপ্ন তখন পূর্ণতা পায়নি। আজ প্রায় দুই দশক পর ২০২৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি টাটা মোটরস সেই অসমাপ্ত স্বপ্নকে এক বৈপ্লবিক রূপ দিল। মুম্বাইয়ের এক জমকালো অনুষ্ঠানে টাটা সন্স এর চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরন পর্দা সরালেন নতুন ন্যানো ইভি বা Nano EV এর ওপর থেকে। আর তার সাথে সাথে ঘোষিত হলো এমন এক দাম যা শুনে অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞদের চোখ কপালে উঠেছে মাত্র ৩ লাখ টাকা এক্স শোরুম।

পেট্রোল ইঞ্জিনের সেই নড়বড়ে ছোট্ট গাড়িটি এখন অতীত। নতুন ন্যানো ইভি দেখতে যেমন ফিউচারিস্টিক প্রযুক্তিতে তেমনই অত্যাধুনিক। আর সবচেয়ে বড় চমক হলো এর রেঞ্জ। সংস্থার দাবি একবার ফুল চার্জ দিলে এই গাড়ি ছুটবে ৩০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ কলকাতা থেকে দিঘা বা মুম্বাই থেকে পুনে এক চার্জেই পৌঁছে যাওয়া যাবে। পেট্রোলের দাম যখন লিটার প্রতি ১২০ টাকার গণ্ডি পার করে অনেক দূর তখন মধ্যবিত্তের জন্য এর চেয়ে বড় সুখবর আর কিছু হতে পারে না।

লঞ্চ ইভেন্ট এবং রতন টাটার স্মৃতিচারণ

অনুষ্ঠানের শুরুতেই শ্রদ্ধার্ঘ্য জানানো হয় টাটা গ্রুপের ইমেরিটাস চেয়ারম্যান রতন টাটাকে। মঞ্চের পেছনের বিশাল স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ২০০৮ সালের সেই দৃশ্য যেখানে রতন টাটা প্রথম ন্যানো চালিয় মঞ্চে এসেছিলেন। এন চন্দ্রশেখরন বলেন ন্যানো কোনো গাড়ি নয় এটি একটি দর্শন। এটি ভারতের সাধারণ মানুষের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি। আমরা জানতাম আমাদের ফিরে আসতেই হবে তবে এবার আমরা এসেছি ভবিষ্যতের প্রযুক্তির সাথে। এই গাড়িটি কেবল সস্তা নয় এটি স্মার্ট এটি গ্রিন এবং এটি নিরাপদ। তিনি আরও বলেন যে টাটা মোটরস বিশ্বাস করে ইলেকট্রিক গাড়ি কেবল ধনীদের বিলাসিতা হওয়া উচিত নয়। পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব এবং প্রযুক্তির সুবিধা সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়া আমাদের লক্ষ্য।

গাড়ির স্পেসিফিকেশন এবং ছোট প্যাকেজে বড় ধামাকা

টাটা ন্যানো ইভি কে তৈরি করা হয়েছে টাটার নতুন জেন ৩ বা Gen 3 স্কেটবোর্ড প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে। এর ফলে বাইরে থেকে গাড়িটি ছোট দেখালে কী হবে ভেতরে এর জায়গা বা কেবিন স্পেস আগের ন্যানোর চেয়ে অন্তত ২০ শতাংশ বেশি। ইঞ্জিন না থাকায় সামনের বনেটের নিচেও কিছুটা জায়গা বের করা সম্ভব হয়েছে।

ব্যাটারি ও রেঞ্জ নিয়ে বলতে গেলে এতে ব্যবহার করা হয়েছে ২৫ কিলোওয়াট আওয়ারের অ্যাডভান্সড লিথিয়াম আয়রন ফসফেট বা LFP ব্যাটারি। তবে টাটা জানিয়েছে তারা দাম কমানোর জন্য নতুন সোডিয়াম আয়ন প্রযুক্তির একটি ভেরিয়েন্টও এনেছে যা ৩ লাখ টাকার মডেলে ব্যবহার করা হয়েছে। এই ব্যাটারি আগুন লাগার ঝুঁকি কমায় এবং দ্রুত চার্জ হয়। ডিসি ফাস্ট চার্জার দিয়ে মাত্র ৪০ মিনিটে গাড়িটি ১০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ চার্জ হতে পারে। বাড়িতে সাধারণ ১৫ অ্যাম্পিয়ারের সকেটে চার্জ দিতে সময় লাগবে প্রায় ৬ ঘণ্টা। অর্থাৎ রাতে চার্জ দিলে সকালে অফিস যাওয়ার জন্য গাড়ি প্রস্তুত থাকবে।

