Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

আলুসিদ্ধ ভাত খেয়ে পড়াশোনা পরিযায়ী শ্রমিকের ছেলে সাগর মণ্ডলের রাজ্যে নবম আইএএস হওয়াই স্বপ্ন

নদীয়ার শান্তিপুরের কৃতি ছাত্র সাগর মণ্ডল চরম দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্যেও উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যের নবম স্থান অধিকার করে নজির গড়েছে  পরিযায়ী শ্রমিক বাবা-মায়ের সন্তান সাগরের আগামী দিনের স্বপ্ন আইএএস অফিসার হয়ে সমাজ ও কৃষকদের জন্য কাজ করা।

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা জগতে আবারও উঠে এলো এক অনুপ্রেরণার গল্প। দারিদ্র্য, সংগ্রাম এবং প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যের নবম স্থান অধিকার করে নদীয়ার মুখ উজ্জ্বল করলো শান্তিপুর থানার নৃসিংহপুর এলাকার কৃতি ছাত্র সাগর মণ্ডল। পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের সন্তান হয়েও নিজের অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে এই সাফল্য অর্জন করেছে সাগর। তার এই সাফল্যে গর্বিত গোটা নদীয়া জেলা তথা রাজ্যবাসী।

সাগর মণ্ডলের বাবা ভিন রাজ্যে একটি হোটেলে থালা-বাসন মাজার কাজ করেন এবং মা অন্য রাজ্যের একটি হাসপাতালে শ্রমিকের কাজ করেন। সংসারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই সাগরকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বাবা-মা কাজের সূত্রে ভিন রাজ্যে থাকতেন বলে বাড়িতে একাই থাকতে হতো তাকে। দুই দিদির বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর কার্যত একাই নিজের জীবন সামলেছে সাগর।

পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা মহারাজা হাইস্কুলের ছাত্র সাগর এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অসাধারণ ফল করেছে। কলা বিভাগের ছাত্র হয়েও রাজ্যের নবম স্থান অধিকার করেছে সে। তার প্রাপ্ত নম্বরগুলি হল— বাংলায় ৯৬, ইংরেজিতে ৯৯, ভূগোলে ৯৬, ইতিহাসে ৮৭ এবং পলিটিক্যাল সায়েন্সে ৯৬। এই ফলাফল শুধু তার মেধার প্রমাণ নয়, বরং তার অদম্য সংগ্রামেরও প্রতিফলন।

বাড়িতে একা থাকার কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়ির সমস্ত কাজ নিজেকেই করতে হতো সাগরের। রান্না থেকে ঘর পরিষ্কার— সবটাই সামলাত সে। পড়াশোনার চাপের কারণে অধিকাংশ দিনই আলুসিদ্ধ ভাত রান্না করে খেত। সেই সাধারণ খাবার খেয়েই দিনের পর দিন পড়াশোনা চালিয়ে গেছে সে। সকালবেলায় নিয়মিত শরীরচর্চাও করত সাগর। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়াতো সে।

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর নিজের পড়াশোনার ভবিষ্যৎ খরচের কথা ভেবে বাবার কাছে ভিন রাজ্যে গিয়ে হোটেলে কাজও করতে শুরু করে সাগর। পরিবারের উপর চাপ কমানোর জন্যই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু তখনও সে বুঝতে পারেনি যে তার ফলাফল রাজ্যজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করবে। বাবার সঙ্গে কাজ করার সময় সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারে যে সে রাজ্যের নবম স্থান অধিকার করেছে।

