৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা। সিবিএসই বোর্ড আজ ঘোষণা করেছে যে নবম ও দশম শ্রেণীতে অঙ্ক এবং বিজ্ঞান শেখানোর জন্য এআই রোবট শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। মানুষের সাহায্যকারী হিসেবে এই রোবটগুলো প্রতিটি ছাত্রের মেধা অনুযায়ী পার্সোনালাইজড ক্লাস নেবে। শিক্ষক সংগঠনগুলো এর বিরোধিতা করলেও অভিভাবকরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। নতুন এই প্রযুক্তি কি সত্যিই পড়াশোনার মান বাড়াবে নাকি মানুষের জায়গা কেড়ে নেবে তা নিয়ে চলছে জোর তর্ক।
ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে আজ এক যুগান্তকারী অধ্যায় যুক্ত হলো। চক ডাস্টার এবং ব্ল্যাকবোর্ডের দিন কি তবে শেষ হতে চলল। সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন বা সিবিএসই আজ সকালে এক বিশেষ নির্দেশিকা জারি করে জানিয়েছে যে দেশের বাছাই করা কিছু স্কুলে এবার থেকে নবম ও দশম শ্রেণীর অঙ্ক এবং বিজ্ঞান ক্লাসে মানুষের পাশাপাশি ক্লাস নেবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স চালিত রোবট শিক্ষক। প্রাথমিক পর্যায়ে বা পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে দিল্লি মুম্বাই বেঙ্গালুরু এবং কলকাতার মোট ১০০টি স্কুলে এই এআই শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই শিক্ষামহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। শিক্ষক সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে অন্যদিকে প্রযুক্তিবিদ এবং শিক্ষাবিদদের একাংশ একে স্বাগত জানিয়েছেন।
কেন এই সিদ্ধান্ত
সিবিএসই র চেয়ারম্যান বিনীত যোশী এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন আমরা লক্ষ্য করেছি যে নবম ও দশম শ্রেণীতে ওঠার পর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অঙ্ক এবং বিজ্ঞান নিয়ে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়। সিলেবাসের চাপ এবং জটিল ধারণাগুলো বুঝতে না পারায় অনেকেই পিছিয়ে পড়ে। একজন মানুষের পক্ষে ক্লাসের ৪০ বা ৫০ জন ছাত্রের প্রত্যেকের মেধা অনুযায়ী আলাদাভাবে বোঝানো সম্ভব হয় না। এখানেই এআই শিক্ষকের প্রয়োজন। এই রোবটগুলো প্রতিটি ছাত্রের শেখার গতি বা লার্নিং স্পিড বিশ্লেষণ করবে এবং সেই অনুযায়ী তাদের আলাদা আলাদাভাবে বোঝাবে। তিনি আরও বলেন ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল যুগে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের বিশ্বমানের শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে। জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে ইতিমধ্যেই রোবট শিক্ষকের ব্যবহার শুরু হয়েছে। ভারত কেন পিছিয়ে থাকবে।
কীভাবে কাজ করবে এই এআই রোবট
বোর্ডের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে এই রোবটগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে শিক্ষা বট। এগুলো মানুষের মতো দেখতে হিউম্যানয়েড রোবট নয় বরং এগুলো চাকাযুক্ত এবং স্ক্রিনসহ এক বিশেষ ধরনের স্মার্ট মেশিন। এই রোবটগুলো ক্লাসরুমের নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত থাকবে।
১ পার্সোনালাইজড লার্নিং বা ব্যক্তিগত শিক্ষা প্রতিটি ছাত্রের ডেস্কে একটি করে ট্যাবলেট থাকবে যা রোবটের সাথে সংযুক্ত থাকবে। যখন শিক্ষক কোনো কঠিন অঙ্ক বোঝাবেন তখন কোনো ছাত্র যদি তা বুঝতে না পারে তবে সে ট্যাবলেটে সিগন্যাল দেবে। রোবটটি সঙ্গে সঙ্গে সেই ছাত্রের কাছে গিয়ে তার বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী সহজ ভাষায় বা এনিমেশনের মাধ্যমে বিষয়টি বুঝিয়ে দেবে।
২ ফেসিয়াল রেকগনিশন বা মুখমন্ডল শনাক্তকরণ এই এআই রোবটগুলোর চোখে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা থাকবে। ক্লাস চলাকালীন কোন ছাত্র অমনযোগী বা কে বুঝতে পারছে না তা এই ক্যামেরা ছাত্রদের মুখের অভিব্যক্তি দেখে ধরে ফেলবে। এরপর সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রোবটটি শিক্ষককে জানাবে যে কোন ছাত্রের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া দরকার।