পারফরম্যান্সের দিক থেকেও ন্যানো ইভি পিছিয়ে নেই। এর ইলেকট্রিক মোটরটি ৪০ বিএইচপি শক্তি এবং ১০০ এনএম টর্ক উৎপন্ন করে। শহরের ট্রাফিকের জন্য এটি যথেষ্ট শক্তিশালী। ০ থেকে ৬০ কিলোমিটার গতি তুলতে সময় লাগে মাত্র ৬ সেকেন্ড। সর্বোচ্চ গতি বা টপ স্পিড ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার যা হাইওয়েতে চলার জন্যও উপযুক্ত।

ডিজাইনের ক্ষেত্রে পুরনো ন্যানোর সেই ডিম্বাকৃতি এখন অনেক বেশি শার্প এবং অ্যারোডাইনামিক করা হয়েছে। সামনে রয়েছে স্লিক এলইডি ডিআরএল বার যা পুরো বনেট জুড়ে বিস্তৃত। পেছনের টেল ল্যাম্পেও রয়েছে ইনফিনিটি লাইট বার যা রাতের অন্ধকারে গাড়িটিকে এক অদ্ভুত সুন্দর লুক দেয়। চাকাগুলো এখন ১২ ইঞ্চির বদলে ১৩ ইঞ্চির অ্যালয় হুইল যা গাড়ির স্টেবিলিটি বা ভারসাম্য বাড়িয়েছে এবং রাস্তায় গ্রিপ উন্নত করেছে।

ভেতরের জগত এবং ৩ লাখে মার্সিডিজের ছোঁয়া

৩ লাখ টাকার গাড়িতে মানুষ সাধারণত এসি এবং পাওয়ার স্টিয়ারিং পেলেই খুশি থাকে। কিন্তু টাটা এবার খেলার নিয়ম বদলে দিয়েছে। ন্যানো ইভি র বেস মডেলেও রয়েছে ৭ ইঞ্চির টাচস্ক্রিন ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম যা অ্যাপল কার প্লে এবং অ্যান্ড্রয়েড অটো সাপোর্ট করে। টপ মডেলে রয়েছে ১০.২৫ ইঞ্চির স্ক্রিন এবং ভয়েস কমান্ড ফিচার। অর্থাৎ আপনি গাড়ি চালানোর সময় শুধু মুখে বললেই গান চালু হবে বা কাউকে ফোন করা যাবে।

ড্যাশবোর্ডের ডিজাইন অত্যন্ত মিনিমালিস্টিক বা ছিমছাম। গিয়ার লিভারের বদলে রয়েছে রোটারি ডায়াল যা জাগুয়ার বা ল্যান্ড রোভার গাড়িতে দেখা যায়। সবচেয়ে বড় কথা এই গাড়িতে ব্যবহার করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব রিসাইকেলড মেটেরিয়াল দিয়ে তৈরি সিট কভার এবং ড্যাশবোর্ড প্যানেল। ডিজিটাল ইনস্ট্রুমেন্ট ক্লাস্টারে দেখা যাবে ব্যাটারির অবস্থা কতটুকু চার্জ আছে আর কত দূর যাওয়া যাবে এবং নেভিগেশন ম্যাপ।

