ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং থেকে শুরু করে কিটো ডায়েট, মেডিটেরেনিয়ান থেকে ওম্যাড ডায়েট— সমাজমাধ্যম খুললেই ওজন কমানোর একাধিক পন্থা চোখে পড়বে। সম্প্রতি চিনের বাসিন্দাদের মধ্যে ওজন কমানোর নতুন ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। রোগা হতে প্লাস্টিক খেতে শুরু করেছেন তাঁরা!
বর্তমান সময়ে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন শুধু সৌন্দর্যের সমস্যা নয়, এটি একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও বটে। বিশ্বজুড়ে ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কোলেস্টেরল, থাইরয়েড, হরমোনের অসামঞ্জস্য, এমনকি মানসিক অবসাদের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে অতিরিক্ত ওজন। তাই চিকিৎসকেরা প্রায় সব ক্ষেত্রেই রোগীদের প্রথম পরামর্শ দেন— ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আর সেই কারণেই দ্রুত রোগা হওয়ার প্রবণতা আজ সমাজের নানা স্তরে ভয়াবহ ভাবে বেড়ে উঠেছে।
সমাজমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে একের পর এক ‘ম্যাজিক ডায়েট’। কেউ বলছেন ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং, কেউ কিটো ডায়েট, কেউ আবার ওম্যাড বা ওয়ান মিল আ ডে পদ্ধতিকে সামনে আনছেন। শরীরচর্চা, ডিটক্স ড্রিঙ্ক, লো-কার্ব ডায়েট— সব কিছু নিয়েই এখন মানুষের মধ্যে প্রবল আগ্রহ। কিন্তু এই প্রবণতার মধ্যেই সম্প্রতি চিনে দেখা দিয়েছে এক ভয়ংকর নতুন ট্রেন্ড, যা শুনলে অনেকেই অবাক হবেন। ওজন কমানোর জন্য মানুষ নাকি প্লাস্টিক খেতে শুরু করেছেন!
শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, চিনের কিছু মানুষের মধ্যে এই অদ্ভুত অভ্যাস ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। রোগা হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা মানুষকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে, যেখানে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পরিবর্তে শর্টকাট পথই হয়ে উঠছে মূল ভরসা। আর সেই শর্টকাটই শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এই অদ্ভুত পদ্ধতিতে খাবার খাওয়ার আগে একটি পাতলা প্লাস্টিকের টুকরো মুখে রাখা হয়। তার পর পছন্দের খাবার মুখে নিয়ে সেটি কিছু ক্ষণ চিবিয়ে স্বাদ অনুভব করা হয়। তবে খাবারটি গিলে ফেলা হয় না। কিছু সময় পরে প্লাস্টিক-সহ পুরো খাবারটিই মুখ থেকে বের করে ফেলা হয়।
এই পদ্ধতির পিছনে যুক্তি হল— খাবারের স্বাদ ও চিবানোর অনুভূতি মস্তিষ্ককে ‘খাবার খাওয়া হয়েছে’ এমন সংকেত দেয়। ফলে না খেয়েও পেট ভরা অনুভূতি তৈরি হয়। বিশেষ করে যাঁরা অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাসে ভোগেন কিংবা জাঙ্ক ফুডের প্রতি আসক্ত, তাঁদের জন্য এই পদ্ধতিকে নাকি কার্যকর বলা হচ্ছে।
অনেকেই মনে করছেন, এতে ক্যালোরি শরীরে প্রবেশ করছে না অথচ খাওয়ার ইচ্ছাও কমে যাচ্ছে। ফলে দ্রুত ওজন কমানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি যতটা সহজ মনে হচ্ছে, আদতে তা ততটাই বিপজ্জনক।
আজকের সমাজে ‘স্লিম’ বা ‘ফিট’ শরীর যেন এক ধরনের সামাজিক পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজমাধ্যমে অভিনেতা-অভিনেত্রী, ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সার বা মডেলদের নিখুঁত শরীর দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে চাপ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম দ্রুত ফল পেতে চাইছে। মাসের পর মাস শরীরচর্চা বা সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখার পরিবর্তে তারা খুঁজছে শর্টকাট।
এই মানসিকতাই মানুষকে বিপজ্জনক সব ডায়েটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কখনও অতিরিক্ত উপোস, কখনও শুধুমাত্র তরল খাবার, কখনও আবার দিনে একবার খাওয়া— এসবের ফলে শরীরের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। এখন সেই তালিকায় যোগ হয়েছে ‘প্লাস্টিক ডায়েট’।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের পদ্ধতি একেবারেই স্বাস্থ্যকর নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে তা শরীরের ভয়ংকর ক্ষতি করতে পারে। কারণ প্লাস্টিক মুখে রাখার সময় বা খাবারের সঙ্গে মেশার ফলে অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
বর্তমানে মাইক্রোপ্লাস্টিক বিশ্বজুড়ে এক বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। পানীয় জল, খাবার, বাতাস— সব জায়গাতেই এখন মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শরীরে জমতে জমতে নানা জটিল রোগের কারণ হতে পারে।