৩ রিয়েল টাইম মূল্যায়ন পরীক্ষার খাতা দেখার জন্য আর শিক্ষকদের রাত জাগতে হবে না। ছাত্ররা ট্যাবলেটে পরীক্ষা দেবে এবং এই এআই শিক্ষক মুহূর্তের মধ্যে তা চেক করে নম্বর দেবে। শুধু তাই নয় কোন ছাত্র কোন চ্যাপ্টারে দুর্বল তার একটি বিস্তারিত রিপোর্টও তৈরি করবে।
৪ ২৪ ঘণ্টা সন্দেহ দূরীকরণ স্কুলের পরেও ছাত্ররা বাড়ি থেকে অ্যাপের মাধ্যমে এই এআই শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে। অঙ্ক কষতে গিয়ে আটকে গেলে বা বিজ্ঞানের কোনো সূত্র ভুলে গেলে রোবটটি চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো প্রযুক্তির সাহায্যে তা সমাধান করে দেবে।
শিক্ষক বনাম যন্ত্র বিতর্ক
এই ঘোষণার পর থেকেই সারা দেশে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। অল ইন্ডিয়া স্কুল টিচার্স ফেডারেশন বা এআইএসটিএফ এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বলেন সরকার শিক্ষার বেসরকারীকরণ এবং যান্ত্রিকীকরণের ষড়যন্ত্র করছে। শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো গুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক। একটি যন্ত্র কি কখনো ছাত্রের মাথায় হাত রেখে ভরসা দিতে পারবে। একটি রোবট কি বুঝবে যে ছাত্রটির মন খারাপ নাকি শরীর খারাপ। অঙ্ক বা বিজ্ঞান কেবল সূত্র মুখস্ত করা নয় এর সাথে যুক্তির বিকাশ এবং মানবিক মূল্যবোধ জড়িয়ে আছে। আমরা আশঙ্কা করছি এর ফলে ভবিষ্যতে মানুষের চাকরি চলে যাবে এবং স্কুলগুলো মেশিনের কারখানায় পরিণত হবে।
শিক্ষক সংগঠনগুলো আরও প্রশ্ন তুলেছে যে ভারতের মতো দেশে যেখানে অনেক স্কুলে এখনো বিদ্যুৎ বা পানীয় জল নেই সেখানে কোটি কোটি টাকা খরচ করে এই রোবট কেনা কি বিলাসিতা নয়। তারা দাবি করেছেন এই টাকা দিয়ে আরও বেশি সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করা উচিত এবং পরিকাঠামো উন্নত করা উচিত।
সরকারের যুক্তি এবং আশার আলো
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান শিক্ষকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন এই রোবটগুলো কখনোই মানুষের বিকল্প নয় বরং তারা মানুষের সাহায্যকারী বা অ্যাসিস্ট্যান্ট। তিনি বলেন একজন শিক্ষককে ক্লাসে পড়ানো খাতা দেখা এটেন্ডেন্স নেওয়া এবং প্রশাসনিক কাজ করতে গিয়ে প্রচুর সময় নষ্ট করতে হয়। এআই রোবট এই একঘেয়ে কাজগুলো করে দিলে শিক্ষক আসল কাজে অর্থাৎ ছাত্রদের মানুষ গড়ার কাজে বেশি সময় দিতে পারবেন। এটি হাইব্রিড মডেল যেখানে মানুষ এবং যন্ত্র একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। কারো চাকরি যাওয়ার প্রশ্নই নেই।
অভিভাবকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
অভিভাবকদের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলের এক ছাত্রের বাবা সুজয় বিশ্বাস বলেন এটি দারুণ উদ্যোগ। আমার ছেলে অঙ্কে কাঁচা। প্রাইভেট টিউটর রেখেও লাভ হচ্ছে না। যদি স্কুলে রোবট তাকে আলাদাভাবে যত্ন নিয়ে বোঝায় তবে তার ভীতি কাটবে। তাছাড়া কোচিং সেন্টারের হাজার হাজার টাকা খরচ বাঁচবে।
অন্যদিকে দিল্লির এক অভিভাবক নম্রতা শর্মা বলেন বাচ্চারা এমনিতেই সারাদিন মোবাইলে মুখ গুঁজে থাকে। এখন স্কুলেও যদি রোবট আর স্ক্রিন থাকে তবে ওদের সামাজিক বিকাশ বা সোশ্যাল স্কিল নষ্ট হয়ে যাবে। ওরা মানুষের সাথে মিশতে ভুলে যাবে। তাছাড়া এই রোবটগুলোর থেকে নির্গত রেডিয়েশন বা চোখের ক্ষতি নিয়েও আমরা চিন্তিত।
প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এবং বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন পরিকল্পনাটি শুনতে ভালো লাগলেও ভারতের বাস্তবতায় এটি কার্যকর করা কঠিন। আইআইটি বোম্বের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড মনোজ কুমার বলেন এআই রোবট চালানোর জন্য হাই স্পিড ইন্টারনেট এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ প্রয়োজন। ভারতের মেট্রো শহরগুলোতে এটি সম্ভব হলেও মফস্বল বা গ্রামের স্কুলগুলোতে এটি কীভাবে চলবে তা নিয়ে সংশয় আছে। তাছাড়া এই রোবটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ বা মেইনটেন্যান্স অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। ধুলোবালি এবং গরমে এগুলো কতদিন ঠিক থাকবে তা দেখার বিষয়। এছাড়াও সাইবার সিকিউরিটি বা তথ্যের নিরাপত্তা একটি বড় ইস্যু। ছাত্রদের ব্যক্তিগত তথ্য যাতে হ্যাকারদের হাতে না যায় সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে।