নিরাপত্তা এবং পুরনো ভুল থেকে শিক্ষা

পুরনো ন্যানোর ব্যর্থতার একটি বড় কারণ ছিল নিরাপত্তার অভাব বা মানুষের মনে সস্তা মানেই অনিরাপদ এই ধারণা। টাটা এবার সেই জায়গায় কোনো আপস করেনি। ন্যানো ইভি তে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৪টি এয়ারব্যাগ এবং টপ মডেলে রয়েছে ৬টি এয়ারব্যাগ। রয়েছে অ্যান্টি লক ব্রেকিং সিস্টেম বা এবিএস এবং ইলেকট্রনিক ব্রেকফোর্স ডিস্ট্রিবিউশন বা ইবিডি। টাটার দাবি তারা ভারত এনক্যাপ বা Bharat NCAP ক্র্যাশ টেস্টে এই গাড়ির জন্য ৫ স্টার রেটিং লক্ষ্য করে কাজ করেছে। বডি শেলে ব্যবহার করা হয়েছে হাই স্ট্রেংথ স্টিল। অর্থাৎ এই গাড়িটি ছোট হলেও মজবুত এবং যাত্রীদের সুরক্ষা দিতে সক্ষম।

অর্থনৈতিক বিপ্লব এবং মধ্যবিত্তের পকেটের বন্ধু

অর্থনীতিবিদরা বলছেন ন্যানো ইভি র এই লঞ্চ ভারতের অটোমোবাইল বাজারে এক সুনামির মতো। বর্তমানে ভারতের বাজারে সবচেয়ে সস্তা ইলেকট্রিক গাড়ির দামও ৮ থেকে ৯ লাখ টাকার নিচে নয় যেমন এমজি কমেট বা টিয়োগো ইভি। সেখানে ৩ লাখ টাকায় ৩০০ কিলোমিটার রেঞ্জ এটি একটি গেম চেঞ্জার।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড অনির্বাণ সেনগুপ্ত বলেন দেখুন ভারতের একটি বিশাল জনসংখ্যা আছে যারা ১.৫ থেকে ২ লাখ টাকা খরচ করে ভালো বাইক বা স্কুটার কেনেন। কিন্তু রোদ বৃষ্টি ঝড়ে তাদের কষ্ট হয়। তারা একটু বেশি খরচ করে গাড়ি কিনতে চাইলেও পেট্রোলের দাম এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচের ভয়ে পিছিয়ে যান। ন্যানো ইভি ঠিক এই গ্যাপ বা শূন্যস্থান পূরণ করবে। ৩ লাখ টাকা ডাউন পেমেন্ট না করে সামান্য ডাউন পেমেন্টে মাসে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা ইএমআই দিয়ে এখন মানুষ বাইকের খরচে গাড়ি চড়তে পারবে। এটি টু হুইলার মার্কেটে ধস নামাতে পারে।

রানিং কস্ট বা চালানোর খরচ

টাটার দাবি অনুযায়ী বাড়িতে চার্জ দিলে ন্যানো ইভি চালাতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হবে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ পয়সা। যেখানে একটি পেট্রোল বাইক চালাতেও প্রতি কিলোমিটারে ২.৫ থেকে ৩ টাকা খরচ হয় এবং পেট্রোল গাড়ির ক্ষেত্রে তা ৭ থেকে ৮ টাকা। অর্থাৎ একজন অফিসযাত্রী যদি দিনে ৪০ কিলোমিটার যাতায়াত করেন তবে মাসে তার সাশ্রয় হবে কয়েক হাজার টাকা। এই অঙ্কটিই মধ্যবিত্ত ক্রেতাকে শোরুমে টেনে আনবে। বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণের খরচও নামমাত্র কারণ ইলেকট্রিক গাড়িতে ইঞ্জিন অয়েল বা ফিল্টার বদলানোর ঝামেলা নেই।

news image
আরও খবর

বুকিং সুনামি এবং সার্ভার ক্র্যাশ

আজ দুপুর ১২টায় টাটা মোটরসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বুকিং উইন্ডো খোলার কথা ছিল। কিন্তু ১১টা ৫৫ মিনিট থেকেই ট্রাফিক বাড়তে শুরু করে। ১২টা বাজার ১ মিনিটের মধ্যে ওয়েবসাইট ক্র্যাশ করে যায়। টাটা মোটরসের আইটি টিম জানিয়েছে প্রথম ৫ মিনিটেই প্রায় ১ লক্ষ মানুষ বুকিং করার চেষ্টা করেছিলেন। অফলাইন শোরুমগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। কলকাতার ইএম বাইপাসের ধারের টাটা শোরুমে সকাল থেকেই লম্বা লাইন। ভিড় সামলাতে পুলিশ মোতায়েন করতে হয়েছে।

