ফুটপাথের একাধিক খাবার গুণগত মানের পরীক্ষায় ফেল৷ সূত্রের খবর, চিকেন রোল, চিকেন চাপ, হলুদ গুঁড়ো, মুগের লাড্ডুর মতো ৬ টি খাবার গুণগত মানের পরীক্ষায় ফেল করেছে বলেই জানা গিয়েছে
কলকাতা, সোমবার: শহরের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক অঞ্চলের মধ্যে একটি—মুচিবাজারে সোমবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকরা ফুটপাথের একাধিক খাবারের দোকানে অভিযান চালায়। সূত্রের খবর, অভিযানের সময় ১৫টি দোকানে গিয়ে ৩১টি খাবারের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। সেই পরীক্ষায় ৬টি খাবারের নমুনা “ফেল” করেছে—অর্থাৎ গুণগত মানে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এই ৬টি খাবারের মধ্যে রয়েছে চিকেন রোল, চিকেন কষা, হলুদ গুঁড়ো, মুগের লাড্ডু ইত্যাদি।
অভিযানকালে উপস্থিত ছিলেন খাদ্য সুরক্ষা দফতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং কলকাতা পুরসভার সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা। ঘটনার স্থলে দাঁড়িয়েই দফতরের নির্দেশে দোকানিদের বাধ্য করা হয় এই খাদ্যদ্রব্যগুলো ফেলে দিতে। অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল—খাদ্য সুরক্ষা সচেতনতা বৃদ্ধি ও অবৈজ্ঞানিক, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্য বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা।
মুচিবাজারের খাবারকে কলকাতার “ফুড হাব” বলা হয়। এ এলাকা শুধু স্থানীয়দের নয়, বাইরের মানুষেরাও ভিড় করেন সস্তা ও স্বাদিষ্ট খাবারের জন্য। বিশেষ করে রোল, চাপ, লাড্ডু, বিভিন্ন ধরনের তন্দুরি-চিকেন, কষা ইত্যাদি এখানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে একাধিক অনিয়মও জড়িয়ে থাকে—অবৈজ্ঞানিকভাবে সংরক্ষণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অনিয়ন্ত্রিত তেল-ঘি ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও ভেজাল উপাদান, এবং পরিচ্ছন্নতার অভাব।
এসব কারণেই খাদ্য সুরক্ষা দফতর এবং কলকাতা পুরসভা মিলে এই ধরনের অভিযান শুরু করেছে। সূত্রের খবর, খাদ্য সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যায় মুচিবাজারের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে অভিযানের সূত্রপাত। সেখানে ১৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মোট ১৫টি খাবারের দোকানে নজরদারি চালানো হয়। এসব দোকান থেকে ৩১টি খাবারের নমুনা নেওয়া হয় এবং তা সেই মুহূর্তেই ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষায় যেসব খাবার “ফেল” করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
১.৫ কেজি চিকেন রোলের পুর
৩টি দোকানের ১.৮ কেজি হলুদ গুঁড়ো
৩.৫ কেজি লাড্ডু (সাড়ে তিন কেজি)
২ কেজি চিকেন কষা
অভিযানকালে ওই সমস্ত খাবার বিক্রেতাদের বাধ্য করা হয় অবিলম্বে ফেলে দিতে। পাশাপাশি দোকানগুলির পরিচ্ছন্নতা, খাদ্য সংরক্ষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, কাঁচামালের উৎস, এবং খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
খাদ্য সুরক্ষা দফতরের পরীক্ষায় সাধারণত নিম্নলিখিত দিকগুলো বিবেচনা করা হয়:
হলুদ গুঁড়োতে অনেক সময় ভেজাল ময়লা, কাঁচামাল মেশানো, রং বা রাসায়নিক যুক্ত করা হয়। এমনকি সস্তা হলুদকে “মেথি বা অন্যান্য মিশ্রণে” বিক্রি করা হয়।
চিকেন রোল বা কষার মতো মাংসজাত খাবারে যথাযথ তাপমাত্রা না থাকলে ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় ফুটপাথে রেখে দেওয়া হলে খাবারে সালমোনেলা, ইকোলাই ইত্যাদি জীবাণুর ঝুঁকি থাকে।
দোকানে হাত ধোয়া, কাটিং বোর্ড, পাত্র-প্রস্তুতিতে পরিষ্কার না থাকা—এসবই খাবারের গুণগত মান নষ্ট করে।
চিকেন রোলের পুর বা কষা দীর্ঘক্ষণ বাইরে রাখা হলে দ্রুত নষ্ট হয়। এতে অস্বাস্থ্যকর গন্ধ, রং পরিবর্তন, গুণগত মানের অবনতি দেখা যায়।
ফুটপাথে ধুলো, ধোঁয়া, ময়লা, পোকামাকড়—এগুলো খাবারে সংক্রমণ বাড়ায়।
এগুলোই প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় যে গুণগত মান পরীক্ষায় ওই খাবারগুলো “ফেল” করেছে।
অভিযানকালে বেশ কিছু দোকানির সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে খাবার তৈরি করে আসছেন। তাদের দাবি, “গ্রাহকই খায়, কেউ অসুস্থ হয়নি”—এমন অনেক বারেই শোনা যায়। তবে দফতরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দৈনন্দিন ক্ষুদ্র ক্ষতি ও স্বল্প মুনাফা হলেও খাদ্য সুরক্ষা মান বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
অনেক দোকানি মনে করছেন, এই অভিযান তাদের আয় কমাবে। কিন্তু খাদ্য সুরক্ষা দফতর মনে করিয়ে দিয়েছে—অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে দীর্ঘমেয়াদে মানুষ অসুস্থ হয়ে ব্যবসায়িক ক্ষতি আরও বেশি হবে।