গ্রাম ও শহরের ব্যবধান
শিক্ষাবিদদের একাংশ আশঙ্কা করছেন এই সিদ্ধান্তের ফলে ডিজিটাল ডিভাইড বা ধনী ও গরিবের ব্যবধান আরও বাড়বে। এআই শিক্ষক কেবল বড় বড় প্রাইভেট স্কুল বা কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে থাকবে। সরকারি বাংলা বা হিন্দি মিডিয়াম স্কুলের ছাত্ররা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় যেমন জেইই বা নিট এ শহরের ছাত্ররা আরও সুবিধা পাবে এবং গ্রামের ছাত্ররা পিছিয়ে পড়বে। এই বৈষম্য দূর করার জন্য সরকারকে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করতে হবে।
মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
মনোবিজ্ঞানীরা শিশুদের মনের ওপর রোবটের প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন। ড অনিরুদ্ধ দেব বলেন শিশুরা অনুকরণ করে শেখে। তারা শিক্ষকের হাঁটাচলা কথা বলার ভঙ্গি এবং ব্যক্তিত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়। একটি যন্ত্রের কোনো ব্যক্তিত্ব নেই। দীর্ঘ সময় রোবটের সাথে কাটালে শিশুদের মধ্যে এমpathy বা সহমর্মিতা কমে যেতে পারে। তারা সবকিছুকে যুক্ত দিয়ে বিচার করবে আবেগ দিয়ে নয়। তবে তিনি এও বলেন যে বর্তমান প্রজন্ম ডিজিটাল নেটিভ। তারা ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির সাথে পরিচিত। তাই তারা হয়তো রোবটকে সহজেই বন্ধু হিসেবে মেনে নেবে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশে কী হচ্ছে
জাপানে ২০১৯ সাল থেকেই কিছু স্কুলে এআই রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে ইংরেজি শেখানোর জন্য। চীনেও স্কুইরেল এআই নামে একটি সংস্থা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ছাত্রদের পড়াচ্ছে এবং সেখানে দেখা গেছে মানুষের চেয়ে এআই এর শেখানোর গতি দ্রুত। ফিনল্যান্ড যা শিক্ষার জন্য বিখ্যাত সেখানেও এলিয়াস নামে একটি ভাষা শেখানোর রোবট ব্যবহার করা হয়। তবে কোনো দেশই মানুষের পরিবর্তে পুরোপুরি রোবট ব্যবহার করছে না। সব জায়গাতেই সহায়ক হিসেবে যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। ভারত সেই পথেই হাঁটতে চাইছে।
আগামী দিনের পরিকল্পনা
সিবিএসই জানিয়েছে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষে এই পাইলট প্রজেক্ট শুরু হবে। প্রথম ছয় মাস পর্যবেক্ষণ করা হবে। ছাত্রছাত্রীদের রেজাল্ট এবং মানসিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে রিপোর্ট তৈরি করা হবে। যদি ফলাফল ইতিবাচক হয় তবে ২০২৭ সাল থেকে আরও ১০০০টি স্কুলে এই ব্যবস্থা চালু করা হবে। ভবিষ্যতে ইতিহাস এবং ভূগোলের মতো বিষয়গুলোতেও এআই এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা ভিআর ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ছাত্ররা ক্লাসে বসেই মুঘল আমল বা সিন্ধু সভ্যতা দেখতে পাবে।
উপসংহার
২০২৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ভারতের শিক্ষার ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ। এআই রোবট শিক্ষক কি আমাদের শিক্ষার মান বাড়াবে নাকি এটি একটি ব্যয়বহুল ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে তা সময়ই বলবে। তবে পরিবর্তন অনিবার্য। পৃথিবী যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে এগোচ্ছে তখন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরনো ধাঁচে আঁকড়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে মানুষের কল্যাণে। রোবট আসুক কিন্তু সে যেন শিক্ষকের মানবিক স্পর্শকে কেড়ে না নেয়। অঙ্কের জটিল সমস্যা রোবট সমাধান করে দিক কিন্তু জীবনের জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য যেন ছাত্ররা মানুষের কাছেই ফিরে আসে। সিবিএসই র এই সাহসী পদক্ষেপ সফল হোক এবং ভারতের প্রতিটি শিশু গুণগত শিক্ষার আলো পাক এটাই আমাদের কাম্য। আপাতত স্কুল গেটের বাইরে কৌতূহলী ছাত্রদের ভিড়। তারা অপেক্ষা করছে তাদের নতুন যান্ত্রিক বন্ধুকে দেখার জন্য। তাদের চোখে বিস্ময় এবং মনে হাজারো প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী কয়েক মাসে।