চিকিৎসকদের আশঙ্কা, এই ধরনের অভ্যাস থেকে ভবিষ্যতে ক্যানসার, হরমোনের সমস্যা, লিভারের অসুখ, কিডনির জটিলতা কিংবা প্রজনন সংক্রান্ত সমস্যাও তৈরি হতে পারে। শুধু তাই নয়, শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব তৈরি হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
অনেকেই মনে করেন কম খেলেই দ্রুত ওজন কমে যায়। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। শরীরের প্রয়োজনীয় ক্যালোরি, প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল— সব কিছুর সঠিক ভারসাম্য দরকার। দীর্ঘ সময় ধরে পর্যাপ্ত খাবার না খেলে শরীর প্রথমে জমে থাকা গ্লাইকোজেন ব্যবহার করে, পরে পেশি ক্ষয় হতে শুরু করে।
অর্থাৎ, ওজন কমলেও তা স্বাস্থ্যকর উপায়ে কমে না। বরং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, চুল পড়া, ত্বকের সমস্যা, হরমোনের অসামঞ্জস্য— এসব বাড়তে থাকে।
চিকিৎসকদের মতে, শরীরের ফ্যাট কমাতে হলে নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র না খেয়ে বা অস্বাভাবিক উপায়ে ওজন কমালে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
আজকের দিনে সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের জীবনযাত্রায় বিরাট প্রভাব ফেলছে। কে কী খাচ্ছেন, কীভাবে শরীরচর্চা করছেন, কোন ডায়েটে রোগা হচ্ছেন— সব কিছু মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। অনেক সময় কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়াই নানা টোটকা ছড়িয়ে পড়ে।
সমস্যা হল, সাধারণ মানুষ সেই তথ্য যাচাই না করেই অনুসরণ করতে শুরু করেন। অনেক ইনফ্লুয়েন্সার শুধুমাত্র ভিউ বা জনপ্রিয়তার জন্য বিপজ্জনক পরামর্শও দিয়ে থাকেন। ফলে তরুণ সমাজ বিভ্রান্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ডায়েট শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ প্রত্যেক মানুষের শরীর আলাদা। একজনের জন্য কার্যকর পদ্ধতি অন্যের ক্ষেত্রে ক্ষতিকরও হতে পারে।
ওজন কমানোর অতিরিক্ত চাপ অনেক সময় মানসিক সমস্যার জন্ম দেয়। শরীর নিয়ে অস্বস্তি, আত্মবিশ্বাসের অভাব, অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা— এসব থেকে উদ্বেগ ও হতাশা বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ ‘বডি ডিসমরফিয়া’ নামক মানসিক সমস্যায় ভোগেন। এতে নিজের শরীরকে সব সময় মোটা বা অসুন্দর বলে মনে হয়, যদিও বাস্তবে তা নয়। এর ফলে মানুষ চরম ডায়েট বা বিপজ্জনক পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়েন।
‘প্লাস্টিক ডায়েট’-এর মতো প্রবণতাও সেই মানসিক চাপেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন কমানোর জন্য কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি—
দ্রুত ফলের আশায় শর্টকাট না খুঁজে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের দিকে মন দেওয়া প্রয়োজন। কারণ সুস্থ শরীর গড়তে সময় লাগে, কিন্তু ভুল পদ্ধতিতে শরীর নষ্ট হতে সময় লাগে না।
চিকিৎসকদের স্পষ্ট বক্তব্য, প্লাস্টিক বা অন্য কোনও অস্বাভাবিক উপায়ে ওজন কমানোর চেষ্টা শরীরের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক হতে পারে। সাময়িক ভাবে ওজন কমলেও দীর্ঘমেয়াদে তার ভয়াবহ প্রভাব দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সব তথ্য সত্যি নয়। তাই কোনও ট্রেন্ড অনুসরণ করার আগে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে এই বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
রোগা হওয়ার ইচ্ছা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই ইচ্ছা যখন মানুষকে নিজের শরীরের ক্ষতি করার দিকে ঠেলে দেয়, তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চিনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ‘প্লাস্টিক ডায়েট’ সেই বিপজ্জনক প্রবণতারই উদাহরণ।
ওজন কমানোর জন্য শর্টকাটের লোভ অনেকের মধ্যেই কাজ করে। কিন্তু সুস্থ থাকার মূল মন্ত্র কখনওই কৃত্রিম বা বিপজ্জনক উপায় হতে পারে না। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সঠিক জীবনযাপনই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার একমাত্র পথ।
শরীরকে ভালবাসা মানে শুধু রোগা হওয়া নয়, বরং তাকে সুস্থ রাখা। তাই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া প্রতিটি ট্রেন্ড অন্ধভাবে অনুসরণ না করে সচেতন হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।