সাগর মণ্ডল জানিয়েছে, সে ভবিষ্যতে আইএএস অফিসার হতে চায়। সমাজের পরিবর্তন, শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা এবং কৃষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই তার মূল লক্ষ্য। সাগরের কথায়, “ভালো পরীক্ষা দিয়েছিলাম, কিন্তু এত ভালো র‍্যাঙ্ক হবে ভাবিনি। আমার পথটা খুব কঠিন ছিল। বাড়িতে একা থাকতে হতো, নিজেকেই রান্না করতে হতো। বেশিরভাগ সময় আলুসিদ্ধ ভাত খেয়েই পড়াশোনা করেছি। আগামী দিনে আমি আইএএস অফিসার হয়ে সমাজের জন্য কাজ করতে চাই।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে শিক্ষা ক্ষেত্রে যেভাবে দুর্নীতি বাড়ছে, তা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। আমি চাই শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের সুসম্পর্ক বজায় থাকুক এবং কৃষকরা যেন তাদের ফসলের ন্যায্য মূল্য পান।”

সাগরের মা সুষমা মণ্ডলও আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “ছোট থেকেই ও খুব মেধাবী ছিল। ওকে পড়তে বলতে হত না। সারাদিন পড়াশোনা করত। আমরা আর্থিকভাবে খুব দুর্বল হওয়ায় সব শিক্ষকের পুরো মাইনে দিতে পারতাম না। কিন্তু শিক্ষকরাও ওর মেধা দেখে অনেক কম টাকায় পড়িয়েছেন। আমরা চাই সরকার আমাদের পাশে দাঁড়াক যাতে ওর স্বপ্ন পূরণ হয়।”

সাগরের জামাইবাবু সুকুমার পাল, যিনি পেশায় রাজমিস্ত্রি, তিনিও জানান যে ছোটবেলা থেকেই সাগর অত্যন্ত মেধাবী এবং পরিশ্রমী। তিনি বলেন, “আমি যতটা পারতাম সাহায্য করেছি। আজ ওর এই সাফল্যে আমরা সবাই গর্বিত।”

প্রতিবেশী গঙ্গা বিশ্বাসও সাগরের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ছোট থেকে ও অনেক কষ্ট করেছে। অনেক সময় আমি ওর বাড়িতে গিয়ে রান্না করে দিয়েছি। ও খুব ভালো ছেলে। সারাদিন পড়াশোনা করত। আমরা চাই ও আরও বড় হোক।”

news image
আরও খবর

বর্তমান সময়ে যখন সমাজের এক বড় অংশ নানা আর্থিক সংকট, বেকারত্ব এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে, তখন নদীয়ার কৃতি ছাত্র সাগর মণ্ডলের সাফল্য যেন নতুন করে আশা দেখাচ্ছে হাজার হাজার সাধারণ পরিবারকে। দারিদ্র্য, একাকীত্ব এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করেও যে স্বপ্ন পূরণ করা যায়, সাগর তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় সংগ্রামে ভরা, আর সেই সংগ্রামকেই শক্তিতে পরিণত করে সে আজ উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যের নবম স্থান অধিকার করেছে।

সাগর মণ্ডলের এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে অসীম কষ্ট, আত্মত্যাগ এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি। মা-বাবা দুজনেই ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করেন। সংসারের আর্থিক অবস্থা এতটাই দুর্বল ছিল যে ছোটবেলা থেকেই তাকে নিজের জীবন নিজেকেই সামলাতে হয়েছে। দুই দিদির বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বাড়িতে কার্যত একাই থাকত সাগর। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি রান্না করা, ঘর পরিষ্কার, বাজার করা— সব দায়িত্ব তার কাঁধেই ছিল। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও সে কখনও পড়াশোনাকে অবহেলা করেনি।

পড়াশোনার চাপে অধিকাংশ দিনই সাগর আলুসিদ্ধ ভাত রান্না করে খেত। অনেক সময় পর্যাপ্ত খাবার বা আরামদায়ক পরিবেশও পায়নি। কিন্তু তবুও সে নিজের স্বপ্ন থেকে সরে আসেনি। বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিকেই নিজের শক্তিতে পরিণত করেছে। সকালবেলায় নিয়মিত শরীরচর্চা করত সে। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়াতো। এই কঠোর নিয়মানুবর্তিতা এবং আত্মবিশ্বাসই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর পরিবারের আর্থিক চাপ কমানোর জন্য বাবার কাছে ভিন রাজ্যে গিয়ে হোটেলে কাজও শুরু করে সাগর। নিজের ভবিষ্যতের পড়াশোনার খরচ কিছুটা জোগাড় করার উদ্দেশ্যেই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু তখনও সে কল্পনাও করতে পারেনি যে রাজ্যের মেধাতালিকায় তার নাম উঠে আসবে। বাবার সঙ্গে হোটেলে কাজ করার সময় সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারে যে সে রাজ্যের নবম স্থান অধিকার করেছে। সেই মুহূর্ত শুধু তার পরিবারের জন্য নয়, গোটা নদীয়া জেলার জন্য গর্বের মুহূর্ত হয়ে ওঠে।