কিছু দোকানি অভিযোগ করেন, “একদিনে হানা দিয়ে আমাদের সম্পূর্ণ খাবার ফেলে দিতে বাধ্য করা হয়। এভাবে ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে ক্ষতি হওয়া স্বাভাবিক।”
তবে সরকারি দফতরের বক্তব্য—এটি “শিক্ষামূলক ও সতর্কবার্তা” প্রচারণা। আগামী দিনে নিয়ম ভাঙলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মুচিবাজারে খাবারের ভিড় অনেক বেশি। অনেকেই দিনরাতের কাজে ব্যস্ত হওয়ায় এখানে সস্তা খাবারের ওপর নির্ভরশীল। অভিযানের খবর প্রকাশ্যে আসার পর অনেক গ্রাহক উদ্বিগ্ন হয়েছেন।
এক স্থানীয় ক্রেতা বলেন, “এখানকার খাবার স্বাদে ভালো, কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সন্দেহ ছিলই। আজকের খবর শুনে মনে হলো, সত্যিই আমরা রোজকার খাবারেও ঝুঁকি নিচ্ছি।”
অন্য একজন বলেন, “দোকানের পাশেই খাবার খাওয়া নিরাপদ নয়। দোকানিরা যতটা সম্ভব পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে আমাদেরও মানসিকভাবে শান্তি হবে।”
খাদ্য সুরক্ষা দফরের আধিকারিকদের বক্তব্য ছিল—এই অভিযান শুধুই একটি “শাস্তিমূলক” উদ্যোগ নয়, বরং জনগণের মধ্যে খাদ্য সুরক্ষা সচেতনতা বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ।
তারা বলেছেন:
খাদ্য তৈরিতে হাইজিন বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
চিকেন, মাছ, মাংসের মতো খাদ্যদ্রব্যকে সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে।
“বিক্রি করার আগে খাবারকে সঠিকভাবে গরম করা” বাধ্যতামূলক।
হলুদ গুঁড়ো, মশলা—এগুলোতে ভেজাল বা নকল উপাদান মেশানো হলে তা সরাসরি গ্রাহকের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলবে।
খাদ্য সুরক্ষা দফরের অধীনে খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কিত আইনগুলি খুবই কঠোর।
ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অ্যাক্ট (FSSAI) অনুযায়ী:
অবৈধভাবে খাবার বিক্রি করলে জরিমানা, দোকান সিল, লাইসেন্স বাতিল ইত্যাদি হতে পারে।
ভেজাল বা নকল উপাদান ব্যবহার করলে দণ্ডনীয় অপরাধ ধরা হয়।
খাদ্যদ্রব্যে “নিষিদ্ধ রাসায়নিক” বা “অবৈধ সংরক্ষণ” পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মুচিবাজারে এই অভিযানকে সেই আইনগত কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে—যেখানে প্রথমে সচেতনতা, তারপর পুনরাবৃত্তিতে কঠোর ব্যবস্থা।
মুচিবাজার কেবল একটি বাজার নয়, এটি একটি “খাবার হাব” যেখানে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন খাবার কিনে। এখানকার ফুটপাথের দোকানগুলোর খাবার শহরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছায়।
কিছু বিশেষ কারণ:
জনসংখ্যা ঘনত্ব বেশি—এখানে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি।
খাদ্য বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েই অল্প আয়ের—সস্তা খাবারই প্রধান বিক্রয়।
পরিচ্ছন্নতার মান বজায় রাখা কঠিন—ফুটপাথের পরিবেশ অনুকূল নয়।
সাধারণভাবে মশলা ও উপকরণ সংরক্ষণে সমস্যা—বাইরের পরিবেশে ভেজাল মেশানোর ঝুঁকি বেশি।
এসব কারণেই খাদ্য সুরক্ষা দফরের নজর এই এলাকায় বেশি।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, এই অভিযান শুধু একদিনের ঘটনা নয়। খাদ্য সুরক্ষা দফর আগামী দিনে নিয়মিত নজরদারি চালাবে। তবে শুধু জরিমানা বা খাবার ফেলা নয়, দোকানিদের জন্য কিছু সহায়তামূলক উদ্যোগও নেওয়া হবে, যেমন:
স্যানিটেশন ও হাইজিনের প্রশিক্ষণ
সঠিক খাদ্য সংরক্ষণ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ শেখানো
হ্যান্ডওয়াশিং, গ্লাভস, মাস্ক ইত্যাদি ব্যবহারে সচেতনতা
সঠিকভাবে লাইসেন্স এবং নমুনা পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া বোঝানো
এই উদ্যোগগুলো দোকানিদের “সহায়তা” হিসেবে দেখা হচ্ছে যাতে তারা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ব্যবসা চালাতে পারে।
এখন গ্রাহকরা খাবার বেছে নিতে আরও সতর্ক হবেন। বাজারের খাবারের গুণগত মানের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়বে।
কিন্তু একই সঙ্গে, অনেকেই বলছেন—দোকানিরা যদি সতর্ক না থাকে, তাহলে “বাজারের খাবার” সম্পর্কে মানুষের আস্থা কমে যাবে।
দোকানিরা জানেন—স্বাস্থ্যবিধি মানলে খরচ বাড়ে। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে, গ্রাহকও বাড়বে। তাই অনেকেই ইতিবাচকভাবে এই পরিবর্তনকে দেখছেন।
প্রশাসনের লক্ষ্য একটাই—খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শুধু দণ্ডিত করা নয়, সচেতনতা বৃদ্ধি করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।