টুইটার বা এক্স এ ন্যানো ইভি এবং মিডল ক্লাস ড্রিম এখন এক নম্বরে ট্রেন্ডিং। অনেকে বুকিং কনফার্মেশনের স্ক্রিনশট শেয়ার করছেন আবার অনেকে সার্ভার ক্র্যাশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তবে এই উন্মাদনা প্রমাণ করে যে ব্র্যান্ড ন্যানো এখনো ফুরিয়ে যায়নি। মানুষ সস্তা এবং টেকসই পরিবহনের জন্য কতটা উন্মুখ হয়ে ছিল তা আজকের এই সাড়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

প্রতিযোগীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ

টাটার এই ঘোষণা মারুতি সুজুকি হুন্ডাই এবং এমজি মোটরের মতো কোম্পানিগুলোর ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে। মারুতি সুজুকি তাদের প্রথম ইভি ইভিএক্স আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে কিন্তু তার দাম হবে অনেক বেশি। এমজি কমেট একটি ছোট ইলেকট্রিক গাড়ি কিন্তু তার দাম ৭ লাখের ওপরে এবং তাতে মাত্র ২টি দরজা। ন্যানো ইভি ৪ দরজার ৫ সিটার গাড়ি হয়েও অর্ধেক দামে পাওয়া যাচ্ছে।

অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞ রোহিত বাল বলেন মারুতি অল্টো বা রেনো কুইড এর বাজার আজ শেষ হয়ে গেল বলে ধরে নেওয়া যায়। যারা প্রথমবার গাড়ি কিনবেন তারা কেন পেট্রোলের ঝামেলায় যাবেন যদি ৩ লাখে ইভি পান। এমনকি ওলা বা এথার এর মতো প্রিমিয়াম ইলেকট্রিক স্কুটার কোম্পানিগুলোও চাপে পড়বে। কারণ ১.৫ লাখ দিয়ে স্কুটার কেনার বদলে মানুষ ৩ লাখ দিয়ে গাড়ি কেনার কথা ভাববে। পরিবারের নিরাপত্তা এবং স্বাচ্ছন্দ্য এখানে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে।

চ্যালেঞ্জ এবং পরিকাঠামো

তবে সব কিছুই যে খুব সহজ হবে তা নয়। ভারতে এখনো চার্জিং পরিকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার পুরোপুরি তৈরি নয়। যদিও টাটা পাওয়ার সারা দেশে হাজার হাজার চার্জিং স্টেশন বসাচ্ছে তবুও লাখ লাখ ন্যানো রাস্তায় নামলে চার্জিং স্টেশনে লম্বা লাইন পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যারা ফ্ল্যাটে থাকেন বা যাদের নিজস্ব গ্যারেজ নেই তাদের জন্য বাড়িতে চার্জ দেওয়া একটি সমস্যা হতে পারে।

এছাড়া ৩ লাখ টাকা বা প্রারম্ভিক মূল্যে টাটা কতদিন এই গাড়ি বিক্রি করতে পারবে তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। ব্যাটারির কাঁচামালের দাম বাড়লে গাড়ির দামও বাড়তে পারে। টাটা জানিয়েছে প্রথম ১ লক্ষ ক্রেতার জন্যই এই ৩ লাখ টাকার বিশেষ মূল্য প্রযোজ্য হবে। এরপর দাম কিছুটা বাড়তে পারে। সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখা এবং বিপুল চাহিদার জোগান দেওয়া টাটার কারখানার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

পরিবেশের ওপর প্রভাব

পরিবেশবিদরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। ভারতের শহরগুলোতে দূষণের মাত্রা যে হারে বাড়ছে তাতে ইলেকট্রিক গাড়ির গণব্যবহার বা মাস অ্যাডপশন ছাড়া কোনো উপায় নেই। সস্তা ন্যানো ইভি যদি লক্ষ লক্ষ পেট্রোল বাইক এবং পুরনো গাড়িকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে পারে তবে তা বাতাসের গুণমান উন্নত করতে বিশাল ভূমিকা রাখবে।

ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন ক্লিন ট্রান্সপোর্টেশন এর ভারতীয় প্রধান বলেন এটি ভারতের নেট জিরো বা কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য একটি বড় পদক্ষেপ। তবে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে এই গাড়িগুলো চার্জ করার বিদ্যুৎ যেন কয়লা থেকে না এসে সৌরশক্তি বা নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে আসে। টাটা মোটরস জানিয়েছে তাদের ন্যানো ইভি তৈরিতেও গ্রিন এনার্জি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং গাড়িটির ৯০ শতাংশ অংশই পুনর্ব্যবহারযোগ্য।

ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং রপ্তানি বাজার

টাটা মোটরস জানিয়েছে তারা ন্যানো ইভি র উৎপাদন শুরু করবে গুজরাটের সানন্দ প্ল্যান্টে যেখানে একসময় আসল ন্যানো তৈরি হতো। বর্তমানে প্রতি মাসে ২০ হাজার গাড়ি তৈরির ক্ষমতা আছে যা আগামী ৬ মাসে বাড়িয়ে ৫০ হাজার করা হবে। গাড়িটির ডেলিভারি শুরু হবে ২০২৬ এর এপ্রিল মাস থেকে অর্থাৎ নতুন অর্থবর্ষের শুরুতেই।

এছাড়া টাটা এই গাড়িটি কেবল ভারতের জন্য নয় বরং এশিয়া আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রপ্তানি করার পরিকল্পনাও করছে। মেক ইন ইন্ডিয়া ব্র্যান্ডের অধীনে ন্যানো ইভি হতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা এবং কার্যকরী ইলেকট্রিক গাড়ি। নেপাল বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে এই গাড়ির বিশাল চাহিদা তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

উপসংহার এবং আবেগের প্রত্যাবর্তন

ন্যানো কেবল একটি গাড়ি নয় এটি একটি আবেগের নাম। ২০০৮ সালে এটি ব্যর্থ হয়েছিল কারণ এটি নিজেকে গরিবের গাড়ি হিসেবে তুলে ধরেছিল যা ক্রেতাদের ইগোতে আঘাত করেছিল। কিন্তু ২০২৬ এর ন্যানো ইভি নিজেকে স্মার্ট মানুষের স্মার্ট চয়েস হিসেবে তুলে ধরছে। টাটা এবার আর সস্তা শব্দটি ব্যবহার করছে না বরং তারা বলছে সাশ্রয়ী এবং আধুনিক।

আজকের এই লঞ্চ প্রমাণ করল যে ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়। সঠিক সময়ে সঠিক প্রযুক্তির সাথে ফিরে আসলে ইতিহাস নতুন করে লেখা যায়। ৩ লাখ টাকার এই গাড়িটি হয়তো ভারতের রাস্তার ছবিটাই বদলে দেবে। ট্রাফিক জ্যাম বাড়বে ঠিকই কিন্তু সেই জ্যামে আটকে থাকা মানুষগুলোর মুখে বিষাক্ত ধোঁয়ার বদলে থাকবে নতুন প্রযুক্তির গর্ব।

মধ্যবিত্ত বাবারা আজ বাড়ি ফিরে হয়তো ক্যালকুলেটর নিয়ে বসবেন। বাচ্চার স্কুলের ফিস বাজারের খরচ এবং বাড়ি ভাড়ার পর যে সামান্য টাকাটা বাঁচে তা দিয়েই হয়তো এবার তাদের গ্যারেজে আসবে স্বপ্নের চার চাকা। বৃষ্টির দিনে আর বাইকে ভিজে অফিস যেতে হবে না বা পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে বেরোতে আর অটো ভাড়ার চিন্তা করতে হবে না। টাটা মোটরস আজ কেবল একটি গাড়ি বিক্রি করেনি তারা বিক্রি করেছে আশা। আর ভারতের মতো দেশে আশাই সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। রতন টাটা হয়তো আজ শারীরিকভাবে উপস্থিত নেই কিন্তু তার দর্শন প্রতিটি ন্যানো ইভি র চাকায় গড়িয়ে চলবে ভারতের প্রতিটি কোণায়।

Preview image