সাগরের এই সাফল্য প্রমাণ করে দিয়েছে যে জীবনে বড় কিছু করতে গেলে অর্থই সব নয়। প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং লক্ষ্যপূরণের অদম্য ইচ্ছা। বর্তমানে অনেক ছাত্রছাত্রী সামান্য ব্যর্থতা বা সমস্যার মুখে ভেঙে পড়ে। কিন্তু সাগরের জীবন তাদের সামনে এক বিরাট অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতি কখনও মানুষের স্বপ্নকে থামাতে পারে না— যদি সেই মানুষটির মধ্যে লড়াই করার মানসিকতা থাকে।

সাগর ভবিষ্যতে আইএএস অফিসার হতে চায়। শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্য কাজ করাই তার মূল লক্ষ্য। সে চায় শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরুক, ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠুক এবং কৃষকরা যেন তাদের ফসলের ন্যায্য মূল্য পান। বর্তমান সমাজে দুর্নীতি এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে চায় সে। এত কম বয়সে তার এই চিন্তাভাবনা অনেককেই অবাক করেছে।

সাগরের মা সুষমা মণ্ডলও জানিয়েছেন, ছোট থেকেই পড়াশোনার প্রতি সাগরের প্রবল আগ্রহ ছিল। তাকে কখনও পড়তে বলতে হত না। সংসারে আর্থিক অভাব থাকা সত্ত্বেও ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি তারা। অনেক শিক্ষকও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কম টাকায় পড়িয়ে সাগরের স্বপ্নপূরণের পথে পাশে দাঁড়িয়েছেন তারা। এই মানবিক সহযোগিতাও সাগরের সাফল্যের পিছনে বড় ভূমিকা নিয়েছে।

প্রতিবেশীরাও সাগরের সংগ্রামের সাক্ষী। অনেক সময় প্রতিবেশীরা এসে তাকে রান্না করে দিয়েছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন। কারণ সকলেই জানতেন, ছোটবেলা থেকেই একা হাতে নিজের জীবন সামলাচ্ছে সে। কিন্তু এত কষ্টের মধ্যেও কখনও তাকে হতাশ হতে দেখা যায়নি। বরং সারাদিন পড়াশোনা আর নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়েই ব্যস্ত থাকত সাগর।

আজ সাগর মণ্ডল শুধু একটি নাম নয়, সে বাংলার হাজার হাজার সাধারণ পরিবারের আশা এবং স্বপ্নের প্রতীক। তার এই সাফল্য প্রমাণ করেছে যে গ্রামের সাধারণ ঘর থেকেও দেশের বড় প্রশাসনিক পদে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখা যায়। দারিদ্র্য কখনও প্রতিভাকে আটকে রাখতে পারে না, যদি মানুষের মধ্যে জেদ এবং পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকে।

নদীয়ার এই কৃতি ছাত্র আজ গোটা রাজ্যের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম। তার লড়াই, তার আত্মবিশ্বাস এবং তার স্বপ্ন আগামী প্রজন্মকে নতুন পথ দেখাবে। সমাজের জন্য কাজ করার যে স্বপ্ন সে দেখছে, তা যেন একদিন বাস্তবে রূপ নেয়— এই কামনাই করছেন সকলেই। সাগর মণ্ডলের এই অসাধারণ সাফল্য আগামী দিনে আরও বহু ছাত্রছাত্রীকে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস জোগাবে।

Preview image